মনে মনে কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
মন তুমি কোনোদিকে চেয়ো না চেয়ো না ; অনেক ঠকেছো তুমি, তবু সাবধানে পারো না থাকতে.----নীল নয়নের টানে শুধুই তো সুধা নেই, কিছু নীল বিষ রয়েছে লুকানো ; মন, এখানে ওখানে যা-কিছু সোনালী দ্যাখো তা-ই নয় সোনা খানিকটা সোনা তার, খানিক পালিশ ; মন তুমি কোনোদিকে চেয়ো না চেয়ো না |
মন তুমি কোনোদিকে যেয়ো না যেয়ো না ; কোথায় সোনার দ্বীপ ! ঢেউ ভেঙে পড়ে চারিদিকে শুধু : মন, এই জলঝড়ে পথের প্রখর নেশা হারিয়ে গেলেই নিবু নিবু আলো লেগে ঢেউয়ের শিখরে যে-সোনা ঠিকরে ওঠে তা-ই খাঁটি সোনা, তা ছাড়া কোথাও কিছু নেই, কিছু নেই ; মন তুমি কোনোদিকে যেয়ো না যেয়ো না |
এখানেও জ্বলে জ্যোত্স্না ! কোথায় বাবুডি, কোথায় কলকাতা, কোথা নাছোড়বান্দা হৃদয় উধাও | রাত্রির ছায়া বুকে টেনে ঘন লাল বারান্দা দীর্ঘ আরামে ভরে ওঠে, দূর বেথুয়ার গলি শান্ত এখন, নির্জন নীল পাহাড়ের গায় ছায়া পড়ে, ছায়া থেমে থাকে, ছায় সারা মনে এক বৈরাগী সুর ; স্বপ্নের চোখে রাত জ্বলে ওঠে, রাত নিভে যায় |
এত আলোছায়া বর্ণালি, শুধু তোমারই জন্য এত আয়োজন, তাহলে মিথ্যে কী করে বলবে একে ? মনে মনে এই অনিত্যে পেরিয়ে সেখানে যেতে পারো যদি ? মন, তুমি তবে নির্ভয়, তবে এই বিষণ্ণ সময়কে ভুলে সেই গান গাও যে-গানে শীর্ণ গৈরিক নদী পাথরের মোহমরণে মরেও বিস্মরণের স্বপ্নে উধাও |
নীলনির্জন কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
এই তো নেমেছে রাত্রি, এই তো . মনের আকাশে ফুটলো জ্যোত্স্না-ধোয়ানো চিন্তার ফুল, . সে ফুল কুড়িয়ে আনতে ঘুমের শিয়রে বাড়িয়ে দু হাত . স্বপ্নেরা জেগে উঠলো ; এই তো নেমেছে রাত্রি মনের . নীলনির্জন প্রান্তে |
এই তো নেমেছে রাত্রি, এ-পথে . এতদূরে যার জন্য কান্না ঝরিয়ে এলাম ; যখন . সারা দেহমনে ক্লান্তি থরোথরো পায়ে নেমে আসে, আর . এ-হৃদয় অবসন্ন --- পথে পথে ঝরে পড়লো চাঁদের . স্তব্ধ নীল প্রশান্তি |
বিকল্প কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
ক্ষমা করো, যদি এই জনতার সমুদ্রে আমার লজ্জাহীন আকাঙ্ক্ষার নৌকা না ভাসাতে পেরে থাকি, উদ্দাম ইচ্ছাকে যদি সারাক্ষণ বন্দী করে রাখি আত্ম-অবমাননার ভয়ে, যদি উন্মার্গ লোভের দাসত্বে রুচি না থাকে, যদি পান্থশালায় সংসার না-ই পাতি | প্রিয়তমা, এখানে আনন্দে কিংবা শোকে মগ্ন হওয়া অর্থহীন, দর্শকের নিষ্ঠুর ক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে লাভ নেই, প্রহসনপঞ্চাঙ্ক নাটকে |
বরং দু-দন্ড এই শ্যামশষ্প মাঠের গভীরে বসে থাকি, স্থিতবুদ্ধি আম-জাম-ঝাউয়ের ছায়ায় কথা বলি কিছুক্ষণ, বিকেলের নির্জন হাওয়ায় সমস্ত ক্ষুধার ক্ষোভ ঝরাই নিঃশেষে | প্রিয়তমা, সে-ই ভালো, অন্তরঙ্গ হাসির ঝাপটায় দাও ছিঁড়ে ইচ্ছার সমস্ত ক্লান্তি, আকাঙ্ক্ষার দৈন্য করো ক্ষমা |
স্মৃতিগন্ধা কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
কে গো তুমি অনেক দূরের থেকে এলে পুরনো সুরের গান নিয়ে | যে-নীরবতার মাঠে মাঠে মাধবীলতার ফুলগুলি কথা হয়ে ফোটে, কথাগুলি হাসি হয়ে ওঠে, তারপরে ঝরে যায়,---বলো, তুমি সেই ম্লান ছলোছলো মাধবীলতার ঝরাফুল ?
না-কি স্মৃতিগন্ধ-আকুল যে-নিশীথে বুড়ো শিমুলের সারা মনে আবার ফুলের সাধ জাগে, তুমি বুঝি তার উতরোল উদাসী হাওয়ার হাসি হয়ে চোখের আড়ালে বুড়ো শিমুলের ডালে ডালে ছোঁয়া দিয়েছিলে ? বলো সেই হাসিটুকু ছড়িয়ে দিতেই আজ আবার এলে বুঝি তুমি ?
পুরনো গানের ঝুমঝুমি চেনা সুরে কে তুমি বাজাও, কে তুমি কে তুমি বলে যাও | জানিনে কোথায় কত দূরে কোনো এক পুরনো পুকুরে কোনো এক প্রাচীন বটের ছায়াখানি শুয়ে আছে, ফের সারারাত হাওয়ার আঁচলে জোনাকিরা নেভে আর জ্বলে | সেখানে তুমিও ছিলে না কি , তুমি সেই বনের জোনাকি ?
আনমনে পা ফেলে পা ফেলে ম্লানছায়া শীতের বিকেলে কোনো মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে | হৃদয়ের থেকে হারিয়েছে তার সব কথা | যদি বলো তুমি তার ভীরু ছলোছলো গান কিনা, তবে নিই চিনে |
যেন চিনি, তবুও চিনিনে | তুমি সেই মাধবীলতার ফুল নও, রাতের হাওয়ার হাসি নও, হাওয়ার আঁচলে যে জোনাকি সারারাত জ্বলে তা-ও নও | শীতের বিকেলে আনমনে পা ফেলে পা ফেলে যে-মেয়েটি হারিয়ে গিয়েছে, যার সব স্মৃতি হারিয়েছে, যার কথা কেউই বলে না তুমি বুঝি ছিলে তার চেনা, তার ভীরু গান বুঝি তুমি ?
কে তুমি কে তুমি বলো বলো কে গো তুমি ম্লান ছলোছলো, একবার শুধু বলে যাও পুরনো স্মৃতির ঝুমঝুমি চেনা সুরে কে তুমি বাজাও |
কে তোমরা আমাকে ডাকো কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
কে তোমরা আমাকে ডাকো | শীতহ্রস্ব আল্পায়ু শিথিল দিনের অন্তিম আলো পৃথিবীর মন যে-মুহূর্তে মেখে নেয়, সূর্যদেব হঠাৎ যখন অপসৃত আকাশের রক্তরঙ রঙ্গমঞ্চ থেকে নেপথ্যের অন্ধকারে, দৃষ্টির দুয়ারে দিয়ে খিল যখন বিবর্ণ জুঁই মল্লিকার ম্লান গন্ধ ভাসে সন্ধ্যার হাওয়ায়, তার স্মৃতির জানলায় মুখ রেখে কে তোমরা আমাকে ডাকো অন্ধকার রাত্রির আকাশে |
কে বলো তোমরা দু হাতে ছড়াও কুয়াশাকঠিন জ্বালা এ-হৃদয়ে, এই নিদ্রানিবিড় রাত্রির চোখে জ্বলে যে-আশা তোমরা কে তাকে পরাও স্মৃতির ছিন্ন মালা, কে তোমরা জাগো শীতরজনীর গোপন গুহার তলে |
কে তোমরা, কে তোমরা এই অবসন্ন চিন্তার শরীরে যন্ত্রণা জ্বালাতে এলে, শীতবন্ধ্যা মাঠে কো তোমরা দাঁড়িয়ে আছো জরাজীর্ণ স্মতির চৌকাঠে আমাকে ডেকো না | ওই ব্যগ্র ডাক শুনে কে যাবে হারিয়ে বলো আকাশের নক্ষত্রের ভিড়ে, কে আর পোড়াবে পাখা বারবার স্বপ্নের আগুনে |
বাসী বকুল কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
ছোটো ছোটো ছবিগুলি কেন বারেবারে মুছে গিয়ে ভেসে ওঠে মনের কিনারে | কবে কোন দূরপথ ট্রেনে যেতে যেতে ঝিমঝিমে রোদ্দুরে ধুধু ধানক্ষেতে দেখেছি স্নিগ্ধ ছায়া বিকেল বেলায় ধীরে ধীরে ভীরু পায়ে নেমে আসে, আর সেই আলোছায়া কার নাম যায় লিখে দিগন্তছোঁয়া মাঠে মাঠে, চারিদিকে ছুটোছুটি করে মরে ব্যস্ত হাওয়া যে, শিরীষের ডালে তার মঞ্জীর বাজে | আলো ছায়া মাঠ মেঘ ধানক্ষেত হাওয়া একসার শালিখের উড়ে চলে যাওয়া--- বারে বারে কেন এরা ফিরে ফিরে আসে ছবি হয়ে ফুটে ওঠে মনের আকাশে |
ছোটো ছোটো ছবিগুলি কেন বারেবারে মুছে গিয়ে ভেসে ওঠে মনের কিনারে | ঘুমন্ত গ্রামখানি, রাত্রি দুপুর, টিপটিপ শিশিরের শব্দের সুর ঝরে পড়ে, স্বপ্নের তুলি দিয়ে আঁকা গাছপালা মাঠঘাট কুয়াশায় ঢাকা | কী দেখে হঠাৎ যেন বাবলার ভিড়ে মুখ লুকিয়েছে চাঁদ মাঝরাত্তিরে | আর তার ছোঁয়া লেগে আকুলিবিকুলি করে ওঠে জ্যোত্স্নার সাদা ভয়গুলি | সেই ছায়া, সেই চাঁদ, সেই ঝিরিঝিরি হাওয়ায় দোলানো ভীরু স্বপ্নের সিঁড়ি --- হারিয়ে গিয়েও কেন ফিরে ফিরে আসে ছবি হয়ে ফুটে ওঠে মনের আকাশে |
ছোটো ছোটো ব্যথাগুলি কেন বারে বারে নিভে গিয়ে জ্বলে ওঠে মনের কিনারে | বৈশাখী দিবসের প্রহারে যখন মুমূর্ষু মাঠঘাট, বিবর্ণ মন, বেদনার সব রঙ চুরি করে নিয়ে মেঘে মেঘে দাউ দাউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে তখন কেউ | ধুধু মাঠগুলি পার হয়ে নেমে আসে রক্ত-গোধুলি | আর যাকে না-চিনেও চিরদিন চিনি ভুলেও কখনো যাকে ভুলতে পারিনি, সন্ধ্যার ছায়া লেগে ম্লান চোখ দুটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই গ্রামের বধূটি | জানি না কী করে তার ব্যথা, তবু বারেবারে সেই ব্যথা বেজে ওঠে হৃদয়ের তারে |
ছোটো ছোটো কথাগুলি কেন বারেবারে নিভে গিয়ে জ্বলে ওঠে মনের কিনারে | কোথায় যে কত দূরে প্রসন্ন ভোর পাহাড়ের গায়ে গায়ে আবছা আলোর করুণা বুলিয়ে দেয়, কি জানি কি জানি রাত্রিকে ডেকে নেয় কার হাতছানি আলোর আড়ালে, আর কোথায় যেন কে বিষাদমধুর কোনো মৃত্যুর শোকে পায়ে পায়ে হেঁটে আসে হৃদয়ের কাছে--- মনে নেই আজ আমার ; শুধু মনে আছে বলেছিলে, ‘ভুলবো না, কিছু ভুলবো না |’ ছায়াছায়া স্বপ্নের কানে-কানে শোনা সেই কটি কথা আজো কেন বারেবারে নিভে গিয়ে জ্বলে ওঠে মনের কিনারে |
ছোটো ছোটো ছবি আর ছোটো ছোটো কথা ছোটো ছোটো ব্যথা ভরা ছোটো ব্যাকুলতা হারিয়ে গিয়েও তবু কেন বারবার চেতনার উপকূলে হঠাৎ-হাওয়ার বিনিদ্র রজনীতে ফিরে আসে ফের ঝরে যাওয়া একরাশ বাসী বকুলের গন্ধের মতো | আর ভীরু আশাগুলি যখন নিয়েছে মুছে ব্যর্থ গোধূলি, আনমনে যা দিয়েছি হাওয়ায় উড়িয়ে সেই ছেঁড়া ছবিগুলি দু হাতে কুড়িয়ে নিয়ে কে আবারো আসে পায়ে পায়ে নেমে বেদনার কাঁটা দিয়ে হৃদয়ের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখবে বলে | স্মৃতির অতলে ব্যথার জোনাকিগুলি সারারাত জ্বলে |
প্রতিবেশী কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’, ১৯৬৯ থেকে নেওয়া।
হৃদয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী আর-এক হৃদয় জেগে থাকে | সারাদিন তার আয়ত দৃষ্টির নীচে ঘুরি ফিরি, কাজ করি, আর চেয়ে দেখি সে-ও ঠিক চেয়ে আছে, শুধু কী-এক গভীর কথা, ভয় চোখ নিয়ে | . ধীরে ধীরে রাত গাঢ় হলে যখন সমস্ত মন মাঠের মতন ফাঁকা ধুধু সে হঠাৎ ম্লান স্বরে বলে, ‘জেগে আছ ?’ আমি বলি, ‘আছি |’ ‘তোমার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত চিন্তার কাছাকাছি আমিও রইলাম, নিও চিনে |’ দু চোখে ঘুমের ক্লান্তি | আমি চুপ | কিছুই বলিনে |
কিছুই বলবার নেই | তা সে কখনো জানবে না, তাই এই ঠান্ডা হৃদয়ের ঘরে আর-একটি হৃদয় থেকে ব্যাকুল প্রত্যাশা ঝরে পড়ে রাত্রিদিন | . যত দূরে যাই একই ম্লান প্রশ্ন আসে ফিরে নিথর সত্তার কাছাকাছি ম্রিয়মাণ রাত্রির আকাশে : ‘জেগে আছ ?’ আমি বলি, ‘আছি |’ ‘তোমার সমস্ত সুখ, সব সাধশান্তির গভীরে আমিও রইলাম, নিও চিনে |’ সুখ নেই, সাধ নেই, শান্তি নেই, তাই আমি চুপ | কিছুই বলিনে |