যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল সন্ধ্যার বাতাসে |
কে এইখানে এসেছিল অনেক আগে, কে এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে | কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে, এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে | ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না, নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না !
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে | ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে |
ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা, ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা | সারাটা দিন আপন মনে গাসের গন্ধ মাখে, সারাটা রাত তারায়-তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে | ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না, নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না | যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে | ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল সন্ধ্যার বাতাসে | নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি, হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি | তেমনি করেই সূর্য ওঠে, তেমনি করেই ছায়া নামলে আবার ছুটে আসে সান্ধ্য নদীর হাওয়া | ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না, নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না |
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে | এখনও সেই ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে |
একদিন সমস্ত যোদ্ধা বিষণ্ণ হবার মন্ত্র শিখে যাবে | একদিন সমস্ত বৃদ্ধ দুঃখহীন বলতে পারবে, যাই | একদিন সমস্ত রক্ত আর ঘাম অর্থ পাবে ভিন্ন রকমের | একদিন সমস্ত শিল্পী কল্পনার প্রতিমা বানাবে | একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো | একদিন সমস্ত ধর্মযাজকের উর্দি কেড়ে নিয়ে নিষ্পাপ বালক বলবে, হা হা | একদিন এইসব হবে বলেই এখনও সূর্য ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, এবং কবিতা লেখা হয় |
এখনও তোমার সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাই ; এখনও তোমার সেই দারুণ বিলাপ কানে বাজে | গগনবিহারী চিল, খর দীপ্র দুপুরবেলায় তুমি এক আকাশের থেকে অন্য আকাশের দিকে তেজস্বী ও স্বভাবত-সঙ্গিহীন সম্রাটের মতো সহজ উল্লাসে বাতাসে সাঁতার কেটে চলেছিলে | যেতে যেতে, শূন্যের মেখলা থেকে যে-রকম উল্ক খসে যায়, তুমিও সহসা সেইরকম ঊর্ধ্বাকাশ থেকে এই গৃহস্থবাড়ির বারান্দায় ছিটকে পড়েছিলে |
মুহূর্তে কাকের মেলা বসে গেল ছাতের কার্নিসে | কা-কা-অট্টহাসির বিদ্রূপে ভরে উঠল দ্বিপ্রহর | তখনও মরোনি তুমি | দুই চক্ষু ঘোলাটে ও ঘূর্ণমান, বাদামি শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে, ফের আকাশে উঠবার শক্তি নেই, তবু তুমি শরীরের শেষ বিন্দু সামর্থ্য সংগ্রহ করে প্রাণপণে ঝাপটাচ্ছে ডানা, কখনও-বা বাঁকিয়ে উদ্ধত গ্রীবা ঘৃণাভরে দেখে নিচ্ছ অদূরে অপেক্ষমাণ শত্রুদের | গগনবিহারী চিল | যারা ঊর্দ্ধে উঠতে পারে না, আর পারে না বলেই যারা পূথীবর ভাগারে ও আঁস্তকুড়ে কাপুরুষ মাস্তানের মতো দঙ্গল পাকিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের হাতে কি কখনও আমি উর্দ্ধচারী মানুষের লাঞ্ছনা দেখিনি ? দেখেছি অসংখ্যবার | বুঝেছি যে লাঞ্ছনাই স্বাভাবিক | এমন কী, লাঞ্ছনা আর নিগ্রহের ফলে মানুষের দীপ্তি ও মহিমা আরও বেড়ে যায় | অথচ সমস্ত দেখে, সমস্ত বুঝেও---- মূর্খ আমি ---- দলবদ্ধ কাকের গুণ্ডামি থেকে তোমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলুম | তোমাকে বারান্দার থেকে তুলে এনে স্নানঘরের মধ্যে আটকে রেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবতে পেরেছিলুম, তোমার মর্যাদা বাঁচানো গেল |
