রস-সাগর কবি কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ীর সমস্যা পূরণ কবিতা
|
দিনে রেতে কামান্ধ না দেখিবারে পায়
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
একদিন মহারাজ গিরীশচন্দ্র এক বিবাহ বাসরে বসে রসসাগরকে এই সমস্যাটি
পূরণ করতে দেন, --- “দিনে রেতে কামান্ধ না দেখিবারে পায়।” রসসাগর এই সমস্যাটি
এভাবে পূরণ করেছিলেন . . .
সমস্যা --- “দিনে রেতে কামান্ধ না দেখিবারে পায়!”
সমস্যা পূরণ ---
প্যাঁচা না দেখিতে পায় দিবসের কালে,
কাক না দেখিতে পায় রাত্রিকাল হ’লে |
এ এক অপূর্ব্ব কাণ্ড বুঝে উঠা দায়,
“দিনে রেতে কামান্ধ না দেখিবারে পায় !”
. *******************
[ ব্যাখ্যা—দ্বিভূজা রমণী = দ্রৌপদী। দশ-ভূজ পতি = দশ-হাত বিশিষ্ট পঞ্চপতি। পঞ্চ-মুখ
পতি, কিন্তু নন্ পশুপতি = পঞ্চানন অর্থাৎ শিব নন, কিন্তু পঞ্চপতির পঞ্চমুখ। অপুত্রক
পতি-পিতা = পাণ্ডু অপুত্রক। যুধিষ্ঠির সহ পঞ্চ-পাণ্ডব পাণ্ডুর ঔরসে জন্ম না হলেও পাণ্ডু
তাদের পিতা। ]
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
দ্বিভূজা রমণী, তার দশ-ভূজ পতি
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
পঞ্চকোটের রাজবাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত ও সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণ কর্ম্মচারী ছিলেন। একবার কোন
এক কাজের জন্য তাকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে আসতে হয়েছিল। তিনি শুনেছিলেন
কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে রসসাগর নামে এক উপস্থিত কবি আছেন। ঐ ব্রাহ্মণ আসতে
আসতে ভাবলেন যে, রসসাগর মহাশয় এক চরণ বলে দিলেই বাকী অংশ মনের মত করে
পূর্ণ করেন ; কিন্তু আমি তা রচনা করে একটি ধাঁধা রচনা করে নিয়ে যাই, এর
উত্তর তাকে দিতেই হবে। এটা ভেবেই তিনি এই ধাঁধাটি নিজেই রচনা করে নিয়ে গেলেন।
সমস্যা ---
“দ্বিভূজা রমণী, তার দশ-ভূজ পতি,
পঞ্চ-মুখ পতি, কিন্তু নন্ পশুপতি |
অপুত্রক পতি-পিতা, --- অপূর্ব্ব কাহিনী |”
রস-সাগরকে এই ধাঁধাটি দেওয়া মাত্র তিনি চতুর্থ চরণে এর উত্তর দিয়ে দিলেন।
সমস্যা পূরণ ---
“এ রস-সাগরে ভাসে দ্রুপদ-নন্দিনী ||”
দুইটী গৃহিণী যার নিত্য ঘরে রয়
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
মহারাজ গিরীশচন্দ্রের দুজন গৃহিণী ছিলেন। এক সংসারে দুজন গৃহিণী এক সাথে থাকলে
পুরুষের কেমন দুর্গতি হয়, তা বর্ণনা করার জন্য রসসাগরকে আদেশ করেন, এবং এই
সমস্যাটি পূরণ করতে দেন, --- “দুইটী গৃহিণী যার নিত্য ঘরে রয়।” রসসাগর মহাশয় তার
রসের ভাণ্ডার খুলে সমস্যাটি এভাবে পূরণ করে দিয়েছিলেন . . .
সমস্যা --- “দুইটী গৃহিণী যার নিত্য ঘরে রয়।”
সমস্যা পূরণ ---
থাকিলে বিড়াল এক গর্ত্তের বাহিরে,
থাকে যদি সর্প এক গর্ত্তের ভিতরে,
তাহাদের মধ্যে এক ইন্দুর থাকিলে
যেরূপ দুর্গতি তার হয় সেই কালে,
সেরূপ দুর্গতি সেই পুরুষের হয়,
“দুইটী গৃহিণী যার নিত্য ঘরে রয় |”
দেখিতে দেখিতে তোর জীবনের ভোর
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
কলকাতার সিমলা অঞ্চলে লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস নামে একজন নামকরা ‘কবিওয়ালা’ ছিলেন।
তার একটি চোখ ছিল না বলে সাধারণ লোক তাকে ‘ল’কে কাণা বলে ডাকত। তিনি প্রায়
প্রতি বছরেই কৃষ্ণনগরের বারোয়ারী-তলায় কবি-গান করতে যেতেন এবং বাড়িতে আসার
সময় মহারাজ গিরীশচন্দ্রের সাথে দেখা করে আসতেন। মহারাজের সভায় রসসাগরের
সাথে দেখা হলেই বিশ্বাস মহাশয়ের সাথে বাগ্-যুদ্ধ করতেন। লক্ষ্মীকান্ত বললেন মহারাজ
এইবারে আরও ভাল ভাল গায়ক ও বাঁধনদার এনে আমার কবির দল পরিপূর্ণ করব।
রসসাগর কাছে বসেই একথা গুলি শুনছিলেন। রসসাগর বললেন, ‘দেখিতে দেখিতে তোর
জীবনের ভোর!’ তখন গিরীশচন্দ্র রসসাগরকে এই সমস্যাটি পূর্ণ করতে বলায় তিনি
লক্ষ্মীকান্তের সামনেই তা পূরণ করে দিলেন . . .
সমস্যা --- “দেখিতে দেখিতে তোর জীবনের ভোর!”
সমস্যা পূরণ ---

. *******************
[ প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিত শ্রীযুক্ত নিখিলনাথ রায় বি. এল, মহাশয় তার প্রণীত মুর্শিদাবাদ
কাহিনী নামক গ্রন্থে এর সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তার সারাংশ দেওয়া হল। ---
কাশিমবাজারে ইংরেজদের একটী রেশমের কুঠী ছিল। কান্তবাবু সামান্য বেতনে ওয়ারেণ
হেষ্টিংসের অধীনে মুহুরীর কাজ করতেন। প্রতিদিন সকালে তিনি কাজে যেতেন। তার
বাড়ির সামনে একটি কলুর দোকান ছিল। যে দিন তিনি কলুর মুখ দেখে কাজে যেতেন,
সেই দিন তিনি প্রচুর উপার্জ্জন করে ঘরে ফিরে আসতেন। প্রচুর ধনের অধিকারী হয়েও
কান্তবাবু তাকে তার বাড়ির সামনে থেকে সরিয়ে দেন নি। দেশপূজ্য বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ মহারাজ
নন্দকুমারের ফাঁসি ও প্রাতঃস্মরণীয়া দানশীলা রাণী ভবানীর কাছ থেকে ‘লাট বাহারবন্দ’
পরগণার জমীদারী গ্রহণ এবং ঐ ফাঁসির পর স্যার ইলাজিযা ইম্পে সাহেবকে অভিনন্দন-
পত্র-দানের সময়ে তাতে সই করা, --- এই সব কাজে কান্তবাবু বিশেষভাবে জড়িত
থাকলেও কান্তবাবুর দয়া, ধর্ম্ম ও বিবেচনা যথেষ্ট ছিল ; এই সব কারণেই ভগবান তাকে
এত উচ্চপদন্নতি ও অতুল-ঐশ্ব্রর্যশালী করেছিলেন। ]
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
দেখিলে কলুর মুখ কার্য্য-সিদ্ধি হয়
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
একদিন মহারাজ গিরীশচন্দ্র রস-সাগরকে প্রবাদ-বিরুদ্ধ সমস্যাটি পূর্ণ করিতে দিলেন, ---
“দেখিলে কলুর মুখ কার্য্য-সিদ্ধি হয়!” তখন রসসাগর হাসতে হাসতে এবাবে পূরণ করে
দিলেন . . .
সমস্যা --- “দেখিলে কলুর মুখ কার্য্য-সিদ্ধি হয়!”
সমস্যা পূরণ ---
ইংরাজের কুঠী ছিল কাশীম-বাজারে,
যাইতেন তথা কান্ত প্রতিদিন ভোরে
বাটীর নিকটে ছিল কলু এক জন,
করিতেন তার মুখ দেখিয়া গমন |
যে দিন তাহার মুখ দেখে যাইতেন,
সেই দিন বিলক্ষণ ঘরে আনিতেন |
কলুর ঘানির শব্দ শুনিয়াও কাণে
কান্তের ব্যাঘাত কভু না হ’ত স্বপনে |
এ রস-সাগর এই কলিকালে কয়,
‘দেখিলে কলুর মুখ কার্য্য-সিদ্ধি হয়!’
দেশের হবে কি?
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
কোন লোক কোন এক সময় রসসাগরকে প্রশ্ন করেছিলেন, “দেশের হবে কি?” তখনই তিনি
এই সমস্যাটি পূরণ করেছিলেন। মনে হয় কোন এক ব্যক্তি বিশেষকে উদ্দেশ্য
করে রসসাগর এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন . . .
সমস্যা --- “দেশের হবে কি?”
সমস্যা পূরণ ---
শূদ্র হ’য়ে বেদ পড়ে, বামুন হ’ল ভেকো,
ছত্রিশ বর্ণ এক হ’লো, --- তার সাক্ষী হুঁকো |
শ্বশুর হরে পুত্র-বধূ, বাপে হরে ঝি,
ইহা দেখে পাখী বলে ‘দেশের হবে কি ?’
ধন্য ধন্য ধন্য সেই রাধিকা সুন্দরী
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
কোন লোক কোন এক সময় রসসাগরকে প্রশ্ন করেছিলেন, “দেশের হবে কি?” তখনই তিনি
এই সমস্যাটি পূরণ করেছিলেন। মনে হয় কোন এক ব্যক্তি বিশেষকে উদ্দেশ্য
করে রসসাগর এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন . . .
একদিন রাজসভায় সমস্যা উঠল, “ধন্য ধন্য ধন্য সেই রাধিকা সুন্দরী!” রসসাগর এই
সমস্যাটি এভাবে পূরণ করলেন . . .
সমস্যা --- “ধন্য ধন্য ধন্য সেই রাধিকা সুন্দরী!”
সমস্যা পূরণ ---
অনন্তে ব্রহ্মাণ্ডে ধন্য বিশাল ধরণী,
মথুরা তাহার মধ্যে ধন্য বলি’ গণি |
মথুরা হইতে ধন্য রম্য বৃন্দাবন,
তার মধ্যে ধন্য সেই ব্রজবাসী জন |
তার মধ্যে ধন্য যত গোপিকা যুবতী ,
তার মধ্যে ধন্য সেই রাধিকা শ্রীমতী,
রূপে গুণে নাহি দেখি তাঁর মত নারী,
‘ধন্য ধন্য ধন্য সেই রাধিকা সুন্দরী !’
ধন্য মা কিরীটেশ্বরী! মহিমা তোমার
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
মহারাজ গিরীশচন্দ্র পরম সাধক ছিলেন। দেব-দেবীর পূজা নিয়ে তিনি শেষ জীবন
কাটিয়েছিলেন। তিনি কথায় কথায় একদিন রসসাগরকে এই সমস্যাটি পূরণ করতে
বললেন, “ধন্য মা কিরীটেশ্বরী! মহিমা তোমার!” তিনি আরও আদেশ দিলেন কোন
ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে আপনাকে এটা পূরণ করতে হবে। রসসাগর মহারাজের ইচ্ছা
বুঝতে পেরে সমস্যাটি এভাবে পূরণ করলেন . . .
সমস্যা --- “ধন্য মা কিরীটেশ্বরী! মহিমা তোমার!”
সমস্যা পূরণ ---
ধন্য ধন্য ধন্য তুমি, হে নন্দ-কুমার!
কত শক্তি ছিল তব, --- বুঝে উঠা ভার |
মীর-জাফরের তুমি নয়নের মণি,
মণি-বেগমের তুমি আদরের খনি |
তোমারি উপর ছিল তাঁদের বিশ্বাস,
তোমারি আদেশে তাঁরা ফেলিত নিশ্বাস !
নবাব সাহেব তাঁর অন্তিম দশায়
কাতর হইলা যবে ঘোর পিপাসায়,
তখন রাখিয়া দিয়া তোমারি সন্মান
দেবীর চরণামৃত করিলেন পান |
ধন্য ধন্য শক্তি তব হে নন্দ-কুমার !
ধন্য মা কিরীটেশ্বরি! ‘মহিমা তোমার!’
মহারাজ নন্দকুমারের শাক্ত-পদাবলীর পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .
ধন্য হে ‘জলদ’ তুমি, ধিক্ ‘জলনিধি
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
গ্রীষ্মকালে একদিন সন্ধ্যার পর রসসাগর, যুবরাজ শ্রীশচন্দ্রের বাড়িতে বসে জলযোগ
করছিলেন, এমন সময় অত্যন্ত বৃষ্টি শুরু হল। তখন শ্রীশচন্দ্র বললেন, “ধন্য হে ‘জলদ’
তুমি! ধিক্ ‘জলনিধি’।” রসসাগর শ্রীশচন্দ্রের ইচ্ছে বুঝতে পেরে এ সমস্যাটি পূর্ণ করে
দিলেন . . .
সমস্যা --- “ধন্য হে ‘জলদ’ তুমি, ধিক্ ‘জলনিধি’!”
সমস্যা পূরণ ---
দরিদ্রও যদি হয় নির্ম্মল-হৃদয়,
পর-উপকার তবু করিবে নিশ্চয় |
সমল-হৃদয় কিন্তু যদি হয় ধনী,
পর-উপকারে মন না দেয় কখনি |
‘জলদ’ লইয়া জল ‘জলনিধি’ হতে
বিধিমতে ঢালে জল এই পৃথিবীতে |
‘জলনিধি’ নামে দিই ধিক্ শতবার,
পৃথিবীতে নাহি পড়ে বিন্দুমাত্র তার |
এ রস-সাগর তাই, কহে যথাবিধি,----
‘ধন্য হে ‘জলদ’ তুমি! ধিক্ ‘জলনিধি’!
. *******************
[ ব্যাখ্যা - উর্ব্বশী শাপগ্রস্তা হয়ে অশ্বিনীর রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে বিচরণ করতে
লাগলেন। পৃথিবীতে অষ্ট বজ্র এক হলেই তার শাপ বিমোচন হবে। রাজা দণ্ডী অশ্বিনীকে
পেয়ে মনের সুখে ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ খবর পেলেন, রাজা দণ্ডী এক অপূর্ব অশ্বিনী পেয়েছেন
যে, সে রাত্রিবেলায় মনোহারিণী রমণীর মূর্ত্তি-ধারণ করে রাজা দণ্ডীর সেবা করে থাকেন।
এবং দিনে অশ্বপত্নী হয়ে চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়। শ্রীকৃষ্ণ অশ্বিনীকে চেয়ে রাজা দণ্ডীর
কাছে দূত পাঠালেন। দণ্ডী তার আবেদন অগ্রাহ্য করায় শ্রীকৃষ্ণ তার সাথে যুদ্ধ করতে
গেলেন। দণ্ডীরাজ শ্রীকৃষ্ণের ভয়ে অশ্বিনীর পিঠে চড়ে অনেক রাজার নিকটে আশ্রয়
প্রার্থনা করলেন, কিন্তু কোন রাজাই তাকে আশ্রয় দিলেন না। অবশেষে তিনি কোন উপায়
না পেয়ে পঞ্চ-পাণ্ডবের আশ্রয় নিলেন। ভীম ছাড়া অন্য চার ভাই মহাসঙ্কটে পরলেন। ভীম
স্পষ্টভাবে বললেন “বিপন্ন ব্যক্তি শরণাপন্ন হলে তাহাকে রক্ষা করা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম্ম।” ভীম
তাকে আশ্রয় দান করলেন। পঞ্চপাণ্ডবের সাথে শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ শুরু হলো। এই উপলক্ষে
দেবতাগণ রণস্থলে এসে উপস্থিত হলেন। এইরূপে যমের দণ্ড, শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্র,
কৃষ্ণের সুদর্শন চক্র ইত্যাদি এক হওয়ামাত্র শাপ – বিমোচন হয়ে গেল | ]
. সূচিতে . . .
মিলনসাগর
ধরাতল স্বর্গস্থল, কিছুমাত্র ভেদ তার নাই
কবি রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী
কবিভূষণ শ্রী পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উদ্ভটসাগর সংগৃহিত ও সম্পাদিত, "রসসাগর কবি
কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী মহাশয়ের বাঙ্গালা-সমস্যা-পূরণ" গ্রন্থ থেকে নেওয়া, (১৯২০)।
একবার রাজসভায় প্রশ্ন হয়েছিল, “ধরাতল স্বর্গস্থল, কিছুমাত্র ভেদ তার নাই।” রসসাগর
দণ্ডিপর্ব্বের ঘটনা-অবলম্বন করে তখনি এ সমস্যাটি পূরণ করে দিলেন . . .
সমস্যা --- “ধরাতল স্বর্গস্থল, কিছুমাত্র ভেদ তার নাই।”
সমস্যা পূরণ ---
সুর-পুরী শূন্য করি কৃষ্ণ-আজ্ঞা শিরে ধরি,
. ব্রহ্মা-আদি যত দেবগণ |
দণ্ডী নৃপ দণ্ডে দণ্ডী, ভাবিয়া সহিত চণ্ডী,
. অবনীতে উপনীত হন ||
উর্ব্বশীর শাপ খণ্ড, দণ্ডী নৃপতির দণ্ড,
. অষ্ট বজ্র মিলে এক ঠাঁই |
ভীম জন্য এত হল, ‘ধরাতল স্বর্গ-স্থল ,
. কিছুমাত্র ভেদ তার নাই ||’