কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্তর কবিতা
|
কিশা গোতমী
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত
সরযূবালা দত্ত সম্পাদিত “ভারত মহিলা” পত্রিকার চৈত্র ১৩১৫ (মার্চ ১৯০৯) সংখ্যায়
প্রকাশিত।
একদিন বুদ্ধদেব সপার্ষদ বসি’
জগতের দুঃখ দৈন্য-জরা-মৃত্যু-মসী
কেমনে হইতে পারে সহজে স্খালন
তাহারি শাশ্বতোপায় করেন বর্ণন
অমৃত-মধুর বাবে ; মুগ্ধ আত্মহারা
সুবিপুল জনসঙ্ঘ নব জ্ঞান-ধারা
আনন্দে করিয়া পান ; বুঝি অলক্ষিতে
দেবগণ স্তব্ধ হয়ে ছিলা চারিভিতে
নির্ব্বাণের মহাবাণী উত্সুক হৃদয়
করিতে শ্রবণ আহে!
. এমন সময়ে,
মভোভেদী-আর্ত্তনাদ জাগিল অদূরে
ব্যাকুল চঞ্চল করি সকরুণ সুরে
সবাকারে অকস্মাৎ! সহস্র নয়ন
নিরখিল নারী এক করে আগমন
অতি দ্রুত, ঝড় যথা বৈশাখী-সন্ধ্যায়,---
উন্মাদিনী, ভূমিতলে অঞ্চল লুটায়
বিচূর্ণ আশার সম, কুঞ্চিত কুন্তল
আলুথালু, শূন্যে উড়ে কৃষ্ণ মেঘদল
যেন নব বর্ষাগমে! মৃত পুত্রক্রোড়ে ;
ক্ষণে ক্ষণে বাঁধি তায় দুটি ভুজডোরে
চাপে বক্ষে, মাতৃস্নেহ যেন হৃদি চিরি
মুহূর্ত্তে নিষ্ঠুর ভবে বারেক বাহিরি’
নবীন পরাণ চাহে করিবারে দান
প্রাণাধিক প্রিয় সুতে ; সুন্দর অম্লান
রৌদ্র-দগ্ধ পুষ্প-কলি যবে পড়ে ঝরি’
জননী ধরিত্রী দেবী পুনঃ বৃন্তোপরি
করে বৃথা স্থাপিতে প্রয়াস!
. ত্রস্তে সবে
সরে গেল ;মুক্ত-পথে আপন গৌরবে
গেল অগ্রে ক্ষিপ্র পদে দুর্ভাগিনী নারী
বুদ্ধ পাশে ; সম-দুঃখে মুছি আঁখি-বারি
চিনিল অনেকে সেই সন্তান বত্সলা
কিশা গোতমীরে হায়! আজিকে চঞ্চল
গাম্ভীর্য্যের প্রতিরূপা সুশীলা কামিনী
মহাশোকে, শরতের স্থিরা তরঙ্গিনী
ব্যাতা-ক্ষুব্ধা সুভীষণা!
. প্রণমি গোতমে
গোতমী কহিল ক্ষেদে --- “যদি ভাগ্যক্রমে
পেয়েছি দর্শন তব ওগে ভগবান্ ,
কর তবে কৃপাময়, মোরে পরিত্রাণ
এ তীব্র যাতনা হতে! শুনিয়াছি আমি
বিশ্বের মুক্তির বার্ত্তা বহিবারে তুমি,
ভবে আসিয়াছে শুধু ; মৃত সুতে মোর
ভেঙ্গে দিয়ে আজিকার কাল-সুপ্তি-ঘোর
দাও মোরে মুক্তি প্রভো!
. করুণা-নির্ঝর,
সমর্পিনু এই তব শ্রীপদ উপর
প্রাণ-মণি বত্সে মম!
. এতেক কহিয়া
অশ্রু সুনির্ভরে শোকাতুর হিয়া
বুদ্ধের চরণে শিশু করিল রক্ষণ
ভক্তের অঞ্জলি হেন!
. বিস্ময়ে মগন
সুমহান জনার্ণব ; সিদ্ধার্থ গম্ভীর
দান কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত “ভারতী” পত্রিকার পৌষ ১৩১৭ (ডিসেম্বর ১৯১০) সংখ্যায় প্রকাশিত।
জানিনা দেবতা তুমি থাক কোন্ দেশে পথও তার নাহি মোর চেনা, --- নাহি জানি কবে তুমি কোন্ দেব বেশে ধরা মাঝে কর আনা গোনা! জানি শুধু হে রাজন্ , মোরা হেথা যাহা সুখ আর শুভ রূপে পাই,--- নীরবে গোপনে রহি’ অকাতরে আহা, দাও তুমি, দাও তুমি তাই!!
. ********************
. সূচীতে . . .
মিলনসাগর
|
বীণা কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৩ (জুলাই ১৯১৬) সংখ্যায় প্রকাশিত।
আয় বীণা, বাছনি আমার! আয় মাগো আয় বুকে, কেন দূরে ম্লান মুখে দাড়ায়ে আছিস তুই ? সহে নাত আর! তুই মোর প্রাণ জোড়া ধন, জীবনের সুখের স্বপন--- ভেঙে চূড়ে সব আজ, কে গো হানিল বাজ, সুকুমার কলি হায়, ধুলিতে লুটায়! বুঝি নারে কোন্ জন, এমন পাষাণ মন, চাঁদিমার চারু হাসি ঢাকে বদলায়! ওরে বীণা, বাছনি আমার! আয় মাগো, আয় বুকে, কেন দূরে ম্লান মুখে দাঁড়ায়ে আছিস তুই? --- সহে নাত আর!
২ কারে কব যাদুরে আমার।
|
পূজার অর্ঘ্য কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ ( অক্টোবর ১৯১৬ ) সংখ্যায় প্রকাশিত।
( ১ ) শরতের শুভ্রাকাশে, স্বরগের দীপ্তি ভাসে, বিশ্ব আজি প্রসন্ন উজ্জ্বল ;--- মা আমার! মা আমার! দূরে কত র’বি আর, দীন সুতে কাঁদায়ে কেবল! কি আনন্দে পাখী গাহে গান! হর্ষোত্ফুল্ল প্রসূন-বয়ান! তটিনীর কলোচ্ছ্বাসে কি আনন্দ ভেসে আসে, স্নিগ্ধ সমীরণ কিবা পুলক-চঞ্চল! মা আমার! মা আমার! দূরে কত র’বি আর, দীন সুতে কাঁদায়ে কেবল!
( ২ ) সুদীর্ঘ বরষ পরে, মা তুই আসিবি ঘরে, সারা বঙ্গে পড়ে সাড়া ; ---
|


প্রতীক্ষা
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার মাঘ ১৩২৬ (জানুয়ারী ১৯১৯)
সংখ্যায় প্রকাশিত।
মনের মাঝে একটি কথা জাগ্ ছে শুধু বারংবার,
গগন-কোণে একটি তারা সন্ধ্যারাণীর উপহার!
কখন যে সে আসবে ফিরে শূন্য গৃহ পূর্ণ করি’
অকূল মাঝে ভাসবে আবার ঘাটে বাঁধা জীর্ণ তরী
একটি কথা অকটু হাসি আঁখির দিঠি একটু খানি,
সকল ব্যথা ভুলিয়ে দিত সত্য আমি সত্য জানি!
দীনের ঘরে হীড়ার কণা বৃষ্টি হত হাজার ধারে,
বুকের মাঝে নিবিড় করে নিশায় যবে পেতাম তারে
কত দুজ্ঃখের নিধি সে মোর, সাথী সে মোর সুখের কত!
সাগর-ছেঁচা পরশমণি কর্ ল সোনা প্রেমের ব্রত!
জীবন-যাগে পুণ্য-চরু সখী সে-মোর অনন্তেরি,---
অন্ধ আঁখি নূতন আলো পেলো ও মুখ বারেক হেরি’!
আজকে সে যে অনেক দূরে---শ্যামল কোলে পল্লীমার
হেথায় আমি একলা পড়ে বহিগো শুধু হৃদয়-ভার।
কখন হেথা ফুটবে ফুল, কখন পাখী গাইবে গান,
পথের পানে পলক হারা গুমরে মরে সকল প্রাণ!
. ********************
. সূচীতে . . .
মিলনসাগর