শুধু হেঁটে আসা হল কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ১৯৮৭, শারদীয়া দেশ
যেহেতু সামান্য-কিছু পুঁজিপাটা ছিল, তাই পথে ঘুমোতে পারিনি | দেখিনি পথের পাশে কী-কী ছিল, অথবা কিছুই ছিল কি না | গ্রাম ছিল ? চালাঘর, দালান, খড়ের গাদা ছিল ? দিঘি ছিল ? দিঘিতে মেঘের ছায়া ছিল ? নারী ও পুরুষ ছিল ? ছেলেপুলে ছিল ? কিংবা ফুটন্ত ভাতের গন্ধ কি ছড়িয়েছিল কখনও হাওয়ায় ? টুকরো-টুকরো দুটো-চারটে সাংসারিক কথাও বাতাসে ভেসে আসে | তেমন কথা কি কিছু কানে এসেছিল ?
পথ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে | কিন্তু পথে কী দেখেছি, কী শুনেছি, অথবা কিছুই দেখেছি-শুনেছি কি না, মনে নেই, কিছু মনে নেই | যেহেতু সামান্য-কিছু পুঁজিপাটা ছিল, তাই পথে ঘুমোতে পারিনি | চোখ খোলা ছিল, তবু দুই চক্ষু কিছুই দেখল না | কান খোলা ছিল, তবু কোনো শব্দ, কোনো কথা, কোনো গান মরমে ঢোকেনি | পাইনি পুষ্পের কিংবা ভাতের সৌরভ | দুই হাতে ছুঁয়েও দেখিনি কোনো-কিছু | যেহেতু সামান্য ছিল পুঁজিপাটা, তাই ওড়ানো গেল না তাও | শুধু অনেক দূরের থেকে হেঁটে চলে আসা হল, আর কিছুই হল না |
তবু সে হয়নি শান্ত | দীর্ঘ অমাবস্যার শিয়রে যে-রাত্রে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে মলিনলাবণ্য-স্নিগ্ধ জ্যোত্স্নার মমতা, যে-রাত্রে সমস্ত তুচ্ছ অর্থহীন কথা গানের মূর্ছনা হয়ে ওঠে শোক শান্ত হয়, দুঃখ নিভে আসে, যে-রাত্রে শীতার্ত মনে ফোটে কল্পনার সুন্দর কুসুম, নামে সান্ত্বনার জল চিন্তার আগুনে, আর আকন্যাকুমারীহিমাচল কপালে জ্যোত্স্নার পঙ্ক মেখে জেগে ওঠে অতলান্ত অন্ধকার সমুদ্রের থেকে--- তখনো দেখলাম তাকে, কী এক অশান্ত আশা নিয়ে সে খোঁজে রাত্রির পারাপার, দুই চোখে তার স্বপ্নের উজ্জ্বলশিখা প্রদীপ জ্বালিয়ে | সে এক পরম শিল্পী | সংশয়-দ্বিধার অন্ধকারে সে-ই বারে বারে আলোকবর্তিকা জ্বালে, দুঃখ তার পায়ে মাথা কোটে, তারই তো চুম্বনে ফুল ফোটে, সে-ই তো প্রাণের বন্যা ঢালে দামোদরে, গঙ্গার কি ভাকরা-নাঙালে | সে-এক আশ্চর্য কবি, পাথরের গায় সে-ই ব্রহ্মকমল ফোটায় |
কী যে নাম, মনে নেই তা’ তো--- আবদুল রহিম কিংবা শঙ্কর মাহাতো, অথবা অর্জুন সিং | মাঠে মাঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে সে জাগে সমস্ত রাত স্বপ্নের কোরক হাতে নিয়ে | আমার সমস্ত সুখ, সকল দুঃখের কাছাকাছি সে আছে, আমিও তাই আছি ||
চেনা ছবিগুলি ক্রমেই এখন অচেনা হয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় একটু-একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে অচেনা সব ছবি | অচেনা মানুষ, অচেনা ঘরবাড়ি, অচেনা নদী, অচেনা গাছ আর অচেনা ফুল |
রোজকার মতো আজ সকালেও ঘুম ভাঙবার পরে আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম | তখন যে আকাশটা আমার চোখে পড়েছিল, ঠিক তেমন আকাশ এর আগে আর কোনোদিনই আমি দেখিনি | মেঘে-মেঘে যে-সব রঙের খেলা দেখলুম, তার একটাও আমার চেনা নয় |
এইসব মানুষ, নদী, ঘরবাড়ি, গাছ, ফুল আকাশ আর মেঘ সাধারণত স্বপ্নের মধ্যেই দেখা যায় | কে জানে, আমাদের স্বপ্ন যেখানে বাস্তব হয়ে ওঠে, ঠিকমতো পথ চিনতে না-পেরে হয়তো সেইদিকেই আমি আমার পা বাড়িয়ে দিয়েছি |
অমলকান্তি আমার বন্ধু, ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম | রোজ দেরি করে ক্লাসে আসত, পড়া পারত না, শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকত যে, দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের |
আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল | অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি | সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল | ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর, জাম আর জামরুলের পাতায় যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে |
আমরা কেউ মাস্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল | অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি | সে এখন অন্ধার একটা ছাপাখানায় কাজ করে | মাঝে-মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে ; চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, ‘উঠি তা হলে |’ আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি |
আমাদের মধ্যে যে এখন মাস্টারি করে, অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত ; যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল , উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না | অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া | অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি | সেই অমলকান্তি--- রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে ভাবতে-ভাবতে যে একদিন রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছিল |
যে আমার পক্ষে নেই, সে আমার বিপক্ষ-শিবিরে ঢুকেছে নির্ঘাত | যে আমার বন্ধু নয়, সে আমার শত্রুতাসাধনে অবশ্যই বদ্ধপরিকর | আসলে নির্দল কিংবা নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই, কোনোখানে ছিল না কখনো |
কথাটা এখন খুব শুনছ বটে, তবে এটা কোনো আনকোরা নতুন কথা নয় | নেহেরুর নিরপেক্ষ নির্জোট নীতিকে ঠেস দিয়ে বিগত শতকে মার্কিন মুল্লুকে জন ফস্টার ডালেস এমনই বলতেন, মনে পড়ে |
এ বড় নির্বোধ কথা, সর্বদেশে গ্রামে ও শহরে রয়েছে নির্দল বহু লোক | যারা কোনো দলে নেই, পক্ষে নেই, যারা যুধ্যমান দলগুলির কার্যাকার্য দেখে যা সিদ্ধান্ত করার, নির্ভুল তা-ই করে | তেমনি লোক এ-দেশেও অবশ্য রয়েছে লাখে-লাখে |
একটা কথা বলি এই ফাঁকে : ও দলভুক্তেরা, তোমরা সব্বাই এককাট্টা হয়ে গিয়ে এ-দেশের সবটা যেন দখল কোরো না | দলে ঢুকতে চায়নি যারা কস্মিনকালেও, তাদের জন্যেও অন্তত খানিকটা যেন জায়গাজমি থাকে |
এইরকমই হয়ে থাকে, এইরকমই হয় | বারে বারে ঘুরেঘুরে হয় | মাঝখানে কয়েকটা বর্ষ বা যুগ কেটে যায় বলে তোমরা তা বোঝো না | কিংবা বুঝতে পারলেও সে-কথা প্রকাশ্যে বলো না | তোমরা বলো ; ইতিহাস একই রাস্তা ধরে চিরকাল হাঁটে না বলেই তার ঘটনাক্রমের কক্ষনো পুনরাবৃত্তি ঘটতে আমরা দেখি না কোথাও | আমি বলি : এইরকমই একটা প্রবচন ইংরেজি ভাষায় আছে বটে ; কিন্তু সেটা সত্য নয়, স্থানকালপাত্রপাত্রী পালটায় যদিও, বিস্তর ঘটনা ইতিহাসে ঘুরে ঘুরে নিরন্তর ঘটে | তোমরা সেটা মানো বা না-মানো, এই সত্যটাই কিন্তু ধরা আছে বিশ্ব-ইতিহাসে | বারে বারে ঘুরে ঘুরে আসে, সত্যি-সত্যি নির্ভুল পথ চিনে ফিরে আসে যা অতীতে ঘটেছিল সেই সমস্ত ঘটনা আবার--- প্রায় ঋতুচক্রের মতন | এতে নেই সন্দেহ সংশয় এক তিলও | বঙ্গোপসাগর থেকে যেমন আয়লা এসেছিল দিন কয়েক আগে | কিন্তু সেও নতুন ঘটনা নাকি ? ভিন্ন ভিন্ন নামে ইতিপূর্বে এই ঝড় এসেছে বহুবার | তবে কিনা শুধু ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, ইতিহাসে একই প্রকৃতির অন্যান্য ঘটনা--- যুদ্ধ দাঙ্গা উপপ্লব শত্রুতা ও সন্ধি আর উত্থান-পতনও--- বারে বারে ঘটে | তোমরা বলো, ইতিহাসে কক্ষনো পুনরাবৃত্তি কোথাও ঘটে না | তোমরা ভুল বলো |
লাল বাতির নিষেধ ছিল না, তবুও ঝড়ের-বেগে-ধাবমান কলকাতা শহর অতর্কিতে থেমে গেল ; ভয়ঙ্কর ভাবে টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ট্যাকসি ও প্রাইভেট, টেম্ পো, বাঘমার্কা ডবলডেকার | ‘গেল গেল’ আর্তনাদে রাস্তায় দু-দিক থেকে যারা ছুটে এসেছিল --- ঝাঁকামুটে, ফিরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার --- এখন তারাও যেন স্থিরচিত্রটির মতো শিল্পীর ইজেলে লগ্ন হয়ে আছে | স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে, টালমাটাল পায়ে রাস্তার এক পার থেকে অন্য-পারে হেঁটে চলে যায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি শিশু |
খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গিপাড়ায় | এখন রোদ্দুর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মতো মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে নেমে আসছে : মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর |
স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে | ভিখারি-মায়ের শিশু, কলকাতার যিশু, সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ | জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি, কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই ; দু-দিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার মাঝখান দিয়ে টলতে টলতে হেঁটে যাও | যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও হাতের মুঠোয় | যেন তাই টালমাটাল পায়ে তুমি পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য-কিনারে চলেছ |
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে আজ বড় বেশী বিমর্ষ দেখলুম চিড়িয়াখানায়, তুমি ঝিলের কিনারে দারুণ দুঃখিতভাবে বসেছিলে | তুমি একবারও উঠলে না এসে লোহার দোলনায় ; চাঁপাকলা, বাদাম, কাবলি-ছোলা--- সবকিছু উপেক্ষিত ছড়ানো রইল | তুমি ফিরেও দেখলে না | দুঃখী মানুষের মত হাঁটুর ভিতরে মাথা গুঁজে ঝিলের কিনারে শুধু বসে রইলে | একা
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে কেন এত বেশী বিমর্ষ দেখলুম ? কি দুঃখ তোমার ? তুমি মানুষের মতো হতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ বছরের সিঁড়ি ভেঙে এসেছিলে, তবু মাত্রই কয়েকটা সিঁড়ি টপকাবার ভুলে মানুষ হওনি | এই দুঃখে তুমি ঝিলের কিনারে বসে ছিলে নাকি ?
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে আজ বড় বেশী দুঃখিত দেখলুম | প্রায় হয়েছিলে, তবু সম্পূর্ণ মানুষ হওনি, হয়তো সেই দুঃখে তুমি আজ দোলনায় উঠলে না ; তুমি ছেলেবুড়ো দর্শক মজিয়ে অর্ধমানবের মতো নানাবিধ কায়দা দেখালে না, হয়তো দেখনি তুমি, কিংবা দেখেছিলে, দর্শকেরা পুরোপুরি বাঁদুরে কায়দায় তোমাকে টিটকিরি দিয়ে বাঘের খাঁচার দিকে চলে গেল |
অনেক রাত্রি হল, এখানে এখন ঘুম নামবে, এখানে ঘুম থামবে | ক্লান্ত, তবু সারি-সারি নিঝ্ ঝুম গাছের খোকারা বুঝি জেগে আছে, তারা বুঝি ঘুমোইনি ? সক্কলে ঘুমিয়েছে, সব্বাই চুপচাপ | এরা শুধু এখনো জাগ্ নো, তাই আবছা-আবছা দূর পাহাড়ের ধার দিয়ে এখানে এখন ঘুম নামবে, এখানে ঘুম থামবে, . এখন ঘুম নামবে |
অনেক রাত্রি হল, এখানে এখন ঘুম নামবে, এখানে ঘুম দুষ্টু খোকারা বুঝি জেগে আছে, তারা বুঝি ঘুমায়নি ? গাছপালা মাঠঘাট সব্বাই ঘুমিয়েছে ? এরা শুধু এখনো জাগ্ নো তাই গাছের খোকারা দুই চোখ থেকে ঘুম নিয়ে আবছায়া স্বপ্নের লাল কুমকুম নিয়ে এখানে এখন ঘুম নামবে, এখানে ঘুম থামবে . এখন ঘুম নামবে |