আমরা কৃতজ্ঞ কবির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী নবীনচন্দ্র দত্তের পৌত্র শ্রী প্রণব কুসুম দত্তর কাছে জিনি আমাদের
কবির সম্বন্ধে প্রভূত তথ্য দিয়ে পাতাটিকে ঋদ্ধ করতে সাহায্য করেছেন। ইমেল - pkusumdutta@gmail.com
আমরা মিলনসাগরে কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্তর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।
উত্স:
- কবির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী নবীনচন্দ্র দত্তের পৌত্র শ্রী প্রণব কুসুম দত্তর ইমেলে পাঠানো বিস্তারিত কবি-
পরিচিতি। তাঁর দেওয়া তিনটি তথ্যসূত্র, আমরা নীচে দিয়ে দিলাম।
- ১। চট্টগ্রাম চরিতাভিধান, সুনীতি ভূষণ কানুনগো সম্পাদিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কর্তৃক
প্রকাশিত।
- ২। দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস (আদিকাল), জামাল উদ্দিন লিখিত এবং বলাকা প্রকাশনা কর্তৃক
প্রকাশিত।
- ৩। রবীন্দ্র জীবনে ও সাহিত্যে চট্টগ্রাম, শিমুল বড়ুয়া লিখিত ও অমিতাভ প্রকাশন, চট্টগ্রাম কর্তৃক
প্রকাশিত।
- যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, “বঙ্গের মহিলা কবি” গ্রন্থ, ১৯৩০।
- শিশিরকুমার দাশ, সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী, ২০০৩।
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্তর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-
srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২.১.২০১৭।
কবির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী নবীনচন্দ্র দত্তের পৌত্র শ্রী প্রণব কুসুম দত্তর তথ্যাদি সংযোজন - ১১.৭.২০২০।
.
কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত - জন্মগ্রহণ করেন
চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। পিতা সাবজজ অনঙ্গ
মোহন দত্ত । ডাঃ রামকিনু দত্তের তিন কৃতী
সন্তানের মধ্যম অনঙ্গচন্দ্র দত্ত। তাঁর তিন ছেলেরই চট্টগ্রামের ইতিহাসে খ্যাতি আছে। ডাঃ রামকিনু দত্ত
স্বয়ং খ্যাতিমান পুরুষ ছিলেন। চট্টগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে এঁদের প্রত্যেকের ব্যাপারেই অনেক কিছু জানা
যায়।
মাত্র দেড় বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে জীবেন্দ্র কুমার পঙ্গু হয়ে পড়েন। স্বাভাবিকভাবে তাই
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। শারীরিকভাবে অক্ষমতা তাঁর জ্ঞানার্জনের জন্য
প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। তাঁর গৃহ শিক্ষক বিপিন বিহারী দাশ শর্মা তাঁকে শিক্ষা দান করেন। বাড়িতে
প্রগ্রতিশীল আবহাওয়া এবং জীবেন্দ্র কুমারের সহিষ্ণু মনের জোরে, দৈহিক বাধা অগ্রাহ্য করে প্রকৃত শিক্ষা
অর্জন করেছিলেন।
কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্তর পিতা ও পিতামহ এবং তাঁর ছোট বোন হেমন্তবালা দত্তও অসামান্য কবি
প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, “উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি কবিত্ব শক্তি লাভ
করেন”। মাত্র তেরো বছর বয়স থেকে তাঁর রচিত কবিতা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।
শৈশবে পোলিও রোগে আক্রান্তে পঙ্গুত্ব প্রাপ্ত হয়েও তিনি কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এতেই তাঁর
মনোবলের ও মানসিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
জীবেন্দ্র কুমার দত্তের দুই সন্তানের নাম ফুলরেণু ও স্বর্ণময়।
কবির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী নবীনচন্দ্র দত্তের পৌত্র শ্রী প্রণব কুসুম দত্ত আমাদের জানিয়েছেন যে তাঁদের বংশের
৯৯% কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়ে যায় ৪০ এর দশকেই। বাংলাদেশে যা অবশিষ্ট ছিল তা সরকারী /
বেসরকারী লুটপাটে শেষ হয়ে যায়। কোন স্মৃতি নিদর্শন সংরক্ষণ করার সামর্থ্যও তাদের থাকেনি।
বঙ্গীয় সাহিত্য জগৎ ও জীবেন্দ্রকুমার দত্ত - পাতার উপরে . . .
তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ সহ বিভিন্ন সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন ও সম্মেলনের সাথে জড়িত
ছিলেন। ১৯০৬ সালে কলিকাতা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি যোগদেন। ১৯১১ তে
ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেন এবং স্বরচিত গান “অর্ঘ্য” স্বকণ্ঠে পরিবেশন করেন। ১৯১৩ সালে
সাহিত্য পরিষদ চট্টগ্রাম শাখায় প্রথম সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরিষদের মূখপত্র ত্রৈমাসিক “প্রভাত”
এর ও তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ষষ্ঠ অধিবেশন
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলে তিনি এতে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯১৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের
কলিকাতা অধিবেশনে তিনি চট্টগ্রাম শাখার প্রতিনিধি হিসেবে যোগদেন। ১৯১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান
সাহিত্য সম্মেলনে চট্টগ্রাম অধিবেশনে তিনি যোগদেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষার পরীক্ষক
নিযুক্ত হন। ১৯২০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্যে পরিষদের অষ্টম অধিবেশনে তিনি যোগদেন এবং স্বরচিত কবিতা
পাঠ করেন।
জীবেন্দ্রকুমার দত্তর কবিতা ও রচনাসম্ভার - পাতার উপরে . . .
জীবেন্দ্র কুমার দত্ত মূলত ছিলেন কবি। বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক ও খ্যাতনামা পণ্ডিত ও দার্শনিক হিসেবে
খ্যাত হীরেন্দ্র নাথ দত্তের, জীবেন্দ্র কুমারকে নিয়ে একটি লেখা "ঢাকা রিভিউ ও সম্মিলন" পত্রিকায়
ছাপানো হয়। তিনি লিখেছিলেন . . .
“এই সুলিখিত ভূমিকা পাঠ করিতে আমাদের প্রসাধিত চিত্ত স্বত্বই উৎফুল্ল হইয়া উঠে। আমরা বুঝিতে পারি
তপোবনের কবি ধ্যানের দ্বারা এমন এক নবলোক সৃজন করিয়াছেন যেখানে অন্তর্যামী দেবতাকে আত্মায়
আত্মায় অনুভব করিয়া আত্মহারা কবির বীণা উচ্ছ্বসিত প্রাণের ভাষায় বর্ষণ করিয়াছে”।
তাঁর রচিত কবিতা সমূহের সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক। তাঁর রচিত কবিতা সমূহ "সাহিত্য পরিষদ
পত্রিকা", "ভান্ডার", "সমাজ", "নব্য ভারত", "অঙ্কুর", "ব্রহ্মবিদ্যা", "অর্চনা", "সুধা", "প্রতিভা", "প্রভাত",
"মানসী", "প্রবাসী", "ভারতবর্ষ", "নবনূর", "সাধনা", "স্বদেশী", "জগজ্জ্যোতি” প্রভৃতি সাহিত্য সাময়িকীতে
প্রকাশিত হয়।
কবি জীবেন্দ্র কুমারের কাব্যগ্রন্থ “ধ্যান লোক” কলকাতার নব্যভারত প্রেসে মুদ্রিত হয়ে ১৯১৩ সালে প্রকাশিত
হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “তপোবন” একই সময়ে একই সাথে প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রামের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র
মহাকবি নবীন চন্দ্র সেনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বইটি উৎসর্গ করা হয়। গ্রন্থ দু’টির মূল্যায়ন করে ঢাকা রিভিউ
(১৩২১) লিখেছেন “জীবেন্দ্র কুমারের কবিতা প্রসাদ গুণশালিনী। তাঁর ভাষার লালিত্য ভাবের গাম্ভীর্য এবং
ছন্দের বৈচিত্র্য প্রশংসনীয়। পক্ষান্তরে তাঁহার নিস্কাম প্রেমনিষ্ঠা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সর্ব-সম্প্রদায়
প্রীতি, স্বদেশ-প্রাণতা, ভগবৎ নির্ভরতা এবং সৌন্দর্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা তাঁর কাব্যদ্বয়ে পরিস্ফুট। তিনি
প্রকৃতির যথার্থ ভক্ত ও উপাসক”।
তাঁর রচিত শ্রেষ্ঠ কাব্য হিসেবে বিবেচিত গ্রন্থ “অঞ্জলি” প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। এর ভূমিকা লিখেছিলেন
কবি গুণাকার নবীন চন্দ্র দাশ। কাব্য গ্রন্থটিতে ভক্তি, প্রীতি, প্রেম ও সম্মিলন এই চার অংশে বিভক্ত।
‘প্রবাসী ও স্বদেশী’ পত্রিকায় কাব্যগ্রন্থটির প্রভূত প্রশংসা করে প্রবন্ধ লেখা হয়। ‘ভারতী’ পত্রিকাতে তাঁর
রচিত “অঞ্জলি, তপোবন ও ধ্যান লোক-এর সমালোচনা প্রকাশিত হয়।
তাঁর রচিত অন্যান্য গদ্য এবং কাব্য গ্রন্থগুলো হলো যথাক্রমে : সুনীতি বিকাশ (১৩২২), নির্মাল্য (১৯১৯),
মাতৃশোক, মর্মবেণু, প্রহ্লাদ উপখ্যান প্রভৃতি। পরবর্তীতে তাঁর রচিত "সুনীতি বিকাশ" এবং "নির্মাল্য" স্কুলে
পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্বাচিত হয়। কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্ত পদ্য ও গদ্য ছাড়াও বেশ কয়েকটি উন্নতমানের
প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন যা সেই সময়কালে খুবই প্রশংসিত হয়।
এছাড়াও তিনি কয়েকটি প্রাচীন পুথিও পুনরুদ্ধার করে সংগ্রহ করেন। তাঁর একাজে জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি
করার উদ্দেশ্যে তিনি “প্রাচীন সাহিত্য উদ্ধার” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ রচনা করে প্রকাশ করেন, যা সেই সময়ে
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্ত, মুসলিম মনীষীদের জীবনী ভিত্তিক কয়েকটি
আলোচনা গ্রন্থ ও প্রবন্ধ লিখেছিলেন যা সমকালীন বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর রচিত সে সব
প্রবন্ধাদির মধ্যে "রাজর্ষি দায়ুদ", "সাধ্বী রাবেয়া", "খলিফা ওমর" প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তিনি ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজের প্রায় ২৭টি কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছিলেন, যা "প্রবাসি"
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জীবেন্দ্র কুমার দত্তের লিখিত "সার নাথ", "বুদ্ধ স্ত্রোত্র", "বুদ্ধ প্রেরণা" প্রভৃতি কবিতায়
বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। দেশপ্রীতি, প্রকৃতি প্রীতি এবং ঈশ্বর ভক্তি তাঁর কাব্যের
অন্যতম বিষয়বস্তু।
কবি জীবেন্দ্রকুমারের মৃত্যু ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শোক সভা - পাতার উপরে . . .
অপেক্ষাকৃত অধিক বয়সে তিনি বিয়ে করেন। কবির বয়স যখন মাত্র আটত্রিশ বছর তখন তিনি গুরুতর
অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় চট্টগ্রাম শহরস্থ বাসভবন “সাধনা কুঞ্জ” তে ১৯২১ সালে মাত্র আটত্রিশ
বছর বয়সে কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবি জীবেন্দ্র কুমার দত্তের পরলোক গমন
উপলক্ষ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শোক সভায় প্রয়াত কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন. . .
“তিনি যশের জন্য কবিতা লিখতেন না। তাঁর কবিতার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল, প্রাণের প্রেরণায় তিনি
কবিতা রচনা করিতেন। তিনি ফরমাইসি কবিতা লিখতেন না। তিনি কবিতার দ্বারা হৃদয়ের নানা ভার
পরিস্ফুট করিতেন।--- যে চট্টল ভূমিতে কবি নবীন চন্দ্রের জন্ম, সে ভূমিতেই জীবেন্দ্র কুমার দত্ত জন্মে
ছিলেন। চট্টগ্রামের আরেক মহান ব্যক্তিত্ব কবি নবীন চন্দ্র বলিতেন, “এই চট্টলমাতা কবি জননী হইবার
উপযুক্ত।" যাঁহারা চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিয়াছেন, তাঁহারা এই উক্তির সত্যতা উপলব্ধি করিতে
পারিতেন। জীবেন্দ্র কুমারের চট্টগ্রামে জন্ম সার্থক হইয়াছিল যা তাঁর লিখনির মাঝে ফুটে উঠে।"