| কবি রমণীমোহন ঘোষের কবিতা |
| নিশীথে কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। হের কি মধুর নিশি কৌমুদীবসনা দিশি চরাচর সুষুপ্তিমগন, শান্ত তটিনীর বুকে ঘুমায়ে পড়েছে সুখে চন্দ্রমার চঞ্চল কিরণ। উপবনে ফুটি' শত শুভ্র পুষ্প অবিরত চেয়ে আছে অকাশের পানে, যেন কোন্ দেবতারে শোভা গন্ধ উপচারে পূজা করে পরাণে পরাণে। জন শুন্য পথ ঘাট সুদূরবিস্তৃত মাঠ, শব্দহীন নিখিল ভুবন,--- কভু নীড় হ'তে পাখী ঘুমঘোরে উঠে ডাকি' দেখি কোন'সুখের স্বপন। চেয়ে দেখ চারিধার জন প্রাণী নাহি আর বিশ্ব যেন বিজন, স্বজনি, শুধু আমাদেরি তরে হেন চারু রূপ ধরে আসিয়াছে আজি এ রজনী। অসীম কাশতলে হেথা শ্যাম দুর্ব্বাদলে এস ভুমি সৌন্দয্যরূপিনি ! নীরব নিশীথে আজি এস নববেশে সাজি' ধরি' মূর্ত্তি বিশ্ববিমোহিনী। ঘনকৃষ্ণ কেশভার খুলে দাও একবার, মেল আঁখি---নীলোত্পল নব ; কঠিন ধরার ভূমি কুসুমিত কর তুমি চরণ-অলক্তরাগে তব। ফুটন্ত জ্যোছনা রাশি উল্লাসে পড়ুক আসি' অনবগুন্ঠিত মুখ পরে, মহিম মূরতিখানি দেখি, সৌন্দর্য্যের রাণি, অতৃপ্ত নয়ন দুটি ভরে'। . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| আঁখি কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। তোমার নয়ন, সখি, নির্ম্মল আকাশ, প্রশান্ত নীলিমা তার স্বর্গের আভাস। তোনার নয়ন, সখি, সরসী অমল, ফুটে' তাহে স্নেহ প্রীতি লাজ শতদল। তোমার নয়ন, সখি, যেন ধ্রুবতারা, আঁধারে যখনি মোর চিত্ত দিশাহারা। তোমার নয়ন পানে তাই অনিমেষ চেয়ে চেয়ে তবু সাধ নাহি হয় শেষ। . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| কবির প্রেয়সী কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। তোমারে গড়েছে বিধি---হেন মনে লয়, ওগো কবি-প্রিয়া, তিল তিল নিখিলের সৌন্দর্য্য আহরি' একান্তে বসিয়া। তাই তোমাপানে চাহি' অতৃপ্ত নয়নে, নিত্য নব গীতে প্রকাশিতে চাহে কবি বিপুল বিস্ময় ছন্দ রাগিনীতে ! তাই গৃহকেণে থাকি' ধনমানহীন সংসার মাঝারে স্বর্গ মর্ত্ত্য হ'তে করে উপমা চয়ণ বর্ণিতে তোমারে। সত্যই কি এ সৌন্দর্য্য শ্রীঅঙ্গে তোমার উঠেছে বিকশি' প্রশান্ত সন্ধ্যায় যথা গগনের গায় শোভে পূর্ণশশী ! অথবা---এ শুধু স্বপ্ন, প্রদীপ্ত কল্পনা কবি-হৃদয়ের পড়েছে তোমার পরে, তাই নাহি শেষ তব সৌন্দর্য্যের ; প্রাবৃটের নভস্তলে---নবমেঘস্তরে রবির কিরণ পড়িয়া, বিচিত্রশোভা পূর্ণ ইন্দ্রধনু বিকাশে যেমন ! . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| কবির প্রতি কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। সুনীল আকাশ পানে মেলি' অনিমেষ বিমুগ্ধ নয়ন, বিজন বকুল বনে বসিয়া বিবশ মনে কি নব স্বপনে কবি আছ নিমগন। সম্মুখে তটিনী তুলি' তরঙ্গ চঞ্চল কোথা' বহে' যায়, কুলু কুলু কলরোলে কি কথা সে যায় বলে' কোকিল বকুলশাখে কি যে গান গায়। দূর হ'তে বাঁশরীর কম্পিত মধুর সুর আসে কাণে, কাহার লুকান ব্যথা ভাষাহীন ব্যাকুলতা ভেসে আসে যেন ওই সকরুণ তানে। জ্যোত্স্না, মলয়, গীতি, ফুল-পরিমল, ভ্রমর -গুঞ্জন, মধুমাখা কুহুরব, একত্র করিয়া সব কি স্বপনলোক্ কবি করিছ সৃজন। নিভৃত হৃদয়ে তব কোন মায়াময়ী মানসী মূরতি, আকুল বাসনা, আশা, প্রাণপূর্ণ ভালবাসা পূজা-উপচারে তারে করিছ আরতি ! উঠ, কবি, ছেড়ে এস প্রিয় ঘুমঘোর, অলস স্বপন ; আকাশ-কুসুমে আর কত না গাঁথিবে হার, এস ছেড়ে সুকোমল শ্যামল শয়ন। ফেলে দিয়ে এস বাঁশী ভুলে যাও যত প্রণয়ের গীতি, প্রাণদান-প্রতিদান, বিরহ মিলন মান, অনাদি প্রেমের শত সুমধুর স্মৃতি। চেয়ে দেখ চারিধারে ঘিরিয়া তোমায় কঠিন সংসার, কোথা প্রেম, কোথা স্নেহ, কোথা শান্তিময় গেহ, কত দুঃখ কত শোক, কত হাহাকার ! এ নহে খেলার ঘর,---হেথা যে কঠোর জীবন-সংগ্রাম, এত নহে সুশোভন কল্পনার উপবন, যুদ্ধ দ্বন্দ্ব কোলাহল হেথা অবিরাম। চাঁদের কিরণ কোথা?---দেখ প্রজ্জ্বলিত দাবানল-শিখা ; বসম্ত, মলয়, হায় ! নিমেষে মিলায়ে যায় শুধু ছুটে' আসে বেগে প্রমত্ত ঝটিকা ! এস, কবি, ছেড়ে তব মানস ভুবন, পৃথিবীর মাঝে, থেকোনা অলস হয়ে অসার স্বপন লয়ে রত হও সুকঠিন জীবনের কাজে। . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| নিবেদন কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। এ নহে কুসুমকুঞ্জ স্বপনমণ্ডিত, এ যে গো সংসার ; তবু ভাঙ্গিয়োনা মোর এ অলস ঘুমঘোর মুছিয়োনা আঁখি হ'তে অঞ্জন মায়ার। সমর-বিমুখ আমি, শান্তির ভিখারী, অঙ্গম দুর্ব্বল, জনস্রোত দূরে রাখি', একাকী নির্জ্জনে থাকি, অবাধ কল্পনা শুধু আমার সম্বল। কে আমারে সারাক্ষণ রেখেছে ভূলায়ে বাঁধি মায়াডোরে, আমি হেথা দীনতম, কুবেরভাণ্ডার সম ঐশ্বর্য্য-স্বপনে আনি' কে দেখায়, মোরে ! কঠোর জগতমাঝে চাহে-মোর প্রাণ ব্যগ্র ভালবাসা ; দীনতা হীনতা যত চারিধারে দেখি, তত জেগে থাকে হৃদে মোর সৌন্দর্য্যপিপাসা। গোপন পরাণে প্রেম উঠে উচ্ছ্বসিয়া,--- কে জানিবে তায় ; কত সাধ ফুল সম নীরবে হৃদয়ে মম বিফলে ফুটিয়া উঠি' ঝরে' পড়ে যায়। নিখিলের শোভা লয়ে চাহি বিরচিতে স্বর্গের আভাস মলিন ধরায় থাকি' কেমনে দেখিবে আঁখি কি মাধুরী ঢেকে রাখে সুন্দর আকাশ ! নীলিমার পর পারে আছে কোন্ দেশে সৌন্দর্য্যের রাণী, সকল কুসুম বার বহিছে সুরভিভার সকল সঙ্গীত যার সুধাসিক্ত বাণী ! তাহারে দেখিতে যেন চাহে চিরদিন ব্যাকুল নয়ন, মুগ্ধ কুরঙ্গের প্রায় পরাণ শুনিতে চায় সে মায়াময়ীর স্বর্ণবীণার নিক্কণ। তাহারি অঞ্চল ঘিরে' আছে অবিচল স্নেহ প্রেম আশা, অতৃপ্তি, আকাঙ্ক্ষা, তাই সকলি ভুলিতে চাই লভি' তার সকরুণ স্নিগ্ধ ভালবাসা। যত তারে ধ্যান করি হৃদয়ে রাখিয়া, মিটেনা তিয়াষ ; যত হই অগ্রসর দেখি তারে দূরতর, পরশে ধরিতে যাই - বিফল প্রয়াস ! আমারে ডেকোনা তবু সংসারের মাঝে, থাক্ এ স্বপন, জাগ্রত জগত ভুলি' একান্তে গড়িয়া তুলি সর্বসুখশান্তিময় মানস ভুবন। . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| জীবনের পথে কবি রমণীমোহন ঘোষ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত কবির “মুকুর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। বানান যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং! মিলনসাগরে প্রকাশ - ৮.৮.২০২০। স্বদীর্ঘ এ জীবনের পথ, এখনো অনেক আছে বাকি, এখনি চরণ কেন ক্লান্ত হুয়ে আসে হেন দৃষ্টিহারা হয়ে আসে আঁখি ! মধ্যাহ্নের খর রৌদ্রে যদি' তাপিত বিকল হয় কায়া, চারি ধারে শুধু মরু নাহি কোথা গৃহ তরু, নাহি থাকে 'বিন্দুমাত্র ছায়া ; প্রতি পদে বাধা বিঘ্ন ভয় সদা যদি দেখা দেয় এসে, তবু চলি' প্রাণপণে সবল অটল মনে যেতে হবে দীর্ঘ পথশেষে। পথ দিয়া যা'রা যায় চলি' সগৌরবে, গরবের ভরে, করুণ নয়নকোণে যদি এ অধম জনে নাহি চায় নিমেষের তরে ; ছিল যা'রা নিতান্ত আপন, তাহারাও হয় বদি পর, নিঠুর কঠোর বাণী উপেক্ষার শর হানি' শ্রান্ত তনু করে জরজর ; আজন্মের প্রিয় সঙ্গী যদি একে একে ছেড়ে যায় সবে, তবু একা দীর্ঘ দিন সুপ্তি-তৃপ্তি-শান্তিহীন লক্ষ্যপানে শুধু যেতে হবে। একদা মধুর সন্ধ্যাবেলা ফুরাবে এ সুদুর্গম পথ চিরশাস্তি-নিকেতনে পশিব প্রফুল্ল মনে পূর্ণ হবে জীবনের ব্রত। আপনি বিজয়লক্ষ্মী আসি' কণ্ঠে মোর পরাইবে মালা, তা'র সুকল্যাণ হাসি বরষি' অমৃতরাশি ঘুচাইবে চির দুঃখজ্বালা। . *************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |