আমার কথা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সবাই বলে লেখ লেখ . তোমার কথা লেখ | শুনে শুনে ইচ্ছে জাগে কেমন করে লিখবো তবে, সময় যখন সঙ্গে ছিল . তখন লিখি নাই | সবে বলে এখন তবে লেখ, এখন আমার বয়স হয়েছে স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে শব্দগুলি মনে এলে . তখনই হারিয়ে যায় | কেমন করে মালা গেঁথে সৃষ্টি করে নূতন ছাঁদে পুরানো সেই কথাগুলি . ছড়িয়ে দিই সভায় | যখন সবই ভুলে গেছি . এখন কিসের দায় | দেশের কথা দশের কথা মনে জাগায় বিষম ব্যথা ভুলে গিয়ে কোনক্রমে . থাকি নিরালায়| এই ভাবেতেই বাকি জীবন . কেটে যেন যায় |
অর্থাভাবে বিদ্যাদেবী বিমর্ষ বদন বিদ্যার্থীর শিরে করে অশ্রু বিসর্জন | পরনে বসন নাই পেটে শুধু ক্ষুধা বিদেশীর সুশাসনে ইহাই প্রতিষ্ঠা | জগৎ সভায় তারা অন্য কথা কয় ভারতকে সভ্য করা তাহাদের দায় |
অবশেষে একদিন যুদ্ধ বেঁধে গেল ইংল্যান্ডের অহংকার ধূলায় মিলালো, ভিক্ষাপাত্র হাতে বয়ে পশ্চিমেতে গেল | বদান্য মার্কিন জাতি কৃপাপরবশে ঋণজালে বদ্ধ করি অস্ত্র দিল শেষে | আমাদের জন্মভূমি হইল স্বাধীন বিদ্বেষের বিভেদের হইনু অধীন |
কোটি কোটি নরনারী নিঃস্ব রিক্ত বেশে জন্মভিটা ছাড়ি চলে গেল ঘোর নিরুদ্দেশে | অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কঠিন সাধনা কি জানি কী হবে তার জীবন যাপনা | দুইবেলা দুই মুঠি ক্ষুন্নিবৃত্তিতরে ঘুরিয়া ফিরিতে হইল দ্বার হতে দ্বারে |
বছর বছর ধরে এই মত চলে আনন্দ উচ্ছ্বল দিন সব গেছে ভুলে | স্মৃতি হতে যদি কিছু লিখিবারে চাই দুঃখের বিষাদ রাত্রি দেখিবারে পাই | বিভীষিকা ভরা নিশি নয়নেতে ভাসে আর্তের কান্নায় আর হিংস্রের উল্লাসে | আসমুদ্র হিমাচল হয় বিধুনিত নিঃশব্দে হারায়ে গেল প্রাণ কতশত | এই ব্যথা হৃদি মাঝে সদা জাগরুক তোমার মহিমাগীতি কী গাহিব বলো . ওগো বিশ্বভূপ |
অবক্ষয় কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
দশদিক শুধু দেখি হতাশায় ভরা অশান্তির বাড়াবাড়ি চিত্তক্ষুব্ধ করা | সমষ্টির আশ্রয় হারি ব্যাষ্টির জীবন ভাবে লাভ করিতেছি প্রতিক্ষণে ক্ষণ | ছোট ছোট পরিবার ইহাই দৃষ্টান্ত অবলুপ্ত প্রায় যৌথ পরিবার তন্ত্র | প্রাচীনেরা হইতেছে আশ্রয় বিহীন সমাজের অত্যাচার দয়ামায়াহীন | নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা কুটিল কৌশলে ধ্বংসের লীলায় মাতে নানা ছলেবলে | পরম প্রেমের জন হয়ে যায় পর গ্লানিকূপে পড়ে থাকে প্রবীণ প্রবর | এ লীলায় আইডেন্টিটি একখানি মুখ ধ্বংসের লীলায় যার পরম কৌতুক |
দাম্ভিক কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
দেখিলাম শুনিলাম সকলি বিস্ময় মনে ছিল জন্মিলাম করিবারে জয় | জগতের যাহা কিছু সম্মুখে আমার অগ্নিস্বাৎ করি আমি করি ছারখার | সেই মত চলিলাম দুর্দান্ত আবেশে সম্মুখে পর্বত সিন্ধু তরিলাম বেগে | আপামর জনতাকে করি ক্রীতদাস নিজেকে ইন্দ্রের রূপে করিনু প্রকাশ | পর্বত ভাঙিয়া পড়ে আমার ইচ্ছায় সমুদ্র উদ্বেলি এসে কর দিয়ে যায় | নিয়তির পরিহাস ললাটে লিখন কেমনে মানুষ তাহা করে উল্লঙ্ঘন | জরা সে একদিন অতি অসময়ে গর্ব্বোদ্ধত টুটিখানি ধরিল চাপিয়া অযুত হস্তীর বল যার গায়ে ছিল শত চেষ্টা করে তারে নড়াতে নারিল | ততদিনে বুঝিলাম কত অসহায় লম্ফ ঝম্ফ করিয়ছি কাহার লীলায় |
জিজ্ঞাসা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
অবোধ্য অভাববোধ, তাহার মূর্চ্ছনা আচ্ছন্ন করছে মোর সার্বিক চেতনা, কিসের অভাববোধ সেই তো অজানা সে কী অর্থের, সে কী ভোগ্যের অথবা অজানা কোন অতৃপ্ত কামনার ? প্রয়োজন মত অর্থের অকুলান দেখি না ভোগ্যপণ্যাভাব চিন্তা করে না বিড়ম্বনা খাদ্য অথবা পরিধেয় করে না বঞ্চনা | নয়নের দৃষ্টি শক্তি কুয়াশায় ঢাকা শ্রবণের প্রখরতা সেও তথৈবচ স্মৃতিশক্তি ডুবে গেছে অতল গভীরে | কীসের অভাববোধ ---উত্তর নাহিরে | অবাস্তব অতীন্দ্রিয় অভাব সকল কেন যে আমার সত্ত্বা করেছে দখল | সে কী সহানুভূতির অভাব অতিপ্রিয় পৃথিবীর বিরূপ মনোভাব নহে নহে নহে তাহা | তবে কি অন্তর্লীন জীবনের সুপ্ত অনুভূতি অথবা দৈবের সঙ্কেত, ঊর্ধাকাশে যাহার বসতি | অসহায় আমি কিছু বুঝিতে পারি না পীড়ন করিছে মোর যাবতীয় স্মৃতি কেমনে ঘটিবে মোর চৈতন্যে প্রশান্তি |
বিরহ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আগত এই পৃথিবীকে ছেড়ে যাবার ক্ষণ কত মায়া কত মোহ কত আকর্ষণ, মাস বর্ষ দিন অচ্ছেদ্য বন্ধনে মোরে রেখেছে বাঁধিয়া | পূর্বপুরুষের দেওয়া এ প্রাণ ত্যাজিয়া কোন পুরে চলে যাবো না পাই ভাবিয়া | মিছে এই ভাবনা, অন্য কোনও জীবজগত আছে কি আছে না | যুগযুগান্তর ধরে কত গবেষণা আজিও পায়নি ঠিকানা | সহস্র সহস্র বছরের হিন্দু জাতির বিশ্বাস এমন জগত রয়েছে--- নহে ইহা পরিহাস | নিশীথে নিদ্রার মাঝে যখন থাকে না কোনও বাস্তব চেতন অচেতনে দেখা দেয় অন্য কোন্ স্বপন | প্রতীতি কেমনে যেন অন্তরে পশিয়া অন্য জীবনের কথা যায় গো বলিয়া | এ জগতে কত ভাবে কত মতে মনুষ্য জীবন হিংসা দ্বেষ স্নেহ প্রীতি বাৎসল্যের অপূর্ব মিশ্রণ যখন ছাড়িয়া যাবো এই সব জীবন লক্ষন সেখানে একাকী পান্থ কেমনে সহিব এই বিরহ বেদন |
শৈশব স্মৃতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
মনে পড়ে শিশু কালের সকাল সন্ধ্যাবেলা ভাইবোন সবাই মিলে লুকোচুরি খেলা | ধরা পড়লে হয়ে যেত বিষম গণ্ডগোল চোখের জলে ভেসে যেত দুইখানি কপোল | ঠাকুমা পিসিমা এসে তুলে নিত কোলে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিত আর কেঁদো না বলে | রাত্রি বেলা দাদুর সাথে যেতাম আমরা শুতে গভীর ঘুমে লুটিয়ে যেতাম গল্প শুনতে শুনতে | কাকের ডাকে ঊষাকালে ঘুম যেতো ছুটে পড়াশুনার কঠিন ব্যায়াম ভালো লাগতো না মোটে | ন্যায়রত্ন আর কবিরাজ দাদুর আশীর্বাণী শুনেছি বারংবার | বড় হয়ে হবে দাদু জজসাহেব কি ব্যারিস্টার | দেশটা ভেঙে দুভাগ হ’ল, তখন কে কাহার, অন্তরে যে স্বপ্ন ছিল ভেঙে হ’ল চুরমার |
নদী আমার মা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
জন্ম হতে তাহার সাথে আমার জানা শোনা ঢেউ খেলানো তাহার বুকে নৌকা চড়ে যেতাম ছুটে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে নৌকা ছাড়া ছিল না উপায় | শীতের দিনে নদীর পাড়ে প্রতিদিনের হাট বাজারে কত রকম পন্য সম্ভার নিয়ে আসত নায় | নীল আকাশের প্রতিচ্ছায়া নদীর বুকে ধরতো কায়া আনন্দে মন উঠতো নেচে ঢেউ এর সাথে সাথে কতো মাছ ধরা পড়তো জালের মাঝে গেঁথে | বর্ষাকালে দেখতে পেতাম তাহার অন্যরূপ ভয়ে ভয়ে নৌকা চড়ে বুক করতো ধুকধুক | যাত্রীবীহী স্টিমার যখন চলত মাঝ নদী দিয়ে বড় বড় ঢেউ গুলো সব পাড়ে আসতো ধেয়ে ঘাটে বাঁধা ডিঙা গুলো সব হত ওলট পালট মাঝি মাল্লার চিৎকারেতে হতো বিস্ময় প্রকট বর্ষাকালে কূল ছাপিয়ে উজিয়ে এসে দিত ভরিয়ে খাল বিল মাঠ পুকুর বসতি আদি সব বাড়িগুলির দ্বীপের মতন হইতো উদ্ভব | কিন্ত হায় সে সব দিন হয়েছে অতীত মা আমাদের ছেড়ে দিল পরম বেদনাহত | দস্যু এসে তাড়িয়ে দিল মায়ের কোল হতে মায়ের স্মৃতি রয়ে গেল ভগ্ন হৃদয়েতে |