কবি রমণীমোহন ঘোষের কবিতা
*
হৃদয়াসীনা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং!

আমার শূন্য হৃদয়-আসনে
.        কে তুমি আসীনা আজি !
ছিল এ চিত্ত জড়, আচেতন,
নিদ্রিত সাধ, বাসনা, বেদন ;
আজি সেথা একি রাগিনী নূতন
.        আপনি উঠিছে বাজি’ !
শূন্য হৃদয় আসনে আমার
.        কে তুমি আসীনা আজি !

আমার গোপন মনেমন্দিরে
.        কে তুমি দেবতা অয়ি !
আমার এ চির আঁধার ভবন
আলোক-রশ্মি দেখেনি কখন,
সহসা কি শুভ কিরণে মগন
.        করিলে জ্যোতির্ম্ময়ি !
আনার প্রাণের মন্দির মাঝে,
.        কে তুমি আসীনা অয়ি।

আমার শুষ্ক হৃদয়-মরুতে
,        কে তুমি প্রেমের নদি !
ভরা বরষায় ভরি’ কূলে কূলে
যৌবনাবেগে আপনায় ভুলে
উছলি’ রঙ্গে তরঙ্গ তুলে’
.        ছুটিতেছ নিরবধি !
আমার শুষ্ক হৃদয়-মরুতে
.        কে তুমি অমৃত নদী !

কে তুমি আমার হৃদয়-কুঞ্জে
.        নববসন্ত-রাণি !
চরণ-পরশে ধরণী আকুল
দিতেছে অর্ঘ্য শতকোটী ফুল,
বিহরে মলয়, গাহে পিককুল
.        অবসাদ নাহি মানি’।
আমার হৃদয়-নিকুঞ্জবনে
.        অয়ি বসন্তরাণি !

কে তুমি আমার মানস-রাজ্যে
.        চির সুষমার খণি !
ঊষা গোধূলির রঙীন আকাশে,
ইন্দুকিরণে, তারকার হাসে,
কোথা হ’তে আজি নব শোভা আসে?
.        কে তুমি পরশমণি !
আমার এ দীন হৃদয়-রাজ্যে
.        তুমি সুষমার খনি।

কে তুমি আমার অন্তরে থাকি’
.        সুধীরে বাজাও বীণা !
দিবানিশি শুধু গাহি’ সুমধুর
সান্তনা ভরা স্বরগের সুর,
পরাণের যত ব্যথা কর দূর
.        আমার হদয়াসীনা !
অন্তর মাঝে থাকি’ নিশিদিন
.        কে তুমি বাজাও বীণা !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঊষায়
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

( ১ )
তুমি দাঁড়ায়েছ আসি’                        ঊষার মতন হাসি’
শিয়রে আমার,
অমৃত পরশে তব                          ‘করি’ সূপ্ত প্রাণে নব
চেতনা সঞ্চার।
নিশ্বাস-মলয় বায়
ধীরে লাগে আসি’ গায়,
ভেসে ভেসে আসে তায়
পুষ্পগন্ধ সার।
শত বিহঙ্গের গানে
ভ্রমর-গুঞ্জর তানে
পশে আসি’ আজি কাণে
সঙ্গীত তোমার।
তুমি দাঁড়ায়েছ আসি’                        ঊষার মতন হাসি’
শিয়রে আমার।


( ২ )
ঊষার মতন তুমি                        আলো করি’ ধরাভূমি
হয়েছ উদয়,
অসীম তিমির টুটি’                          সহসা উঠেছে ফুটি’
রূপ জ্যোতির্ম্ময়।
না ভাঙ্গিতে ঘুমঘোর
চেয়ে দেখি’ নিশি ভোর,
জেগে উঠে মনে মোর,
.                        কি মহা বিশ্বয় !
কিরণ-মণ্ডিত ভব,
একি হর্ষ-কলরব,
একি জাগরণ নব
.                        আজি বিশ্বময় !

ঊষার মতন তুমি                        আলো করি’ ধরাভুমি
হয়েছ উদয়।


( ৩ )
উধার স্বরূপ তব                        হেরি মূর্ত্তি অভিনব
ভরিয়া নয়ন।
নির্ম্মল ললাটতলে                         সিন্দূর বিন্দুর ছলে
তরুণ তপন ;
কণ্ঠে কুসুমের মালা,
করে ফুল্ল-ফুলডালা,
চরণে অলক্ত ঢালা
সস্মিত বদন,
স্নাত, স্নিগ্ধ, শুভ্র, কান্ত,
শুচি শোভা, দিবা, শান্ত,
বিস্রস্ত অঞ্চল প্রান্ত
কনক বরণ।
ঊষার স্বরূপ তব                        হেরি মূর্ত্তি অভিনব
ভরিয়া নয়ন।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সন্ধ্যায়
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

( ১ )
তুমি দেখা দাও                        এসে প্রথর দিবস শেষে
সন্ধ্যার মতন,
তাপিত দেহের পরে                        মলয় বীজনে করে’
অমিয় সিঞ্চন।
এস তুমি সৌম্যকান্তি,
সঞ্চার’ সান্ত্বনা, শান্তি,
দূর করি’ সর্ব্ব ক্লান্তি
সকল বেদন।
আন শুধু নীরবতা,
না কহিয়া কোন কথা
কর পরাণের ব্যথা
গোপানে হরণ।
তুমি দেখা দাও এসে                        প্রখর দিবস শেষে
সন্ধ্যার মতন।


( ২ )
আজি দেখা দাও এসে                  সন্ধ্যার করুণ বেশে
‘মুগ্ধ করি’ মন
অধদে নাহিক বাণী,                       সরম প্রতিমাখানি
বিশ্বে অতুলন ৷
এস তুমি একবার
খুলে’ ফেলি’ অলঙ্কার
আলুলিত কেশ ভার
আনম্র আনন।
প্রদীপ ধরিয়া করে
এস শুভ অবসরে,
লইয়া আঁচল ভরে’
সোণার স্বপন।
আজি দেখা দাও এসে                সন্ধ্যার সুন্দর বেশে
মুগ্ধ করি’ মন।


( ৩ )
এস তুমি ধীরে ধীরে                স্পর্শ করি’ ধরণীরে
অলস চরণে ;
দাঁড়াও সন্ধ্যার মত                আঁখি-পাতা করি’ নত
অসীম নির্জ্জনে।
থেমে যাক্ কলরব,
করি শুধু অনুভব
নীরব মাধুরী তব
অবসন্ন মনে।
ললাটে বালেন্দু আঁকা,
কুসুম-সৌরভ-মাথা
তনু নীলবাসে ঢাকা,
দেখি দুনয়নে।
এস তুমি ধীরে ধীরে                স্পর্শ করি’ ধরণীরে
অলস চরণে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যোগ-ভঙ্গ
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

বনদেবীদ্বপ্ন মাঝে কুসুমাভরণা
আসে উমা তপোবনে অলস চরণা,
মূর্ত্তিমতী বসন্তের বনলক্ষ্মী যথা---
সুকুমারী সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতা।
অশোক-বলয় করে, স্বর্ণ কর্ণিকার
শোভিছে কবরী মাঝে, গলে সিন্ধুরার
মুক্তামালা, কটিদেশে বকুলে রচিত
অপূর্ব্ব মেখলা ; লুন্ধ ভ্রমর তৃষিত
নিশ্বাস সৌরভ মুগ্ধ, বেড়ার উড়িয়া
বিম্ব অধরের কাছে ; সচকিত হিয়া
চঞ্চল দৃষ্টিতে বালা চাহি’ প্রতিক্ষণ
করধৃত নীলপদ্ম করি’ সঞ্চালন
নিবারণ করে তারে।---
.                        এইরূপে যবে
প্রবেশিয়া লতা-গৃহে, করিলা নীরবে
প্রণাম মহেশ-পদে, ---নব কর্ণিকার
সুনীল-অলক-শোভী, কর্ণ অলঙ্কার
নবীন পল্লব, খসি’ পড়িল ভূতলে॥
ইষ্ট আশীর্ব্বাদ লভি’ যবে কুতূহলে
যতনে গ্রথিত দিব্য প্রদ্মবীজ মালা
আরক্তিম করপদ্যে লয়ে গিরিবাল !
ধরিলা সম্মুখে, সেই প্রেমভক্তি-প্রভা-
সমুজ্জল বরাননে পূর্ণ পূণ্য শোভা,
কুমারী-হৃদয়-ক্ষুদ্ধ চির অতুলন
সৌন্দর্য্যের প্রতিচ্ছায়া, নেহারি তখন
সহসা শিবের চিত্তে কি মহা বিস্ময়
উঠিল জাগিয়া ! মুগ্ধা উমার হৃদয়
কি উচ্ছ্বাসে গেল ভরে’ ! লজ্জারক্ত মুখে
পুলক-অঞ্চিত দেহে শিবের সম্মুখে
রহিলা দাঁড়ায়ে শুধু আনত নয়নে !

অমনি মুহূর্ত্ত তরে মহাদেব-মনে---
শশীর উদয়ে সিদ্ধু সলিলে যেমন---
উপজিল অধীরতা ! যোগীন্দ্র তখন
বিম্বাধরা পার্ব্বতীর চন্দ্রমুখ পানে
চাহিয়া রহিলা শুধু সতৃষ্ণ নয়ানে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুটি কথা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

তুমি কি বুঝিবে সখি আমার অন্তরে
নিশি দিন তৃপ্তি হীন কি যে ব্যাকুলতা,
কি চাহি বলিতে তোমা’ প্রেমাপ্লুত স্বরে
মরন-আবেগ ভরা দুটি ক্ষুদ্র কথা !
কতদিন কতবার বেঁধেছি হৃদয়
কি কথা কহিতে অনুকূল অবসরে,
অমনি আসিয়া শত আশঙ্কা সংশয়
অধরের ভাযা মোর 'লইয়াছে হরে”।

আজি নৰ বসন্তের বিজন নিশাতে
আসিয়াছি কাছে লয়ে আকুল হৃদয়,
আজ চাহি আপনারে দিতে তব হাতে
দেখাতে এ পরাণের নিভৃত নিলয়।
হৃদয়ের অন্তস্তলে আজ দেখ নামি’
সেই দুটি ক্ষুদ্র কথা---‘ভালবাসি আমি’।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

তোমারে যত দেখি
.                তৃষিত আঁখি তুলে’
ও রtপ মাধুরীতে
.                আপনা যাই ভুলে’ !

মধুর মুখ পানে
.                চাহিয়া থাকি যত,
ততই নব শোভা
.                নিরখি অবিরত ৷

কি মোহ-মাখা ওই
.                নয়ন-শতদল !
নিমেষে ভুলে’ যাই
.                আকাশ ধরাতল।

নয়ন মুদি যদি,---
.                আঁধারে উঠে ফুটি’
অসীম স্নেহ ভরা
.                তোমারি আঁখি দুটি!

তোমারি মাঝে শুধু
.                আমারে পাই খুঁজি’,
নহিলে আমি আর
.                কোথাও নাই বুঝি !

যতই করি ধ্যান
.                তোমার নাহি কুল ;
যেন গো তুমি ছাড়া
.                জগতে সবি ভুল !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মিনতি
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

যা কিছু আমার ছিল,
দিয়েছি আমি,
চাহি নাই প্রতিদান
হৃদয়-স্বামি !

আপনা সঁপিনু তব
চরণ পরে,
আপনি লয়েছ তুলে’
করুণা করে’,

নিয়েছ পরাণ, মন,
নবীন আশা,
জীবনের সুখ, সাধ,
বাসনা ভাষা।

নিখিল বিশ্বের চির
মাধুরী নব,
মুছিয়া নয়ন হ’তে
নিয়েছ সব॥

উছসিত প্রেম মোর
নিয়েছ হরে’
চাহি’ সকরুণ চোখে
নিমেষ ভরে।

সরবস্ব দিয়েছি তো
কিছুনা রাখি’,
লহু নাথ আজি তবে
যা’ আছে বাকি।

সকলি নিয়েছ, কেন
রেখেছ বল,
বুকভরা ব্যথা, আর
নয়ন-জল !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পূর্ণিমায়
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

আজি পুর্ণিমার রাতে বসিয়া একাকী
মনে পড়ে কা’র মুখখানি,
কা’র দু’টি ছল ছল প্রেমসিক্ত আঁখি
বাষ্পরুদ্ধ বিদায়ের বাণী !

কাহার পরশ মাখি’ আজি এ কুটীরে
পশে আসি’ চাঁদের কিরণ,
কাহার সৌরভ লয়ে আজ ধীরে ধীরে
বহিছে মলয় সমীরণ।

আজি দুজনার মাঝে কত ব্যবধান !
বুঝি এই বিশদ জ্যোৎস্নায়,
মুক্ত জানালায় বসি’ আকুল পরাণ,
সেও আজ ভাবিছে আমায় !

এমনি চাঁদিনী কত পূর্ণিমার নিশা
আসিয়া গিয়াছে কত বার,
তবু মিটে নাই মোর পরাণের তৃষা
অনিমেষে দেখি’ রূপ তা’র।

বুঝি বা হৃদয়ে তা’র এই পূর্ণ চাঁদ
জাগায়েছে নব ব্যাকুলতা,
কহিতে চাহে সে টুটি' সরমের বাঁধ
যত তার মরমের কথা।

আজি তা’র ভালবাসা, বাসনা বেদনা,
চন্দ্রকরে আনিতেছে ভাষি’,
তাই জেগে উঠে প্রাণে কতনা কল্পনা
নয়নে উছলে অশ্রুরাশি॥

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবন-বসন্ত
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।


মম অন্তরে                     নব বসন্ত
উদয় আজ,
এস, তুমি এস,                চিরবাঞ্চিত
হদয়-রাজ !
সুন্দর আজি নেহারি বিশ্ব,
কত নব শোভা সুচারু দৃশ্য,
প্রকৃতি ধেন গো পরিয়াছে নব
মোহন সাজ।
মম অন্তরে                নব বসন্ত
উদয় আজ !


আজি বহিতেছে             আনন্দ-ধারা
আমার প্রাণে,
চারিদিক হ’তে                সঙ্গীত নব
পশিছে কাণে !
মাখি’ নন্দন-কুসুমগন্ধ,
মধুর মলয় বহিছে মন্দ ;
অমিয়-লহরী উঠিছে উথলি’
বিহগ-গানে।
কে আজি এ নব               আনন্দরাশি
ঢালিছে প্রাণে !


কত শোভাময়                  আমার প্রাণের
গোপনগেহ !
কি মাধুরী সেথা                রয়েছে লুকান’
দেখেনি কেহ।
আজি মনে হয়, শতদল সম
বিকশিত যেন সে সুষমা মম
বাহিরিয়া আসি’ ঘিরেছে সে শোভা
এ হীন দেহ।
কত সুন্দর                   আমার প্রাণের
গোপন গেহ!


আমার কুঞ্জে                    পুঞ্জে পুঞ্জে
ফুটেছে ফুল,
কোকিল কূহরে,                করে গুজন
ভ্রমর কুল
আজি অন্তরে এস প্রিয়তম
সার্থক কর ব্যর্থ্য জনম,
এস অভিসারে, চিতরঞ্জন,
হদয়াকূল !
আজি এ কুঞ্জে                পুঞ্জে পুঞ্জে
ফুটেছে ফুলে।


মনে লয় যেন                যুগ যুগ ধরে’
তোমারি তরে
বসে’ আছি আমি        পথ পানে চাহি’
বিজন ঘরে।
আজ তুমি এস, হৃদয় রতন,
আমার সর্ব্বসাধনার-ধন !
বিরহ-অশ্রু দাও মুছাইয়া
করুণ করে।
বসে’ আছি আমি         যুগ যুগ ধরে’
তোমারি তরে।


এসগো আমার                   শত জনমের
বাসনারাশি !
আমার জীবন-                দেবতা ! গোপন
হৃদয়বাসি !
আজি চঞ্চল নব যৌবন,
আন অনস্ত নিবিড় মিলন ;
বাসন্তী ফুলে গাঁথিয়াছি মালা,
লহগো আসি’।
এস তুমি মোর                শত জনমের
বাসনারাশি !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষা
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

আবার নব হরষভরে বরষা আসে ভুবনে
ফুল্ল করি’ তাপিত তরু লতিকা,
গগনপথে নবীন মেঘ বেড়ায় ভাসি’ পবনে,
কাননে ফুটে কামিনী জাতী যূথিকা।

উচ্ছ্বসিতা নির্ঝরিণী তুলিয়া শত লহরী
ছুটিয়া যায় যৌবনের গরবে,
মত্ত বায়ে শ্যামল বন উঠিছে ঘন শিহরি’,
বকুলগুলি ঝরিয়া পড়ে নীরবে।

কদম্বের গন্ধ মাখি’ সিক্ত বায়ু আসিয়া
শীতল করে অঙ্গ খর পরশে ;
কুঞ্জ হ'তে ভ্রমরতান শ্রবণে আসে ভাসিয়া,
সারসকুল হরষে খেলে সরসে !

স্নিগ্ধ নব জলদজালে আবৃত দেখি নভসে
উল্লসিত চাতক যত পিপাসী,
রঙ্গভরে মত্ত শিখি নৃত্য করে রভসে,
কলাপে তা’র ইন্দ্রধনু বিকাশি’।

নিবিড় করি' মেঘের ছায়া সন্ধ্যা আসে নামিয়া,
অন্ধকারে মিশিয়া যায় ধরণী,
কুলায়লীন বিহঙ্গের কাকলি যায় থামিয়া,
রজনী আসে তামসী মসীবরণী।

কোথা গো আজি বরষারাতে স্নিগ্ধ বনভবনে
তরুণী বালা---আকুলা প্রেমপুলকে,
নীরদনীল বসন পরি’ এসগো অয়ি শোভনে,
কুসুমদাম জড়ায়ে নীল অলকে।

নিভৃত গৃহ কক্ষমাঝে এসগো অয়ি নায়িকা,
ললিত তনু---মালতীমালাধারিণী ;
মোহন বীণাযন্ত্রে অয়ি অমৃতময়ী গায়িকা,
বাজাও নব রাগিণী মনোহারিণী।

কৃষ্ণ মেঘে কনকরেখা ফুটিয়া উঠি’, দামিনী
নিমেষ ভরে ঝলসি’ দেয় নয়নে,
বজ্রনাদে সুপ্ত গৃহে চমকি’ পুর-কামিনী
কাঁপিয়া উঠে মিলন-সুখ-শয়নে।

ব্যাকুল চিতে নিরখি’ আজি বাদল-ঘেরা আকাশে
পথিক-বধূ পথের.পানে চাহিয়া,
ভাবিছে---কবে দয়িত তা’র আসিবে ফিরে সকাশে,
অশ্র ঝরে কপোলতল বাহিয়া।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর