কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্তর কবিতা
*
‘রাখী’-উত্সবে
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত
নারায়ণচন্দ্র বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত “স্বদেশী” পত্রিকার কার্তিক ১৩১৫ (নভেম্বর ১৯০৮)
সংখ্যায় প্রকাশিত।


প্রাণে প্রাণে হলো আজি ‘রাখী’র বন্ধন,
নব বাঙ্গালার নব সন্তাননিকর!
এস হর্ষে, লয়ে ফুল্ল পবিত্র অন্তর---
স্বাগত মহেন্দ্র-লগ্নে --- মহাশুভক্ষণ!

আট কোটি হৃদি-পদ্ম উঠুক ফুটিয়া
একই মহান লক্ষ্যে জননী পূজায়,---
নাহি কোন রুদ্র-শক্তি বিপুল ধরায়
সে অর্চ্চনা করে ব্যর্থ গরবে ভুলিয়া!

দর্পিত-মসীর কৃষ্ণ-কলঙ্ক-রেখায়
বিধি-দত্ত অধিকার হয় নি খণ্ডন,---
সেত এস জাগাইতে সুযুপ্ত-জীবন
শাশ্বত মঙ্গল-বার্ত্তা বিঘোষিয়া হায়!

ত্যজি সর্ব্ব ক্ষুদ্রত্বের তুচ্ছ অভিমান,
হোক্ তবে শর্ব্বরীর চির-অবসান!

.              ********************             

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মিলন-স্মৃতি
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার পৌষ ১৩২৬ (ডিসেম্বর ১৯১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত।


জীবনের দীর্ঘ পথে মনে হয় ক্ষণিকের তরে
হে প্রেয়সী! মানসী আমার!
অকস্মাৎ অতর্কিতে পেয়েছিনু তোমা বক্ষ ভরে
মুহূর্ত্ত ভুলিতে হাহাকার!
অনন্ত অম্বরে যথা দু’টি ক্ষুদ্র জলদের কণা
যাত্রা-পথে করি কোলাকুলি,
কোথা পুনঃ ভেসে যায় আত্মহারা একাকী উন্মনা
ক্ষণ-দেখা বুঝি পথ ভুলি’।
তেমতি কি হে বাঞ্ছিতা! এ বিশাল বসুন্ধরা তলে
এক শান্ত শিশির-সন্ধ্যায়,
মঙ্গল-উত্সব মাঝে মনে হয় যেন স্বপ্ন-ছলে
মিলেছিনু তোমায় আমায়!
পীড়ানত মুখোপরে হেরিলাম দেব বালিকার
কি সারল্য পতিব্রতা মাপা,---
মনে হল চিত্তে তব ঘুচাতে এ প্রাণের আঁধার
পুণ্য-প্রেমে পূর্ণ শশী আঁকা!


নিরমম সংসারের বিষ-দগ্ধ নয়নসম্মুখে
সহিল না এত সুখ মোর,
বিস্তারি’ সহস্র ফণা সর্প হেন কি ক্রুর-কৌতুকে
মর্ম্মে মম দংশিল কঠোর!
সে দংশনে সে আঘাতে বজ্র বুঝি ভস্ম হয়ে যায়,
নীলকণ্ঠ মানে পরাজয়!
জান তুমি হে কল্যাণী, দাঁড়াইনু হাসি’ উপেক্ষায়
ও হৃদয়ে লভিয়া আশ্রয়!

ক্ষুদ্র বুকে এত সুধা ছিল তব বিশল্যকরণী!
জুড়াইতে বিক্ষত পরাণ ;---
সংসারের শক্তিশেল ব্যঙ্গ যাহে দিবস রজনী
উদ্ভাসি’ সৌভাগ্য জিযোতিষ্মাণ!

সত্য জানি প্রিয়তমে! কি বিশ্বাস নির্ভর তোমার
করেছিল নির্ভীক আমায়,---
তব ধ্যৈর্য্য-সহিষ্ণুতা জ্বেলেছিল অন্তর মাঝার
ধ্রুবজ্যোতিঃ সান্ত্বনা আশার!


এনন্ত কালের স্রোতে বর্ষ এক কতটুকু প্রিয়ে!
ওইটুকু আমারই সম্বল।---
তারপর কোথা তুমি নাহি পাই বিশ্ব অন্বেষিয়ে
সারা চিত্তে জ্বলে দাবানল!

শূন্য গৃহ! শূন্য প্রাণ শূন্য ধরা --- নিষ্ঠুর সংসার ---
দশদিক নিস্তব্ধ নির্জ্জন!---
ইন্তরে বাহিরে যেন ঘনীভূত অমাতমিস্রার
নামিয়াছে ভীষণ প্লাবন।

এ আঁধারে আত্মহারা লক্ষ্যহারা শান্তিহারা হয়ে
সর্ব্বশক্তি হারিয়েছি আজ,---
অশ্রুর গৈরিক চাপি’ জীর্ণ দীর্ণ উদ্ভ্রান্ত হৃদয়ে
বিলুণ্ঠিত তপ্ত মরু মাঝ!

কে দিবে আশ্বাস আজি---শ্রান্ত প্রাণ জুড়াব কোথায়---
কোথা পাব ব্যথার আশ্রয়,---
আনন্দ-উত্সব-শেষে দূরাগত-বংশীধ্বনি প্রায়
স্মৃতি শুধু কাঁদে বক্ষময়!


জীবন সঙ্গিনী অয়ি! পড়ে আছে সুদীর্ঘ জীবন
চিহ্ন তব হেথা কিছু নাই!---
অন্তর্হিত ছায়া কুঞ্জ অকস্মাৎ মরীচি’ মতন
রেখে শুধু অতৃপ্ত তৃষ্ণায়!

ক্ষণিকের হাসি খেলা ক্ষণিকেতে হল সমাপন
একি স্বপ্ন ---  একি গো কল্পনা---
সত্য তোমা পেয়েছিনু মোর শত সাধনার ধন!
বক্ষ মাঝে একান্ত আপনা ?

নহে নহে ভ্রান্তি কভু! এখনো যে তোমারি পরশ
সারা চিত্তে করি অনুভব,---
ভগ্নমঞ্জুষার কোণে লেগে আছে করিতে বিবশ
নিরুদ্দিষ্ট কস্তুরী-সৌরভ!

অন্তরের অধিষ্ঠাত্রী অয়ি দেবী, প্রেমময়ী মম!
আজ তুমি ধ্যানের বন্দিতা,---
তোমারি মিলন-স্মৃতি জপমাল্য দিব্য নিরুপম
মুমূর্ষুর শান্তিদাত্রী ‘গীতা’!

.              ********************             

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর