কবি অনির্বাণ রায়ের কবিতা
আমার শহর
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


আমার শহর ভিজে চলেছে
সদ্য কিশোরীর উচ্ছাসে
সন্ধ্যার ঘরমুখী কেরানিমুখের বিরক্তিতে
স্কুলপেরোনো সদ্য় গোঁফ ওঠা শিহরনে
অথবা সন্ধ্যাশাঁখে ফুঁ দেওয়া ঘোমটার উতকন্ঠায়
আমার শহর একা একা ভিজেই চলে |
আমি সঙ্গ দেবো বলে একলাটি হেঁটে যাই
চেনা চেনা পথ ফুটপাথ ধরে |
আবছায়ায় স্মৃতি এগিয়ে আসে নাম ধরে ধরে
প্রিটোরিয়া--গোর্কি টেরেস--পিকাসো বীথি---
একে একে হারানো বিকেলের রং ধুয়ে যায়
আমার শহর ভেজানো মেঘমল্লারে |
পিকাসো-সৃষ্টির মতই তারা টুকরো টুকরো
দালির বুনোটে রুমাল হয়ে নেতিয়ে পড়া সময় কাঁটা |
স্মৃতিরা শহরে বুড়োটে হয়ে চলে
আমিও অল্প ছাঁটে গা ভিজিয়ে শহরের সাথে সাথে চলি |
বিকেলের রঙগুলো ধুয়ে যায় ;
চেনা চেনা শূন্য ফুটপাথ ঘেঁষে
পাতাগুলোয় নোনতা জল জমা হয় |
আমার শহর একলাই আজ বড় কাঁদছে |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
রেসিপি
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


একটা জমাট অন্ধকারের পাত্র নিন,
দেখবেন, নন-স্টিক হলে ভালো হয়
কোনো আলো যেন না লেগে যায়।
এবার স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে
বেছে নিন সবচেয়ে দাগ রাখা
সোনালী লাল আবিরে
টুকটুকে বিকেলটাকে।
সাথে নেবেন দুটো, নানা তিনটে
চেনা চেনা ফুটপাথের গন্ধ।
এবার এদের ফালা ফালা করে কেটে
তাতে ছড়িয়ে দিন
চেনা ঠোঁটে লেগে থাকা
একচিলতে হাসির রং।
এদের সাথে মিশিয়ে ফেলুন
পাঁচ কাপ বিচ্ছেদ,
এক কাপ অভিমান
আর অচেনা হওয়া মুখের একটু ছায়া।
ভালো করে সব মিশিয়ে
মনখারাপের হালকা আঁচে পুড়তে দিন
সাথে আন্দাজমত কফির বিষ।
ব্যস! রেডি!
কি?
একটা প্যাস্টেলের কবিতা
একটা জলরঙা গান
একটা চারকোলের ছন্দ
নয়তো
অনেক অনেক অনেকখানি
বিষাদের মজা!

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অকিঞ্চিৎকর
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


পরপর একরাশ পদ্য রাখা,
কিছু হতাশার
কিছু প্রেমের
কোনোটার গায়ে লেগেছে
রাজনীতির আলতো আবির।
তবুও পছন্দ না
কোনোকিছুই আজকাল
মনে রাখেনা
দীর্ঘমেয়াদী কোনো দাগ।
কলমের পিঠে ভরে শুধুই
দাঁতের আঁচড়।
টেনে নিই সাদা পাতা
মনে মনে স্থির ডাক দিই
একে একে শব্দদের,
ঠিক তখনই দুই শরীর
কাছে ঘেঁষে
আমার কবিতার মতই
আরও এক অকিঞ্চিৎ
জন্মের উদ্দেশে।

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
একটু অন্যরকম
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


আমার একটু
অন্যরকম জীবন পেতে ইচ্ছে করে
একটু অন্যরকমের জীবন।
না! না! বলব না তুমি ছাড়া হোক সেই জীবন!
তুমি থাকবে! আমি থাকব! সুখ থাকবে!
সকাল গুলো রোজ আসবে
একটু অন্য কোনো চায়ের গন্ধ নিয়ে!
অন্যরকম রোদ এসে পড়বে
বিছানায়
তোমার আমার ঠিক মধ্যিখানে!
দুপুরবেলার একলা পাখিটার
হয়তো জুটে যাবে
সাথে ডাকবার কেউ!
একটু অন্যরকমের বিকেলবেলা
মেঘ করবে...
মন খারাপ করা বিকেল?
না! না! বৃটিভেজা
রবি ঠাকুর বিকেল নামবে!
সন্ধ্যারা একে একে উঠান জুড়ে বসবে!
তুমি ঠিক তখন খালি গলায়
গেয়ে উঠবে হংসধ্বনি!
আমার যন্ত্রে তাল কাটবে বার বার!
পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্না
দূরের আবছা গাছ গুলো স্নান করবে!
আমার একটা অন্যরকমের
রাত নামবে।
তোমার একটা অন্যরকমের
রাত নামবে।
আমারর একটা
অন্যরকম জীবনের বড় সাধ জাগে!

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কলকাতা
কবি অনির্বাণ রায়
বাংলা ব্যান্ড ‘নির্বাক’-এর জন্য লেখা গান।


শ্যামবাজারের এক সিগারেট গলি
অন্ধকারের ভিড়ে হাত ছুঁয়ে যায় হাতে
কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের গন্ধ মেখে
সন্ধ্যে কাটুক ছলাৎ ছলাৎ ঘাটে  

কোলাহলময় আমার কলকাতায়
প্রথম চুমু, প্রথম মিছিলে হাঁটা
নন্দন আকাডেমি ঘেঁষে  
প্রথমবার সুমন-নচিকেতা  

ট্রামলাইন মাঝে মৃত কবি শুয়ে থাকা
অচেনা স্মৃতি park street কবরে
লেকের ধারের নরম বিকেল জুড়ে
আরেকটা রাত নেমে আসে শহরে  

রাতের আলোতে শহর মোহময়ী
নেশাতুর চোখ, কখনও সস্তা সুখ
কখনও রঙিন, কখনও সাদাকালো
এক শহরের অনেক অনেক মুখ  

Shopping mall, multiplex আজ
গিলে চলেছে আমার শহরটাকে
এই শহরের মধ্যে শহরটাকে
বিজ্ঞাপন মুখটা ঢেকে রাখে

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অতঃপর
কবি অনির্বাণ রায়


অতঃপর ছেলেটিই প্রেমে পড়ল
রুমাল না ভেজানো ওই মেয়েটির;
নদীর মত স্বাপ্নিক সেই মেয়ে,
ধমনীতে উচ্ছল জীবনের শোণিত
তীরধরে ছুট দেয় সেই বল্গাহীনার তালে তাল ।

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
রঁদেভু
কবি অনির্বাণ রায়


“দেখা হোক, অনেক কথা আছে”
“দেখা হোক, দেখা হলে বলব”
তারপর অনেকগুলো টিক-টিক-টিক-
সময় আর সম্পর্ক ।
কথাগুলো যেন কবে, কোন রাস্তায়
হাতটা ছুঁয়ে, না, না ছুঁয়েই
বলার ছিল--- আর স্মরনে নেই তা /
আজও অন্য অন্য মুখ
ওই চেনা চেনা ফুটপাথ ধরে
আঙুলে আঙুল ছুঁয়েই হেঁটে যাবে।
না বলা গল্পেরা
না বলা শব্দেরা চালান হবে,
কোনো এক ঠোঁট হতে অন্য ঠোঁটে।
মনখারাপের সন্ধ্যেবেলা
রেডিওধারে সুমন গেয়ে উঠবেন...
“ভালোবাসার নিষিদ্ধ ইস্তাহার...”

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
ঈগল
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


আমার প্রথম চুম্বন
হোক কোনো এক ঈগল পাখির ঠোঁটে।
আর তীক্ষ্ণ ঠোঁট
ক্ষত বিক্ষত করুক
আমার শরীর।
তার অপরিমিত কামনায়
রক্তাক্ত হোক আমার চুম্বন।
ঈগলের চোখে থাকুক
মাংসের খোঁজ।
রক্ত-মাংস-কামনা
একাকার হোক
ওই ঈগল পাখির ঠোঁটে।
তার শ্যেনদৃষ্টি
হত্যা করুক আমার প্রেমকে।
কাব্যিকতায় নয়,
প্রেমের ব্যারিকেড গড়ে উঠুক
ঈগলের বুকে।
দূরে
বহুদূরের আকাশে
ডানা মেলেছে
আমার ঈগল।
হে ঈগল
তুমি আমার প্রেমিকা হও।
হে ঈগল
এস,
তোমার ডানা ঘেঁষেই
বসন্ত নামুক কৈশোরের তৃণশয্যায়।
হে ঈগল,
তোমার, আমার এই মাদকায়
জন্ম নিক নতুন প্রমিথিউস।
যে আগুনে ছাড়খার করুক বাস্তবকে ।
হে ঈগল,
এসো
আমরা ঘনিষ্ট হই।
ধ্বংস করি চরাচর।
হে ঈগল,
এসো,
আমরা চুম্বন করি।

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
খাঁচা
কবি অনির্বাণ রায়
এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত হলো।


মানুষটা ঝুলছে।
বাঁশে বাঁধা মানুষটা ঝুলছে।
শিকারী বিড়াল যেমন মুখে ধরে ইদুর
তেমনি কয়েকটা উর্দি
মানুষ মেরেছে
ঝুলিয়েওছে তাকে।
মানুষটার অনেক দোষ।
সে উড়তে গিয়েছিল।
খাঁচার তারগুলো কেটে
সে উড়তে চেয়েছিল।
মানুষ, তবু...
“আসলেতে পাখি সে...”

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
উৎসব এবং এক কবিবিদায়
কবি অনির্বাণ রায়
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চলে যাওয়া নিয়ে লেথা এই কবিতাটি এখানেই প্রথম প্রকাশিত
হলো।


তখন অনেক রাত।
অনেক রাত ভীড় জমিয়েছে
কলকাতার মাঠে-ময়দানে-ফুটপাথে-
টালাব্রিজ থেকে গড়িয়াহাটে...
উৎসবের রাত—আলোর রাত-
খুশির-প্রেমের-ঢাকের-
আরও অনেক লাল-নীল-সবুজের রাত।
এরকম অনেক অনেক রাত সেদিন ভীড় করেছিল
কলকাতার বুকে,
ব্যস্ত ছিল কলকাতার দৈনিক মুখগুলো।
হঠাৎ
একটা কবিতা হঠাৎ চিৎকার করল।
কবিতার খাতা অথবা কবির মন হতে
শয়ে শয়ে কবিতারা চিৎকার করেছিল।
‘নীরা’ কি শুনেছিলে সেই হাহাকার?
আজ উৎসবের সকালে
মানুষ কাঁদছে
নীরা কাঁদছে... ।

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*