এই যে দাদা, এতদিনে বেরিয়েছে--- নতুন ফরমুলায় তৈরি খলিফাচাঁদের আশ্চর্য কলম : ‘খাই-খাই |’ চোর, জোচ্চোর, লোচ্চা, লম্পট, খাজা, খোজা, পণ্ডিত, মূর্খ যে-কেউ চোখ বুঁজে রাতারাতি লেখক হতে পারে | এ কলম হাতে থাকলে বসা বা দাঁড়ানো, চিৎ বা উপুড় যে-কোনো অবস্থায় প্রকাশ্যে ঝোপ বুঝে কোপ দেওয়া যায়— কোনোরকম তাগবাগ বা রাখঢাকের দরকার হয় না |
দিনকে রাত, সোজাকে কাত, হতাশকে হাত করতে এ কলমের জুড়ি নেই | মনে রাখবেন, নতুন ফরমুলায় তৈরি খলিফাচাঁদের আশ্চর্য কলম ‘খাই-খাই |’
রাঘববোয়াল থেকে চুনোপুঁটি হরেক সাইজের পাওয়া যায় ; দাম উত্তমমধ্যম হিসেবে | সঙ্গে বিনামূল্যে চুন এবং কালি |
যা হট্ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় কাল মধুমাস কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনাকাল ১৯৬৬।
নায়েব, গোমস্তা, বাঈজী, মাহুত, সহিস তোশাখানা, রাতেক-দিন-করবার ডায়নামো সব চাই, নইলে গ্রামে থাকাই বোকামো--- বোতলকে-বোতল করে দৈনিক হাবিস আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে দিতেই চম্পট সে-গদিতে বসতে গেল যে তার ওয়ারিশ
কালের সিপাই এসে ঘাড় ধরে তুলি দিয়ে বলল : যা---হট্ !
উঠে আসছে শক, হুণ., কুষাণ, পহ্লবী স্বপ্নাদ্য কলমে, হচ্ছে ছাপাই বাঁধাই বই যা ভারী, বইতে পারে একমাত্র গাধাই --- কী মজা, লিখলেই সব হয়ে যাচিছে ছবি ! মগজে জবল শিফ্টে তৈরি করে প্লট যেই না নেবার চেষ্টা লেখক পদবি
কালের সেপাই এসে ঘাড় ধরে তুলে দিয়ে বলল : যা---হট্ !
আমাদের মুক্তকচ্ছ রণছোড় বাবাজি ভোটযুদ্ধং দেহি বলে আঁটেন মালকোঁচা যাকেই তাকিয়ে মনে হয় খাঁদাবোঁচা তাকেই আটকান জেলে | কারণ, সে গররাজি মন্ত্র পড়তে গণতন্ত্রে ওঁ স্বাহা ফট্ ---- পাঁচসালা উৎরে দেবে সত্যি কি ভোজবাজি ?
কালের সেপাই বসে খেলা দেখে | . এবার বড়ের চালে কিস্তি পড়বে ? . নাকি হবে মন্ত্রীর পালট ||
চরাতে নিয়ে গিয়েছিলাম গো মালিক . তিন শো শব্দ গো . মালিক . তিন শো শব্দ ফিরে এলম গো মালিক তিনটে কম গো . মালিক . তিনটে কম একটি ছিল আগে সেটিকে পেয়ে বাগে . খেয়ে নিলে হালম গো মালিক . খেয়ে নিলে হালম।
দুটিকে দিলে খোঁয়াড়ে ও-পাড়ার সেই চোয়াড়ে | একটি ভূত একটি ভগবানের পুত--- ভালোবাসা ছিল সবার আগে গো মালিক . ছিল গো মালিক আগে— . তাকেই খেলে বাঘে॥
তিন্তিড়ি
তেঁতুলতলায় শব্দ কিসের বিশ্রী বিদিকিচ্ছিরি--- কে ওখানে? কে হে?
এজ্ঞে আমি হেঁ-হেঁ--- অন্ধকারে চোখটা জ্বেলে খুঁজে বেড়াচ্ছি তিন্তিরি।
ঢুকব কি না ঢুকব দেহে--- মুখপুড়িটা আমায় ফেলে দিয়েছে দেখুন, কী বিষম সন্দেহে॥
উত্তরপক্ষ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় “এই ভাই” কাব্যগ্রন্থের ( ১৯৭১ ) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
১ বাবা বলেন, যখন হবার . আপনিই হয়, . আসল ব্যাপার . সময় |
বাবা বলেন, সবার আগে . জানা দরকার . স্রোতে লাগে . কখন জোয়ার, . কখনই বা ভাঁটা |
বাবা বলেন, এমনি করে . সারা রাস্তা ধৈর্য ধরে . মড়া টপ্ কে . মড়া টপ্ কে . মড়া টপ্ কে হাঁটা |
বাবারা যা বলেন তা কি ঠিক ? . এও ভারি আশ্চর্য . গা বাঁচাবার নাম দিয়েছেন সহ্য . বাবাদের ধিক্ . বাবাদের ধিক্ . বাবাদের ধিক্ |
২ আমাদের প্রাণভোমরাগুলো বড় বড় খোলের মধ্যে ভ’রে সরু সুতোয় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ; আমরা অপেক্ষা করে আছি মাথার ওপর বহ্নিমান হয়ে আকাশ কখন ভেঙে পড়বে | এখন যে যতই সাফাই গাক্ হাত-ধোয়া নোংরা জল আমাদের চোখের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে |
বইতে পা লেগে গেলে আগে আমরা কপালে হাত ছোঁয়াতাম, গায়ে পা ঠেকলেও এখন আমরা প্রণাম করি না ; এমন কাউকেই আমরা দেখছি না যার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াতে পারি | সরু করে বানাচ্ছি প্যান্ট যাতে হাঁটু গেড়ে বসতে না হয়, যাতে সারা দুনিয়াকে আমরা ভালো করে পা দেখাতে পারি | আর শত্রুর চোখকে ফাঁকি দেব বলেই আমাদের জামায় ফুল-লতা-পাতা কাটার ফৌজি ব্যবস্থা | কেউ আমাদের আদর করে ভোলাতে এলে আমরা কাঠপুতুলের মতো ঠিক্ রে উঠি | কানাকে কানা বলতে, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে আমাদের মুখে একটুও আটকায় না | ভদ্রতার মুখোশগুলো আমরা আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছি, কাউকেই আমরা নকল করতে চাই না | যা বলবার আমরা জোর গলায় বলি, শব্দ আমাদের ব্রহ্ম |
বাঁধা রাস্তায় পেটোর পর পেটো চম্ কাতে-চম্ কাতে আমরা হাঁক দিই | আমাদের আওয়াজে বাসুকি নড়ে উঠুক ||
জেলখানার গল্প কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় “ছেলে আছে বনে” কাব্যগ্রন্থের ( ১৯৭২ ) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
গাছ পাখি মাঠ ঘাট হাট দেখে . আসছিলাম চলে ---
হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন চিত্কার করে ডাকতে লাগল ‘কমোরে-ড !’ ‘কমোরে-ড !’ ব’লে |
ফিরে দেখি চেনামুখ দেখে থাকব হয়তো কোনো মিছিলে-মিটিঙে ; মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভাঙা গাল, একেবারে রোগা টিঙটিঙে খাটো ধুতি, মার্কামারা খাঁকির হাফশার্ট |
কাছে যেতে মনে পড়ে গেল অকস্মাৎ--- এক সময় আমরা সব . একই জেলে একসঙ্গে ছিলাম, মুখচ্ছবি মনে ছিল ; কিছুতেই মনে করতে পারলাম না নাম | আমার কপাল, . স্মৃতির অ্যালবামে যত ছবি . সব নাম-মোছা |
বেঞ্চিতে বসলাম আমরা . এসে গেল তক্ষুনি দুটো চা— গরম গেলাস দুটো ভাঙাচোরা টেবিলে বসিয়ে পুরনো দিনের গল্প, সেও খুব রসিয়ে রসিয়ে, বলা হল | . দাঁতে দাঁত দিয়ে সব বসে থাকা . কিছুতে না-খাওয়া, সারা সিঁড়ি ব্যারিকেড, বারান্দায় জল ঢেলে রাখা টিয়ার গ্যাসের জন্যে, সারা রাত ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি --- তবু কী আনন্দে, ভাবো, . কেটেছিল জীবনের সেই দিনগুলি | বলতে বলতে জল আসে আমাদের দুজনেরই চোখে মুখগুলো ভেসে ওঠে মনে পড়ে . প্রভাত-মুকুল-সুমথকে |
তারপর ওঠে . আজকের দিনের কথা | . কে কোথায় আছে, কে কী করছে—এই সব | দেখা গেল, . ভয়টা ছোঁয়াচে |
দুজনেই চুপ, কিছু ভাঙতে চায় না দুজনের কেউ | কে আজ কোথায় আছি কোনদিকে . কোন তরফে— যেই বলা, . অমনি প্রকাণ্ড একটা ঢেউ ছুটে এসে . দুহাতে দুজনকে তুলে . দিল এক প্রচণ্ড আছাড় |
সামনে দেয়াল শুধু, . লোহার গরাদে ধরে . বাইরে দাঁড়িয়ে অন্ধকার | চেয়ে দেখি, আমরা আবার সেই পাশাপাশি সেলে |
একটু পা চালিয়ে, ভাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় “একটু পা চালিয়ে ভাই” কাব্যগ্রন্থের ( ১৯৭৯ ) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
১ সব আরম্ভেরই একটা শেষ আছে, সব শেষেরই একটা আরম্ভ |
শঙ্খ-লাগা সাপ যেমন একটি আরেকটিতে লগ্ন হয়ে থাকে, যেমন বানের মধ্যে থাকে পলি আর পলির মধ্যে বান |
কথাটা হল, কে কিভাবে দেখে, কখন কোন্ খানে দাঁড়িয়ে
ধানের মধ্যে বীজের পরম্পরায় অন্তহীন ধান ? নাকি . কাঁধে-তোলা খাটিয়ার আগে আগে ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া . ভাঙানো পয়সার টোপে গাঁথা হরির লুটের খই ?
সামনে মুক্তি, না এখানেই ছেদ? ফস্ করে জ্বলে ওঠা, না . দপ্ করে নিভে যাওয়া ? আগুনের চুম্বন, না হাওয়ার ফুত্কার ?
আমি বলি, যা হচ্ছে হোক, যা চলছে চলুক— দশ আঙুলের টিপছাপে একদিন জীবন সব বাকি বকেয়া . উশুল করে নেবে |
আসলে ওটা একটা কথার কথা, যারপরনেই ধরতাই বুলি এই যেমন এক সময়ে আমাদেরই একজন বলতেন
বড়বাবু বললেন, আমি বললাম, আমি বললাম, বড়বাবু বললেন, শেষকথা বলবেন আপনারা | বলতে বলতে . বলতে বলতে . মুখে ফেনা বেরিয়ে গেল এখন শুনছি বড়বাবুরও বড়বাবু আছে . আরেকটু না তুললে কিচ্ছু হওয়ার নয় |
২ আমাদের এদিককার রাস্তাঘাটে, মশাই আর বলবেন না, বছরে বারোমাস ভোঁচকানি-লাগা ক্ষিধে--- বেরোলেই পা জড়িয়ে ধরে | আর এমন অবাধ্য, কী বলব | যাকেই বলি, দাঁড়াও— . সে সটান শুয়ে পড়ে |
. আর ওঠে না |
সকালবেলায় জানালার গরাদ ঠেলে ভেতরে আসে হাসপাতালের রুগীর পোশাকে রোদ্দুর ! পাশ ফিরে দেখি মেঝেতে মুখ থুবরে পড়ে রয়েছে সকালের কাগজ | সেকেন্ডক্লাস ট্রামে কাল আমার হাঁটুর বয়সী একজনকে দেখে বুকের মধ্যেটা হিম হয়ে গিয়েছিল | চোখে একরাশ ঘুম নিয়ে লোকটা কাজ থেকে ফিরছিল | তার চোখের কোণ, নাকের ডগা, লালা-ঝরানো ঠোঁট, নখের ময়লার নীচে থেকে হাতের চেটো সমস্তই কাগজের মতন সাদা |
কাগজটা হাত বাড়ালেই পাই | একটুও ইচ্ছে করছে না— কেননা বন্যায় ভেসে-যাওয়া মৃত সন্তান বুকে আঁকড়ানো মৃত মায়ের পাশেই দেখব
হয়তো . তুইথুলি মুইথুলি করছে . তিনটে ঘাটের মড়া . একজন বলে বৃষ্টি . তো একজন বলে খরা . দুজনে এ ওকে টিপছে . তিন নম্বরকে সরা নয়তো . মাথায় পট্টি, গলায় লেত্তি . সামনে করে ভাঁড়ামি . কাটে ফোড়ন আপনি মোড়ল . এক ভুঁইফোড় সোয়ামী
. যার খায় নুন তার গায় গুণ . নইলে নিমকহারামি . যাকেই দেখে শুধায় তাকে . বলো তো বাবা, কার আমি ?
৩ আমি এখুনি নৌকো বানিয়ে রাস্তায় ভাসিয়ে দিতে পারি কিংবা জল না থাকলে ধরাতে পারি আগুন | কিন্তু এরা কেউই তাতে নাকচ হয়ে যাবে না | মাঝখানে পর্দা পড়বে এই যা, আর তার আড়াল থেকে একই মানুষ শুধু একটু নামনিশান আর পোশাক বদলে চুল কাঁচিয়ে, নয় চুল সাদা ক’রে ঠিক পরের দৃশ্যেই আবার দোর্দণ্ডপ্রতাপে ফিরে আসবে |
হাততালি দিতে গিয়ে মাথার ভেতর হাতকড়াগুলো ঝন্ ঝন্ করে উঠছে, দিনের আলোয় কালো দস্তানায় ঢাকা সাদা থাবা অন্ধকারে বার করে আনছে তার ধারালো নখ বেকার ছেলেগুলো চোখের মাথা খেয়ে আর কিছু না পেয়ে . কাজে-না-লাগা হাতগুলোই . আগুনে পোড়াচ্ছে |
আকাশে মেঘ করেছে | ধ্রুবতারা না দেখতে পেয়ে কেউ কেউ ভরসা করছে না . ঘরের বাইরে পা দিতে | আমার কাছে অনেক দিনের পুরনো এক দিগ্ দর্শন যন্ত্র . আমার হৃদয় | আমি সেটা কোনো আগন্তুককে দেব বলে কেবলি ঘর-বার ঘর-বার করছি |
৪ লেনিনকে আমরা দাঁড় করিয়ে রেখেছি ধর্মতলায় ট্রামের গুমটির পাশে | আঁস্তাকুড়ের ভাত একদল খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ডাস্টবিনে হাত চালিয়ে দিয়ে |
. লেনিন দেখছেন |
গ্রামের এক লোক শহরে ডাক্তার দেখিয়ে সর্বস্বান্ত হতে এসেছিল তার আগেই তাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়ে গেল এক পকেটমার |
. লেনিন দেখছেন |
সন্ধের মুখে যে মেয়েটাকে একটা ট্যাক্সি এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সন্ধে গড়িয়ে গেলে, হাই তুলতে তুলতে সে আবার এসে দাঁড়িয়েছে গাছতলায় |
. লেনিন দেখছেন |
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে লেনিনেরও খুব হাই পাচ্ছিল |
হঠাৎ দেখলাম একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন |
যেদিকে তাঁর নজর, সেইদিকে তাকিয়ে দেখলাম লাল নিশান নিয়ে একদল মজুরের এক বিশাল মিছিল আসছে |