| কবি যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তর কবিতা ও গান |
| আহ্বান সঙ্গীত কবি যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত এই কবিতাটি, দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩১৪ সংখ্যায় (অগাস্ট ১৯০৭) প্রকাশিত হয়েছিল। বিশ্ব ভরিয়ে উঠেছে বাজিয়া শোনরা অই বাজনা, কে রহিবে ঘরে এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! লাঞ্ছিত হিয়া জাগাও তুলিয়া, নব-সঙ্গীত-তানে উঠরে মাতিয়া, চলরে চলরে ধরা কাঁপাইয়া অই---বাজিয়া উঠেছে বাজনা, কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ২ আঁধার বিদারি উঠেছে সূর্য্য, দীপ্ত বহ্নি হৃদে নবীন বীর্য্য, উগারি অনল, জ্বলে ঝল মল জাগায়ে নব চেতনা, কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ৩ সাহস-গৌরবে তোল নিশান, প্রত্ত উত্সাহে হও আগুয়ান, উন্মত্ত ঝটিকা কাঁপাও ভূধর, আসুক গরজি প্রলয়ে সাগর, তাণ্ডব নর্ত্তনে ছুটুক লহর কি ভয় ? কি ভয় বলনা ? অই শোন বাজে ভৈরব রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ৪ চল দেখি সবে বীরের মতন, ঘুচাও নিরাশ কাতর রোদন। রৌদ্রমন্দ্রে কেন্দ্রে কেন্দ্রে, ছুটুক অশনি অগিনি মন্ত্রে, জাগাও সাহস হৃদয়-যন্ত্রে, গরজে ভেরী, শোন না ? কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ৫ এক দিন যার কুটীরে কুটীরে উঠিত সঙ্গীত সুমধুর সুরে, হা অন্ন! আ অন্ন রবে কাঁদে নারী নরে, শ্মশানে এখন প্রেতিনী বিহরে স্বর্ণপুরী মলিনা! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ৬ ঘুচাও কলঙ্ক, যাক্ অবসাদ, কেন এ দৈন্যতা ? বৃথা পরমাদ! ভাই ভাই মিলি জননীর ব্যথা, দূর করা বলো বেশী কিবা কথা ? জাগাও শকতি, জাগাও একতা বাঁধহ বলে আপনা! অই শোন বাজে, ভৈরব রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ৭ বীরত্ব-গৌরবে চির গরবিনী, স্বর্ণপ্রসূ মাতা বৈভবশালিনী, হের হের আজি সে যে রত্নহারা, দু’কপোল বাহি ঝরে অশ্রুধারা, লাঞ্ছিতা দলিতা মলিনা কাতরা একবার চেয়ে দেখ না ? কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ৮ সম্মুখ সমরে অরাতি দলি, রণরঙ্গে মাতি কৃপাণ খুলি, দেশের লাগিয়া করেছিলা রণ, সেই বীরজাতি তোরা কি এখন ? প্রতিজ্ঞা অটল ভীম দরশন! একবার ফিরে ভাবনা ? জাগিতেছে চীন, জেগেছে জাপান উঠেছে বিজয় বাজনা, কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ৯ জাগিয়াছ যদি জাগ এইবার, ঘুচাও কলঙ্ক দৈন্যতা মাতার! ভোল দলাদলি ভোল হিংষা দ্বেষ, হও এক প্রাণ---একাত্মা বিশেষ, থাকেনাকো যেন বিন্দু ঈর্ষা লেশ, জাগাও সুপ্তে চেতনা, অই শোন বাজে, ভৈরব রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ১০ যাও দ্বারে দ্বারে বল নিবেদন, কে ঘুমের ঘোরে জাগরে এখন! হিন্দু, মুসলমান, পারসী, খ্রীষ্টান, জৈন শিখ ব্রাহ্ম সকলই সমান, ওরে তোরা সবে মিলে হও আগুয়ান হেররে মায়ের যাতনা! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ১১ মায়ের অঙ্গনে মোরা সবে এক, ওরেরে জগৎবাসী তোরা চেয়ে দেখ্, পূজার লাগিয়ে কর আয়োজন, কৃষি-শিল্প আদি উন্নতি কারণ হও সবে এক,---কর প্রাণপণ নবভাবে কর অর্চ্চনা! অই শোন বাজে ভৈরব রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ১২ নব ভাবে কৃষি চষুক মাঠ, তাঁতি জোলা নব চালাক নাট, সূতা জাঁতা কল ঘরে ঘরে ঘরে, চলুক ছুটুক নব তেজ বরে আপনার পায়ে দাঁড়াও নির্ভরে কি কাজ ভিক্ষা লাঞ্ছনা ? কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ১৩ ঘরে ঘরে শিক্ষা করহ প্রচার, ছোট বড় ভেদ কিছু নহে আর, জ্ঞান, ধর্ম্ম, শিক্ষা একতার বলে, অসাধ্য সাধন হয় ধরাতলে আমি বড় হ’য়ে উঁচু হ’য়ে র’লে কিছুই---কিছুই হ’বেনা। অই শোন বাজো, কিভীষণ রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ১৪ সাম্যতন্ত্র সহ প্রেমের বন্ধনে, ভুলি আত্মমান বাঁধ প্রাণপণে জ্ঞানহীনা হ’য়ে, হইয়ে লাঞ্ছিতা, তোমাদেরি ঘরে ভগিনী দুহিতা--- সহে নির্য্যাতন, ঘুচাও এ ব্যথা, জাগাও ভারত ললনা, কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ১৫ আত্রেয়ী, গার্গী, খনা, লীলাবতী, সাবিত্রী, সীতা, দময়ন্তী সতী--- বিদুলা, দ্রৌপদী গরীয়সী নারী, তারাওত ছিল এই ভারতেরি, আবার তেমন জ্ঞানদান করি জাগাও, জাগহ আপনা! অই শোন বাজে, কি ভীষণ রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ১৬ দলিত পন্নগ, তোল তোল শির, গর্জ্জিবে লহর কর্ম্ম পয়োধির! কি কাজ ভাবিয়ে অতীতের কথা, বর্ত্তমানে ভাবষ্য@ ভবিষ্য বারতা, মিছে স্বপ্ন শুধু প্রাচীনের কথা সে সকল কিছু হ’বেনা! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ১৭ চল-চল ছুটি এস ভাই ভাই, সময় চলেছে আর দেরী নাই! বাঁধহ উষ্ণীষ, কটিতে কৃপাণ, রণসাজে সাজ গাহ জয় গান! করে ধরে চল বিজয় নিশান, মেঘ মল্লারে তোল মূর্চ্ছনা! অই শোন বাজে কি ভীষণ রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ১৮ জয় জয় জয় জয় ভারতের, জয় বাঙ্গালীর জয় মারাঠের পারসী পাঞ্জাবী সবারি জয়। অই আসে শত্রু নাহি কিছু ভয়, দুর্ভেদ্য দুর্গে করহ আশ্রয় জাগায় শক্তি প্রেরণা! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ১৯ গর্জ্জিছে কামান ধূম উদ্গারি, গরজিছে ভেরী কি ভয় তারি ? শত্রু-অস্ত্রাঘাতে ঝরিছে রুধির কাঁপে হাতে অসি---কম্পিত শরীর, স্বেদবারি ঝরে হ’ওনা অধীর, হো আগুয়ান সাহসমনা! অই শোন বাজে কি ভীষণ রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা ২০ অশনি ছুটিছে দামিনী ঝলকে, জলদ গরজে রমকে ঝমকে, প্রাবৃটের ধারা ঝরে অবিরল, হওনা অধীর হওনা বিকল, আছে আছে আছেরে সম্বল হ’ওনা কখন বিমনা! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ২১ সম্মুখে তোমার উন্নত ভূধর, তুষার কিরীট ভীম কলেবর, শাতের বাতাস শ্বাসিয়া ছুটিছে, বরফ গলিয়া তটিনী সৃজিছে, সম্মুখে শিলা পথ রুধিছে আগুসারি, চলনা ? অই শোন বাজে ভৈরব রবে প্রলয় বিষাণ বাজনা! ২২ শত বাধা বিঘ্ন দলি চরণে, চলরে চলরে অভয় শরণে যদি থাকে তব লক্ষ্য পথ ঠিক, বাঁধা বিঘ্ন ঠেলা সেকি গো অধিক ? হ’ওনা অবশ!---সে যে বড় ধিক্, পথ কভু ভুলো না! কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! ২৩ জীবনে মরণে প্রতিজ্ঞা দারুণ রাখিও সতত হৃদয়ে আগুন, সরল উন্নত তরুটীর প্রায়, উচ্চ লক্ষ্য ধরি জাগরে ধরায়, আকাশের পানে হের গ্রহ ছুটি ধায়, ক্ষণ তরে স্থির রয়না! বিশ্ব ভরিয়ে উঠেছে বাজিয়ে শোনরে অই বাজনা, কে রহিবে ঘরে, এস ত্বরা করে দিন গেলে আর পাবে না! @ “ভাবষ্য” - শব্দটি সম্ভবত মুদ্রণ প্রমাদ, “ভাব” হবে। . ******************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| তোমারি গরবে গরবী আমরা কথা - কবি যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সুর - সঙ্গীতাচার্য্য ব্রজেন্দ্রলাল গঙ্গোপাধ্যায় গীতটি রচিত হয়, বিক্রমপুর সম্মিলন কর্তৃক বিজ্ঞানাচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর অভ্যর্থনা উপলক্ষ্যে এবং প্রকাশিত হয় যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত বিক্রমপুর পত্রিকার ১৩২২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র-আশ্বিন সংখ্যায় (১৯১৫ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। তোমারি গরবে গরবী আমরা তোমারি মানে মানী, মেঘনার কল-কল্লোল-নাদে তোমারি কীর্ত্তি-বাণী! জড়ের জীবনে কি গোপন কথা, বিটপীর কাণে কি যে কহে লতা কেন হাসে ফুল পুলকে আকুল জান সে নিগূঢ় বাণী! ঋষিদের বাণী নবীন ছন্দে, জাগায়ে তুলিলে মুরজ মন্দ্রে এক প্রাণ খেলে বিশ্ব-নিখিলে এক সুরে বাঁধা প্রাণী! দিগ দিগন্তে উজলিয়া যশে এসেছ হে সুধী ফিরি নিজদেশে কণ্ঠে জয় মাল্য সৌরভ-বিভোর (ওহে) স্বদেশ-ভূষণ-মণি। মিলিয়াছি আজ আমরা হেথায় প্রীতি পুষ্পাঞ্জলি অর্পিতে তোমায় তুমি আমাদের,---আমরা তোমার---অতুল গৌরব গণি! জয় জগদীশ! রাখ জগদীশে সুখে স্বাস্থে সদা স্বদেশে বিদেশে। নাচিছে পদ্মা শত তরঙ্গে বহিয়া সুযশ-কাহিনী। জয় জন্মভূমি বিক্রমপুর! জয় জগদীশ-জননী! . ******************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |