কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য-এর গান ও কবিতা
*
নীল নব-জলদ রুচি, রুচি রুচির সুন্দর
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য রচিত পদাবলী
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” মাসিক পত্রিকার
আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত।


॥ জয়জয়ন্তী, ঝাপতাল॥

নীল নব জলদ রুচি,                রুচি রুচির সুন্দর,
পীত-ধটি কটিতটে সু-সাজে।
মুকুট ’পরি খচিত             শিখি-পুচ্ছে নব-ম্ললিকা,
বক্ষে বনমালা বিরাজে॥
অধর ’পর বেণু তঁহি                মিলিত মুখ মোদনে,
মধু মধু মধুর মোহ-তানে।
শুনই পশু পাখিকুল,                শাখিকুল পুলকিত,
তপন-তনয়া বহে উজানে॥
শ্রবণ-যুগে মণি-মকর                গণ্ডে করু ঝলমল,
মেহ’পর(১) বিজরি যনু হাসে।
সহজ দৃক্-অঞ্চল(২)                জিনিয়া সরসীরুহ,---
তাহে কত কুসুম-শর ভাসে॥
কেলি-কদমকি তলে                সুললিত ত্রিভঙ্গিয়া,
নব-অরুণ চরণ-অরবিন্দ।
গোকুল-কুল-রমণীক                মনসিজ সু-মূর্ত্তিময়,
পেখব কি ললিত(৩) মতিমন্দ॥

.             ***************             

(১) মেহ’পর = মেঘের উপর
(২) দৃক্-অঞ্চল = নয়নপ্রদেশ
(৩) ললিত = কবির ভণিতা

.      ****************       
.                                                                                                
সূচীতে . . .    
  

মিলনসাগর
*
জয় জগত-বন্দিনী
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত।


॥ জয়জয়ন্তী, ঝাপতাল॥

জয় জগত-বন্দিনী
হরি-হৃদয়-রঞ্জিনী,
ব্রজ-রমণী মুকুট-মণি---
.                রাধিকে শ্রীরাধিকে।

ঘন-জঘন সোহিনী,
গজহুবর গামিনী,
চরণ-কুচি তরুণ
.                অরুণাধিকে শ্রীরাধিকে॥

মৃদু মধুর হাসিনী,
রসময়-সুভাসিণী,
বদন কত ইন্দু শত-
.                নিন্দিতে শ্রীরাধিকে।

শ্যাম-মনোমোহিনী,
কান্তি জিনি দামিনী,
রসিক বজ্রনাগর---
.                বিমোহিতে শ্রীরাধিকে॥

সরস-রস-রঙ্গিনী,
নিধুবন বিলাসিনী,
শ্যাম সুখ-সাধ সব
.                সাধিকে শ্রীরাধিকে।

চটুলতর চাহনী,
মদন-মূরছায়নী,
ঘন-বরণ-হৃদয়মণি
.                মালিকে শ্রীরাধিকে॥

শ্যাম-পট-রিঁধনে
শ্যাম-চিত-বন্ধনে,
শ্যাম-ঘন-অঞ্জন হি
.                লোচনে শ্রীরাধিকে।

জয় কৃষ্ণ-ভামিনী,
জয় কৃষ্ণ সোহিনী
রটহুঁ বীরচন্দ্র নিতি
.                আননে শ্রীরাধিকে॥

.   
.                                                                                
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পূণ্যময় আজি ঋতু সুরভি-শুভ খনিয়া
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। শ্রীশ্রী মহাপ্রভুর
জন্মতিথির উত্সব উপলক্ষে রচিত এই গানটি আগরতলায় প্রচলিত হয়েছিল।


॥ কাফি, ঝাপতাল॥

পুণ্যময় আজি ঋতু সুরভি-শুভ খনিয়া।
পুণ্যময় আজি কলি নিখিল ধনিধনিয়া॥(১)
পুণ্যময় রাতি নব প্রেম-মণি খনিয়া।
পুণ্যময় রাহুমুখ-কলিত-নিশি-মণিয়া॥(২)
পুণ্যময় কিরতন পতিতজন-তরণীয়া।
পুণ্যময় হরি হরি ধ্বনি কলুষ হরণীয়া॥
পুণ্যময় শান্তিপুর ভকত-জন সাধিয়া।
পুণ্যময় পুণ্যময় পুণ্যময় নদীয়া॥
গৌরহরি অবতরণ কনক-বিধু-কাঁতিয়া।
বীরচন্দ্র তচ্ছু চরণ ভজহু দিন রাতিয়া॥

.                 

(১) ধনিধনিয়া = ধন্য ধন্য
(২) মহাপ্রভুর জন্মকালে চন্দ্রগ্রহণ ছিল, তা বলা হয়েছে।

.          
.                                                                           
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মন্দ মন্দ বহত পবন
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। খেয়াল ও টপ্পার
নিদর্শন এই বসন্ত বন্দনা।


॥ বসন্ত, একতালা॥

মন্দ মন্দ বহত পবন,
বিরহিণী জন হৃদয় দহন,
পিয়াকি কারণ ঝুরত নয়নে,
.        মাহেরি ফাগুন আয়েরি।
ফুট রহি ফুল মাধবী মালতী,
গেন্ধি গোলাপ উজর শেঁওতি,
আওর বকুল চম্পক যূথি,
.        আলিয়গণ গুঞ্জরী॥
মত্ত ময়ূর নাচত শোভন
হেরতরজ যুবতিগণ
কোহেলা কোহেলি মধুকর গান
.        দাস বীরচন্দ্র গায়েরি॥

.      ***********************
.                                                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রসে ডদমগ ধনি আধ আধ হেরি
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। “হোরি”
কাব্যগ্রন্থের গান, যা হোলি উত্সবে গাওয়া হয়ে থাকে।


রসে ডগমগ ধনী আধ আধ হোরি,
আঁচল সঞে ফাগু লেই কুঁয়রি॥
হাসি হাসি রসবতী মদন তরঙ্গে,
দেয়ল আবির রসময় অঙ্গে॥
চতুর নাহ হৃদয়ে ধরু প্যারী,
মুচকি মুচকি হাসি হেরত গোরী॥
দেয়ল ফাগু নাহ লোচন যোড়,
মুদল ধনী দুহুঁ নয়ন চকোর॥
ইহ অবসরে কত চুম্বই কাণ,
বীরচন্দ্র রস দুহুঁ রস গান॥
.         
.                                                                                  
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিনোদ হিল্লোলে বিনোদ নাগর
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” মাসিক পত্রিকার
আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। “ঝুলন” কাব্যগ্রন্থের গান, যা হোলি উত্সবে গাওয়া
হয়ে থাকে।


বিনোদ হিল্লোলে                বিনোদ নাগর,
বিনোদিনী সহ দোলে,
চারি দিকে মিলি                বিনোদিনী দল,
নাচয়ে বিনোদ তালে॥
বিনোদ বিনোদ                        বাজিছে নূপুর,
ঝুনু রুণু রুণু নাদে,
মুরজ মুলী                        বাণা মুরচঙ্গ,
বাইছে প্রমোদ মদে॥
তাকৃতি তাকৃতি                        কৃতি থৈ থৈ,
মধুর মুরজ বোলে,
মন্থর গতি                         পদকি চাল,
সঘন মঞ্জরী রোলে॥
গাইছে কিশোরী,                        মুরলী সহ
মিশায়ে মধুর স্বর,
মুরলী থুইয়া                        চিবুক ধরিয়া
চুম্বয়ে নাগরবর॥
কমলে মধুপ                        যৈছন শোভত,
দুহুঁ মুখ শোভা তায়,
পরাঁ ভরিয়া                        দাস বীরচন্দ্র,
ও রস মাধুরী গায়॥

.          ****************           
.                                                                                             
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ প্রার্থনা
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। “ঝুলন” কাব্যগ্রন্থের
শেষ গান।


ওহে রাধা শ্যাম, ---
আজি কি সুখের দিন                    ঝুলন মঙ্গল হে,
.                 ভাব মাখা সরস চাহনি,
যুগল অধরে হাসি,                শ্রীঅঙ্গে পুলক নাথ,
.                মন সহ ঝুলন দোলনী॥
আগে এ সুখের দিনে                অভাগিয়া কত হে,
.                পূজিয়াছি ওই রাঙ্গা পায়,
দু’নয়নে সুখ-ধারা                বহিত হিল্লোলে নাথ,
.                প্রেম-ঢেউ খেলিত হিয়ায়॥
বিধাতা ব্যাধের মত                আসি চুপি চুপি হে,
.                সাতনালা বাড়ায়ে বাড়ায়ে,
দারুণ সন্ধান তার,                শূন্য সব দিক নাথ,
.                এবে একা আঁধারে দাঁড়ায়ে॥
বাসনা বাঁশরী তানে                বিধি নিরদয় হে---
.                পরাণ কুরঙ্গে ভুলাইল,
আনি বিষয়ের দেশে                পুন বেড়া-জালে নাথ
.                ঘেরি বাণ মরমে হানিল॥
পাঁজরে বিষের জ্বালা,                হিয়ায় অনল হে---
.                ঝলকে ঝলকে উঠে জ্বলে,
উঠিতে পড়িয়া যাই                পায়ে মোর বাঁধা নাথ,
.                বিষয়ের বিষম শিকলে॥
কাটি এ করম ডোর                বজরের বাঁধ হে---
.                বীরচন্দ্র দাসে রাখ পায়,
যে ক’দিন বাঁচি আর,                শ্রীবৃন্দা বিপিনে নাথ,
.                থাকি যেন যুগল সেবায়॥

.                        ****************           
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেম-মরিচিকা
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” মাসিক পত্রিকার
আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। স্ত্রী, মহারাণী ভানুমতী দেবীর মৃত্যুর পরে লেখা
“প্রেম-মরিচিকা” কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি অংশ বিশেষ।


সে মধু বাতাসে যেন উঠিছে বাজিয়া,
জীবনের নিদ্রিত বাঁশীটী ;
আজি ভালবাসা যেন সাথীহারা পাখী,
কাঁদিছে গাইছে একেলাটী!
র’য়ে র’য়ে এখনো কি উঠিস্ রে ডে’কে,
সাড়া দিবে কেবা আর আছে?
যা ছিল সকলি গেছে, এবে একা আমি,
কেন রে আসিস্ মোর কাছে?

####  

আলোক ডুবিয়া গেল দারুণ আঁধারে,
সে আঁধারে দেখিলাম,
প্রেমময়ী প্রতিমায়---
শ্বাসহীন স্তিমিত নয়ন ;
হুঁ হুঁ করি চারিধারে, ঘেরিল স-ধূমানল,
এ হৃদয় জ্বালিল শ্মশান!

####

শোভিল অটবী, শোভিল মাধবী,
কুসুম ভূষণ পরা ;
উঠিল মালতী ছাড়িয়া শয়ন,
কুয়াসার জলে পাখালি নয়ন,
অলি যে তায় কাজল ভরা!

.           ****************           
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সখি রে, উঠিছে পড়িছে আজি কত
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। মহারাণী
মনোমোহিনী দেবীর সংস্পর্শে আশার পরে লেখা “উচ্ছ্বাস” কাব্যগ্রন্থের কবিতার অংশ
বিশেষ।


সখি রে,---
উঠিছে পড়িছে আজি কত,
দুঃখের সুখের কথা হৃদয় নিভৃতে মোর,
.        আধ আধ আব্ ছায়া মত!
আধদুঃখ আধসুখ ছিল আবরিয়া,
.        কি যেন মেঘের কোলে জোছনা রাখিয়া॥

.        *        *        *        *

.                বিষাদ মাখান কত গান,
যেতেছিল মিশি মিশি,                নিশার আশায় ভাসি,
.                মিলাইয়া পরাণের তান!
.            দুখময় সে দিনের দুখ স্মৃতিগুলি,
.          দিতেছে মরমে যেন কত সুখ তুলি।

.        *        *        *        *

.                সুখে দুখে গিয়াছে ডুবিয়া,
দুঃখের হৃদয় আজি                নেশার আধের ঘোরে,
.                বহিয়াছে কি সুখ ছাইয়া!
.             নয়নে ভাসিছে কত সুখের স্বপন,
.             পাইয়া তোমার সেই সুখ সম্মিলন! . . .

.                         ****************           
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেয়সি রে, গেঁথেছি তোমার লাগি
কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
মাসিক পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত। মহারাণী
মনোমোহিনী দেবীর সংস্পর্শে আশার পরে লেখা “অকাল কুসুম” কাব্যগ্রন্থের কবিতার
অংশ বিশেষ।


প্রেয়সি রে, ---
গেঁথেছি তোমার লাগি                বিরলে বসিয়া আমি,
.                যে সাধের মালা,
উজল মাণিক নহে,                নহে যুঁই নহে বেলী,
.                রূপে গন্ধে নাহি করে আলা।
ভাল মন্দ নাহি জানি,                গাঁথিয়া পেয়েছি সুখ,
.                রূপে গুণে তোমারি মতন,
.                তাই এত করেছি যতন! . . .

.                         ****************           
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর