মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য - জন্মগ্রহণ করেন ত্রিপুরার রাজবংশে। পিতা মহারাজ কৃষ্ণকিশোর
মাণিক্য। ৫ই আগস্ট ১৮৬২ তারিখে তিনি মাণিক্য উপাধী ধারণ করেন এবং ত্রিপুরার রাজসিংহাসনে তাঁর
অভিষেক হয়। তিনি মাণিক্য বংশের ১৮১তম শাসক ছিলেন।

তাঁর রাজত্বকালে ত্রিপুরার আধুনিক যুগের সূত্রপাত। দাসবিক্রয়, সতীদাহ প্রভৃতি কুপ্রথা ও দুর্নীতি তিনি
কঠোরহস্তে দমন করেছিলেন। বাংলা ভাষার প্রচলন ও উন্নতিকল্পে মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের অবদান
বাঙালী যদি ভুলে যায় তাহলে সেটা হবে এক মহা-অপরাধ!

তিনি নিজে ছিলেন কবি, সুগায়ক ও বহু বাদ্যযন্ত্রে সিদ্ধহস্ত। নিজে খেয়াল ও টপ্পা রচনা করতেন। তাঁর
দরবারে সাদরে স্থান পেয়েছিলেন গায়ক ও কবি যদুনাথ ভট্ট, গায়ক ভোলানাথ চক্রবর্তী, সুরবীণ বাদক
নিসার হোসেন, তানসেনের বংশোদ্ভূত ভারতবিখ্যাত রুবাব বাদক কাশেম আলি, এসরাজ বাদক হাইদর খাঁ,
সেতার বাদক নবীনচাঁদ গোস্বামী, বেহালা বাদক হরিদাস, পাখোয়াজ বাদক কেশব মিত্র, পঞ্চানন মিত্র
(পাঁচুবাবু) ও রামকুমার বসাক প্রমুখরা। যদু ভট্টকে মহারাজ “তানরাজ” উরাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

চিত্রকলায়ও তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। দেশী  ও  বিদেশী চিত্রকরেরা তাঁর দরবারে স্থায়ীভাবে নিযুক্ত
থাকতেন। তাঁর ছত্রছায়ায় রাজপ্রাসাদে চিত্র প্রদর্শনীও করা হোতো। তিনি নিজেও জলরং ও
তৈলচিত্র অঙ্কনে পারদর্শী ছিলেন।

তিনি নিজে ছিলেন একজন ফোটোগ্রাফার। উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে তিনি প্রথমে ডাগিয়ের্রো টাইপ
(Daguerreotype) ফোটোগ্রাফির পদ্ধতিতে ছবি তুলতেন ও পরে ওয়েট-প্লেট কল্লোডিয়ন (wet-plate collodion)
পদ্ধতিতে। তিনিই প্রথম ভারতীয় রাজা, যিনি তাঁর রাজপ্রাসাদে বার্ষিক ফোটোগ্রাফির প্রদর্শনী করতেন।

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার পত্তন করেন মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য ১৮৪৯ সালে, হাওড়া নদীর অপর
পারে। তাঁর পর মহারাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্য তৈরী করান রাজপ্রাসাদটি। ১৮৬২ সালে মহারাজ বীরচন্দ্র
মাণিক্য আগরতলার নগরায়ন শুরু করেন। তিনি ১৮৭১ সালে স্থাপন করেন আগরতলা মিউনিসিপ্যালিটি, ৩
বর্গ কিমি এলাকার উপর, একটি রাজকীয় ফরমান জারি করে। জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৮৭৫।

মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য তাঁর জীবদ্দশায় রাজপ্রাসাদে একটি উল্লেখনীয় লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করে যান। ১৮৯৬
সালে ইংরেজী বইয়ের সংগ্রহ রাজপ্রাসাদে রেখে বাংলা বইয়ের সম্ভারটি নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত করে,
আম জনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়। মহারাজ বীরচন্দ্রের পুত্র মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য,
পিতার স্মৃতিতে এই পাঠাগারের নাম রাখেন বীরচন্দ্র লাইব্রেরী। ১৯২৪ সালে লাইব্রেরীর নতুন গৃহ নির্মান
করে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেন মহারাজ বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর।

রাজ্যে শিক্ষার প্রসারের জন্য, মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য ১৮৯০ সালে স্থাপন করেন ত্রিপুরার প্রথম পশ্চিমী
শিক্ষা ধারার স্কুল উমাকান্ত অ্যাকাদেমি।

ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সাথে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের যোগাযোগ ছিলো দীর্ঘ কালের। মহারাজ
বীরচন্দ্র মাণিক্যের পিতা মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের সঙ্গে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রীন্স
দ্বারকানাথ ঠাকুরের যোগাযোগ ছিলো।
রবীন্দ্রনাথ, ত্রিপুরার ইতিহাস সম্বন্ধে জানার জন্য যখন মহারাজ
বীরচন্দ্র মাণিক্যকে  পত্র লেখেন,  তখন তিনি সেই পত্রে তাঁরে পারিবারিক সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ
করেছিলেন। মহারাজ বীরচন্দ্রের দেওয়া ত্রিপুরার ইতিহাসের তথ্যের উপর তিনি রচনা করেন “রাজর্ষি”,
“বিসর্জন” ও “মুক্তি” উপন্যাস। ১৮৮১ সালে স্ত্রী মহারাণী ভানুমতী দেবীর অকাল প্রয়াণে শোক-সন্তপ্ত হৃদয়ে
মহারাজ বীরচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের “ভগ্ন হৃদয়” কবিতাটি পড়ে সান্ত্বনা লাভ করেছিলেন। তাঁর
প্রতিনিধি রাধারমণ ঘোষ কে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানাতে। তাঁর আমন্ত্রণে
রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মে মহারাজের সঙ্গে কারসিয়ং ভ্রমণ করে আসেন। এসব রবীন্দ্রনাথের নোবেল
পুরস্কার প্রাপ্তির বহু আগের ঘটনা!

বাংলা ভাষার প্রচলন ও উন্নতিকল্পে মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের অবদান অসীম। ইংরেজদের জন্য
রাজকার্যে ইংরেজী ভাষার ব্যবহার হতে দেখে তিনি আইন করে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রাজকার্যে বাংলা
ভাষার ব্যবহার বজায় রাখেন। অতি দুঃখের বিষয় এই যে বাংলাভাষার প্রতি এমন প্রকৃত দরদ, স্বাধীন
ভারতের বঙ্গভাষী প্রদেশগুলির কোন সরকারেরই দেখা যায়নি, আজ অবধি। নির্বাচন বৈতরণী পার হতে
যেটুকু প্রয়োজন তার বেশী কেউ কিছু সময় ব্যয় করেনি।

পণ্ডিত রামনারায়ণ বিদ্যারত্নকে দিয়ে তিনি বিবিধ টিকা ও বঙ্গানুবাদ-সহ শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ সম্পাদন করান
এবং বিনামূল্যে তা বিতরণের ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও তিনি বহু প্রাচীন গ্রন্থ প্রচারের ও বহু সদগ্রন্থ মুদ্রণের
জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। তাঁর প্রজত্নে নিরক্ষর পার্বত্য কুকিজাতি বাংলা লেখা-পড়া শিখেছে।

সর্বপরি তিনি নিজে ছিলেন একজন কবি। তাঁর “প্রেম-মরিচিকা” কাব্যগ্রন্থ তিনি তাঁর স্বর্গতা স্ত্রী মহারাণী
ভানুমতী দেবীকে উত্সর্গ করেছিলেন। তিনি একজন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ছিলেন এবং বহু বৈষ্ণব-পদাবলী রচনা
করে গিয়েছেন। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “হোরি” ( হোলির ৩৪টি গান ), “ঝুলনগীতি”, “প্রেম-
মরিচিকা” (মহারাণী ভানুমতী দেবীর মৃত্যুর পরে শোকাকুল হৃদয়ে লেখা ), “উচ্ছ্বাস”, “অকাল কুসুম”,
“সোহাগ” প্রভৃতি।  যার মধ্যে “হোরি” ও “ঝুলন” কাব্যগ্রন্থের গীত বৈষ্ণব পর্ব উপলক্ষ্যে গাওয়া হয়ে থাকে।
তিনি “ললিত”, “ললিতচন্দ্র”, “বীরচন্দ্র” প্রভৃতি ভণিতায় গান রচনা করে গিয়েছেন।

কবি রাজকুমারী অনঙ্গমোহিনী দেবী ছিলেন মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের জ্যেষ্ঠা কন্যা। শৈশবকাল থেকেই
পিতার উত্সাহদানে তাঁর কবিত্বের বিকাশ ঘটে।

আমরা
মিলনসাগরে কবি মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য-এর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা। তাঁর প্রতি এই পাতাই মিলনসাগরের স্রদ্ধার্ঘ্য।


উত্স - কালীপ্রসন্ন সেনগুপ্ত, “কবি বীরচন্দ্র মাণিক্য” নামক প্রবন্ধ, মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় ও প্রভাতকুমার
.          মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী” পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২) সংখ্যায়
.          প্রকাশিত।
.          সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, পঞ্চম
.          সংস্করণ, ২০১০।
.          
ত্রিপুরা বংশাবলী।      
.                  http://thenortheasttoday.com/        
.                 
Rabindranath and Tripura         
.                 
Birchandra State Central Library      



কবি বীরচন্দ্র মাণিক্য-এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     




এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ০৭.১১.২০১৬




...