অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা
*
গৌরীপুর, আসাম
কবি অমিয় চক্রবর্তী
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” ১ থেকে
নেওয়া |


ক্রমান্বিত
.        বৃষ্টি,
.        এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা | একত্র ধারা
.        টপটপ পড়ছে বাড়ির টিনের ছাদে,
.        ছোট্ট দোপাটির বাগান জলে ভ’রে এল
.        আমাদের পুকুর আর পারের সব্ জি খেত
.                রুপোলি-কালো একশ’ জলের তলে ;
.        ছলছল. ঝিরিঝিরি, বেল-জাম-লিচু গাছে
.        বিন্দু গুনতে গিয়ে ভুল হল, শব্দ নামে ঝামরে ,
.        স্নাত জল ঠাণ্ডায় ছোঁয় সর্বাঙ্গ |
.        ক্ষুদে পুঁটিমাছ আর সাঁপলার সঙ্গ-স্রোতে
ডোবা সংসারে ভাসছি, ঘুরছি, জাগছি ; নিবিড় ঢেউ –
.        এবারে কি বন্যায় হারাবে গ্রাম,
.                সব জল এক হবে ঐ ব্রহ্মপুত্রে, ধুবড়ির কাছে ---
.        তারপর ধু ধু সমুদ্র,
.        সর্বহীন
.        ভাবাই যায় না ||

.               ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
চেতন স্যাক্ রা
কবি অমিয় চক্রবর্তী
ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “শুধু আবৃত্তির জন্য” কবিতা সংসলন  থেকে নেওয়া |


সোনা বানাই | সাঁকোর বাঁ পাশে গয়না
কাঁচের বাক্সে, জানালায় দ্রষ্টব্য ;  জানলার উপর ময়না
রেগে ওঠে তোমাদের ভিড়ে---ছোলা খাও, বলো “রাধে
রাধে“  “কেষ্ট কেষ্ট” --- বলতে বাধে

গলিতে, তোমাদের অতীব নোংরা গলিতে,
সোনার সুন্দর, রূপোর রূপকার, এই নর্দমার দোকান দেহলিতে
ধ্যান বানাই | এই আমার উত্তর |
ড্রেন, ধুলো, মাছি, মশা, ঘেয়ো কুত্তার

আড়ৎ বেঁধে আছ, বাঁচো ( কিমাশ্চর্য বাঁচা ) এবং
.        যমের কৃপায় মরা ;
অমৃতস্য অধম পুত্র, বন্দী স্যাঁৎসেতে গলির ঘরে ইঁদুর ভরা ;
নেই রাগ! ----অবশ্য |  আছ আনন্দে |

.         খাও ভেজাল ঘিয়ের জিলিপি,
শিশু কাঁদায়, ধোঁয়ার সংসারে, খুলে ওষুধের ছিপি

মা-বোনকে খাওয়াও---দয়ার ডাক্তার অন্তিম লাগলে,
তত্পূর্বাবধি রান্নার পাকে ক’ষে ঘোরাও ; নিজে ভাগলে
শক্ত সিনেমার সীটে, ইতরপ্রাণের গিল্টি
মুখ-ভরা পান, দৃশ্য হলিউড, মোক্ষের পিলটি

ভোলায় ধিক্কার, সন্ধেটা কাটে,
.             তবু রাত্রে জেগে ভাবো ভাবোই
কিছু একটা হয়তো হবে, বুঝিবা কোথাও যাবো, যাবোই---
কোথাও যাবে না, গলিতেই থাকবে |
.             বড়ো রাস্তায় যাদের বাসা
হাঁ ক’রে দেখবে তাদের মোটর ; পনেরোটা বেড়াল,
.              ----শখের চাকর---থাকবে খাসা,

কেউ ছোঁবে না তাদের ঘোড়দৌড়, মদ পাশা ;
.               দারোয়ানের লাঠি
বাঁচবে তাদের লুঠ-ভরা সিন্দুক ;  একটু ঈর্ষা করবে,
.               দীর্ঘশ্বাস, তবু তাদের চাটবে মাটি
চাকরির রাস্তায় |  তোমরা ধার্মিক, কৃষ্ণের জীব,
.               বিদ্রোহ করো না, অদৃষ্ট মানো,
পরজন্মের পথ পাও গলিতেই ; আহা গদগদ মাদুলি
.                তাগা,  মূর্তি,  বুকে টানো ;
গুরুর দর্শন, কর্তার বাক্য, দলীয় ভক্তির অদ্ভুত দৈবে
মরলে যাও   স্বর্গে ----জীবনকে বানাও নরক—
.                বিশুদ্ধ আর্যামি সইবে
বিদেশীর শাসন ; যতক্ষণ আছে জাত, অধিকারী-তত্ত্ব
.                ম্লেচ্ছকে ঘৃণা
ভয় কী দেশের ? বাহিরের পরাজয় হবেই তো,
.                 ( ভিতরে জীবন্মুক্ত ) কলিযুগ কিনা |

তাল তাল সোনা, উত্তম উত্তর ; ছুঁড়ে তো মারা যায় না ?
গলিতে গলিতে মেশাই রোদ্দুরে, দাঁড়ের ময়নাকে দিই বায়না
গান শোনায় বনের ;  চোখে আছে, আমার চালসের চোখেও,
.               গাঁয়ে গঙ্গার উপর
শুভ্র ধাপ, তেঁতুল গাছের ঝিল্ মিল্ ,
.                প্রাণের ছাঁদ মেলাই রূপোর   

চন্দ্রহারে, দোলাই কানের দুলে, আমার উত্তর মণিতে বাঁধি ;
জ্বেলে দিতে পারিনে গলিকে ( এবং তোমাদের ),
.           নই নৈতিক পল্টন, সভার বক্তা ইত্যাদি |
শুধু জানি আগুন, আগুনের কাজ, সৃষ্টির আগুন লাগলে প্রাণে
তীব্র হানে বেদনা জাগবার, আর্টের আগুন, মরীয়াকে টানে |
গর্বিত আধবুড়োর উদ্ধত এই গয়না |
ভিড়ে কাঁচ ভেঙো না ; ---বুলি, বুলি, রাম রাম, বলো ময়না
বলো ফার্সি, আরবি,  ধার্মিক গজল---ফিরে গলির গর্তে
সোনার মার নাও সঙ্গে ---পার তো কিছু কিনো----থাক,
.              চাইনে খদ্দের ধরতে ||

.                   ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
বড়বাবুর কাছে নিবেদন        
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


তালিকা প্রস্তুত
কী কী কেড়ে নিতে পারবে না---
হই না নির্বাসিত কেরানি |
বাস্তুভিটে পৃথিবীটার সাধারণ অস্তিত্ব |
যার এক খণ্ড এই ক্ষুদ্র চাকরের আমিত্ব |
যতদিন বাঁচি, ভোরের আকাশে চোখঘ জাগানো,
হাওয়া উঠলে হাওয়া  মুখে লাগানো |
কুয়োর ঠাণ্ডা জল, গানের কান , বইয়ের দৃষ্টি
গ্রীষ্মের দুপুরে বৃষ্টি |
আপন জনকে ভালোবাসা,
বাংলার স্মৃতিদীর্ণ বাড়ি-ফেরার আশা |

তাড়াও সংসার, রাখলাম
বুকে ঢাকলাম
জন্ম-জন্মান্তরের তৃপ্তি যার যোগ প্রাচীন গাছের ছায়ায়
তুলসী-মন্ডপে , নদীর পোড়ে দেউলে, আপন ভাষার কন্ঠের মায়ার |
থার্ডক্লাশের ট্রেনে যেতে জানলায় চাওয়া,
ধানের মাড়াই, কলা গাছ, কুকুর, খিড়কি-পথ ঘাসে ছাওয়া |
মেঘ করেছে, দু-পাশে ডোবা, সবুজ পানার ডোবা,
সুন্দরফুল কচুরিপানার শঙ্কিত শোভা,
গঙ্গার ভরা জল ছোটো নদী গাঁয়ের নিমছায়াতীর ---
.                হায়, এও তো ফেরা-ট্রেনের কথা |

শত শতাব্দীর
তরু বনশ্রী
নির্জন মনশ্রী

.                   তোমায় শোনাই, উপস্থিত ফর্দে আরো আছে---
.                   দূর-সংসারে এলো কাছে
.                   বাঁচবার সার্থকতা ||

.                   ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
রাত্রিযাপন
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


বুকে প্রাণটা এমনিই রইলো, জানো ভাই,
ঘরে দাঁড়িয়ে মন বললে শুধু যাই
.                          ---যাই |
.      প্রকাণ্ড তামার চাঁদ রাত্রে
.      গ’লে হ’লো সোনা |  সোনার পাত্রে
.          পরে আভায় ছড়ালো অন্তর্লীন রেদ্দুর |
.      নৌকো দূরে গেলো বেয়ে সেই অভ্রের সমুদ্দুর |
.        সেদিন রাত্রে যখন আমার কুমূ বোনকে হারাই

আর, অজ্ঞান মুহূর্তগুলো, তারায়
.        মিলিয়ে রইলো স্বচ্ছধারায় |
.           জেগে-থাকা চোখে,
মাটিগাছমাঠের জমা-ঠাণ্ডা দৃশ্য পলকে-পলকে
.             বদলালো একটু বর্ণ ; তবু বর্ণহীন
.   একটু আলো ছিলো, ক্ষীণ, খুব ক্ষীণ |
আলোর সূক্ষ্ম প্রাণ অণুতে-অণুতে কী হচ্ছিলো |  কালোর মধ্যে
.     দিয়ে উদয়
.                        অন্য কিছু নয় |

তিরোহিত চন্দ্রবর্ণ আকাশে উষা
.           এলো আবার দিন, প্রাচীন সোনার বেশভূষা |
.           ঘরের দেয়ালগুলো ফুটলো রাঙা আঁচড়ে |
.           তারপর ?  মেঘের স্তরে-স্তরে
.           রোজকার বিষণ্ণ সুন্দর সকাল এলো ভ’রে |

তখন দরজায় দেখলেম দাঁড়িয়ে ---হঠাৎ---আছি সবাই,
.                                      জানো ভাই,
.                               ---- আর সবাই |
বুকের হাড়ে শক্ত কান্না নেই, কেবল, কী জানি
.                হয়তো এমনিই মনে-করা,
যাই, একবার যাই |  রইলাম তবু |   শক্ত ধরা ||

.                   ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
বৈদান্তিক
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


প্রকাণ্ড বন প্রকাণ্ড গাছ,--
বেরিয়ে এলেই নেই |
ভিতরে কত লক্ষ কথা, পাতা পাতায়, শাখা শাখায়
সবুজ অন্ধকার ;
জোনাকি কীট, পাখি পালক, পেঁচার চোখ, বটের ঝুরি,
ভিতরে কত আরো গভীরে জন্তু চলে, হলদে পথ,
তীব্র ঝরে জ্যোত্স্না-হিম বুক-চিরিয়ে,
কী প্রকাণ্ড মেঘের ঝড় বৃদ্ধ সেই আরণ্যক---
বেরিয়ে এলেই নেই |
ভিতরে কত মিষ্টি ফল, তীক্ষ্ণ ফুলের তীর,
ইচ্ছে ভরা বুনো আঙুর, জামের শাঁস,
ভিতরে কত দ্রুতের ভয়, কখনো বেলা সময়হীন—
বেরিয়ে এলেই নেই |
চক্রবাল চোখে রেখেই বাহিরে চাই,
গাঁয়ের ধোঁয়া একটু রেখা সন্ধ্যা হ’লে,
অনাসক্ত নদীর জলে সিক্ত মাটি
বিনা চাষের বুনো ধানের গুচ্ছে রয়,
এখানে সবই বিরলতার |
.      বুকের মধ্যে বাড়ি যাবার
.           খুঁজে পাবার এখনো কোনো চিহ্ন নেই ;
.                        দৃষ্টি আছে ||

.                      ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
১৬০৪ য়ুনিভার্সিটি ড্রাইভ
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


পরে-পরে নয়, একসঙ্গে |     ঝিরিঝিরি
.      চুলে ছোঁয় বন্য হাওয়া, কানে ঝাউগাছ শিরিশিরি,
.            কফির সুরভি, টোস্টে মাখনের স্বাদ মধু-মেশা,
.          ভোর-সাড়ে-সাতটার গোলাপি আলোর ঠাণ্ডা নেশা—
.                 মুহূর্তে এই মূর্তিবহ
.                 শরীরী চৈতন্যে বাঁধা আমার সংগ্রহ
.                 ও-ডিকোলনের গন্ধমাখা,
.                 বন্ধু, তোমার আজ নীলান্তে পাঠাই দূর পাখা |
.                ঝগ্ ঝগ্ ট্রেন শব্দ, স্টেশনের স্তব্ধ রোদ,
.                কাল রাত্রে স্বপ্নে-দেখা ডোবা বোধ,
.                            পৌঁছনো তবুও ফিরে-চাওয়া ;
ক্লাসে পড়ানোর ঘন্টা ঐ বাজে, ব্যস্ত হাওয়া |
.       লরেন্সে আমার বাড়ি, সোনার গমের কিনারায়
.                বিদায়-সিঁড়িতে তার এ-লগ্ন দাঁড়ায়.---
.                      ( ঠিকানা এখনো সেই, যোলো-শূন্য-চার )
.                          কলোনের স্মৃতি-গাঁথা নাও উপহার ||

.                             ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
এপারে
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


দেখলাম দু-চক্ষু ভ’রে, হে প্রভু ঈশ্বরমহাশয়
চৈতন্যে প্রসণ্ণ সূর্য্য,
.                    খচিত রাত্রির দেয়া গান
রেডিয়ো নক্ষত্রে বাজলো | এই দেহে ঝিমঝিম দূরে
শিরায় জড়ানো নহবৎ |
.                        ইন্দ্রিয়ের চূর্ণ সুরে
জেগেছে সংসারপ্রান্তে আদিম গায়ত্রীমন্ত্রময়
ভূর্ভু বঃ স্বঃ |
.                হোক না স্বেচ্ছায় বন্দী প্রাণ
হঠাৎ মুক্তি সে   সে পেলো |
.                                  ( কিছু বন্দীদশা ইচ্ছাতীত,
সে-তর্কে নামবো না আজ | )
.                                মহাশয়, পার্থিবের দেশে
স্বীকার্য, অনেক হ’লো :  সভ্যতা যতই পাপ কাজে
যুদ্ধে হানে জ্যোতির্বুদ্ধি,  রক্তবহা যন্ত্রণা সমাজে
গঙ্গোত্রীর ধারা নেমে বার-বার অলক্ষ্য রঙ্গিত
ধুয়ে মুছে দিয়ে গেলো মুহূর্তে অক্ষয় লোকালয়
কোটি মৃত্যু কান্না-ছোঁয়া সমুদ্রের নীল নিরুদ্দেশে |
.        শুধু আজ্ঞা দাও, যেন বুঝি
.                                আয়ুকাব্য মহাময়
.        অধ্যায়ে-অধ্যায়ে খোলা অভাব্যের এই পরিচয়
.        গ্রন্থিবাঁধা তারি মধ্যে এসে আমি জন্মমৃত্যুপারে
.        আজো কোন খুঁজি বাসা,
.                                এদিকে পঞ্চাশ হ’লো, দিন
.        এ-যাত্রা সন্ধ্যায় ক্রমে সন্ধিক্ষণে হ’য়ে আসে ক্ষীণ
.        পালা-বদলের বেলা,
.                                মেলাবে কি যোগ অন্ধকারে
.        সৌরধুলো-তৈরি দেহ রাখি যবে, ঘরে-ফেরা বাঁশি—
.        বহু পথ এসেছি তো বস্টনে বাঙালি দূরবাসী ||

.                             ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ইতিহাস        
কবি অমিয় চক্রবর্তী
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা” কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |


নেবুরঙা শার্টপরা একটি মানুষ এসেছিলো
ঢালু মাটি মস্ত গাছ পেরিয়ে, নদীর ধার দিয়ে
ঘোড়া চ’ড়ে ;   
.              কী  মনে লাগলো তার, ফিরে গিয়ে
নির্জন চড়াইয়ে এলো আরো দু-জনার সঙ্গে ব’সে
গাছতলে খানিকক্ষণ তিনজন ( স্ত্রী আর গাঁয়ের খুড়ো হবে )
থলি খুলে রুটি সব্ জি খেলো, ঘোড়া দাঁড়ালো গা ঘ’ষে
তারপরে গলা তুলে ডেকে উঠলো চিঁহি-চিঁহি রবে |
ঠুকঠাক দিনে-দিনে কাঠ কাটা, বাড়ি তোলা, ভালোবেসেছিলো

ওরা এই জায়গা |  আজ সেখানে একটি খুদে পাড়া
ড্রাগ-স্টোর, বিয়র-হল ; মস্ত গাছ আজও খাড়া,
খুড়োর হদিশ নেই, শাদা অক্ষরে লেখা সিমেট্রিতে
একটা পাথরে জল-মোছা কার নাম, সেই স্ত্রীর,--
তারই সঙ্গে পুরুষের, বাইশ বছর পরে মারা যায় ;
এক ছেলে নেভাডায়, অন্য ক্যারিবিয়ানের তীর
কোন-এক দ্বীপের শহরে থাকে |  খটখট শব্দ ওটা কাঠবেড়ালির |

                     ২
পোল্ ( ইতালিয়ানের সংখ্যা পাঁচ ) ভাঙা ইংরেজিতে
তর্ক করে একত্র তিনজনে, ওরাই এখানে বেশি সংখ্যায় ;
উক্রেনের দুর্বৎসরে যুদ্ধের আগেই সিধে বল্ টিমোরে
তারপরে ঘুরে ঘুরে এলো সাতজন |  চিনি-দানি থেকে
দু-চামচে চিনি নিয়ে কফি খায় রোগা যুবা, রেস্তরাঁয়
দেয়াল-কাগজ হলদে, পেরেকের বহু দাগ, ডেকে
ওঠে সিমেন্ট ( না সোডিয়াম ) কারখানা সাইরেন জোরে
কাঁপিয়ে উপত্যকা ---গ্রামের প্রধান নির্ভর ঐ ফ্যাক্টরি ; ঘোরে
ঠাণ্ডা দুপুরে চিল,
.               খড় উঠে ঠেকে রকে, উঁচু জুতো প’রে
মেরুন-রঙের জামা ঐ যে মেয়েটি যায়, মুখে সুখ নেই,
কী করবে, জর্জিয়া থেকে বোন সে লিখেছে চ’লে যাবে
স্বামী-ছেলে ঘরে ফেলে---স্বামী একটু বেশি মদ খায়---পাবে
হলিউডে কোন চাকরি তা-ই মনে ক’রে ;  ভাবে যেই
এর চোখে জল আসে |
.                 দুটো মস্ত কুকুরের ঘেউঘেউ-ডাকা গেটে
জেল-এর মতন বাড়ি, থাকে কারখানা-প্রভু স্মিথ, ,স্টেটে
ডলারকুবের শ্রেষ্ঠ, কারখানা নানাখানে, কথা বলতে অন্য দৃষ্টি
.        চোখে ঘোরে,
টাক-মাখা, আপিশের যম,  গ্রামের কিছুতে নেই, শিকাগোতে গাড়ি
নিজেই হাঁকিয়ে যায়, কিছুদিন থেকে ঘন-ঘন ট্রাকে ভ’রে
কী-সব জিনিস সব পাঠায় কোথায় | সন্ধ্যার ধুলোয় তাড়াতাড়ি
আজ বেলা নামলো রাঙা ব্যাপ্ত লাল,
.                                “আনা,
ঘড়িতে দিয়োছো দম ?”  ঘড়িটা আসলে মৃত, ভুলেছে সময়, নানা
ধুকপুক পেরিয়ে আজকে, মধ্যে-মধ্যে তবু চলে | খাটে শুয়ে
.        আনার দিদিমা
বারো বছর ঐ গির্জের পাশের ঘরে, আনার বয়স দশ, নেই সীমা
উত্সাহ খুশির তার, মোটা নীল ফিতে চুল বাঁধা, লাল গাল,
বাপের দোকানে সারাদিন কাজ করে, ভাই তার প্রত্যহ সকাল
সাতটায় সাইকেল চ’ড়ে চ’লে যায়, পাঁচ মাইল দূরে বালি-পথে
ফিলিং স্টেশনে, খবর এনেছে কাল নতুন প্রকাণ্ড বাঁধ হবে
এই দিকে, সিসি-আইসিস দুটো নদী বেঁধে |      দূরে কোন
.       জায়গায় তবে
ইট-বাঁধা বহু গ্রাম একত্র শহরে গেঁথে, কোনোমতে
থাকবে বহুলোক |   এই গ্রাম
তাহ’লে
উঠে যাবে ||

.           ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
মারিকা
কবি অমিয় চক্রবর্তী
যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার বৈশাখ ১৩৫৩ (মে ১৯৪৬) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।


স্বপ্নপসরা দুই হাতে নিয়ে
.        চলেছে কে সংসারে---
তাকে আমি একা গহন নদীর তটে
.        দেখেছি সেদিন রাতে।

.        ম্লান অরণ্যে ভরা চাঁদ আলো ঢালে,
ডালে ডালে পাতা চমকিত নেয় জ্যোত্স্নাধারা,
.        বাব্ লা গন্ধে মুচ-কুন্দের মুগ্ধ হাওয়ায়
.                কে সে উজ্জ্বলা---
.                আঁচল উড়িয়ে স্বর্গমাটিতে নামে।
দেখি সেই পসারিণী॥

সেই পসারিণী বেলাবনে গিয়ে
.        সুধার পাত্র দিয়েছিল তাঁর হাতে,
মহাজীবনের অন্ন সহজে বহে’
.        ঘরে ঘরে সে যে কল্যাণীব্রত আনে।
তাপস-চিত্তে করুণার জল দিয়ে
.        মুক্তির পথ সিঞ্চিত ক’রে যায় ;
.        প্রতিদিন তার সেবার আঁচলে ভ’রে
.        মায়া দিয়ে ছোঁয় সংসার বেদনাকে---
.                কর্মবহ্নি জ্বালে।
.                এই সেই পসারিণী।
চিনি আমি তাকে ক্ষণে ক্ষণে যবে
.                        সহরের পথে চলি॥

.           ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ভারতবর্ষ
বোলপুর শান্তিনিকেতনের অধ্যাপিকা মিস্ শ্লোমিথ্ ফ্লাউমের মূল জার্মান কবিতা থেকে
কবি অমিয় চক্রবর্তীর অনুবাদ। মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত ভারতী পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৩০ (অগাস্ট ১৯২৩) সংখ্যা থেকে নেওয়া।


মায়ের মত নিলে আমায় কোলে।
.        হে ভারতী, হে সুন্দরী,
.                কি রূপ তোমার মরি মরি
মাথায় তোমার লক্ষ মাণিক দোলে!
.        অঙ্গ তোমার সোনার বরণ
.                ঘিরে যে রয় সবুজ বসন
চরণতলে নীল সাগরের খেলা---
.        গাছে ভরা ঘন বনে
.                মাঠে ঘাটে গিরি-কোণে
কত পাখী কত পশুর মেলা!
.        কোথাও দেখি কেবল শুধু
.                ধূসর বালু করে ধূ-ধূ,
কোখাও ধূলা রাঙা রেখাই আঁকে ;
.        আঁচল তব চপল হাওয়ায়
.                স্বপন বোনে আলো-ছায়ায়
চমক কোথাও লাগায় পথের বাঁকে!
.        দিনের আলোয় নয়ন মম
.                চেয়ে থাকে মুগ্ধসম
কিছুতে সে তৃপ্তি নাহি মানে,---
.        দৃত্প তোমার বাহুর ডোরে
.                বাঁধ আমায় নিবিড় করে’
গোপন কথা কতই যে কও কাণে!
.        তার পরে ফের দিনের শেষে
.                সন্ধ্যা ধীরে নামলে এসে,
ঘোমটা টানি ঘন-কুয়াশাতে,
.        দাঁড়াও যখন উদাসিনী
.                মনে হয় যে নাহি চিনি
অচিন্ যেন হও গো নিমেষ-পাতে!
.        আমার সনে লীলা তব
.                চলে সে যে নিত্য নব,
রাত্রে তোমার রয়না রূপের সীমা!
.        ঘন নীলে শূন্য গগন
.                নীরবতায় হয় নিমগন
জাগায় সে কোন্ অনন্ত মহিমা!
.        মায়ের স্নেহে শান্তিবিলীন
.                যেমন আমার কাট্ ত  গো দিন
আপন দেশে সহজ সুখের দোলে---
.        তেমনি সুখে রাত্রি হলে
.                ঘুমোই তোমার তারার তলে।
মায়ের মত নিলে আমায় কোলে॥

.           ************************     
.                                                                              
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর