অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা
*
সাবেকি
কবি অমিয় চক্রবর্তী  


গেলো
গুরুচরণ কামার, দোকানটা তার মামার,
হাতুড়ি আর হাপর ধারের ( জানা ছিল আমার )
দেহটা নিজস্ব |
.             রাম নাম সত্ হ্যায়
গৌর বসাকের প'ড়ে রইল ভরন্ত খেত খামার |
.             রাম নাম সত্ হ্যায় ||
দু-চার পিপে জমিয়ে নস্য     হঠাত্ ভোরে হ'লো অদৃশ্য---
ধরনটা তার খ্যাপারই---
হরেকৃষ্ণ ব্যাপারি |
.             রাম নাম সত্ হ্যায়
ছাই মেখে চোখ শূণ্যে থুয়ে,   পেরেকের খাট তাতে শুয়ে
পলাতক সেই বিধুর স্বামী
আরো অপার্থিবের গামী
.             রাম নাম সত্ হ্যায়
রান্না রেঁধে কান্না কেঁদে,        সকলের প্রাণে প্রাণে বেঁধে
দিদি ঠাকরুন গেলেন চ'লে---
খিড়কি দুয়োর শূণ্যে খোলে!
.             রাম নাম সত্ হ্যায়
আমরা কাজে রই নিযুক্ত,     কেউ কেরানি কেউ অভুক্ত,
লাঙল চালাই কলম ঠেলি,     যখন তখন শুনে ফেলি
.             রাম নাম সত্ হ্যায়
শুনবো না আর যখন কানে       বাজবে তবু এই এখানে
.             রাম নাম সত্ হ্যায় ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
পিঁপড়ে
কবি অমিয় চক্রবর্তী


আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ঘুরুক দেখুক থাকুক
.   কেমন যেন চেনা লাগে ব্যস্ত মধুর চলা ---
.   স্তব্ ধ  শুধু চলায় কথা বলা ---
.   আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে তার ঐ ভুবন ভ'রে রাখুক,
আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ধুলোর রেণু মাখুক ||

.   ভয় করে তাই আজ সরিয়ে দিতে
.   কাউকে, ওকে চাইনে দুঃখ দিতে |
.   কে জানে প্রাণ আনলো কেন ওর পরিচয় কিছু,
.   গাছের তলায় হাওয়ার ভোরে কোথায় চলে নিচু ---
আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে সেই অতলে ডাকুক |
.   মাটির বুকে যারাই আছি এই দুদিনের ঘরে
.   তার স্মরণে সবাইকে আজ ঘিরেছে আদরে ||

.                  ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
রাত্রি
কবি অমিয় চক্রবর্তী


অতন্দ্রিলা,
ঘুমোওনি জানি
তাই চুপি চুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে
বলি, শোনো,
সৌরতারা-ছাওয়া এই বিছানায়
---সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি---
কত দীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন,
আলাদা নিশ্বাসে---
এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে ছুঁই
কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা---
অতন্দ্রিলা,
হঠাত্ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোত্স্না,
দেখি তুমি নেই ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
বিনিময়
কবি অমিয় চক্রবর্তী


তার বদলে পেলে---
.           সমস্ত ঐ স্তব্ ধ  পুকুর
.           নীল-বাঁধানো স্বচ্ছ মুকুর
.                       আলোয় ভরা জল---
.           ফুলে নোয়ানো ছায়া-ডালটা
.           বেগনি মেঘের ওড়া পালটা
.                       ভরলো হৃদয়তল---
.           একলা বুকে সবই মেলে ||

তার বদলে পেলে---
.           শাদা ভাবনা কিছুই-না-এর
.           খোলা রাস্তা ধুলো-পায়ের
.                        কান্না-হারা হাওয়া---
.           চেনা কণ্ঠে ডাকলো দূরে
.           সব-হারানো এই দুপুরে
.                        ফিরে কেউ-না-চাওয়া |
.           এও কি রেখে গেলে ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ওক্লাহোমা
কবি অমিয় চক্রবর্তী


সাক্ষাৎ সন্ধান পেয়েছ কি ৩-টে ২৫-শে?
বিকেলের উইলো বনে রেড্ এরো ট্রেনের হুইসিল
শব্দ শেষ ছুঁয়ে গাঁথে দূর শূণ্যে দ্রুত ধোঁয়া নীল ;
মার্কিন ডাঙার বুকে ঝোড়ো অবসান গেলো মিশে ||
.                    অবসান গেল মিশে ||

মাথা নাড়ে 'জানি' 'জানি' ক্যাথলিক গির্জাচুড়া স্থির,
পুরোনো রোদ্দুরে ওড়া কাকের কাকলি পাখা ভিড় ;
অন্যমনস্ক মস্ত শহরে হঠাত্ কুয়াশায়
ইস্পাতি রেলের ধারে হুহু শীত-হাওয়া ট'লে যায় ||
.                    শীত হাওয়া ট'লে যায় ||

হৃত্পিণ্ডে রক্তের ধ্বনি যেখানে মনের শিরা ছিঁড়ে
যাত্রী চ'লে গেল পথে কোটি ওক্লাহোমা পারে লীন,
রক্ত ক্রুশে বিদ্ধ ক্ষণে গির্জে জ্বলে রাঙা সে-তিমিরে---
বিচ্ছেদের কল্পান্তরে প্রশ্ন ফিরে আসে চিরদিন ||
.                    ফিরে আসে চির দিন ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
অন্নদাতা
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বঙ্কিমচন্দ্র সেন সম্পাদিত দেশ পত্রিকার ১লা আশ্বিন ১৩৫০ (১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩) সংখ্যা
থেকে নেওয়া |


পাথরে মোড়ানো হৃদয় নগর
জন্মে না কিছু অন্ন—
এখানে তোমরা আসবে কিসের জন্য ?
বেচাকেনা আর লাভের খাতায়
এখানে জমানো রক্তপণ্য—
যারা দান দেয় তারা মুনাফায়
সাধুতার সুদ কষে তবে হয় দাতা,
নয়তো তারাও রাষ্ট্রচাকায় পিষ্ট, দরদী নাগর :
তাদের দেওয়ার ফলাবে না ধান শান-বাঁধা কলকাতা |
আসো যদি তবে শাবল হাতুড়ি
আনো ভাঙ্ বার যন্ত্র,
নতুন চাষের মন্ত্র |
গ্রামে যাও,  গ্রামে যাও,
এক লাখ হয়ে মাঠে নদী ধারে
অন্ন বাঁচাও, পরে সারে সারে
চাবে না অন্ন, আনবে অন্ন ভেঙে এ-দৈত্যপুরী,
তোমরা অন্নদাতা |
জয় করো এই শান-বাঁধা কলকাতা ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
উজানী
কবি অমিয় চক্রবর্তী
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়” ২য় খন্ড থেকে নেওয়া |


সকাল উদয়বিষণ্ণ মেঘলা সমুদ্রে ;
সিংহল ঝাপসা উঠছে নারকলবন পাহাড়মাথায়,
বোটের ডেকে চলি ডাঙার দিকে, হাতে কফি-পেয়ালা—
যাত্রীরা তাস-খেলায় মত্ত, সমুদ্র-আসমান-দ্বীপ জানে না |
দুই জগতের মধ্যে আছি, তিন জগৎ, মাটির মানুষের জলের,
নীল-শাদার কেরামতি শূন্যে, সিন্ধু-শকুনের পাখায় অদৃশ্য তীর ;--
হঠাৎ মন ঘুরল সংকেতে, মালাবার পাহাড়ে, বোম্বাইয়ে,
সেই সমুদ্র-তোরণ অগণ্য যাওয়া-আসার ;
কেন অন্যত্র আছি, আকাশ-ভরা সানাই, অত আলো
ভারতের নিঃসীম ঘর দূরে রেখে---জানি
পরিধির পরে পরিধি,আয়ুর চক্র একই যাত্রায় আবর্তিত,
পৌঁছনো কেবল এগিয়ে যাওয়া, ফিরে-আসা, বাসা-বদল,
লগ্ন দোল,
তারপর সব জাহাজ থামে শান-বাঁধা ঘাটে, স্তব্ধ,
কলম্বো-মাদ্রাজ পেরিয়ে টিকিট-মাশুলের অতীত,
কোথায় ?
হে আমার দিন
তোমাকে ফিরে চাই, সমগ্র, একটিবার আমারই পৃথিবীতে
সব চেয়ে আমার ভারতী-বাংলায়, ভূমিষ্ঠ হব
থাকব মায়ের সঙ্গে, বড়ো হব, ভাই-বোন-পিতৃসংসারে,
ভাষা হবে আজ দুই বাংলার নতুন যোগে ;
দেশবিদেশের আত্মীয় পাব যৌবনে শান্তিনিকেতনে,
পরিক্রমা পরে-পরে প্রেমের মহীয়ান বিরাট অজানা দেশে-দেশে,
পারাপার গাঁথব চৈতন্যের জালে, স্মৃতির চেয়ে বেশি, ঐকান্তিক,
আবার উত্তীর্ণ হব, সমাঙ্কিত, অনিঃশেষ,
সন্ধ্যায় কি পৌঁছব না শেষবার যমুনায়, গঙ্গাতীরে, কলকাতায় ||

.                    ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
সংগতি
কবি অমিয় চক্রবর্তী
সুকুমার সেন  সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়”১ম খন্ড থেকে নেওয়া |


মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হাওয়া আর
.           পোড়ো বাড়িটার
.           ঐ ভাঙা দরজাটা |
.                     মেলাবেন |

পাগল ঝাপটে দেবে না গায়েতে কাঁটা |
আকালে আগুনে তৃষ্ণায় মাঠ ফাটা
মারী-কুকুরের জিভ দিয়ে ক্ষেত চাটা ,
.           বন্যার জল, তবু ঝরে জল,
.            প্রলয় কাঁদনে ভাসে ধরাতল—
.                   মেলাবেন |

তোমার আমার নানা সংগ্রাম,
দেশের দশের সাধনা, সুনাম,
ক্ষুধা ও ক্ষুধার যত পরিণাম
.                  মেলাবেন |
জীবন, জীবন-মোহ,
ভাষাহারা বুকে স্বপ্নের বিদ্রোহ—
.                মেলাবেন, তিনি মেলাবেন |

দুপুর ছায়ায় ঢাকা,
সঙ্গীহারানো পাখি উড়িয়াছে পাখা,
পাখায় কেন যে নানা রঙ তার আঁকা |
প্রাণ নেই, তবু জীবনেতে বেঁচে থাকা
.           ---- মেলাবেন |

তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে
যত কিছু সুর, যা-কিছু বেসুর বাজে
.       মেলাবেন |

মোটর গাড়ির চাকায় ওড়ায় ধুলো,
যারা সরে যায় তারা শুধু – লোকগুলো ;
.        কঠিন, কাতর, উদ্ধত, অসহায়,
.        যারা পায়, যারা সবই থেকে নাহি পায়,
কেন কিছু আছে বোঝানো, বোঝা না যায়—
.          মেলাবেন |

দেবতা তবুও ধরেছে মলিন ঝাঁটা,
স্পর্শ বাঁচিয়ে পুণ্যের পথে হাঁটা,
সমাজধর্মে আছি বর্মেতে আঁটা,
ঝোড়ো হাওয়া আর ঐ পোড়ো দরজাটা
.        মেলাবেন, তিনি মেলাবেন ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
বিধুবাবুর মতো
কবি অমিয় চক্রবর্তী
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ থেকে
নেওয়া |


“চিঁড়েগুড় খেয়ে তৃপ্তিটুকু, গাছতলায় শুয়ে শান্তি,
শুধু অভাব দূর নয়, বেশ একটু গ্রথিত গোছের ভাব,
মেঘ নামল গাঢ়, বৃষ্টি নেই, স্নিগ্ধদুপুর আর্বিভাব
.                        ---কৃষিসফলতার আশা ?
.        না, মরীচিকা-হরা ভ্রান্তি-
.                দূর-করা মেঘমেদুর ভালোবাসা ?
পাড়ার মেয়ের বিয়ের শঙ্খ, সারাদিন বাজাচ্ছে সানাই
.        আমি কী করে জানাই
আমার বিকেল আড় হয়ে এল আশ্চর্য এক দান ?

পায়ের মাপের জুতোর খুশির টান,
ডাইনামো-ঘরে গন্ গন্ আর কোটি-চলন্ত রেখা,
মসৃণ নিবে অফিসের খাতায় হিসেব লেখা,
দেশে-ফেরার ছুটির সকালে টবে-ভরা স্নানের জল,
দরকারি দিনের রোদ্দুরে আশ্বিনের হাওয়া টলমল,
দার্জিলিং চায়ের আসচে ---যাকে বলি—তৃষাতুর সুগন্ধ
নতুন ক্ষুরে দাড়ি কামাবার আনন্দ,
অনেকদিন পরে ধুতি পাঞ্জাবি আর উড়োনি,
মোঘলসরাই পার হয়ে চলছে গাড়ির ধ্বনি :
.        সবের বার, অর্থাৎ যা, এবং তার চেয়ে বেশি
.        এই নিয়ে কাব্যের ফরমাশ | খাঁটি স্বদেশী |”

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
পর্তুগীজ আঙ্গোলা
কবি অমিয় চক্রবর্তী
দেশ, সুবর্ণজয়ন্তী কবিতা সংকলন ১৯৩৩-১৯৮৩ থেকে নেওয়া  |


যদি থাকত একটি তৃণ, মরুধ্যানে কোথাও বিস্মৃত
শ্যামরক্ত চিহ্নটুকু ,
তাকেই নির্যাসে তপ্ত আঙ্গোলার কবিতা গোলাপে
জাগাতেম মিশ্রিত উপমা,
দূর যাত্রী দাহ ধূপে সুরভিত |
এ-মুহূর্তে দগ্ধ শুধু কঠিন কাতর ইচ্ছা,
চেয়ে চেয়ে উবে যাওয়া ব্যথার আতর
অস্নিগ্ধ আহত শূন্যে তাপ :
তলে পর্তুগীজ-বন্দী জর্জর আফ্রিকা
প্লেনের পাখায় কাঁপে কাংস্য অনির্দেশ
অগণ্য নিস্তরু ডাঙা, ছায়া-সাক্ষ্যহীন |
প্রকাণ্ড নির্লজ্জ ব্যাপ্তি, তবুও গোপনে
কলঙ্ক শৃঙ্খল গাঁথা, জানি, লুয়ান্দায় ---
ক্রীতদাস ধিক্কৃত কলোনিতে |
ছিন্ন বাঁচা বন্দী জনতার
কোথাও খনিতে লুপ্তি, কারা খাটে কলে ;
কালো ত্বক বিধিদত্ত, নির্যাতিত নিগ্রো শোধে তারি
আমৃত্যু ভীষণ দাম অপমানে রাত্রিদিন |
অধম বণিক ঘোরে সাম্রাজ্য পাপের মূর্খ দাপে,
সামরিক বিধাতার নিষ্ঠুর ক্ষণিক প্রহসনে |

ধূ  ধূ  ক্রান্তি তটে দেখি অশ্রুতীর রক্ত নিঃশ্বসিত
নীল যেন লাল হয়ে জাগে নীর, নিঃসংসর্গ ভূমিকায় অশ্রুত ক্রন্দন |
পাহাড়ের স্তব্ধ সারি দূর-মনা |
অভিশাপ কবিতায় রচা তাও সাধ্য নয় :
এতখানি প্রান্তরের দারুণ অলক্ষ্য অত্যাচার
নিষ্ফল আক্রোশে বাঁধি সে কোন্ সত্তায় |
যদি পারি জাকারান্দা গাছে ঘেরা কোনো পথে
নরদাস-ব্যবসায়ী আড়তের রন্ধ্রে নেমে যেতে,
কবিতাও ফেলে দিয়ে জানি না সে কোন্ দৈবযোগে
বিদীর্ণ দিতাম বক্ষ প্রাণের বিজয় বিদ্রোহে |
চেয়ে ভারতীয় ক্ষমা, যেচে শাস্তি কাফ্রি চেতনার
ব্যর্থ হয়ে শূন্যে আজ দূরে চলি ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর