উপবাসী প্রার্থনার পর কবি তারাপীড় সেনগুপ্ত কুলটি, ডিসেম্বর ১৯৬০ কুলটি অ্যাপ্রেনটিস এসোসিয়েসনের আয়োজিত স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরষ্কার প্রাপ্ত | বিচারক কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র।
উপবাসী প্রার্থনার পর সমুদ্র প্রতীক্ষার নিরসন করে দিয়ে জানালাটা হঠাৎ খুলে গেল | ঘরের হাঁপ পাওয়া হাওয়াটা এক চিমটে রগচটা রোদ্দুরের চুম্বন পেয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ অবসাদ থেকে এক মসৃন মুক্তি পেল ---
. মরু মন এরই মাঝে খুঁজে পায় . তৃষিত অবকাশ এক . শুধু ভাববার--- . ফেলে আসা জীবনের অহেতুক পট গুলো . অকারণে এসে ভীড় করে রং এ আর রূপে . আর বেদনাহত মুহূর্ত্তগুলো থমকে থাকে . নির্ল্লজ্জ সারল্যের মুখোস এঁটে ---
. রংচটা জানালার ফ্রেমে . হঠাৎ ছন্দময় ধুসর দুটি ছোট্ট চড়ুই এসে বসলো . সরল বলিষ্ঠ মুখরতায় . উড়িয়ে দিলো জমে ওঠা যত ক্ষোভ . আর . অনির্ব্বচনীয় এক স্নিগ্ধতায় . আমার এ মনে হলদে আশ্বিন এলো --- . *************************** . সূচিতে . . .
বন্ধুরা কাশ্মীরে কবি তারাপীড় সেনগুপ্ত বাণীভবন, কুলটি , ২৪. ১০.৬৫
আমার বন্ধুরা এখন কাশ্মীরে ( আমার বন্ধুরা আমার প্রাণের বন্ধুরা ) জার্মান স্কলার মোক্ষ মুলার যত্ন করে রেখেছেন নাম ভূস্বর্গ যার . এখানে কুলটি কুটীল কুলটি . আমি আছি পড়ে ---
কারখানা, কাজ আর কাজ, ফার্নেস, তপ্ত তরল লৌহ শব্দের অশিষ্ট ঐকতান তারই মাঝে পরিচিত বিস্মিত কন্ঠস্বর “তারু ! তুই, তুই যা স নি ! কেন রে কেন রে ?”
. কেমন যেন ন্যাকা ন্যাকা মনে হয় . এইসব কেন কেন কেন ! . ওরা বোঝে না কেন . আমাদের এই হৃদয় যদি হয় . মার্জিত ইচ্ছার প্রজাপতি . তাহলে এই কুলটি ঝলমলে এক . লোভী গিরগিটি !
আমার বন্ধুরা এখনও কাশ্মীরে ( আমার বন্ধুরা আমার প্রাণের বন্ধুরা ) আহা! কী অকপট আমায় ডাকে ঘন সবুজেরা সেই সব হ্রদ, উপত্যকা কী ভীষণ স্তব্ধ প্রকৃতি ! অবিশ্রান্ত সম্মোহনে ক্রমশঃ হৃদয় টানে অজানা অজস্র ফুলেরা !
. আহা হই যদি নীল দিগন্তের . পরিযায়ী পাখী, . দৃপ্ত পাখসাটে উড়ে যাই . চলে যাই উ ড়ে----- . কিন্তু কুলটি কুটীল কুলটি . আমি আছি পড়ে | . *************************** . সূচিতে . . .
মধু যামিনীতে কবি তারাপীড় সেনগুপ্ত জাপলা, ২০. ১২. ৭১
চঞ্চল সুখের মতো নদী কত স্বচ্ছন্দে তোমার বুকে ঝাপ দিতে পারি আমার মনের স্রোত তোমার সরল স্রোতে কী অবলীলায় একাকার হ’য়ে যায় !
অনন্তকালের বৃদ্ধ বৃক্ষ আমার মনের সবুজ কী সহজেই তোমার গাঢ় সবুজে গাঢ়তর হয় তোমার কোলে শুয়ে অনায়াসে পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকে আমি ডাক দিতে পারি |
তারাভরা অন্তহীন আকাশ আমার মনের ফুল দিয়ে কী যত্নে তোমার বিরাট সামিয়ানা সাজিয়ে দিতে পারি একটি একটি ক’রে যা নিয়ে অন্ধকারেও অপরূপ হাসো তুমি |
. আর তুমি! তুমি ! . নদী, বৃক্ষ, লতা, তারাভরা আকাশ . তোমারই মধ্যে এক নিমেষে একাকার সব . সমস্ত চেতনা নিয়ে আমি তোমারই মধ্যে . শিহরিত হতে চাই অনুক্ষণ | . *************************** . সূচিতে . . .
তিরিশে জুন, ১৯৭১ ( বন্ধুর বিবাহ বার্ষিকীতে ) কবি তারাপীড় সেনগুপ্ত চিত্তরঞ্জন
ভাবতে আশ্চর্য লাগে কী ভয়ানক দ্রুত বদলে যাচ্ছে সময় | কী ভয়ানক বদলে যাচ্ছে মানুষ বিশ্বাস ভালবাসা অঙ্গীকার কী ভয়ানক পাল্টে যাচ্ছে বাংলার আকাশ বাতাস কী নিদারুণ অনিশ্চয়তায় --- অমোঘ অসহায়তায় রক্তাক্ত বাংলার হৃৎপিন্ড ভাবতে আশ্চর্য লাগে |
. আবার আশ্চর্য লাগে . শুনি ওপার হতে ভেসে আসে . আপোষহীন জীবনের . আকাংখার গান— . নিশ্চিহ্ন সবুজের বুক চিরে . সীমান্তের সীমানা ছাড়িয়ে . ভেসে আসে বারুদের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস . অথচ কী নির্ভিক নিষ্ঠায় . এঁকে যায় মুক্তির প্রদীপ্ত পতাকা . ভাবতে আশ্চর্য লাগে ---
. আর আশ্চর্য লাগে . কী দ্রুত দীপ্তিমান এগিয়ে আসে . তিরিশে জুন --- জীবনের ঈপ্সিত ইংগিত . দুই প্রাণের মিলে . আকাংখার সুনীলে অংকিত . যে শান্তির ছবি . কী পরম মমতায় . ভেসে ওঠে হৃদয়ের প্রত্যন্ত প্রদেশে . পৃথিবীতে তাই বুঝি ফিরে আসে . জীবনের তরল সংগীত | . *************************** . সূচিতে . . .
আট ডিসেম্বর কবি তারাপীড় সেনগুপ্ত ট্রেন পথে, লখনউ, ৮. ১২. ১৯৭২
হিমেল হাওয়ায় স্পন্দিত অম্বর হেমন্তের কুহেলীকে ডেকে বলে “শীত এসে গেছে” মকর ক্রান্তির সূর্য্য সোচ্চার ঘোষণায় “শীত এসে যায়, শীত এসে যায়” |
. থরো থরো খুশীর আবেগে . উল্লসিত অঘ্রাণের সোনালী প্রান্তর . সমস্ত আকাশ, সমস্ত বাতাস, . সমগ্র প্রাণ, সমগ্র চেতনা . বুকের মন্দিরে ঘন্টা বাজায় . “আট ডিসেম্বর আট ডিসেম্বর” |
অকস্মাৎ উদ্ভাসিত মনের দুয়ার শিহরিত সেই দিনের স্মৃতিতে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, রিনিঝিনি শব্দের সম্ভার একনিষ্ঠ চেতনায় অন্য এক প্রাণের ঝংকার আবিষ্কৃত সেই দিনে সেই প্রাণ চিরন্তনী ! তোমার তোমার |
. এই অতিথি আবাস . তিন তলার হিসেবী বারান্দা . বসে বসে নিরুপায় আয়াসে . আমি দেখি অদেখা জীবনের চলচ্চিত্র . খন্ডে খন্ডে দৃশ্যমান . চলমান সকাল বাচাল টেম্পো . আর রগচটা প্লান্ট বাস . তারই পাশে অধোমুখী আর্তনাদে তাল দেয় রিক্সা . চপল মাছের মত পিছলে . অভ্যস্ত অক্লেশে নবীন যুবারা সাইকেলে . এই নির্দিষ্টে একই মিছিলে . একই আশ্বাসে ভরপুর
. দুপুর, . সচতুর হাওয়ারা নেমে পড়ে শূন্য পথে . খোলা মাঠে, . লুঠেরা দৌরাত্ম চলে . নীল আকাশ আর লাল মাটির নিখিলে . খবরদারি হল্লা ছুটে আসে প্লান্টবাস . গাছের বিরল সবুজে হাওয়ারা চকিতে আবার . ‘হাওয়া’---
. অমনি বিকেল--- . সুবাসিত সুন্দরীরা ( নাকি ছুটন্ত নারীই সুন্দরী ) . স্বচ্ছন্দ অভ্যাসে উড়ে যায় . এক হাতে করুণায় আদ্র করে স্বামীদের পিঠ . ছুটে যায় স্কুটারে, পরিমিত নির্জনে . কিংবা কোন সিভিক সেন্টারে . শাড়ীর সাংঘাতিক উড্ডীনে . আর তাদের খোলা তলপেটে . হাওয়ারা ভীষণ উত্সাহী--- . তারই পাশে উপায়হীন স্ত্রীরা . ( বুঝি সেই আশা মেটাতে ) . মধ্যবিত্ত সাইকেলে, ক্যারিয়ারে . নির্বিকার নিরেট ভঙ্গীতে . আর কায়িক পরিশ্রমে ক্রমাগত ক্লান্ত স্বামী . কিন্তু নয় অধোমুখী . বুকে বুঝি বিকেলের ফুরফুরে নরম আমেজ . সংগে চলে হাওয়ার বাহবা . আর বাবাদের উত্সাহে . উল্লসিত শিহরিত শিশুরা . অনুকুল আনন্দে ----
. সন্ধ্যে . মহিলারা সানন্দে . স্বামীদের আহ্লাদ শরীরে ব’য়ে . আশ্চর্য কৌশলী পরিপাটে . একে একে বের হয় নৈমত্তিক পরিক্রমনে . সফল স্বামীরা সংগ দেয় . ( এ সময় সান্ধ্য ভ্রমণ স্বাস্থ্যের স্বপক্ষে ) . আর অতলে অন্ধকারে . ভবিষ্যের অনাগত আগন্তুকেরা . কি জানি কী ভাবে . তারপর ঘনীভূত অন্ধকারে . ঘন যুগলেরা একে একে ফেরে . শুধু নির্দ্দিষ্ট দূরত্বে স্ট্রীট ল্যাম্প . চকিতে চোখ ঠারে
দিনের উত্তেজিত উপকরণে— উশৃঙ্খল হাওয়া এখন নিস্তেজ, নিতান্ত বিনয়ী আর আমি একলা---- অকস্মাৎ মনে পড়ে যায় বিদ্বান বিস্বাদ চা, তুখোড় আড্ডা, গান, সিগারেট, আর চার ইয়ারের দল . নেই কেউ কোথাও নেই . শুধু শব্দহীন আলোর রোশনাই . ভিলাই --- ! . *************************** . সূচিতে . . .