এখন বুঝতে পারি, বস্তুত তোমাকে এক বিদ্রূপের থেকে আরও ক্রুর, আরও ভয়ংকর বিদ্রূপের ভিতরে নিক্ষেপ করেছিলুম সেদিন | গগনবিহারী চিল, বৈদুর্যমণির তীব্রদাহনে উজ্জ্বল খর দুপুরবেলায় সম্রাটের মতো তুমি সমস্ত আকাশ ঘুরে এসে তারপর শহরতলির এক গৃহস্থের ছয় বাই তিন ফুট ওই কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়েছিল | সারারাত্রি ঝাপট মেরেছ তুমি কাটের দরজায়, নখরে আঁচড়েছ মেঝে, সারারাত আপন সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত, বিদ্যুত হবার অপমানে, গ্লানিতে ও যন্ত্রণায় চিত্কার করছে |
অমন ধারালো, শুকনো, বুকফাটা আর্তনাদ আমি কখনও শুনিনি | মনে হয়েছিল, যেন পাখি নয়, বিশ্ব-চরাচর আজ রাত্রে ওই কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়ে চিত্কার করছে | গগনবিহারী চিল, সকালে তোমাকে আমি মুক্তি দেব বলে দরজা খুলে দেখলুম, মেঝের উপরে তুমি স্থির ও নিঃশব্দ হয়ে পড়ে আছ, তখন আবার মনে হয়েছিল, তুমি পাখি নও. তুমি অফুরন্ত আকাশের প্রাণমূর্তি, যেন সমস্ত আকাশ আজ নিতান্ত ছাপোষা এক গৃহস্থের কলঘরের ক্লিন্ন অন্ধকারে
নিজের কাছে স্বীকারোক্তি কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
আমি পাহাড় থেকে পড়তে পড়তে . তোমাকে ধরে বেঁচে রয়েছি, কবিতা | আমি পাতালে ডুবে মরতে মরতে . তোমাকে ধরে আবার ভেসে উঠেছি | আমি রাজ্যজয় করে এসেও . তোমার কাছে নত হয়েছি, কবিতা | আমি হাজার দরজা ভালোবেসেও . তোমার বন্ধ দুয়ারে মাথা কুটেছি | . কখনও এর, কখনও ওর দখলে . গিয়েও ফিরি তোমারই টানে, কবিতা | . আমাকে নাকি ভীষণ জানে সকলে, . তোমার থেকে বেশি কে জানে, কবিতা ? আমি ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াই, . গোপন রাখি সকল শোক, কবিতা | আমি শ্মশানে ফুল ঘটাব, তাই . তোমার বুকে চেয়েছি ঢেউ রটাতে | আমি সকল সুখ মিথ্যে মানি, . তোমার সুখ পূর্ণ হোক, কবিতা | আমি নিজের চোখ উপড়ে আনি, . তোমাকে দিই, তোমার চোখ ফোটাতে | তুমি তৃপ্ত হও, পূর্ণ হও, . জ্বালো ভূলোক, জ্বালো দ্যুলোক কবিতা |
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর নদীর ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছি | পিতামহ, দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি, রাত্রির আকাশে ওঠেনি একটাও তারা আজ | পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়েছি আশ্রয় | আমি ভিতরে বাহিরে যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে যেখানে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে যেখানে তাকাই --- শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার | পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর সময়ে বেঁচে আছি |
এই এক আশ্চর্য সময় | যখন আশ্চর্য বলে কোনো-কিছু নেই | যখন নদীতে জল আছে কি না আছে কেউ তা জানে না | যখন পাহাড়ে মেঘ আছে কি না আছে কেউ তা জানে না | পিতামহ, আমি এক আশ্চর্য সময়ে বেঁচে আছি | যখন আকাশে আলো নেই, যখন মাটিতে আলো নেই, যখন সন্দেহ জাগে, যাবতীয় আলোকিত ইচ্ছার উপরে রেখেছে নিষ্ঠুর হাত পৃথিবীর মৌলিক নিষাদ ---- এই ভয় |
পিতামহ, তোমার আদেশ নীল--- কতখানি নীল ছিল ? আমার আকাশ নীল নয় | পিতামহ, তোমার হৃদয় নীল--- কতখানি নীল ছিল ? আমার হৃদয় নীল নয় | আকাশের, হৃদয়ের যাবতীয় নীলিমা আপাতত কোনো-এক স্থির অন্ধকারে শুয়ে আছে | পিতামহ, আমি সেই ভয়ের দারুণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছি ! পিতামহ, দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি রাত্রির আকাশে ওঠেনি একটাও তারা আজ | মনে হয়, আমি এক অমোঘ মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়েছি আশ্রয় | আমি ভেতরে বাহিরে যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে যেখানে তাকাই--- শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার অন্ধকারে জেগে আছে মৌলিক নিষাদ--- এই ভয় |