কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
সাগরের মোহনায়
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


নদী চলে যায় সাগরের মোহনায়,
নীহারিকা জ্বলে আকাশের কিনারায় |

স্বর্গ নাকি সুখের দেবালয়,
নরক হচ্ছে দুঃখের যমালয় |

ছোট ছোট মাছ শ্যওলা খেয়ে বাঁচে,
বৃহত্ মত্স শুধু তালে তালে নাচে |

মাত্স্যন্যায়, খেতে চায় ছোটদের,
মায়া-মমতা থাকে না যে তাদের |

গন্তব্যস্হল সবার থাকে, ছোট থেকে বড় হবার,
সময়ের তালে খাপ খাওয়ানো, কাজ বড় ক্ষুরধার |

মুক্তি তো চায় সবাই,
সবাই কি মুক্তি পায় ?

মুক্ত নদীর অবাধগতি সাগরপানে যায়,
যদিও সাগর মন খুলে পথ দেয় |

মানুষ কি পারে না, সাগরের মত হতে,
মানুষে মানুষে মিলন-মোহনায় একেবারে মিশে যেতে ||

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
বাদলাবেলার কথা
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


বৃষ্টি ঝরা বাদলা দিনে                  
  পাগলা হাওয়া লাগে মনে,
মেতে ওঠে মন আনন্দেতে           
খুশীর পল্লবেতে |
সুখের আবেগ ছড়িয়ে আসে         
  সবুজ পাতায় ঘাসে ঘাসে,
শস্যশ্যামল সবুজ ঘেরা                
বাংলার নদী মাঠে |
বন হতে বন বনান্তরে                 
 হাসির ঝিলিক উঁকি মারে,
নাচে ময়ূরী পেখম তুলে             
সব কিছু কাজ ভুলে |
বৃষ্টি ঝরা বাদলা ক্ষণে                
 উদাস হাওয়া লাগে মনে,
মন ভরে যায় আসসেমিতে        
কাজ লাগে না মনে |
আলসেমির এই ক্ষণে ক্ষণে        
যত কথা পড়ে মনে,
গেঁথে রাখি অন্তরেতে              
ছোট্ট মালা গেঁথে ||

.                  ************************                    
.                                                                                         
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
ছোট্ট মেয়ে
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


ছিল একটা ছোট্ট মেয়ে
জীবন শুরু সংগ্রাম দিয়ে
ছোটবেলায় অনেক বন্ধু ছিল
খেলনা নিয়েই দিন কাটছিল
হঠাত্ পড়লো খেলায় বাধা
কারণ জগত্ একটা গোলকধাঁধাঁ |
স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হল
সমস্ত দায়ীত্ব কাঁধে চাপলো
শিশুমন গেল সংসারের টানে
পেল না দেখতে নিজের পানে
একটা করে বছর যায়
আর ঝড়ের মুখে পড়তে হয় |
একদিন এল কাল বৈশাখী
ধুলোর ঝড়ে ভরল আঁখি
চোখের সামনে ঙেঙে গেল বাসা
থাকলো না আর বাঁচার আশা |
তবুও আশায় বুক বেঁধে নিয়ে
মেয়েটা চললো আঘাত পেরিয়ে
থামবে না সে থামবে না
কোন বাধাই সে মানবে না
একদিন সে উঠলো জ্বলে
মনের জোরে মনের বলে |
 কিছু সে করে ধেখাতে চায়
 পথ গুনছে তার অপেক্ষায়
জানে না কখনও আসবে কি সে দিন
যেদিন মিটবে জীবনের ঋণ
 মনুষ্য জীবন শ্রেষ্ঠ জীবন
 আছে জন্ম আছে মরণ
মরণের তরে ভীত না হয়ে
একদিন সে বাধ ভাঙলো
 যারা আঘাত আনতে চাইলো
 তারাই সবাই মাথা নত হল |
ছোট্ট মেয়েটির বাঁচার স্বপ্ন
অনেকের মন করল ভগ্ন
কিন্তু তার আত্মশক্তি
তৈরি করল নূতন গতি
একদিন সে হারিয়ে যাবে
যাবার আগে ভাবিয়ে যাবে
একদিন যারা করেছিল তাকে লাঞ্ছনা
মৃত্যুর দুয়ারে সবাই কাঁদবে
এটাই তার সান্ত্বনা
তাকে কেউ ভুলবে না |

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
২১শে জুলাই, রক্তে লেখা এক নাম
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


ভুলিনি আমরা, ভুলবো না কোনদিন
২১শে জুলাই বাংলার ইতিহাসে
     রক্তঝরা একদিন |
পায়ে পায়ে পথ হেঁটে, বুক বেঁধে এসেছিল ওরা
জানতো না, এ আসাই ওদের শেষ আসা
ঘরে ফিরবে না আর কোনদিনই তারা |
যাদের মনে ছিল প্রতিবাদ
অন্তরেতে ছিল ঘৃণা আর বিদ্বেষ
পুলিশের ক্রোধে আর আক্রোশে
যাদের ভবিষ্যত হল শেষ |
জানলো না যারা কি তাদের অপরাধ
কেন তাণ্ডব আর অমানিশার বিভীষিকায়
খুন করা হল গণতন্ত্রের বাঁধ |
ফিরবে না আর যারা কেনদিন
যাদের রক্তে মিশে আছে মোদের রক্তের ঋণ
তাদের জন্য আজ আমাদের শপথ নেবার দিন |
ভুলবো না মোরা ভুলবো না
প্রতিরোধ মোদের থামবে না
প্রতিরোধের ভাষায় গর্জে উঠবে একদিন আকাশ বাতাস
ওই মহাকরণের অলিন্দে আজও আসল খুনীদের বাস
খুন করেও গর্ব করে যারা
বিচার হয় না যাদের
তাদের তরেই আমার লেখনী
সকলের দরবারে |
বামপন্থার নাম নিয়ে যারা করছে অত্যাচার
যাদের ঘরে জমা হয়ে আছে মৃত শহীদদের হাড়
তাদের তরে কে দেবে বিচার ?
কে হবে আজ গণতন্ত্রের পাহারাদার ?
অত্যাচারের বন্দুকের গুলির এক দিন হবে শেষ
সেদিন যেন আমরা না ভুলি শহীদদের
      রক্তের রেশ |
যাবার আগে বলে গেল যারা বন্দেমাতরম
এগিয়ে যাও বলে গেল যারা প্রাণ বাজি রেখে পণ
তাদের তরেই মোদের লড়াই
       জীবনমরণ পণ
তাই তাদের তরেই করবো না মোরা
       আত্মসমর্পণ
২১শে জুলাই অশ্রু সজল রক্তে লেখা নাম
শহীদ স্মরণে রইলো মোদের
       হাজার হাজার সেলাম ||

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
যবনিকা
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

কাব্যের প্রথম শ্রোতেই নিস্পন্দের স্পন্দন শুরু
স্পন্দিত মানবজীবনের বিয়োগান্ত নাটক
স্রোতের কল্লেলে লুক্কায়িত এক একটি
                             কল্লোলধ্বনি |
কাব্যের দ্বিতীয় স্রোতে মন্থর গতি পথ
রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিস্তব্ধ উদাসীর হাওয়া
শ্রান্ত ঝড়ের বেগে ধূমায়িত অল্প
                           অল্প মেঘের ঘটা |
কাব্যের তৃতীয় স্রোতে পড়ন্ত বেলায়
                            অস্ত যাওয়া
ক্ষণিকের হাসিকান্নার জাজ্জ্বল্যমান ধারায়
প্রবহমান দম্ভের যবনিকার তুলির
                               সমাপ্তি টান ||

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
গুছিয়ে নেওয়া
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়


অনেকেই ভাবি যত পারি গুছিয়ে নিই
সবই যেন ভোগের জন্য রাখা
ভোগের যেন কোন সীমারেখা নেই |
জীবন আর কত দিন ?
অচিরেই আসা, হঠাত্ চলে যাওয়া
তবু কেন মনোবৃত্তি এত ক্ষীণ
যতটুকু প্রয়োজন তাতো প্রশ্নাতীত
সম্ভবপূর্ণ চাহিদার অন্যায় নয়
তবে বেশী চাহিদার গোপন অশুভ সংকেত
বেশি ক্ষুধায় বেসামাল হলে লোভ আসবেই
আর লোভ সংবরণ না হলে বিপদ
অযথা আকাঙ্ক্ষা অন্যায় করতে সাহায্য করবেই |
লোভকে সংবরণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ
নিজেকে আগে সংবরণ করতে হবে
ত্যাগের তৃপ্তি, স্বর্গপ্রাপ্তি দেখাবে নূতন রাস্তা |
সবাইকে যখন যেতে হবে সমস্ত মায়া ভুলে
কেন শুধু গুছিয়ে নেওয়া ভবিষ্যতের তরে
এসেছি একা, যাবোও একা, থাকবে সব পড়ে |

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
রাস্তার ধুলো
কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

কেউ যখন ভাবে আমি রাস্তার পরিত্যক্ত ধুলো
মনে মনে ভাবি এটাই জীবনের সঠিক মূল্যায়ন
আমি পথের ধুলো হয়েই থাকতে চাই
আর রাস্তাতেই যেন আমার মৃত্যু হয়
কেউ আমাকে নিয়ে ভাবুক আমি চাই না
কারণ, কারো দয়াভিক্ষা আমার ধাতে সয় না |
রাস্তাই আমার নিশানা, আমার আস্তানা
নেই কোন জীবনের চিরস্থায়ী ঠিকানা
এই ভাবেই কাজ করতে করতে যেন রাস্তার কোণে
কোনদিন হয়তো আশ্রয় মিলবে চিরদিনের জন্যে |
অশ্রুসজল প্রতীক্ষা নয়, এ প্রতীক্ষা বাস্তব
রাস্তার ধুলোই হোক, ধুলোর মত সার্থক |
এই ধুলোতেই মিশে থাকবে অতি বাস্তব সত্য
কবে আসবে সেদিন মাগো, যবে হব শান্ত ?

.                  ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*.
তোমার নাম আমার নাম
কথা ও সুর - কবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কণ্ঠ - অসীম গিরি
নন্দীগ্রাম টু মেগাসিটি সিডির গান, ২০০৭।

গানটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন . . .        



তোমার নাম আমার নাম
রক্তেস্নাত নন্দীগ্রাম
হলদী নদী লাশে ভাসে
ধর্ষিত হয় ক্ষেতের ধান
নন্দীগ্রাম ও মা নন্দীগ্রাম
নন্দীগ্রাম মা গো নন্দীগ্রাম,
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম।

লড়াই চলছে চলবে
প্রতিবাদ চলছে চলবে
প্রতিরোধ চলছে চলবে
হিংশন জাগছে জাগবে
জনতা জাগছে জাগবে
দুশমনের বুক কাঁপিয়ে
মাটি জল জঙ্গল জাগবে
দুশমনের বুক কাঁপিয়ে
মাটি জল জঙ্গল জাগবে।

তোমার নাম আমার নাম
রক্তেস্নাত নন্দীগ্রাম
হলদী নদী লাশে ভাসে
ধর্ষিত হয় ক্ষেতের ধান
নন্দীগ্রাম ও মা নন্দীগ্রাম
নন্দীগ্রাম মা গো নন্দীগ্রাম,
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম।

স্বাধীনতা এনেছিলে তুমি
তেভাগার লাঙ্গল চুমি
স্বাধীনতা এনেছিলে তুমি
তেভাগার লাঙ্গল চুমি
ভূমিপুত্রের রক্তে রাঙানো মাগো
তুমি মোর জন্মদায়িনী
তুমি মোর জন্মদায়িনী
ভূমিপুত্রের রক্তে রাঙানো মাগো
তুমি মোর জন্মদায়িনী
তুমি মোর জন্মদায়িনী

নন্দীগ্রাম ও মা নন্দীগ্রাম
নন্দীগ্রাম মা গো নন্দীগ্রাম,
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম।

সকালের প্রত্যয় তুমি
তুমি দাও সূর্যের বহ্নি
সকালের প্রত্যয় তুমি
তুমি দাও সূর্যের বহ্নি
বিকালের গোধূলি আলোয়
মায়ের আঁচলখানি
তুমি মাতঙ্গিণী তুমি মাতঙ্গিণী
বীরাঙ্গণা মাতৃভূমী
বীরাঙ্গণা মাতৃভূমী

তোমার নাম আমার নাম
রক্তেস্নাত নন্দীগ্রাম
হলদী নদী লাশে ভাসে
ধর্ষিত হয় ক্ষেতের ধান
নন্দীগ্রাম ও মা নন্দীগ্রাম
নন্দীগ্রাম মা গো নন্দীগ্রাম,
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম
নন্দীগ্রাম হাজার সালাম।

.       ************************                 
.                                                                          
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর