কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা
*
ভালবাসার জন্য
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী   
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত ‘বাংলা আধুনিক কবিতা ১ কাব্য
সংকলন, ১৯৯২ থেকে।

এই প়ৃথিবীর মধ্যে ছিল
হাজার-হাজার মানুষ, বাড়ি,
ফুলবাবু আর দিনভিখারী,
অরণ্য, পথ, নদী, পাহাড়,
রৌদ্র, জ্যোত্স্না, কুজ্ঝটি আর
আকাশ জুড়ে অজস্র রং |
খানিকটা তার গদ্যে এবং
খানিকটা তার পদ্যে ছিল |

এই পৃথিবীর মধ্যে ছিল
অনন্ত এক শীতলপাটি |
অনেক দাঙ্গা ঝগড়াঝাঁটি
পার হয়ে তাই ভালোবাসা
জাগিয়েছিল অনেক আশা,
ফুটিয়েছিল অজস্র রং |
খানিকটা তার গদ্যে এবং
খানিকটা তার পদ্যে ছিল |

.       *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
ঈশ্বরের মুখোমুখি
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী   
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত ‘বাংলা আধুনিক কবিতা ১ কাব্য
সংকলন, ১৯৯২ থেকে।

পাহাড়টাকে
মস্ত একটা ময়াল সাপের মতন
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে যে
সরকারি সড়ক,
তার ল্যাজা থেকে
পাক খেতে-খেতে, পাক খেতে-খেতে
পাক খেতে-খেতে
হঠাৎ একসময়
মুড়োয় উঠেই আমি অবাক |

অবাক কেন, এই তো ?
তা হলে শুনুন,
আমি মোটেই বুঝতে পারি নি যে,
ঈশ্বর সেখানে
আমারই জন্যে অপেক্ষা করছেন |

সে ভারি সুন্দর জায়গা |
আমি যখন পৌঁছই,
এক ঝাঁক সাদা-পায়রা তখন তাঁর
লাল-টালির-ছাউনি-দেওয়া বাড়ির
বারান্দা থেকে
গমের দানা খুঁটে খাচ্ছিল |

একগাল হেসে
ঈশ্বর আমার সামনে এসে
দাঁড়ালেন !
তারপর তাঁর বাঁ হাতের তর্জনী তুলে
নীচের মাঠটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন,
‘আরও গম ফলাও, যাতে আমি আরও অনেক
পায়রা পুষতে পারি |’

হুকুম তো পেয়েই গেলুম |
সরকারি সড়কের মুড়ে থেকে
পাক খেতে-খেতে, পাক খেতে-খেতে
পাক খেতে-খেতে
আবার সেই তার ল্যাজার দিকেই আমি এখন
নেমে আসছি |

.       *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
প্রেমিকের তুমি
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী   
মেঘ বসু সম্পাদিত ‘হে প্রেম’ কাব্য সংকলন, ২০১১, থেকে নেওয়া।

চুলের ফিতায় ঝুল-কাঁটাতারে আরও একবার
শেষবার ধাঁপ দিতে আজ
বড় সাধ হয় | আজ দুর্বল হাঁটুতে
আরও একবার, শেষবার,
নবীন প্রতিজ্ঞা, জোর অনুভব করে নিয়ে ধ্বংসের পাহাড়
বেয়ে টান উঠে যেতে ইচ্ছা হয়
মেঘলোকে | মনে হয়,
স্মৃতির পাতাল কিংবা অভ্রভেদী পাহাড়ের চূড়া
ব্যতীত কোথাও তার ভূমি নেই |

প্রেমিকের নেই | তাই অতল পাতালে
অথবা পাহাড়ে তার দৃষ্টি ধায় |
মনে হয়, অন্ধকারে কোটি জোনাকির শবদেহ
মাড়িয়ে আবার ঝুল-কাঁটাতারে চুলের ফিতায়---
ভীষণ লাফিয়ে পড়ি | অথবা হাঁটুতে
নবীন রক্তের জোর অনুভব করে নিয়ে যুগল পাহাড়
ভেঙে উঠে যাই মেঘলোকে |
আরও একবার যাই, আরও একবার, শেষবার |

.       *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
হুল্লো বিল্লি
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী   
কবি পৃথ্বীরাজ সেন সম্পাদিত ‘দশ দিগন্তের বাংলা কবিতা’ কাব্য সংকলন, ২০১২, থেকে
নেওয়া।

হ্যাল্লো – হ্যাল্লো --- হুল্লো বিল্লি
মাঝরাত্তিরে তোর চিল্লা চিল্লি
.        ভাগাল্লো ঘুম |
জাগাল্লি পাড়া তুই, ভয়ে অস্থির
সক্কলে শোনে তোর কাল্লোয়াতির
.        হল্লার ধূম |
পেটে নেই ভাত, নাকি পায়ে নেই তোর
নাগরা, কিংবা শীত গায়ে নেই তোর
.        ব়্যাপার নাকি ?
সিপাই-সান্ত্রি ভাবে, লালকিল্লায়
হুল্লোটা কেন আজ এত চিল্লায়
.        ব্যাপারটা কী ?
উল্লুক নয় তো সে, বেল্লিকও নয়.
হাল্লুমচন্দ্রের মেসোমহাশয়,
.        তিনিই কিনা
দিল্লিতে চিল্লান, “মেয়াঁও, মেয়াঁও
ইল্লিশ, রোহি আর কাতলা লে আও |
.        মছলি বিনা
চলবে না |” তাই শুনে বৃদ্ধ কাজি
বললেন, “ইসি লিয়ে হল্লাবাজি
.        শুন্ রে বিলাই,
চাহে তো তুমকো ম্যায় আজ রাতভর
মোরগ-মুসল্লম বিরিয়ানি অওর
.        ফির্নি খিলাই |”
কবি কয়, “ঠিক কথা, মছলি যে খায়,
দিল্লির পাট তুলে সে-ই চলে যায়
.        মছ্ লি পতন |
মাছের জন্য আর মেঁয়াও মেঁয়াও
না-করে হুল্লো তবে চুপচাপ খাও
.        মুর্গি-মটন |”

.       *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
হৃদয়-সময়-স্বপ্ন
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী                     ‘
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

আর কেন, হে হৃদয়, বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে সারাদিন
কী লাভ চিন্তার ভেলা ভাসিয়ে ? অস্পষ্ট দূর তটে
যদি ফিরে যেতে চাও, লোনাগন্ধ হাওয়ার ঝাপটে
যদি সেই ব্যথানম্র মেয়ের বিষণ্ণ ভালোবাসা
মনে পড়ে যদি চোখে ছায়া নামে করুণ মসৃণ,
সমুদ্রের থেকে ঘরে, ঘর ছেড়ে সমুদ্রে আবার
ইচ্ছার অস্থির শীর্ণ সেতু বেয়ে এই যাওয়া-আসা
আর কেন ? হে হৃদয়, এই পারাপার কেন আর ?

আর কেন, হে সময়, অন্তহীন উজ্জ্বল প্রভায়
কেন আর উদ্ভাসিত হতে চাও ? মনের গভীরে
যে-সঙ্গীত ঝড়ে গেছে, তারো ম্লান আকর্ষণ ছিঁড়ে
এখনো হওনি মুক্ত | শিশুর অস্ফুট মৃদু ভাষা
প্রণয়কাকলি কান্না বিস্মৃতির অতল গুহায়
যদি জেগে উঠে ফের তবে এই আকাঙ্ক্ষা আবার
সম্মুখে চলার কেন ? ফিরে ফিরে এই যাওয়া-আসা
আর কেন ? হে সময়, এই পারাপার কেন আর ?

হে স্বপ্ন, চিন্তার জ্যোতি, হৃদয়ের সময়ের গ্লানি
তোমাকে করেছে স্পর্শ, তোমাকেও | উজ্জ্বল জ্যোতির
চক্র নিভে আসে, সঙ্গী-সঙ্গীতের প্রশান্ত গম্ভীর
সমস্ত মূর্ছনা স্তব্ধ | আলো নেই, নীরন্ধ্র হতাশা
এবার, এখন | মৃদু কান্নার অসহ্য কানাকানি |
হে স্বপ্ন, হে ছিন্নপক্ষ বিহঙ্গম, তাহলে আবার
দিগন্তবিসারী সাধ কেন ? তবে এই যাওয়া-আসা
আর কেন ? প্রাণতীর্থে এই পারাপার কেন আর ?

চিন্তার অঙ্গারে দগ্ধ এ-হৃদয়, সম্মুখের দিকে
সময় চলে না | স্বপ্ন-বিহঙ্গের হিরন্ময় সাধ
হাওয়ার ঝাপটে ঝরে গেছে | তবু আশ্চর্য অগাধ
শান্তি নামে এ-হৃদয়ে, সময়ে, কান্নায়, স্বপ্নে, শোকে
সুগম্ভীর শান্তি নামে |
.                        এইবার আমার আমিকে
হৃদয় সময় স্বপ্ন সাধ থেকে ছিন্ন করো, আর
প্রসন্ন সান্ত্বনা ঢালো অন্তহীন জ্যোত্স্নার আলোকে  |

হে অনন্য, আর কেন, এইবারে খোলো সিংহদ্বার |

.               *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
দুই দিন
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী   
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

মাঘের অন্তিমে বৃষ্টি |  ফাল্গুনের প্রথম সকাল
মাঠে মাঠে বিচ্ছুরিত, রাত্রির কুয়াশা
রৌদ্রের সর্বাঙ্গে ম্লান ভীরু ভালোবাসা
হয়ে ঝরে | মাটিতে লক্ষ্মীর
প্রসন্ন পায়ের চিহ্ন খুঁজে ফেরে দুঃস্থ ভাঙাহাল
বিশীর্ণ গ্রামীণকন্যা | ইতস্তত লাঙলের ফালে
বলিষ্ঠ কর্ষণে মগ্ন শান্ত ধীরস্থির
কয়েকটি কৃষক |  এই ফাল্গুনের উজ্জ্বল সকালে
যখন আশ্চর্য স্বপ্ন প্রান্তরের গায়ে
ছড়িয়ে গিয়েছে, ঝরে কৃষকের ঘাম
নরম মাটিতে, বললাম
মাঠের কন্যাকে, ‘চলো ঘরে চলো |’ আঁচলের থেকে
ছড়িয়ে শস্যের বীজ বললো সে, ‘সময় কোথায় ?
এখন শিশুর সাধ ছড়িয়ে গিয়েছে শস্যহীন
প্রান্তরের মনে ; সেই সাধকে অপূর্ণ ফেলে রেখে
এখন কি ঘরে ফেরা যায় ?
এখন অনেক কাজ, এসো তুমি অন্য একদিন |’

আরেক দিনের কথা | অঘ্রানের রাত্রির শিশির
ঝরে পড়ে মৃতবত্সা প্রান্তরের বুকে ;
ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা মাঠঘাট, মাঠের শিশুকে
ছিঁড়ে এনে গৃহস্থের ঘরে ঘরে শস্যের উত্সব |
সারাদিন উত্সবের ভিড়
দেখে দেখে ক্লান্ত চোখ ; এইবারে রাত্রির আরাম
হৃদয়ে নিঃশব্দে ঝরে, ব্যস্ত কলরব
গ্রামান্তে নিস্তব্ধপ্রায় | আবার বললাম
গ্রামের কন্যাকে, ‘চলো, মাঠে চলো |’ বললো সে, ‘সময় কোথায় ?
ফসল উঠেছে ঘরে, চেয়ে দ্যাখো, নবান্নের গান
কৃষাণী বধূর কন্ঠে, এমন অঘ্রান
আসেনি কখনো বুঝি | এখন কি রিক্ত শস্যহীন
মৃতবত্সা মাঠে যাওয়া যায় ?
এখন অনেক কাজ, এসো তুমি অন্য একদিন |’

.               *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
ততক্ষণ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

থাক,  তবে থাক ;
সমস্ত বেদনা যাক মরে,
সমস্ত যন্ত্রণা ঝরে যাক
স্মৃতির গহ্বরে |

যদি তারো পরে
তোমার স্মৃতির স্বাদে মন
ভরে ওঠে,  যদি দু নয়ন
ছলোছলো করে ;
এ-হৃদয় যদি
তোমাকে তখনো মনে রাখে,
যদি সব গান বেঁচে থাকে
তখনো অবধি,---
তাহলে আবার
এসো তুমি, আমি এইখানে
থাকবো, ঢাকবো গানে গানে
সব হাহাকার |

ততক্ষণ থাক,
আগে এ বেদনা যাক মরে,
সমস্ত যন্ত্রণা ঝরে যাক
স্মৃতির গহ্বরে |

.  *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
উন্মোচন
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

চিন্তায় কেটেছে দিন, রাত্রি ভয়ে | সমস্ত হৃদয়
নিরুচ্চার প্রার্থনায় ঢেলে
জনাকীর্ণ সকালে কি নির্জন বিকেলে
বলেছি তখন---
.                 তোমাকে হারাতে পারি, এই তীক্ষ্ণ সর্বনাশা ভয়
.                 থেকে তুমি মুক্তি দাও আমাকে ; কোথাও কোনোকালে
.                 যেয়ো না যেয়ো না তুমি |  যদি যাও, মন
.                 বাঁচবে না তোমাকে হারালে |

এ-ভয় তোমারো | আর তোমারো শয্যায় তাই ঘুম
নামে না, তোমারো মনে হারাই-হারাই
এই ভয় রাত্রিদিন | তাই
যতো দূরে যাও তুমি, তবু শতছলে
আবার ফিরতে হয়, তাই তীব্র ক্রোধের কুঙ্কুম
মুছে যায় বারবার কান্নার কাজলে |

যে-দুঃখ আমাকে দাও, নিজে তারই যন্ত্রণায় জ্বলো
সারাক্ষণ | দিনে আর রাতে
যতো না আঘাত হানো, আমি সেই আঘাতে আঘাতে
হয়েছি বিমুক্তভয়, আর
চিনেছি তোমাকে | --- তুমি মৌন ছলোছলো
কালো মেঘ সন্ধ্যার আকাশে,
যে-মেঘ পৃথিবী থেকে ঢের দূরে গিয়েও আবার
অশ্রুর আবেগে ফিরে আসে !

.         *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
তৈমুর
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

রাজপথে ছিন্ন শব, ভগ্নদ্বার প্রাসাদে কুটীরে
নির্জন বীভত্স শান্তি | দলভ্রষ্ট আহত অশ্বের
চকিত খুরের শব্দ, মুমূর্ষুর আর্তকন্ঠ, ফের
ভৌতিক স্তব্ধতা | শূন্য মসজিদের গম্বুজে খিলানে
রাত্রির নিঃসঙ্গ ছায়া নামে | প্রাণ-যমুনার তীরে
মৃত্যুর উত্সব সাঙ্গ, বিহঙ্গ-হৃদয় ছিন্নপাখা |
নগরে গ্রামে ও গঞ্জে মসজিদে মন্দিরে সর্বখানে
দুরন্ত তাতার-দস্যু তৈমুরের পদচিহ্ন আঁকা |

তৈমুর এখানে আসে দস্যুর মতন, ---- জীবনের
কামনাকে হত্যা করে, একটানা অদ্ভুত আহ্বানে
মৃত্যুকে সে ডাকে, তার লোভাতুর অতর্কিত টানে
ছিঁড়ে আসে প্রাণের মৃণাল, ত্রস্ত জীবনের সুর
দুরন্ত আঘাতে থেমে যায় | ভয়বিহ্বল মনের
সমস্ত কপাট বন্ধ, এসে পড়ে কখন তৈমুর |

.              *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
শিয়রে মৃত্যুর হাত
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

শিয়রে ম়ৃত্যুর হাত | সারাঘরে বিবর্ণ আলোর
স্তব্ধ ভয় | চেতনার নির্বোধ দেয়ালে
স্তিমিত চিন্তার ছায়া নিভে আসে | রুগ্ ণ হাওয়া ঢালে
ন্যাসপাতির বাসী গন্ধ | দরজার আড়ালে কালোটুপি
যে আছে দাঁড়িয়ে তার নিষ্পলক চোখ, রাত্রি ভোর
হলে সে হারাবে |
.                   সিঁড়ি-অন্ধকারে মাথা ঠুকে ঠুকে
কে যেন উপরে এল, অনভিজ্ঞ হাতে চুপি চুপি
ভিজিট চুকিয়ে দিয়ে ম্রিয়মাণ ডাক্তারবাবুকে |

শিয়রে মৃত্যুর হাত | স্তব্ধীভূত সমস্ত কথার
মন্থর আবেগে জমে অস্বস্তির হাওয়া | সারা ঘরে
অপেক্ষার নিঃশব্দ জটলা | যেন রাত্রির জঠরে
মানুষের সব ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভাসিয়ে শূন্য সাদা
থমথমে ভয়ের বন্যা ফুলে ওঠে | ওদিক দরজার
আড়ালে আবছায়া-মূর্তি সারাক্ষণ যে আছে দাঁড়িয়ে
নিষ্পলক চোখ তার | নিরুচ্চার মায়ামন্ত্রে বাঁধা
ক্লান্তির করুণ জ্যোত্স্না নেমেছে শয্যার পাশ দিয়ে |

শিয়রে মৃত্যুর হাত | জরাজীর্ণ ফুসফুসে কখন
নিঃশ্বাস টানার দীর্ঘ যন্ত্রণার ক্লান্তি ধীরে ধীরে
স্তব্ধ হয়ে গেছে কেউ জানে না তা | ভোরের শিরশিরে
হাওয়ায় জানলার পর্দা কেঁপে উঠে তারপরে আবার
শান্ত হয়ে এল | ছায়া-অন্ধকার | ওদিকে রাত্রির অবসানে
সে-ও নেই | শান্তি !
.                       শান্তি ! সে চলে গিয়েছে, সঙ্গে তার
কে গেছে জানে না কেউ, শুধু এই অন্ধকার জানে |

.              *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর