কবি রমণীমোহন ঘোষের কবিতা
*
শিবাজী ও সুন্দরী
কবি রমণীমোহন ঘোষ
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার জ্যেষ্ঠ ১৩১৫ (মে ১৯০৮) সংখ্যা থেকে
নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

মহারাষ্ট্র-ভাগ্যাকাশে সমুদিত যবে ভানুসম
.                শিবাজী নৃপতি,
সেনাপতি স্বর্ণদেব একদিন নিবেদিলা আসি
.                করিয়া প্রণতি,---
“জয় হোক্‌ মহারাজ, সম্পাদিত এবে---যে আদেশ
.                ছিল ভৃত্য ’পরে,
বিজয়-পতাকা তব সগৌরবে উড়িতেছে আজি
.                কল্যাণ নগরে ;
বন্দীকৃত আহাম্মদ---বিজাপুর-রাজ-প্রতিনিধি
.                সহ পরিজন।”
শিবাজী কহিলা *ধন্য স্বর্ণদেব, বীরত্ব তোমার
.                রহিবে স্মরণ।”
কহিলেন সেনাপতি, “মহারাজ, আরো কিছু মোর
.                আছে নিবেদন,
শত্রুপুরী মাঝে এক অপরূপ সৌন্দর্য্যপ্রতিমা
.                করিনু দর্শন ;---
রূপসী ষোড়শী বালা---তিলোত্তমা রমা এর কাছে
.                পায় বুঝি লাজ,
হেন ফুল শোভে শুধু রাজোদ্যানে ; তাই আনিয়াছি
.                সাথে, মহারাজ।”

ইঙ্গিতে সৈনিক এক লয়ে এল রাজ সভামাঝে
.                লজ্জিতা যুবতী ;
নিমেষে নিস্তব্ধ সভা, বিস্মিত বিমুগ্ধনেত্র যত
.                হেরি সে মূরতি।
যেন এ সৌন্দর্য্যস্বপ্ন---বিধাতার মানবী-কল্পনা
.                চিত্রপটে আঁকা !
শিবাজী কহিলা ধীরে---ক্ষণকাল দেখি সেইরূপ
.                পবিত্রতা-মাখা,---
“মাতঃ তোর গর্ভে যদি জন্মিতাম, আমরাও বুঝি
.                হতেম সুন্দর !
সেনাপতি, পতিপাশে সযতনে এ কুলবধুরে
.                পাঠাও সত্বর।”---


এই কবিতাটি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে
লেখা। একবার কল্যাণের শাসক মুল্লা আহমেদ এর পরিবারবর্গকে শিবাজীর সেনাপতি
আবাজী সোণদেব আটক করেন। তাঁদের মধ্যে সেই মুল্লা আহমেদের অতীব সুন্দরী
পুত্রবধুও ছিলেন। শিবাজীর আদেশে মেয়েদের সসম্মানে সেই পরাজিত শাসকের কাছে
ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ছত্রপতি  শিবাজী  মহারাজের  এই  ঐতিহাসিক,  ঘটনাটিকে  নিয়ে  বিনায়ক  দামোদর  
সাভারকার তাঁর
Six Glorious Epochs গ্রন্থের ১৫২-পৃষ্ঠায় শিবাজীকে প্রশংসা করার বদলে,
ভর্ৎসনা করে লিখেছেন . . .
“. . . But because of the then prevalent perverted religious ideas about chivalry to women,
which ultimately proved highly detrimental to the Hindu community, neither Shivaji Maharaj
nor Chimaji Appa could do such wrongs to the Muslim women. It was the suicidal Hindu
idea of chivalry to women which saved the Muslim women (simply because they were  
women) from the heavy punishments of committing indescribable sins and crimes against
the Hindu women.”  

এর থেকে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নায়ক সাভারকারের আশ্চর্যজনক,  প্রায়  
অবিশ্বাস্য, নেতিবাচক ও বিপথগামী চিন্তাধার বহির্প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত্যু-সন্ধ্যা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার আশ্বিন ১৩১৯ (সেপ্টেম্বর ১৯১২) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।


নীরব বিহঙ্গ-গীতি,                  পশ্চিম অচলে
রবি অন্ত যায় ;
মিশে গেল দিবসের              শেষ আলো-রেখা
দিগন্ত সীমায়।
দূর বনরাজি শিরে         নেমে আসে যেন ধীরে
কৃষ্ণ যবনিকা,---
সন্ধা বুলাইয়া দিল                    বিশ্ব-দৃশ্যপটে
তিমির-তুলিকা।
এমনি একদা সন্ধা                  আসিবে নামিয়া
জীবনের ’পরে,
নিবিবে আঁখির আলো,                বাসনার ঢেউ
থামিবে অন্তরে,
ক্ষান্ত যত গীত গান           সুখ-দুঃখ ভরা তান ;
শুধু চুপে-চুপে
করুণ মরণ আসি                   ঘিরিবে আমায়
অন্ধকার রূপে !


নিখিল ধরণী ক্রমে                      লুপ্ত রজনীর
অন্ধকার গ্রাসে,
কোথা হ'তে উঠে ফুটে’              অগণ্য তারকা
অসীম আকাশে !
কে জানিত রবি-করে             ঢাকাছিল নীলাম্বরে
জ্যোতিষ্কনিচয়।
নিবিড় আঁধার মোরে                 অনন্ত লোকের
দিল পরিচয়।
ওই মত পরিশ্রান্ত                    জীবনের শেষে
সন্ধ্যায় যখন
মৃত্যুর শীতল কোলে                   জনমের মত
মুদিব নয়ন,
আঁধারে মিশিবে ভব,             দেখিব কি নব নব
জ্যোতির্ম্ময় দেশ---
এ জীবনে কোন দিন                     স্বপনেও যার
পাইনি উদ্দেশ !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সাধ
কবি রমণীমোহন ঘোষ
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩০৫ (ফেব্রুয়ারী ১৮৯৯) সংখ্যা থেকে নেওয়া
। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির মুকুর কাব্যগ্রন্থের কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ -
৮.৮.২০২০।

সে উঠেছে ফুটি’ স্বর্ণকমল
আমার মানস-সরসে ;
সাধ যায় তাই, হয়ে মধুব্রত
সৌরভে তার ভাসি’ অবিরত
তা'রি চারিধারে উড়িয়া নিত্য
গুঞ্জন করি হরষে।

সে আমার বনে কুসুম গুচ্ছ
ফুল্ল যূথিকা কামিনী :
তাই চাহি, হয়ে বালরবিকর
ফুটাই তাহার শোভা মনোহর,
শিশিরবিন্দু হয়ে করি তারে
সিক্ত সারাটি যামিনী।

সে শোভিছে একা পূর্ণ ইন্দু
নির্ম্মল নীল আকাশে ;
সাধ যায়, হয়ে সিন্ধু অতল
বক্ষে রাখিতে সে ছবি অমল,
চকোরের মত উড়িতে ঊর্দ্ধে
তাহার অমিয় সকাশে।

সে যে বসন্তশোভার প্রতিমা---
মাধুরী অতুল ভুবনে ;
সাধ তাই, হ'য়ে কোকিল সুরব
গাহিতে তাহার গুণগৌরব,
অশোকের মত চরণ-পরশে
শোভিতে কুসুম-ভূষণে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সে
কবি রমণীমোহন ঘোষ
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার চৈত্র ১৩০৭ (মার্চ ১৯০১) সংখ্যা থেকে নেওয়া।
মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

সে ছিল আমার হৃদয়-বৃন্তে
পদ্মের মত ফুটিয়া ;
যেন এসেছিল মূরতি বিকাশি’
আমারি গোপন আকাঙ্ক্ষারাশি,
আমার মনের সকল মাধুরী
নিয়েছিল যেন লুটিয়া।

সে ছিল একটি মধুর স্বপ্ন
আমার মুগ্ধনয়নে,
বিশ্ব প্রকৃতি নিত্য নূতন
সুষমার হারে শোভিত তখন,
কঠোর কঠিন ধরাভূমি ছিল
বিলীন কুসুম-শয়নে।

সে ছিল আমার যৌবন-বনে
মৃদুল মলয়-লহরী,
পরশে তাহার কল্পনা-লতা
পল্লবে ফুলে হ'ত অবনতা,
মুখর কোকিল ছেয়ে দশ দিক
হরষে উঠিত কুহরি’।

সে ছিল আম।র পরাণ-বীণায়
একটি ললিত রাগিণী ;
নিশি দিনমান সে মধুর ধ্বনি
ঝঙ্কারি" চিতে উঠিত আপনি,
দে আমার ছিল চির সুধাধারা
নিখিল বিশ্বপ্লাবনী।

সে ছিল আমার অন্তরাকাশে
চির অচপল দামিনী ;
চারিধার ঘিরি’ নীরদ নীলিমা,
তারি মাঝে তার দীপ্তি প্রতিমা,
উজ্জ্বলি' ছিল সে মোর আঁধার
স্তব্ধ জীবন-যামিনী।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুক্তি
কবি রমণীমোহন ঘোষ
ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত, কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত “সৌরভ” পত্রিকার পৌষ ১৩২০ (ডিসেম্বর
১৯১৩) সংখ্যা থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

কত গ্রহ-উপগ্রহ রবি-শশি তারা
খচিত এ মুক্ত মহাকাশ,
ব্যাকুল কল্পনা ফিরে হ'য়ে দিশাহারা
অসীমের লভিতে আভাস।
কতটুকু এ জগৎ! ক্ষুদ্র কারাগারে
বন্দী মোরা কাটাই জীবন।
বাহিরে অনন্ত বিশ্ব ; রহিয়াছে দ্বারে
অচঞ্চল প্রহরী মরণ।
পিঞ্জরের পাখীসম আমার অন্তরে
জাগে তবু মুক্তির স্বপন ;
বিচিত্র-অপরিজ্ঞাত---মহা চরাচরে
যাব নাকি টুটিয়া বন্ধন !
জানি, মৃত্যু, একদিন আসি' শুভক্ষণে
মুক্ত করি' দিবে রুদ্ধ দ্বার ;
চির স্বাধীনতা লভি’ অনন্ত ভুবনে
বাহিরিব প্রসাদে তোমার।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবির দান
কবি রমণীমোহন ঘোষ
ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত, কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত “সৌরভ” পত্রিকার কার্তিক ১৩২১ (অক্টোবর
১৯১৪) সংখ্যা থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

(১)
কোথা পাব আমি                    অমূল্য মণি---
মুক্তায় গাঁথা হার,
কি আছে রতন---দিতে তোমা উপহার !
শুধু কথা গাঁথি’                        হৃদয়ের সুরে
এনেছি করিতে দান---
উদ্দেশে তব---আমার ক্ষুদ্র গান।

(২)
ঊষার আলোকে                        কতফুল আজি
ফুটেছে কানন ভরি’ ;
সন্ধ্যার ছায়ে---নীরবে পড়িবে ঝরি’।
তখনো কোমল                           বন-যুথিকার
মৃদু সৌরত সম
ঘিরিয়া তোমায়---রহিবে এ গান মম।

(৩)
বাতাসের সাথে                        মিশিয়া নিশীথে
শত ছলে অবিরাম
গানটি আমার---ধ্বনিবে তোমার নাম।
উজ্জ্বল করি’                             মূরতি তোমার
থাকিবে এ চিরদিন
আঁধারে যেমন---দীপ নির্ব্বাণহীন।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর