কবি রমণীমোহন ঘোষের কবিতা
*
বিচ্ছেদের দিনে
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

চাহি' যবে মোর পানে কাতর নয়নে
.        নীরবে সে মাগিল বিদায়,
'কি আর বলিব তারে?---মোর ক্ষুদ্র মনে
.        কি আছে জানাতে বাকি তা'য় !
বিদায়ের দিনে সেই নয়ন তৃষিত
দেখিবে ষে রূপ তা'র, তাও উচ্ছ্বসিত
.        অশ্রু আসি' হ'ল অন্তরায়।

আজি হেন মনে হয় যেন তা'র কাছে
.        কত কথা বলা হয় নাই,
হৃদয়ে লুকান' যেন কত কথা আছে---
.        শেষ তার দেখিতে না পাই !
আজি তা'র প্রেমভরা আঁখি ছল ছল,
কমল-আননখানি বিষাদ-কোমল,
.        মনোমাঝে জাগিছে সদাই।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মেঘদূত
কবি রমণীমোহন ঘোষ
কাব্যানুধাদ। শ্রীযুক্ত বরদাচরণ মিত্র কৃত।
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

কবে রামগিরি হ’তে কোন্‌ নির্ব্বাসিত
বিরহ-তাপিত
হত ভাগ্য যক্ষ কোন্‌ প্রথম বর্ষায়,
তরুণী কান্তায়
জানাতে মরম ব্যথা, আকুল আবেগে
সেধেছিল মেঘে !

উজ্জয়িনী-রাজকবি মোহি' বিশ্বলোকে
মেঘমন্দ্র শ্লোকে
বিশ্বের ব্যাকুল যত বিরহীর বাণী
মায়ামন্ত্রে আনি'
রেখেছে অমর করি' অমৃত ভাষায়
সে প্রেম-ব্যথায়।

আজি বহু বর্ষ পরে,---একান্ত সুদূরে
বঙ্গ-অন্তঃপুরে
অবরুদ্ধা বঙ্গবধূ, কান্তবিরহিনী
পড়ি' সে কাহিনী
প্রবাসী পতির তীব্র বিরহু বেদনে
ভাবে মনে মনে।

মনে ভাবে--নবমেঘ আসে বুঝি ভেসে
তাহারি উদ্দেশে,
মেঘ সনে পাঠায়েছে হৃদয়ের ভার
বুঝি প্রিয় তা'র !
চেয়ে থাকে---মুগ্ধহিয়া, বসি বাতায়নে,
সঘন গগনে।

আজি বরষার দিনে তাই দুর্ব্বিষহ
প্রিয়ের বিরহ ;
যক্ষের বিরহগাথা ধ্বনিত অন্তরে
আজি শূন্য ঘরে
নব-বিরাহিণী মগ্ন মিলন-স্বপনে
সজল নয়নে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আক্ষেপ
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

এবার বসন্ত, সখি,
.        হ'ল বুঝি অবসান !
যত ফুল ছিল বনে
ঝরে' গেছে অযতনে,
তাই বুঝি নাহি আর
.        মত্ত মধুপের তান ;
মধুর মলয় আর
বহেনা সুরভি ভার,
তমালের ডালে বসি'
.        কোকিল গাহেনা গান।
বিফলে বসন্ত হায়
.        হ'ল বুঝি অবসান !


বিরহ-বিধুর প্রাণে
চেয়ে চেয়ে পথ পানে,
বসন্তের শেষ চন্দ্র
.        হ'ল বুঝি অস্তমান !
এমন যামিনী, হায়,
বিফলে কাটিয়া যায় !
কোথা মিলনের অশ্রু,
.        অনুরাগ, অভিমান !
এবার বসস্ত, সখি,
.        হ'ল বুঝি অবসান।


সেই যে কখন এসে
কেড়ে নিয়ে গেছে হেসে
আমার যা' কিছু ছিল---
.        অবোধ হৃদয় প্রাণ ;
আর কি আসিবে ফিরে'
ভাসিব প্রণয়নীরে,
হেরিব সে রূপ-জ্যোতি
.        সারানিশি দিনমান !
এবার বসন্ত, সখি,
.        হু'ল বুঝি অবসান !


সে যে অমৃতের সিন্ধু
শুধু তার এক বিন্দু
আমার তৃষিত চিত্ত
.        চাহে করিবারে পান।
কখনো নিমেষ তরে
সেকি হায় মনে করে
মলিন আনন মোর
.        জলভরা দুনয়ান !
এবার বসম্ত, সখি,
.        হ'ল বুঝি অবসান।


তা'র গলে দিব বলে',
বসন্ত কুসুম দলে
কতনা গাঁথিনু মালা,
.        শুকায়ে হয়েছে ম্লান !
যদি আসে পথ ভুলে'
চাছে যদি আঁখি তুলে'
বসন্তের অসবসানে
.        কি তারে করিব দান !
বিফলে বসন্ত, সখি,
.        হল বুঝি অবসান।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিরহ
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

তুমি এস, আজি এস,
চিরদিন তরে                     কর আসি' মোর
অসহ বিরহ শেষ।
তেমনি কুসুম ফুটেছে কাননে,
হাসিছে ইন্দু তেমনি গগনে,
শুধু নাহি দেখ, হেথা মোর মনে
তেমন সুখের লেশ।


মনে হয়, যেন                       শত যুগ তোমা'
ছাড়ি' আছি, হৃদয়েশ !
আজ তাই আমি অতি দীনহীন,
কত না দুঃখ সহি নিশি দিন ;
দেখ আসি' আজি শ্রীহীন মলিন
জীর্ণ আমার বেশ।


কত সুখস্মৃতি                     আনিয়াছে আজি
দুখের চাঁদিনী নিশা !
নাহি বুঝি কোথা এত ভালবাসা,
কেহ নাহি জানে এত প্রেমভাষা,
কারো প্রাণে বুঝি নাহি এত আশা
আকুল প্রণয়-তৃষা !


আজ কিগো তব                    পশে না শ্রবণে
আমি হেথা যত কাঁদি !
দেখ আসি', লয়ে অশ্রু-সজল
হৃদয় মাধুরী চির উজ্জ্বল,
আছি পথ তব চাহিয়া কেবল
আশায় পরাণ বাঁধি !


বুঝি আমি মোরে                   পারিনি বুঝাতে
আজ দেখ আসি' ফিরে',---
কারো নাই এত মত্ত বাসনা
কোথাও পাবে না এত সান্ত্বনা ;
ধুয়ে দিব তব সর্ব্ব বেদনা
বিমল অশ্রুনীরে।
ঘুচাতে তীব্র                        বিরহ-যাতনা
তুমি এস, এস ফিরে॥

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বসন্ত
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

হিমে জর জর ধরণীর জরা ঘুচায়ে
সযতনে তার শিশির-অশ্রু মুছায়ে
শীকর শীতল মন্দ মলয় পবনে
আসে বসন্ত ভূবনে।
সঞ্চার করি’ সুকোমল কর পরশে
'নবীন জীবন নব যৌবন হরষে
স্থলে জলে বন-ভবনে,
নব গৌরবে বসন্ত আসে ভুবনে।

অন্বরে নীল উজ্জ্বল শোভা অমলা
পাদপ জড়িত পুষ্পিত লতা শ্যামলা,
মুগ্ধ নয়ন স্নিগ্ধ হরিত বরণে
নিখিল পূরিত কিরণে।
তটিনীর কুল ঢাকা নব তৃণ দুকুলে,
আম্র কানন আবারিত নব মুকুলে
নব পল্লবাভরণে !
শোভিত ভুবন কিরণে শ্যামল বরণে।

উদ্দাম বায়ু বনে উপবনে বিহরে
মর্ম্মর রবে ঘন তরুরাজি শিহরে।
স্বচ্ছ সলিলা চিরচঞ্চল-চরণা
বহে ঝর্ঝর ঝরণা।
পরিমলভরা ফুল্লকুসুম-অধরে
মত্ত মধুপ চুম্বন করে আদরে !
উপল-ব্যথিত-সরণা
বনপনে সদা বহে ঝর্ঝর ঝরণা।

সহুকার-শাখে পঞ্চম তানে কূহরি’
দিকে দিকে পিক সঞ্চারে সুধালহরী ;
অটবীতে শত বিহগকণ্ঠ-কাকলি,
গীতময় আজি সকলি।
দোয়েল পাপিয়া গাহে প্রাণ খুলে’ মধুরে,
বৌ কথা-কও অনুনয় করে বধুরে
বিরহি-চিত্ত বিকলি’।
উঠে অটবীতে শতবিহঙ্গ-কাকলি।

আজিকে এসেছে মধুর মাধবী রজনী,
জাগ ত্বরা, চল মঞ্জু কুঞ্জে, স্বজনি ;
নব সাধভরে কর কুরঙ্গ-লোচনা
বাসরসজ্জা রচনা।
নব বসন্তে এস নব অনুরাগিনী,
স্বর্ণবীণায় বাজাও মদির রাগিনী,
অমিয়সিক্ত-বচনা,
বাসরসজ্জা ফুলদলে কর রচনা।

আন চম্পক, অশোক, টগর, করবী,
নবমল্লিকা, বকুল, পাটল সুরভি,
সারা বন ফিরি' যতনে চয়ন করিয়া
আন অঞ্চল ভরিয়া।
এসেছে যামিনী মধুর ইন্দুশালিনী,
বকুলকুঞ্জে এসগো বকুলমালিনী
বাসন্তী বাস পরিয়া।
বন হ'তে ফুল আন অঞ্চল ভরিয়া।

চকোর চকোরী চাঁদের শুভ্র আলোকে
সুধাপান করি’ খেল করে উড়ি’ পুলকে।
আজিকে মিলন সুমধুর এই বিজনে
মধুর মলয়-বীজনে।
চথা আর চখী ব্যাকুল বেদনে জাগিয়া,
কাঁদে আজ রাতে প্রিয়-সমাগম লাগিয়া
নদীর দুপারে দুজনে।
আজিকে বিরহ দুঃসহ হেন বিজনে।

কে আছে তরুণী জাগিয়া শূন্য শয়নে
আজি বসন্তে অশ্রুআকুল নয়নে !
হেন মধুরাতে প্রাণ-বল্লভ বিহনে
কে দহে বিরহ-দহনে !
সে কি পারে আজি থাকিতে প্রিয়ায় পাসরি’,
ওই শোন ঝুঝি বেজে উঠে তা’র বাঁশরী
অদূরে গহনে গহনে !
আজি মধুরাতে কে দহে বিরহদহনে !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জ্যোত্স্না রাত্রে
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।


একি        বিমল জ্যো’স্না প্রবাহে ভাসিছে
.                        ধরণী !
ফিরে’        এল কি সে মধু রজনী রজত-
.                        বরণী ;
.        তেমনি মধুর মৃদু সমীরণ,
.        শোভা সঙ্গীত গন্ধ তেমন,
.        বহিয়া এনেছে আজি কোন্‌ মায়া-
.                        তরণী !
সেকি        বিমল জ্যো’স্না প্রবাহে প্লাবিত
.                        ধরণী !


সংকি        মনে পড়ে কবে হেন মধুরাতে
.                        দুজনে
সেই        মধুর প্রথম মিলন, এমনি
.                        বিজনে !
.        কি মধুর সেই কৌমুদীরাশি,
.        নব বিকশিত কুসুমের হাসি,
,        কি যে সুধা ভাসি’ এসেছিল পিক-
.                        কুজনে !
ষবো        প্রথম মিলন হেন মধুরাতে
,                        দুজনে।


সেই        মম মনোবনে মুকুলিত নব
.                        কামনা
কত        আশা, সংশয়, সুখ, দুখ, ভয়,
.                        যাতনা!
.        মুগ্ধভ্রমর গুণু গণু সুরে
.        পদ্মমুকুল ঘিরি’ যথা উড়ে,
.        ঘুরেছে তোমায় ঘিরে’ মোর যত
.                        বাসনা ;
যবে        মন-উপবনে মুকুলিত নব
.                        কামনা।


কবে        পেয়েছি বিরাগ, অবহেলা, নাই
.                        স্মরণে,
মম        উন্মুখ প্রেম দলিয়াছ কবে
.                        চরণে।
.        মনে নাই আজ পেয়েছি কখন
.        মূক অভিমান, কঠিন বচন।
.        শুধু জানি,---আমি তোমারি, জীবন
.                        মরণে।
কবে        পেয়েছি বিরাগ উপেক্ষা নাই
.                        স্মরণে।


শুধু        মনে পড়ে, কবে সরম-অরুণ
.                        আননে,
হেন        মধু-যামিনীতে কুসুম-কুঞ্জ-
.                        কাননে,
.        কণ্ঠে আমার দিয়ে ফুলমালা
.        বরণ করিয়া লয়েছিলে বালা,
.        প্রীতি-সুকোমল হৃদয়-কমল-
.                        আসনে।
সেই        কুসুমিত বনে সরম-অরুণ
.                        আননে !


আজি        জ্যোত্স্না প্লাবিত সুনিভৃত এই
.                        নিশীথে,
কাঁদে        পরাণ আমার তোমার পরাণে
.                        মিশিতে।
.        তাই আজ ফিরে’ এসেছি আবার,
.        তুচ্ছ জীবন লহ উপহার,
.        করুণাবিন্দু দান কর চির-
.                        তৃষিতে ;
আজি        জ্যো’স্নামগন 'নির্জ্জন এই
.                        নিশীথে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেমের রাণী
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

বুঝিতে পার না, সখি, কেন আমি আসি
শতবার, লয়ে এই পরাণ পিপাসী
তোমার কুটীরদ্বারে ; কেন চেয়ে থাকি
মূকসম, মেলি’ দু'টি তৃপ্তিহীন আঁখি
তোমার মুখের পানে !--- কি সুখ স্বপন
মাঝারে নিমেষে চিত্ত হয় নিমগন
যখন তোমারে দেখি ! কেন বা নীরবে
অশ্রুবিন্দু ফুটে’ উঠে নয়ন পল্লবে !
কেন এত ব্যগ্র হয়ে থাকে কর্ণপুট
শুনিতে তোমার শুধু একটি অস্ফুট
সরমজড়িত ভাষা ! হৃদয় আমার
কেন মুকুরের মত ওই সুকুমার
হৃদয়ের প্রতিবিম্ব করিতে ধারণ,
হেরিতে মাধুরী তব, চাহে সারাক্ষণ !
কেন হয় এ আবেগ উচ্ছ্বসিত চিতে
তোমার দর্শনে, তুমি পারনা বুঝিতে !

কঠিন সংসারপথে প্রতিপদে সহি
শতব্যথা, অপমান, সারাদিন দহি
নিরাশার তীব্রতাপে, বিফলতা-দুখে
জরজর যবে প্রাণ, ম্লান নত মুখে
আসি তব পাশে। অয়ি হৃদয়ের রাণি,
তখন হেরিয়া শুধু ওই মুখখানি
প্রেম-পবিত্রতা-মাখা, অতুল-সুরভি
নন্দন কুসুম সম, সরলতা-ছবি,---
তোমার মহিমা আমি করি অনুভব,
তখনি জাগিয়া উঠে তোমার গৌরব
আমার মানস-পটে নব দীপ্তিমান্‌ ;
তোমার লাবণ্যসুধা করি শুধু পান
অনিমিক্‌ আঁখি ভরি’ ; ভুলি যত ব্যথা
লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অবিচার নির্ম্মমতা
সংসারের। মনে হয়, এ ধরা নিষ্ঠুর
শোকতাপভরা নহে ; হেথা সুমধুর
তোমার প্রেমের ধারা---সম্তাপহারিণী
স্বর্গচ্যুতা মন্দাকিনী পীযূষবাহিনী---
বহে সদা। মনে হয়, স্বরগ-আবাস
আতি তুচ্ছ---নাহি যেথা হেন সুখ-আশ !
তখনি মর্ত্ত্যের দৈন্য হয় অবসান,
স্বরগেরো চেয়ে তারে মানি মহীয়ান্‌।

প্রিয়তমে নিশীথের ঘন-অন্ধকার
ধীরে যবে নেমে আসে ঘিরি’ চারিধার
অসীম অম্বর হ'তে, সুপ্ত ধরণীরে
করে গ্রাস, তুচ্ছ দীপালোকিত কুটীরে
পশেনা তাহার অধিকার ; সেথা হীন
প্রদীপের শিখা দেখি’ পলায় মলিন
অন্ধকার। সেই মত তোমার মূরতি---
বক্ষোমাঝে স্নিগ্ধ শান্ত সমুজ্জ্বল জ্যোতি
জেগে খাকে অবিরত : পারে না পশিতে
পৃথিবীর অন্ধকার তাই মোর চিতে ;
তাই সেথা যত কিছু সুখ শাস্তি আশা,
তাই উছলিয়া উঠে হেন ভালবাসা
নিরন্তর,---অন্তরের অনন্ত নির্ঝর---
অমৃত-উৎসের মত, প্লাবি’ চরাচর !

আমার মানসে চেয়ে দেখ আজি তাই---
হাহাকার, করুণ ক্রন্দন, কিছু নাই
অবশেষ।---কি অভাব আছে সে রাজ্যের
তুমি যার রাণী, সখি ! সেথা ঐশ্বর্য্যের
অক্ষয় আকর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম
চিরবিরাজিত। দেখ, এ হৃদয়ে মম
তোমার হাসির রবিকরে মুকুলিত
হয়ে উঠে কত আশা, কত প্রস্ফুটিত
বাসনা-কুসুম পরে তব অশ্রুকণা
শিশিরের মত পড়ি’ সৌন্দর্য্য কত না
করে সঞ্চারিত ! প্রতি স্নেহসিক্তবাণী
কি অমৃত করে বরিষণ ! নাহি জানি
কোথা হ’তে জন্মান্তের সুখস্মৃতিরাজি
আসে মনে, উঠে যেন শত তন্ত্রী বাজি’
পরাণ-বীণার ! নিত্য নূতন সঙ্গীতে
চির পুরাতন প্রেম চাহে বিকশিতে
আমার অন্তর মাঝে। তাই ব্যাকুলতা
জেগে থাকে প্রাণে মোর ; মরমের কথা
ফুটে কি, ভাষায় কভু? হৃদয়-বিভব
হৃদয়ে লুকান’ থাকে, কেবল নীরব
অন্তরের প্রতিধ্বনি অন্তরের মাঝে
নীরবে দিবসনিশি সুমধুর বাজে।

আজ শুধু মনে হয়, এমন অকূল
প্রেমের কি আছে শেষ ! জীবনের ভুল
ভ্রান্তি শত শত যবে হবে অবসান
মরণের পর পারে, সুখ দুঃখ তান
পৃথিবীর পশিবেনা কাণে, সেথাও কি
তোমার প্রেমের আঁখি থাকিবে না, সখি,
আমার মানসাকাশে ধ্রুব জ্যোতি সম
সমুদিত, দূর করি যত গাঢ়তম
অন্ধকার? করিবে না সদা বরিষণ
অসীম সান্ত্বনা, আর স্নেহের কিরণ
আমার মলিন প্রাণে? অয়ি বরাননে
আজি মোর মনে হয়, যেন তোমা’ সনে
অনন্ত কালের পরিচয় ! কোন্‌ শুভক্ষণে
হয়েছিল দুজনার নয়নে নয়নে
প্রথম পরাণ বিনিময়, তাহা আর
মনে নাহি পড়ে। যেন এ প্রণয়-ধার
বহিয়াছে চিরদিন !---তাই এ বিশ্বাস,
এ প্রেমের নাহি আদি,---নাহি এর নাশ।

কি ভাবিছ মনে, ওগো মানস-বাসিনি,
লজ্জানম্র মুখে? অয়ি মধুরহাসিনী
প্রণয়িণি মোর, কহিয়োনা কোন কথা ;
আজি তব এই সুমধুর নীরবতা
বড় ভাল লাগে প্রাণে ; যে প্রেমক্ষীরোদ
তোমার হদয়ে, যেন করি আজি বোধ---
তরঙ্গ নীরবে তার লাগিছে আসিয়া
আমার সর্ব্বাঙ্গমনে ; গিয়াছে ভাসিয়া
সর্ব্ব চঞ্চলতা মম। আজি, সখি, আমি
তোমার প্রেমের বলে যেন অন্তর্য্যামী,----
অন্তরের প্রেম তব, মাধুরী অপার
করিতেছি অনুভৰ ; তাই আজি আর
কোন সাধ নাহি মোর। তোমার হৃদয়
কি মধুর চিরনব রহস্যনিলয়,
তুমি তা জান না, শুভে ! ---আপন সৌরভ
বিকশিত সুবিমল রূপের গৌরব
কুসুম জানে না যথা। আজি আমি জানি
হৃদয়- মাধুরী তব, হৃদয়ের রাণি,
অতুলন বিশ্বমাঝে। তাই আপনারে
আজি আমি মানি ধন্য ভুবন মাঝারে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুগ্ধ
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

.                        ( ১ )
যবে        মাধুরী-বিভোর                হেরি সুখ তোর
.                মেলি অনিমেষ আঁখি,
শুধু        মনে হয়---আর                জীবনে আমার
.                কোন সাধ নাই বাকি !
আমি        ভাবি হীন ধরা                উজ্জ্বল অমরা
.                হেরি’ তোর মধু হাসি ;
আমি        তোরি রূপলীন                দেখি নিশিদিন
.                নিখিলের শোভারাশি।

.                        ( ২ )
যবে        থাকি অতিদুরে                স্নেহহীন পুরে,
.                তখনও তোরি স্মৃতি
মোর        তাপিত পরাণে                নব আশা আনে
.                বরিষে সান্ত্বনা প্রীতি।
যেন        সারা বিশ্বময়                তোরি রূপোদয়
.                হেন মনে হয় ভুল,
ফুটে        শ্যামল ভূতলে                নীলাকাশ-কোলে
.                তোরি লাবণ্যের ফুল।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পুরাতন
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

তুমি                চির পুরাতন।
.        জনমে জনমে ছিলে তুমি মোর
.                বাসনার ধন।
.        যুগে যুগে যেন মূর্ত্তি তোমারি
.                দেখেছে নয়ন।

মোর                স্মৃতি-আলো-রেখা
.        অতীত-তিমিরে পশে যত দূরে,---
.                সেথা যায় দেখা ---
.        গৌরবে তুমি আছ সাথে, কভু
.                নহি আমি একা।

আমি                জানি না কখন
.        ফুটেছিলে তুমি প্রথম প্রভাতে
.                কুসুম যেমন,
.        সৌরভ আর সুষমার করি’
.                মুগ্ধ এ মন।

তাই                হৃদয়-আলোকে
.        মুখখানি তব যেমনি আমার
.                পড়িয়াছে চোখে,
.        চিনিয়াছি তোমা’ আপনার বলে’
.                অনন্ত লোকে।

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নূতন
কবি রমণীমোহন ঘোষ
১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০।

তুমি                নিত্য নূতন।
.        প্রতিদিন তব শোভা নব নব
.                করি দরশন ;
.        যত দেখি, তত মনে হয়, --- যেন
.                দেখিনি কখন।

আমি                মেলি’ দুটি আঁখি
.        তোমার নলিন-নয়নের পরে
.                যত চেয়ে থাকি,
.        মিটেনাকো সাধ, ---রহস্য তার
.                তবু থাকে বাকি !

ওই                হৃদয় তোমার
.        রেখেছে লুকায়ে যেন সযতনে
.                মাধুরী অপার,---
.        প্রাণ-মনে যত করি অনুভব
.                শেষ নাই তার।

তব                রূপ নিরূপম
.        সমগ্র কভু উঠিবে কি ফুটি’
.                শতদল সম
.        পূর্ণ তোমায় দেখিবে কি কভু
.                কল্পনা মম !

.               ***************                
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর