কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা
*
দুঃখশান্তি
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

সকল দুঃখ জয় করে তবু তার
নিভৃত হৃদয়ে কী-এক দুঃখ বাজে ;
তারই একটানা নিবিড় যন্ত্রণা যে
সারাদিন সারারাত্রির চারিধারে
জেগে থাকে | আলো নিভিয়ে অন্ধকার
থেকে টেনে নেয় গভীর অন্ধকারে |

সকল শান্তি হারিয়েও তবু তার
দু চোখে কোমল কী-এক বহ্নি জ্বলে ;
তাই তার ব্যথাজীর্ণ হৃদয়তলে
রূঢ় কান্নার যতো না আঘাত লাগে ---
সকল দুঃখ সকল যন্ত্রণার
শিয়রে অমেয় আরেক শান্তি জাগে |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
রঙছুট
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

আকাশে তবু রয়েছে রঙ ছড়ানো---
এখনো তার খানিক দিয়ে
.                হৃদয় যায় ভরানো |
এখনো ক্ষয়ক্ষতির খাতা
ওঠেনি ভরে, ভরিয়ো না তা,
হাওয়ার হাতে এখনো পাতা ঝরানো
হয়নি শুরু, হৃদয়ে রঙ
.                এখনো যায় ছড়ানো |

এখানে তবু এলে না, তুমি এলে না---
স্তব্ধ জলে দু হাতে ঢেউ
.               ছড়িয়ে দিয়ে গেলে না |
অন্ধকারে, আলোর ডাকে,
পাহাড়ে, পথে, নদীর বাঁকে
রাত্রিদিন খুঁজেও যাকে মেলে না
তাকেই চাই তোমার, তাই
.               এখানে তুমি এলে না |

দীর্ঘ দিনরাত্রি আমি দাঁড়িয়ে
রয়েছি বীতনিদ্র চোখে
.               ব্যগ্র হাত বাড়িয়ে |
চেয়েছ যাকে, বোঝনি আহা
সকল মোহ সকল মায়া
রৌদ্র আর বনচ্ছায়া ছাড়িয়ে
সে চলে একা সঙ্গিহীন,
.               এখানে আমি দাঁড়িয়ে |

কারো না, তুমি কারে না, তুমি কারো না---
আমাকে ধরা দাওনি তুমি,
.                অথচ তুমি তারো না |
দু হাত দিয়ে কুড়িয়ে আর
ছড়িয়ে ক্ষুধা মেটে না যার
তীক্ষ্ণতম সেই ক্ষুধার তাড়না
তোমাকে ফেরে তাড়িয়ে, তুমি
.                 কিছুই পেতে পারো না |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
রাত্রিদিন
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

দেবার যার ছিল না কিছু, তাকে
কেউই ডেকে নেয়নি, সাড়া
.                দেয়নি তার ডাকে |
কিছুই তার ছিল না ?  ছিল গান
তাই কি আজ পড়েছে তাকে মনে ?
সকালে বুঝি ব্যাকুল হলো প্রাণ
মধুর সেই গানের গুঞ্জনে ?
হায়রে, তারো বন্ধ দরোজা—
ফিরে যা তোরা, ফিরে যা, তোরা যা |

তোদেরো ডেকে পায়নি, বারেবারে
তোদেরি প্রাণে লজ্জা হানে
.                 গানের ঝঙ্কারে |
সঙ্গিহীন রাত্রে যদি না-ই
পেয়ে সে থাকে যা চেয়েছিল তবে
সকালে আর তা দিয়ে কীবা হবে ?
সকল চাওয়া মিটেছে তার, তাই
এবারে তারো বন্ধ দরোজা---
ফিরে যা তোরা, ফিরে যা, তোরা যা |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
শেষ বৈশাখ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

বৈশাখের শুষ্ক তালু | শীতের প্রেত কাঁপে
হাওয়ায়, ঝরাপাতার ঝড় ; আকাশে উত্সুক
মেঘের ছায়া পড়ে না, নেই কাজলকালো মুখ
কোথাও ; নেই, ব্যথাও নেই হৃদয়ে | উদ্দাম
আশায় বুক কাঁপে না, হাড়-কাঁপানো অভিশাপে
নামে না ভীরু ভয়েরো স্রোত | কোথাও একতিল
সবুজ নেই, ঝিমায় দূর মায়াডাঙার গ্রাম ;
মাঠের বুকে ফাটল, কাঁপে বৈশাখের বিল |

বর্ষণের শান্তি নেই আকাশে, হাহাকার
হাওয়ার যাওয়া-আসায় |
.                              শুধু একলা অস্থির
গুল্মোরের শাখায় ধরে আগুন, খায় চিড়
মাঠের মড়া হৃদয় | যেন প্রগাঢ় কুমকুম
কপালে আঁকা অবাক বুড়ো বৈশাখের, তার
দৃষ্টিহীন দু চোখে লাল ফাল্গুনের ঘুম |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
অন্বেষণ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

তোমাকে দেখেছি আমি, হে প্রিয় সুহৃৎ, রাত্রিদিন
কী আনন্দে মগ্ন থাকো, কী প্রগাঢ় নিবিড় বিশ্বাসে
বঞ্চিত বুদ্ধির জ্বালা ক্রমশ প্রশান্ত হয়ে আসে
সমাহিত সান্ত্বনায়, কী পরম প্রার্থনায় লীন
জিজ্ঞাসার সমস্ত যন্ত্রণা ; শুভ্রতার অন্তহীন
অপরূপ রৌদ্রময় উন্মোচিত উদার আকাশে
স্বপ্নের মুহূর্তে মূর্ত স্থিরজ্যোতি নক্ষত্রের পাশে
তোমার বিহঙ্গ-মন আনন্দের পাখায় উড্ডীন |

এখানে বিক্ষত আমি, সারাক্ষণ প্রশ্নের পাথরে
মাথা খুঁড়ি, শান্তিহীন বুদ্ধির আগুনে দুই পাখা
পুড়িয়ে সর্বস্বরিক্ত | তবু শোনো, যে-উত্তর আঁকা
তোমার সহাস্যশুভ্র শান্ত মনে, আমিও কান্নার
প্রহারে তাকেই খুঁজি, খুঁজি তাকে বিক্ষোভের ঝড়ে,
আমারো এ রক্তঝরা জিজ্ঞাসায় অন্বেষণ তার |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
সেই গান
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

যতোই যন্ত্রণা থাক এ-জীবনে, সব যন্ত্রণার
একদিন শান্তি হয়, দুঃখের দাহনে
নামে জল | হৃদয়ের প্রত্যন্ত প্রদেশের সঙ্গোপনে
যে-তীব্র চিন্তার বহ্নি পরিব্যাপ্ত, যার
শতজিহ্বা নিষ্ঠুর চাবুকে
চেতনা রক্তাক্ত, প্রতি মুহূর্তের পরিপূর্ণ সুখে
যে ঢালে শুধুই দুঃখ, তীব্র থেকে আরো-তীব্র আরো
যে-যন্ত্রণা,---- এইরাত্রে তা আমার কাছে
যতোই দুঃসহ হোক, স্থির জানি সেই যন্ত্রণারো
শান্তি আছে |

দুঃখের শীতেও তাই এ-হৃদয় বসন্তবাহারে
গান গায় | গানে গানে দীর্ঘ রজনীর
ভয় কাটে, প্রত্যুষের তীর
বেঁধে এসে রাত্রির পাহাড়ে |

সে-ই তো মহান মন্ত্র |  যন্ত্রণাজর্জর এই প্রাণে
সেই মন্ত্র দাও, তবে দাও
গানে গানে উজ্জীবন-আশার সন্ধান ;
যে-গানে তৃষ্ণার জল নেমে আসে, অমর্ত্য যে-গানে
সমস্ত দুঃখের শান্তি , কোটিকন্ঠে তাহলে জাগাও
সেই গান |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
ফুলের স্বর্গ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

যৌবনে আনন্দ নেই,  যদি তার সমস্ত সম্ভার
আমৃত্যু অক্ষয় থাকে | ক্ষয়ে তার শান্তি, জীবনের
প্রার্থনাপূরণ | এই অপরূপ প্রথম গ্রীষ্মের
আলস্যের ভারে নম্র আদিগন্ত রৌদ্র-হাওয়া-নীলে
সামান্যই সুখ, দুঃখ অসামান্য ; সে-ঐশ্বর্যে তার
শুধু ব্যর্থ সঞ্চয়ের বিড়ম্বনা বাড়ে | এ-যৌবন
রিক্তই না হয় যদি, বঞ্চনায় বাঁচে তিলে তিলে,---
শাস্তিও সান্ত্বনা তার,  মৃত্যু তার সম্তাপহরণ

সে-মৃত্যু যখনি নামে বিদ্যুৎবিদীর্ণ ঘন মেঘে
বৃষ্টির ধারায়, তুচ্ছ যৌবনজড়িমা লজ্জা সব ;
প্রাণের সমস্ত পাপড়ি মেলে তার দেবতাদুর্লভ
আলিঙ্গনে সঙ্কোচের বৃন্ত থেকে খসে পড়ে যাওয়া ---
সে-ই তো আমার স্বর্গ |
.                          প্রত্যাশায় সারারাত্রি জেগে
হাওয়ার হাততালি শুনি ;  হাওয়া, হাওয়া--- অফুরন্ত হাওয়া |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
সঙ্গী-সঙ্গীত
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

তবু কিছু শান্তি, এই দুর্দিনের মেঘের আড়ালে
সুবর্ণ-সূর্যের ছটা ঝিলিমিলি আশ্বাসে হঠাৎ
ভেসে ওঠে | মনে হয় এই অন্ধ ভয়ে-ভরা রাত
সমস্ত দুঃস্বপ্ন নিয়ে মুছে যাবে | সারাক্ষণ আর
জীবনের শত্রু তার পথে পথে সর্বনাশা জালে
শিকার খুঁজবে না | যেন প্রত্যুষের আশীর্বাদ নিয়ে
দুঃসহ গ্লানির শেষে ভেসে এল সুরের ঝঙ্কার
মাতালের উচ্ছৃঙ্খল অসংব়ৃত প্রলাপ থামিয়ে |

অথচ এ শুধু আশা |  বৈশাখের শুভ্র স্বপ্ন যতো
প্রত্যহ রক্তাক্ত হবে জানি আমি, ভয়ত্রস্ত প্রাণে
আবার নামবে রাত্রি তা-ও জানি, সবুজ ময়দানে
ছিঁড়ে যাবে ঘাসের জাজিম তীব্র বেদনার শীতে
হৃদয় হলুদ হবে |
.                       ---- তবু এই মুহূর্তে অন্তত
স্মৃতির বিবর্ণ ঝাঁপি ভরে রাখি রবীন্দ্রসঙ্গীতে |

.             *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
নির্বাণ
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

কী আশ্চর্য, তব রাত্রি নামে | স্তব্ধ পায়ে হেঁটে যায়
নিঃশব্দে পাহাড়ে মাঠে প্রান্তরে, অতল চক্ষু থেকে
জ্যোত্স্নার কোমল বহ্নি জ্বালিয়ে, অবাক স্বপ্ন এঁকে
নামে রাত্রি, --- রাত্রি নামে অরণ্যের নির্জন হাওযায় |

অথচ হৃদয়ে কিছু তৃপ্তি নেই, জর্জরিত মনে
দিনান্তের শান্তি নেই, যে-আলোকে নদী মাঠ বন
উদ্ভাসিত আলো নেই নির্বাণের বহ্নির বর্ষণ,
নামাও প্রাণের শান্তি অন্তহীন জ্যোত্স্নার প্লাবনে |

মনে নামে রাত্রি, মনে রাত্রি নামে, আবার, আবার ;
হৃদয় ছাপিয়ে যতো রাত্রি নামে, নির্জনতা ততো,---
রাত্রি হলো মন, আর মন হলো অরণ্যের মতো,
কোমল জ্যোত্স্নায় পোড়ে প্রসারিত দীর্ঘ শাখা তার |

.                *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*
অসময়
কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।

সকালে ছিল আকাশ নীল,  বিকেলে এল ঝড়----
.                              বিকেলে তুমি এলে,
যখন সব অন্ধকার, ঝাউয়ের ডালে ওঠে
.                              হাওয়ার চাপা স্বর |
ভেবেছো কালো আকাশে তুমি প্রদীপ দেবে জ্বেলে
ভেবেছো মৃত মনেও বুঝি আশার ফুল ফোটে,
হায়রে মূঢ় দুরাশা, যদি সে-আশা কিছু জোটে
.                             সবাই তবে দু হাত ভরে দিত
আশায় | তুমি এসেছো, কই--- সকালে আসোনি তো |

চৈত্রশেষ, আকাশে কালবৈশাখীর ঝড়---
.                             বিকেলে তুমি এলে,
যখন দ্বার বন্ধ, ঝরে অঝোর জলধারা,
.                             অন্ধকার ঘর |
ভেবেছো শুধু একটিবার এ-পথে হেঁটে গেলে
নয়নবারি শুখাবে, আর হৃদয় দেবে সাড়া ;
দিনের শেষে যখন তুমি দুয়ারে দিলে নাড়া
.                              ধুলায় ঝরে গিয়েছে হায় মৃত
হৃদয় | তুমি এসেছো, তবু সকালে আসোনি তো |

.                *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর