নীলপদ্ম কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
এ এক আশ্চর্য ব্যথা নিদ্রাহীন নিশীথে আমার অঙ্গের অঙ্গারে ওঠে জ্বলে, অস্থিমজ্জার গ্রন্থিকে কঠিন জিহ্বায় খোঁজে, নীলপদ্ম-হৃদয়ের দিকে বাড়ায় সুদীর্ঘ বাহু, থরোথরো অস্থির আঙুল মন্ত্রের মুদ্রায় করে ওঠানামা ; . এ আঙুল কার ? এই বাহু, এই জিহ্বা ? নিদ্রার আকাশে থাকে বিঁধে এ কার সুতীক্ষ্ণ তীব্র শায়ক ? অঙ্গের উপকূল ভাসিয়ে যন্ত্রণা তার জ্বলে ওঠে চিন্তার সমিধে |
এ এক আশ্চর্য সুখ সেই তীব্র ব্যাথার অতলে স্থিরপ্রভ আনন্দের অনির্বাণ অম্লান শিখায় রাত্রিদিন জেগে থাকে, হৃদয়ের সব দুঃখ-দায় নিভিয়ে অশ্রুর স্রোতে ঢাকে তার বঞ্চনার ক্ষতি |
ঢেউ কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
এখানে ঢেউ আসে না, ভালোবাসে না কেউ, প্রাণে কী-ব্যথা জ্বলে রাত্রিদিন, মরুকঠিন হাওয়া কী-ব্যথা হানে জানে না কেউ, জানে না, কাছে পাওয়া ঘটে না | এরা কোথায় যায় জটিল জমকালো পোশাকে মুখ লুকিয়ে, দ্যাখো কতো না সাবধানে আঁচলে কাঁচ বাঁধে সবাই, চেনে না কেউ সোনা ; এখানে মন বড় কৃপণ, এখানে সেই আলো ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ--- এখানে থাকবো না |
যে-মাঠে সোনা ফলানো যায়, আগাছা জমে ওঠে সেখানে, এরা জানে না কেউ কী-রঙে ঝিলিমিল জীবন,---তাই বাঁচে না কেউ ; দুয়ারে এঁটে খিল নিজেকে দূরে সরায়, দিন গড়ায় | সেই সোনা ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ---- দুয়ারে মাথা কোটে, এখানে মন বড় কৃপণ ---- এখানে থাকবো না |
গ্রীষ্মের প্রার্থনা কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
এই যে অসুস্থ রাত্রি, এই মুমূর্ষু কামনা, বৈশাখের সূর্যের প্রহার, মৃত্যু,---এর বিবর্ণ মনকে ভালোবেসে তৃপ্তি নেই, কিছু তৃপ্তি নেই গ্রীষ্মের হৃদয় থেকে স্তব ওঠে ঊর্দ্ধে তাই, যার শেষে আছে শ্যাম বর্ষার উত্সব |
মেঘডম্বরু কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
নেই তার রাত্রি, নেই তার দিন | প্রাণবীণার ঝঙ্কারে সুরের সহস্র পদ্ম ফুটে ওঠে অতল অশ্রুর সরোবরে, যন্ত্রণার ঢেউয়ের আঘাতে | সেই সুর খুঁজে ফিরি রাত্রিদিন | হৃদয়ের বৃন্তে নিরবধি মুদ্রিতনয়ন পদ্মে যদি না সে শতলক্ষধারে মন্ত্রবারি ঢালে, তার পাপড়িতে পাপড়িতে যদি না সে জেগে থাকে নিষ্পলক তবে সে নিষ্ফল, না-ই যদি ঝড়ের ঝঙ্কার তোলে এই মেঘডম্বরু আকাশে |
আকাশ স্তম্ভিত | মন গম্ভীর | কখন গুরুগুরু গানের উদ্দাম ঢেউ সমবেত কন্ঠের আওয়াজে ভেঙে পড়ে | পুঞ্জীভূত মেঘের মৃদঙ্গে পাখোয়াজে বাজে তার সঙ্গতের বিলম্বিত ধ্বনি | বারে বারে জীবন লুন্ঠিত যার, গানে তার উজ্জীবন শুরু, প্রাণ তার পরিপূর্ণ মন্ত্রময় গানের ঝঙ্কারে |
পূর্বরাগ কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
আরো কতকাল এভাবে কলম ঠেলতে বলো, আরো কতকাল সন্ধ্যাসকালে লেখা-লেখা খেলা খেলতে বলো ?
কতোকাল, বলো আরো কতোকাল দূরে থেকে আমি দেখবো লুকিয়ে রাতের প্রগাঢ় পর্দা সরিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে সোনালি সকাল, হিজলের ফ্রেমে ফুটে ওঠে শিশুসূর্যের মুখ ? আলোর স্নিগ্ধ ঘ্রাণে উন্মন দু-একটা ছোটো পাখি উড়ে যায় মৃদু উত্সুক চঞ্চল দুটি ছোটো পাখা নেড়ে ; মানুষেরা নামে মাঠে, পথেঘাটে বাড়ে কলরব ব্যস্ত হাওয়ায় |
বাড়ে রোদ্দুর, ডানা ঝাপটিয়ে তেঁতুলের ডাল থেকে উড়ে যায় লোভী মাছরাঙা--- হঠাৎ ছোঁ মেরে নীল জলে তোলে ঢেউয়ের কাঁপন, কাঁপে ঝিরিঝিরি বাতাসের শাড়ি, যেন ঘুমভাঙা করুণকান্না বেদনার মতো ; অলস দুপুর ধীরে ধীরে চলে গড়িয়ে ছড়িয়ে ক্লান্তির সুর | . চেয়ে দ্যাখো মন, এই ক্লান্তি এ-শ্রান্তিকে ঘিরে আবার কখন মন-কেড়ে-নেওয়া মায়াবী বিকেল বিছিয়েছে জাল নিপুণ নেশায় | গেল গেল সব, ভেঙে গেল সব, উল্লাসে ঢালা এই অরণ্য আবার, আবার ; শেষবার বুঝি ভালোবাসে নেবে | শিরীষে শিমুলে কথা চলে, আর ডালে ডালে নামে লজ্জার লাল, লাগে থরোথরো শিহরন, তার কপালে তীব্র সিঁদুরের জ্বালা জ্বলে ওঠে | দ্যাখো জ্বলে ওঠে সাদা ঝরোঝরো-শাখা ঝাউয়ের শিয়রে তৃতীয়ার তনুতন্বী চাঁদের বঙ্কিম ভুরু আকাশের কালো হৃদয়ে হঠাৎ | মাঠে মাঠে নামে ছায়াছায়া-ঘুম, সারা রাত ধরে আধো তন্দ্রার গলিঘুঁজি দিয়ে ম্লান ঝুরুঝুরু হাওয়া হেঁটে যায়, শিরশিরে শীতে কাঁপানো হাওয়ায় চাঁদের তীক্ষ্ণ বঙ্কিম ভুরু কেঁপে ওঠে ; যেন এই ধুধু মাঠ মাঠ নয়, নদী নদী নয়, ঘুম ঘুম নয়, এই মাঠ-নদী-বন যেন মিছিমিছি শুয়ে আছে, কেউ ফিরে তাকালেই ডানা ঝাপটিয়ে একসার সাদা বকের মতন উড়ে যাবে এরা | ভাবি, আর মনে ভয় নামে, নামে ছায়াছায়া ভয় সারা মন জুড়ে ; মায়াবী কপাট প্রাণপণে ঠেলি, পালাবো | কোথায় পালাবো ? ধবল ছায়াছায়া ভয় নেমে আসে, আর ম্লান চোখ নিয়ে চেয়ে থাকে মন, মনের দীর্ঘ ছায়া বড়ো হয় |
এই-যে প্রথম সূর্যের সাড়া, উদাস দুপুর, বিকেলের মধুমালঞ্চমায়া, রাত্রির থরোথরো শিহরণ, ছায়াছায়া ভয়, ঝরোঝরো-শাখা ঝাউয়ের শিয়রে বাতাসের ছড়ে টেনে যাওয়া ম্লান কান্নার সুর--- বলো, এ শুধু নিজেকে লুকিয়ে শুধু চোখে-দেখা দেখে যাবো, আমি সকালের মন, দুপুরের মন, রাত্রির মন খুঁজে দেখবো না ? শুধু ফাঁকি দিয়ে চোখে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে যাবো সব ? . তা হলে আমি কি কেউ নই ? আমি সকালের নই, দুপুরের নই, রাত্রিরো নই ? তাহলে, তাহলে এই-যে আকাশে প্রগাঢ় সূর্য সারাদিন জ্বলে এই-যে রাত্রে লক্ষ-হীরার চোখ ঝিকিমিকি--- আমি তো এদের চিনি না | তাহলে আরো কতোকাল এভাবে কলম, ঠেলতে বলো, আরো কতোকাল সন্ধ্যাসকালে লেখা-লেখা খেলা খেলতে বলো ?
কতোকাল, বলো আরো কতোকাল পারানির কড়ি ফাঁকি দেওয়া যাবে, সারাদিনমান খেয়াঘাটে বসে এই মূঢ় আশা লালন করবো ? এখনো যায়নি সময়, এখনো তুমি বলো, নিজেকে গোপন রাখবার যত উদ্ধত আশা যা-কিছু গর্ব সব গেল কিনা ভেঙেচুরে ? হায়, হৃদয়ের সুরে ম্লান ছলোছলো কান্নাকরুণ মিনতির ভাষা ফুটলো না তবু, ফুটে উঠলো না ; তবু আজীবন জীবনের সাথে, মৃত্যুর সাথে, সকালের সাথে, রাত্রির সাথে যে-মায়ারঙ্গে মেতেছিলে তুমি, উচ্ছল ছয় ঋতুর সঙ্গে নিজেকে লুকিয়ে যে-খেলায় তুমি মেতেছিলে, মন, এখনো তাতেই মত্ত ? জানো না সে-খেলায় কার জয় হলো, কার শুধু পরাজয় ?
সকল অঙ্গে তীক্ষ্ণ প্রহার, ম্লান ছলোছলো ঢেউ ভেঙে পড়ে, মনের দীর্ঘ ছায়া বড়ো হয় |
আমি তো রয়েছি নিজেকে নিয়েই মুগ্ধ, যাইনি কোনোখানে, আমি বাড়াইনি হাত, আলুথালু যতো শিশুরা হঠাৎ দু হাতে আমাকে জড়ালো, আমি তো তাদের চাইনি,-- তারাই চাইলো আমাকে | কে জানে দুটি প্রসারিত কোমল মুঠিতে সব কিছু এরা কেন পেতে চায়, হেসে ওঠে কেন ; সে-হাসির মানে কী, আমি কখনো ভাবিনি ; ভেবেছি এই হাসিটুকু— একে আমি গানে বেঁধে নেবো, তার সুর নিয়ে সারাদিন কাটাছেঁড়া করেছি, ভরেছি গানে তাকে,--- আজ সে গানের কী-যে মানে তা তো আমি নিজেই জানি না |
জানি না হৃদয় চেয়েছিল কিনা কখনো কাউকে | . কোন্ সমুদ্রে গানের জাহাজ সাধ করে ভরাডুবি হতে চায়, সে-কার কান্না সারা রাত ভরে শুনেছি, আমার মনে নেই তা তো কার রুখু রুখু ম্লান চুলে যেন বিষণ্ণ আশা ঝরে পড়েছিল, মনে পড়ে না তো | তখন ভেবেছি, আমার গান না যদি এই ঝরা হাহাকারটুকু সুরে সুরে পারে বেঁধে নিতে তবে ব্যর্থ, ব্যর্থ সবকিছু ; সেই হাহাকার – তার সুর নিয়ে সারাদিন কাটাছেঁড়া করেছি, ভরেছি গানে তাকে,---- আজ যতো গান তারা কোন্ কথা বলে, সে-কথার কী-যে মানে তা তো আমি নিজেই জানি না |
সারাদিন গান বাঁধবার ছলে কিছু না চাইতে জীবনের কাছে যেটুকু পেলাম, ফাঁকি দিয়ে পাওয়া যাবে না, হৃদয়, তারো পুরো দাম দিয়ে যেতে হবে, নইলে সে-দেখা কিছু না, সে-পাওয়া কিছু না | তাহলে আরো কতোকাল এভাবে কলম ঠেলতে বলো, আরো কতোকাল সন্ধ্যাসকাল লেখা-লেখা খেলতে বলো ?
কান্না কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
পার হয়ে গিয়ে অজস্র ঢেউ, . অজস্র জল সাঁতরে পাওয়া যায় এক দুর্লভ মণি . সাতসমুদ্র হাতড়ে | যার হাতে থাকে সেই মণিদীপ . তারই চারপাশে তীর্থ জমে ওঠে, সেই মণিকে হারালে . ভেঙে যায় মধুনীড় তো ; চোখের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায় সেই মণিদীপ, আর . যতো গান--- যায় হারিয়ে |
তবু থাকে গান, থাকে সে--- তুষারশুভ্র হাসি হয়ে থাকে . জীবনের ফাঁকে ফাঁকে সে ; যদি বা কখনো মনে পড়ে যায় . বন্ধুকে পরিজনকে--- এ হাসি তখন কান্নার মতো . ধুয়ে দিয়ে যায় মনকে | জীবনে যখন নেই, কিছু নেই, . আলো না, মধুর গান না---- হাসি হয়ে ঝরে চোখের কোনায় . শিশিরের মতো কান্না |