কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা
*
আবহমান
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল
সন্ধ্যার বাতাসে |

কে এইখানে এসেছিল অনেক আগে,
কে এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে |
কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে,
এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে |
ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না !

যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে |
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল,
সন্ধ্যার বাতাসে |

ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা,
ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা |
সারাটা দিন আপন মনে গাসের গন্ধ মাখে,
সারাটা রাত তারায়-তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে |
ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না |
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে |
ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল
সন্ধ্যার বাতাসে |
নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি,
হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি |
তেমনি করেই সূর্য ওঠে, তেমনি করেই ছায়া
নামলে আবার ছুটে আসে সান্ধ্য নদীর হাওয়া |
ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না,
নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না |

যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া,
লাউমাচাটার পাশে |
এখনও সেই ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল,
সন্ধ্যার বাতাসে |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
একদিন এইসব হবে তাই
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

একদিন সমস্ত যোদ্ধা বিষণ্ণ হবার মন্ত্র শিখে যাবে |
একদিন সমস্ত বৃদ্ধ দুঃখহীন বলতে পারবে, যাই |
একদিন সমস্ত রক্ত আর ঘাম অর্থ পাবে ভিন্ন রকমের |
একদিন সমস্ত শিল্পী কল্পনার প্রতিমা বানাবে |
একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো |
একদিন সমস্ত ধর্মযাজকের উর্দি কেড়ে নিয়ে
নিষ্পাপ বালক বলবে, হা হা |
একদিন এইসব হবে বলেই এখনও
সূর্য ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, এবং কবিতা লেখা হয় |

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
কলঘরে চিলের কান্না
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

এখনও তোমার সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাই ;
এখনও তোমার সেই দারুণ বিলাপ
কানে বাজে |
গগনবিহারী চিল,
খর দীপ্র দুপুরবেলায়
তুমি এক আকাশের থেকে অন্য আকাশের দিকে
তেজস্বী ও স্বভাবত-সঙ্গিহীন সম্রাটের মতো
সহজ উল্লাসে
বাতাসে সাঁতার কেটে চলেছিলে |
যেতে যেতে,
শূন্যের মেখলা থেকে যে-রকম উল্ক খসে যায়,
তুমিও সহসা সেইরকম
ঊর্ধ্বাকাশ থেকে এই গৃহস্থবাড়ির বারান্দায়
ছিটকে পড়েছিলে |

মুহূর্তে কাকের মেলা বসে গেল ছাতের কার্নিসে |
কা-কা-অট্টহাসির বিদ্রূপে
ভরে উঠল দ্বিপ্রহর |
তখনও মরোনি তুমি | দুই চক্ষু
ঘোলাটে ও ঘূর্ণমান, বাদামি শরীর
কেঁপে কেঁপে উঠছে,  ফের আকাশে উঠবার
শক্তি নেই, তবু তুমি
শরীরের শেষ বিন্দু সামর্থ্য সংগ্রহ করে
প্রাণপণে ঝাপটাচ্ছে ডানা, কখনও-বা
বাঁকিয়ে উদ্ধত গ্রীবা
ঘৃণাভরে দেখে নিচ্ছ
অদূরে অপেক্ষমাণ শত্রুদের |
গগনবিহারী চিল | যারা ঊর্দ্ধে উঠতে পারে না, আর
পারে না বলেই যারা
পূথীবর
ভাগারে ও আঁস্তকুড়ে কাপুরুষ মাস্তানের মতো
দঙ্গল পাকিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের
হাতে কি কখনও আমি উর্দ্ধচারী মানুষের
লাঞ্ছনা দেখিনি ?
দেখেছি  অসংখ্যবার | বুঝেছি যে লাঞ্ছনাই স্বাভাবিক |
এমন কী, লাঞ্ছনা আর নিগ্রহের ফলে
মানুষের দীপ্তি ও মহিমা আরও বেড়ে যায় |
অথচ সমস্ত দেখে, সমস্ত বুঝেও---- মূর্খ আমি ----
দলবদ্ধ কাকের গুণ্ডামি থেকে
তোমাকে  বাঁচাতে গিয়েছিলুম | তোমাকে
বারান্দার থেকে তুলে এনে
স্নানঘরের মধ্যে আটকে রেখে
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবতে পেরেছিলুম, তোমার
মর্যাদা বাঁচানো গেল |

এখন বুঝতে পারি, বস্তুত তোমাকে
এক বিদ্রূপের থেকে আরও  ক্রুর, আরও ভয়ংকর
বিদ্রূপের ভিতরে নিক্ষেপ করেছিলুম সেদিন |
গগনবিহারী চিল,
বৈদুর্যমণির তীব্রদাহনে উজ্জ্বল খর দুপুরবেলায়
সম্রাটের মতো তুমি সমস্ত আকাশ ঘুরে এসে
তারপর
শহরতলির এক গৃহস্থের
ছয় বাই তিন ফুট ওই কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়েছিল |
সারারাত্রি ঝাপট মেরেছ তুমি
কাটের দরজায়,
নখরে আঁচড়েছ মেঝে, সারারাত
আপন সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত, বিদ্যুত হবার
অপমানে, গ্লানিতে ও যন্ত্রণায়
চিত্কার করছে |

অমন ধারালো, শুকনো, বুকফাটা আর্তনাদ আমি
কখনও শুনিনি |
মনে হয়েছিল, যেন পাখি নয়, বিশ্ব-চরাচর
আজ রাত্রে ওই
কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়ে চিত্কার করছে |
গগনবিহারী চিল,
সকালে তোমাকে আমি মুক্তি দেব বলে
দরজা খুলে দেখলুম,
মেঝের উপরে তুমি স্থির ও নিঃশব্দ হয়ে পড়ে আছ,
তখন আবার মনে হয়েছিল,
তুমি পাখি নও. তুমি অফুরন্ত আকাশের প্রাণমূর্তি, যেন
সমস্ত আকাশ আজ
নিতান্ত ছাপোষা এক গৃহস্থের
কলঘরের ক্লিন্ন অন্ধকারে

মরে পড়ে আছে |

.        *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
নিজের কাছে স্বীকারোক্তি
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

আমি     পাহাড় থেকে পড়তে পড়তে
.           তোমাকে ধরে বেঁচে রয়েছি, কবিতা |
আমি     পাতালে ডুবে মরতে মরতে
.           তোমাকে ধরে আবার ভেসে উঠেছি |
আমি      রাজ্যজয় করে এসেও
.            তোমার কাছে নত হয়েছি, কবিতা |
আমি      হাজার দরজা ভালোবেসেও
.            তোমার বন্ধ দুয়ারে মাথা কুটেছি |
.            কখনও এর, কখনও ওর দখলে
.            গিয়েও ফিরি তোমারই টানে, কবিতা |
.            আমাকে নাকি ভীষণ জানে সকলে,
.            তোমার থেকে বেশি কে জানে, কবিতা ?
আমি      ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াই,
.            গোপন রাখি সকল শোক, কবিতা |
আমি      শ্মশানে ফুল ঘটাব, তাই
.            তোমার বুকে চেয়েছি ঢেউ রটাতে |
আমি      সকল সুখ মিথ্যে মানি,
.            তোমার সুখ পূর্ণ হোক, কবিতা |
আমি      নিজের চোখ উপড়ে আনি,
.            তোমাকে দিই, তোমার চোখ ফোটাতে |
তুমি       তৃপ্ত হও, পূর্ণ হও,
.            জ্বালো ভূলোক, জ্বালো দ্যুলোক কবিতা |

.        *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
মৌলিক নিষাদ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর নদীর ঠিক পাশে
দাঁড়িয়ে রয়েছি | পিতামহ,
দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি, রাত্রির আকাশে
ওঠেনি একটাও তারা আজ |
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর মৃত্যুর কাছাকাছি
নিয়েছি আশ্রয় | আমি ভিতরে বাহিরে
যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে
যেখানে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে
যেখানে তাকাই --- শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার |
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর সময়ে বেঁচে আছি |

এই এক আশ্চর্য সময় |
যখন আশ্চর্য বলে কোনো-কিছু নেই |
যখন নদীতে জল আছে কি না আছে
কেউ তা জানে না |
যখন পাহাড়ে মেঘ আছে কি না আছে
কেউ তা জানে না |
পিতামহ, আমি এক আশ্চর্য সময়ে বেঁচে আছি |
যখন আকাশে আলো নেই,
যখন মাটিতে আলো নেই,
যখন সন্দেহ জাগে, যাবতীয় আলোকিত ইচ্ছার উপরে
রেখেছে নিষ্ঠুর হাত পৃথিবীর মৌলিক নিষাদ ---- এই ভয় |

পিতামহ, তোমার আদেশ
নীল--- কতখানি নীল ছিল ?
আমার আকাশ নীল নয় |
পিতামহ, তোমার হৃদয়
নীল--- কতখানি নীল ছিল ?
আমার হৃদয় নীল নয় |
আকাশের, হৃদয়ের যাবতীয় নীলিমা
আপাতত কোনো-এক স্থির অন্ধকারে শুয়ে আছে |
পিতামহ, আমি সেই ভয়ের দারুণ অন্ধকারে
দাঁড়িয়ে রয়েছি ! পিতামহ,
দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি রাত্রির আকাশে
ওঠেনি একটাও তারা আজ |
মনে হয়, আমি এক অমোঘ মৃত্যুর কাছাকাছি
নিয়েছি আশ্রয় |  আমি ভেতরে বাহিরে
যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে
যেখানে তাকাই--- শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার
অন্ধকারে জেগে আছে মৌলিক নিষাদ--- এই ভয় |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
স্বপ্নে-দেখা ঘরদুয়ার
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

পুকুর, মরাই, সবজি-বাগান, জংলা ডুরে শাড়ি,
তার মানেই তো বাড়ি |
তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,
নিকিয়ে-নেওয়া উঠোনখানি রোদ্দুরে টান্-টান্ |
ধান খুঁটে খায় চারটে চড়ুই, দোলমঞ্চের পাশে
পায়রাগুলো ঘুরে বেড়ায় ঘাসে |
বেড়ালটা আড়মোড়া ভাঙছে ; কুকুরটা কান খাড়া
করে শুনছে, কথা বলছে কারা |
পূবের সূর্য পশ্চিমে দেয় পাড়ি,
দুপুরবেলায় ঘুমের থেকে জেগে উঠছে বাড়ি |
লাঠির ডগায় পুঁটলি বাঁধা, অনেকটা পথ ঘুরে
লোকটা যাচ্ছে দূরের থেকে দূরে |
ওর চোখেও কি এমন একটা বাড়ির স্বপ্ন টানা
ওর মনেও কি গন্ধ ছড়ায় গোপন হাস্ নুহানা
ও বড়বউ, ডাকো, ওকে ডাকো
ওই যে লোকটা পার হয়ে যায় কাঁসাই নদীর সাঁকো |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর