কবি রমণীমোহন ঘোষের কবিতা
*
পল্লীবালা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার কার্তিক ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬) প্রকাশিত। পাতাটি স্ক্যানিং-প্রমাদ
এর জন্য কবির নামটি পুরোপুরি পড়া যাচ্ছে না। আমাদের বিবেচনায়, যে টুকু দেখা
যাচ্ছে, তাতে কবির নাম রমণীমোহন ঘোষই মনে হচ্ছে। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

পড়িছে ঝলসি’ কুন্দ অতসী জাতী যুথী
.        মাধবী গন্ধরাজ,
শেফালিকাগুলি ঝরেছিল আজ পিয়াসায়,
খরতাপে ঐ শুকাতে লেগেছে নিরাশায় ;
তুলসী মাত্র দেবতার পূজা উপচার,
.        বিল্বপত্র সাজ ;
গৃহের লক্ষ্মী দুলালী গিয়াছে পরঘরে,
.        এ গৃহ আঁধার আজ।

ঠাকুরের সেবা হয়ে গেছে আজ চুপি চুপি---
.        সেটা নাহি বটে বাকী।
কলসী বাজেনি ঘাটপথে আজ ঘন-ঘন,
কোশাকুশী ঘাটে করেনিক আজ ঝনরণ ;
প্রসাদী কুসুম না পেয়ে বাছুর আসে ফিরে
.        নামায়ে কাতর আঁখি।
পিতা করেছেন নিজে আহ্নিক আয়োজন
.        চোখ মুছি থাকি থাকি।

খোকা খুকীদের হয়নিক আজ নাওয়া ধোওয়া
.        কে তাদের আজি পুছে?
ঘরে ঘরে আজ বাজেনিক মল রণঝন
ভিখারী আসিয়া ফিরিয়া যেতেছে ঘন ঘন ;
হরিনাম ঝুলি হুয়না সেলাই ঠাকু’মার
.        সূতা নাহি যায় সূচে ;
খুকীর কপোলে দাগ হয়ে আছে, আঁখিজল
.        দেয়নিক কেহ মুছে।

হাম্বা রবেতে গাভীটি ফিরিছে দ্বার দ্বার
.        গোঠ হতে এসে ফিরে।
কাকে মাছ লয়, ছাগে খেয়ে যায় চাল ধান,
পায়নিক দাদা আঁচাবার জল, সাজা পান ;
তুলো আর মেনী ঘুরে ঘুরে কেঁদে হ'ল খুন
.        গা’র লোম দুখে ছিঁড়ে ;
খাঁচার-পাখীটি পায়নিক আজ বুট জল---
.        গলা গেল তার চিরে।

বসেনি বাড়ীতে চুল বাঁধিবার বৈঠক,
.        আসেনি পাড়ার দল।
বালিশের তুলা, আকাচা কাপড় ঘরময়,
বাসন পাত্রে জিনিসপত্রে নয়ছয় ;
আঙিনার তরু পায়নিক আজ বৈকালে
.        একটি ফোঁটাও জল ;
শিউলি-ছোপান কাপড় দেখিয়া, মার চোখে
.        জল ঝরে অবিরল।

ঠাকুরের ঘরে পা ধোবার জল, আলো নাই,
.        পুরুত লাগায় ধুম।
থোকা খুকীদের আনেনিক কেহ পূজো বাড়ী,
হয়নি শীতল প্রসাদ নিবার কাড়া কাড়ি ;
চাঁদের কপালে টি দিয়ে না যায় আজি চাঁদ---
.        চোখে নাই কারো ঘুম
কাঁদে তারা আজ---সারাদিন তাদে' বুকে চাপি,
.        খায়নি যে দিদি চুম্‌।

ললিত কোমল ছোট ছুটি বাহু মুঠি বটে,
.        কম কি ক্ষমতা তার?
তারে পর করা---লোকে বলেছিল দায় সারা,
ভাবেনিক কেহ এ গৃহ অচল সেই ছাড়া,
সংসার পাতা শিক্ষার ছলে নিল সে যে
.        বহু জীবনের ভার।
আজি এ গৃহের শিশু পশু-পাখী তরুলতা!
.        করিতেছে হাহাকার।

আহা সে যে কোন্ অপরিচয়ের মাঝখানে
.        বন্দিনী দিবা রাতি,
তথা গৃহভরা হাস্যোৎসব-কলরোলে,
আহত নিয়ত ফুলসম নদীকল্লোলে,---
অশ্রু মুছিছে অবগুণ্ঠন অঞ্চলে,
.        নাহিক ব্যথার সাথী ;
মা হারা তাহার গৃহ কাঁদে হেথা লুটে লুটে,
.        নিবায়ে ঘরের বাতি।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানস মিলন
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার কার্তিক ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ -
৮.৮.২০২০।

নীল আকাশের চারু চন্দ্রাতপতলে
.        সাগর অম্বরা
মোহিনী ধরণী নিত্য রেখেছে সাজায়ে
.        সৌন্দর্য্য-পসরা
কত বর্ণ কত গন্ধ বিচিত্র সঙ্গীতে
.        কত আয়োজন,---
মানুষ তবুও শুধু খোঁজে চিরদিন,
.        মানুষের মন।

এসেছিল যারা হেথা আমাদেরি মত
.        শত যুগ আগে,
হেরেছে ধরার শোভা-অনন্ত-নবীন---
.        হেন অনুরাগে।
ভাসিয়া গিয়াছে তারা কোথা কত দূরে
.        কালের সাগরে,
রেখে গেছে যত প্রেম-বাসনা-বেদনা
.        মানবের তরে।

কোন্‌ সে অতীত বর্ষে লিখেছিলা কবি---
.        সুধাস্যন্দী শ্লোকে,
অভিশপ্ত বিরহীর আকুল আবেগ
.        নবমেঘালোকে।
কোথা সেই রামগিরি, কোথায় অলকা---
.        কোথা বিরহিণী,
কোথা সেই মহাকবি, নবরত্নপ্রভা---
.        কোথা উজ্জয়িনী !

চাহি' নব আষাঢ়ের সজল জলদ-
.        আবৃত গগনে,
দূরস্থিত প্রণয়ীর চির-ব্যাকুলতা
.        জাগে আজি মনে।
এমনি বরষাগমে নব জলধর
.        যুগ যুগান্তর
বিরহীর বার্তা বহি’ প্রিয়ার উদ্দেশে
.        ধাইবে অন্বরে।
ভরা বাদরের দিনে ভুবন ভরিয়া
.        বারি বরিষণ,
মত্ত দাদুরীর ডাক, বিজলীর লীলা
.        ঝঞ্ঝা-গরজন ;
মনে পড়ে কোন্‌ যুগে এহেন ভাদরে
.        দূর বৃন্দাবনে
শূন্য গৃহে রাধিকার দীর্ঘ দিন রাতি
.        কেটেছে কেমনে।

বিস্মৃত আশ্বিনে কবে গিরিরাজ-জায়া
.        ভূমিতল-লীন,
প্রবাসিনী তনয়ার পণ পানে চাহি’
.        গণেছিলা দিন।
আজি এ আলোক-ফুল্ল শরৎ-প্রভাতে,
.        আগমনী গানে
স্নেহাতুরা জননীর মরম-বেদনা
.        বাজে তাই প্রাণে।

বিচিত্র বাসনা-আশা ফুটে উঠে যত
.        নিভৃত অন্তরে,
কবি চাহে ছন্দে গাঁথি দিতে উপহার
.        বিশ্বজন-করে।
যুগে যুগে মানবের আত্মনিবেদন,
.        কাব্য-গীতি-গানে,
বিপুল পৃথিবী পরে মরমীজনের
.        ফিরিছে সন্ধানে।
ক্ষুদ্র সুখ ক্ষুদ্র দুঃখ নিমেষে মিলায় ;
.        তবু বিশ্বমাঝে
নিখিল মানব চিত্ত-বীণার তন্ত্রীতে
.        সুর তার বাজে।
সকল সাধনা মাঝে তাই চিরদিন,
.        মানুষের মন,
অতিক্রমি দেশ কাল মানবের সাথে
.        মাগিছে মিলন।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রবাসী
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৬ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ১৯১৯) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ -
৮.৮.২০২০।

আজি প্রভাতের শীতল সমীর
.        অঙ্গ পরশি’ ধীরে,
কহিল বারতা, “ওরে পরবাসি,
.        শরৎ এসেছে ফিরে।
বঙ্গজননী ডাকিছে সকলে---
.        কে কোথায় আছে আজ!
এখনো সাঙ্গ হয়নি কি তোর
.        প্রবাসের যত কাজ?”

উঠিনু চমকি' ; একটি বরষ
.        চলিয়া গেছে কি তবে,
এরি মাঝে ধরা নব নব সাজে
.        জানিনা শোভিল কবে !
গিয়াছে আসিয়া নব বসন্ত
.        লয়ে ফুল আভরণ,
আষাঢ়-গগনে নবনীল মেঘ,
.        শ্রাবণের বরিষণ!
হেথা চারি ধারে হেরি নিশ্চল
.        কঠিন শিলার স্তুপ,
কোথায় জননী বঙ্গভূমির
.        অমল শ্যামল রূপ !
কিরণ-খচিত শারদ আকাশে
.        শুভ্র মেঘের মেলা,
কূলে কূলে ভরা তটিণীকুলের
.        কল্লোল সারাবেলা !

আশ্বিনে আজি মা তোর ভবনে
.        বাজে উৎসব বাঁশি,
বিরহীর মুখে উঠিছে ফুটিয়া
.        মধুর মিলন-হাসি।
জানি, কোলে তোর একটুকু স্থান
.        আছে মা আমারো তরে,
ছাড়ি প্রবাসের বেচা-কেনা, তাই
.        ছুটে যেতে চাই ঘরে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আশ্বিনে
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার আশ্বিন
১৩৩০ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ১৯২৩) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।


সেই তো আশ্বিন নব এসেছে আবার
ভরি লয়ে তরণী সোণার।
তেমনি বরষ পরে
আনিয়াছে ঘরে ঘরে
অপরূপ সুষমা-সম্ভার।
ধরণীর শ্যামাঞ্চল
রবিকরে ঝলমল,
নীলাকাশ কোলে শুভ্র মেঘের বিস্তার।


তেমনি শেফালিগন্ধ ভেসে আসে ধীরে
শিশিরার্দ্র প্রভাত সমীরে।
দোয়েল আপনা ভুলে
গাহে গান নদীকূলে
কলহংস আসিয়াছে ফিরে।
জলে স্থলে সুনির্ম্মল
ফুটেছে কুসুমদল,
আসিছে আনন্দময়ী বিশ্বের মন্দিরে।


হে আশ্বিন! আগে যবে হৃদি দ্বারে এসে।
দাঁড়াইতে অতিথির বেশে---
কত শৈশবের প্রীতি,
কত যৌবনের গীতি
জাগিত সে একটি নিমেষে।
শুনিয়া উৎসব বাঁশী
হৃদয় যাইত ভাসি'
কোন্‌ দূর নিরুদ্দেশ স্বপনের দেশে।


হের আজি রুদ্ধ সেই অন্তর আমার---
তোমা তরে খুলিবে না আর।
পুরাণো সে সুরে আজি
আর উঠিবেনা বাজি
সেই মোর বীণা---ছিন্নতার।
আজি সে মন্দিরে চাই---
কই, সেথা দেবী নাই !
ব্যর্থ পূজা আয়োজন---পত্রপুষ্পভার।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পথের ডাক
কবি রমণীমোহন ঘোষ
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রয়াণে লেখা।
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৩২ সংখ্যায় (জুলাই ১৯২৫) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ -
৮.৮.২০২০।

সার্থক করি' সাধনা তোমার,
.        সরোজাসীনা
বাণী দিয়াছিল করে তুলি তব
.        সাধের বীণা।
বিজয় মাল্য গাঁথিয়া স্বর্ণ
.        কমলদলে
আপনি লক্ষ্মী দিয়াছিল আনি
.        পরায়ে গলে।
সংসার পথ সম্মুখে ছিল
.        কুসুমে ঢাকা,
শ্যামলা ধরণী চির বসন্ত
.        মাধুরী মাখা।

দুখিনী জননী ছিল চেয়ে তব
.        মুখের পানে
সহসা একদা আহ্বান তাঁর
.        পশিল কাণে।
সুখনীড় ছাড়ি আসিলে অমনি
.        পথের মাঝে
দেহ প্রাণ মন সঁপিলে সকলি
.        মায়ের কাযে।
বিভব-বিলাস ত্যজিয়া জীর্ণ
.        বসন সম,
চির-দারিদ্র্য করিলে বরণ,
.        নরোত্তম!

ত্যাগে ও কর্ম্মে আদর্শ নব
.        দেখালে তুমি।
গৌরবে তব ধন্যা জননী
.        জন্মভূমি।
দেবতা আত্মা হিমালয়ে আজি
.        কাহার বাঁশী
শুনিয়া, আবার যাত্রার পথে
.        দাঁড়ালে আসি !
খ্যাতি প্রীতি সেবা সম্মান ছিল
.        ঘি
রিয়া যত
ফেলে গেলে চলি নিমেষে, পাথের
.        ধূলির মত।

.         ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবির অধিকার
( Schiller )
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার পত্রিকার
ভাদ্র ১৩২৩ সংখ্যায় (অগাস্ট ১৯১৬) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

“লহ এই ধরা”---                     স্বর্গ হইতে
কহিলেন ভগবান্‌
ডাকিয়া মানবে---                “লহ এ ধরণী,
আমার স্নেহের দান।
'এই বসুমতী                   তোমাদের তরে
র’বে চিরদিন ধরি’,
ভাই ভাই মিলি                ভোগ করিবারে
লহ বণ্টন করি’।”

শুনি’ সেই বাণী,                 যে ছিল যেথায়
ছুটিয়া আসিল ত্বরা,
বালক বৃদ্ধ                        সকলে মিলিয়া
বাঁটিয়া লইতে ধরা।
লইল কৃষক                       ধরা-জাত যত
বিবিধ শষ্যফল ;
শিকারী লভিল                   মৃগয়ায়র তরে
আরণ্য মৃগদল ;
পণ্য আহরি’                       করিল বণিক্‌
পূর্ণ বিপণি তার ;
ঘোষিল নৃপতি                     সবার অংশে
রাজকর অধিকার।
বণ্টন যবে                       হয়ে গেল সারা,
বাকি আর কিছু নাই---
বছ দূর হ'তে                     সকলের শেষে
আসে কবি সেই ঠাঁই।
ধাতার চরণে                     লুঠি কহে কৰি
কাঁদিয়া---“বিশ্বরাজ,
শুধু এ ভক্ত-                            সন্তান তব
বঞ্চিত হ'ল আজ !”
কহিলা বিধাতা              "কোথা ছিলে তুমি---
কোন্‌ স্বপনের পুরে,
সবাই যখন                       ধরা-ভাগে রত,
কেন তুমি ছিলে দূরে?”
“নয়ন আমার                      ছিল অনিমেষে
চাহি, তব মুখ পানে,
শ্রবণ আমার                        আছিল মুগ্ধ
তোর-ৰীণার তানে।
তোমারি আলোকে                  মত্ত এ প্রাণ
ভুলে ছিল ধরাভূমি,
ছিলাম তোমারি           কাছে”---কছে কবি---
“ক্ষমা কর মোরে তুমি।”
“কি দিব তোমায়?”             ---কহিলা বিধাতা
করুণা-কোমল আঁখি,---
“ভুমি, অরণ্য,                        পণ্য, আপণ
কিছু হেথা নাহি বাকি।
এস পাশে মোর---                  পার্থিব কিছু
লহ নাই তুমি মাগি",
রহিবে মুক্ত                         মম গৃহ দ্বার
সতত তোমার লাগি’।”

.         ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষা উত্সব
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার ভাদ্র
১৩২৩ সংখ্যায় (অগাস্ট ১৯১৬) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।


বরষা দিয়াছে মাখি' মেঘের অঞ্জন
নীল নভস্তলে,
ঢাকিয়া দিয়াছে তপ্ত ধরণীর দেহ
শ্যামল অঞ্চলে।
স্নিগ্ধ ঘন সুচিক্কণ পল্লব-ভূষণে
মণ্ডিত কানন,
বিকশিত কদম্বের মদির-সৌরভে
অধীর পবন।
তটিনী কল্লোল তুলি' ছুটিছে গরবে
যৌবন-চঞ্চল,
গুরু গুরু ডাকে মেঘ---ঝর ঝর ধারা
ঝরে অবিরল।


চারি ধারে বরষার ঘোর ঘন-ঘটা ;
ওগো প্রিয়তম,
রহিবে কি এ হৃদয় শুধু, নিদাঘের
শুষ্ক মরু সম !
নাহি দিবসের আলো, ঘেরা দশদিশি
সঘন আঁধারে,
জনহীন বনপথে হে চির-বাঞ্ছিত,
এস অভিসারে।
নিবিড় বরষা ধারা আন এ জীবনে,
জীবন-বল্লভ,
নিভৃত কুটীরে মোর পূর্ণ হোক আজি
বরষা-উৎসব।

.         ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মেঘের খেলা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ সংখ্যায় (সেপ্টেমম্বর ১৯১৬) প্রকাশিত। মিলনসাগরে প্রকাশ -
৮.৮.২০২০।

মুক্ত-আকাশ পানে চাহি আজি
.        সারাটি বেলা,
মুগ্ধ-নয়নে হেরি গৃহ-হারা
.        মেঘের খেলা।
কেহ বা ধূসর---কেহ বা ধবল---
কেহ ঘননীল---কেহ বা শ্যামল,
উৎসবে মাতি যেন ছুটাছুটি
.        করিছে খেলা।

তুষার-শুভ্র মেঘ মিশে আসি’
.        নীলের গায়,
নীল মেঘ ছুটি’ ধূসরের সাথে
.        মিশিতে চায়।
মানব মনের বাসনার মত
কোন্‌ মায়ালোক পানে অবিরত
চঞ্চল বেগে দলে দলে যত
.        মেঘেরা ধায়।

পুঞ্জ পুঞ্জ কাল মেঘ আসি’
.        পবন-ভরে
মসী দিল মাখি' সহসা রঙীন
.        মেঘের স্তরে।
যতদূরে চাহি---গগন আঁধার,
রহি’ রহি’ শুধু ঝরে বারিধার,
সঘন বিষাদ আসিল নামিয়া
.        ধরণী ’পরে।

কৃষ্ণ মেঘের ঘন আবরণ
.        নিমেষে টুটি’
রবির দীপ্ত-কিরণ ভুবনে
.        পড়িল লুটি’।
শ্যামল বনের পল্লব দল
স্বর্ণ-আলোক করে ঝলমল,
দিক্‌-বালিকার মুখে সুধা-হাসি
.        উঠিল ফুটি’।

শুভ্র অমল কিরণে মগন
.        গগন-তল,
দূরে ভেসে যায় স্বপনের প্রায়
.        মেঘের দল।
শান্ত সুদূর অতল আকাশে,
চপল মেঘের ঊর্দ্ধে, বিকাশে
চির দিবসের গভীর নীলিমা
.        অচঞ্চল।

.         ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আহ্বান
(দেশাত্মবোধক)
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমেন্দ্র ভট্টাচার্য্য সংকলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা” দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও
কবিতার সঙ্কলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

ওই শোন্‌ 'ওই শোন্‌ সকরুণ মায়ের আহ্বান ;
আয় ছুটে আয়, আছিস্‌ কোথায় অযুত সন্তান!
কে এখনো বসি' করে ছেলেখেলা,
আলসে বিলাসে কে কাটায় বেলা,
বিবাদে বিষাদে লাজে অপমানে কে বা ম্রিয়মাণ
ওই শোন্‌ ওই শোন্‌ মায়ের আহ্বান!
জননীর দুখে কাঁদে নাকি আজ কাহারো পরাণ?
কে মুছাবে মা'র নয়নের জল,
কে মায়ের মুখ করিবে উজ্জ্বল,
কে সাধিতে চাহে প্রাপপণ করি মায়ের কল্যাণ !
ওই শোন্‌ ওই শোন্‌ মায়ের আহ্বান।

.         ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুপ্রভাত
(দেশাত্মবোধক)
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৯৬০ সালে প্রকাশিত, হেমেন্দ্র ভট্টাচার্য্য সংকলিত ও সম্পাদিত “মাতৃবন্দনা”  
দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও কবিতার সঙ্কলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

হয়েছে রে শেষ নিবিড়-তিমির-পূজিত,
.                ঝঞ্ঝামুখর, ক্ষুব্ধ, সুচির যামিনী ;
হের মেঘমালা---সুদূর অরুণ রঞ্জিত,
.                স্তব্ধ ঝটিকা, লুপ্ত আকাশে দামিনী।
এখনি কাননে উঠিবে বিহগসঙ্গীত,
.                কুসুমগন্ধ আসিবে মন্দ পবনে ;
ওরে আশাহত, ভীত, আর নাই রজনী---
.                নবীন প্রভাত আসিছে আবার ভুবনে।
একটিও তারা ছিল না বিশাল অন্তরে,
.                ক্ষীণ আলোরেখা পড়ে নাই আসি ভূতলে ;
প্রহর গ'ণেছ জাগিয়া সভয় অন্তরে
.                আকাশের পানে চাহিয়া, বসিয়া বিরলে।
ভয়-সংশয় হোক্‌ তব সব অন্ত রে,
.                হের শুকতারা উদিত পূর্ব গগনে ;
ওরে আশাহত, ভীত, আর নাই রজনী---
.                নবীন প্রভাত আসিছে আবার ভুবনে।
ওই আসে ঊষা---আনন অনবগুণ্ঠিত,
.                মধুর হাস্যে বিকাশি শান্ত মহিমা ;
হেম-অঞ্চল চরণকমলে লুষ্টিত,---
.                তিমির প্রান্তে দীপ্ত আশার প্রতিমা।
এখনো কে আছ সুপ্ত, কে আছ কুণ্ঠিত?
.                উঠ উঠ, বলি ডাক, ভাই, ডাক স্বজনে,
ওরে আশাহত, ভীত, আর নাই রজনী---
.                নবীন প্রভাত আসিছে আবার ভুবনে।
ওগো উঠ, উঠ, ছিঁড়ি এস মোহবদ্ধন,
.                ভাই ভাই মিলি দাঁড়াও আসিয়া বাহিরে ;
কেন রে নিরাশ, কেন রে বিফল ক্রন্দন,
.                দুঃখ-রজনী নাহি বাকি, আর নাহি রে।
আনন্দে লয়ে সুগন্ধি ফুল-চন্দন,
.                অঞ্জলি সবে দাও জননীর চরণে ;
ওরে আশাহত, ওরে ভীত, নাই রজনী
.                নবীন প্রভাত আসিছে আবার ভুবনে।

.                      ***************          
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর