কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
কৈশোরের স্মৃতি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মনে পড়ে কৈশোরের কথা
তখন বেলা দ্বিপ্রহর বৈশাখের দিন |
তীব্র দাবদাহ যেন জ্বলন্ত অনল |
বাড়ির প্রবেশ পথে বিশাল পুকুর
নাম তার বাদামতলা
এক কালে ছিল সেথা বৃক্ষ এক খানা
বিশাল পরিধি লয়ে তাহার গুড়িটা
আজিও উদ্রেক করে সেকালের স্মৃতিটা |
সেই জলাশয়ে ছিল সকলের অধিকার
বাড়ির মানুষ আর গৃহে পোষা গবাদি পশুর |
নানা রকমের মাছ ছিল সে পুকুরে
মঝে মঝে ধরা হত জাল দিয়ে ঘিরে |
স্নানান্তে ভোজন অন্তে বই খাতা লয়ে
উপস্থিত হইতাম টানা পাখা শোভাকরা
.                      বৈঠকখানা ঘরে |
আম জাম লিচু আর জামরুল কাঁঠালের
ঘনছায়া সমন্বিত শীততাপ ঘর |
শালিক কাক ঘুঘুদের মিশ্র কলরব
ভঙ্গ করে দিত একমনে পাঠ বালকের
থেকে থেকে পক্ক আম্র লভিত ভূতল
কুড়ায়ে আনিয়া তাদের রাখিতাম পাশে |
গণিতের জট যখন কঠিন লাগিত
ভক্ষণে অমৃত ফল মনস্থির হত |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
ব্রহ্মাণ্ড
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


গ্রহ তারা রবি
কোটি কোটি নক্ষত্রের দল
সাথে লয়ে নিজ নিজ পরিজনে
ছুটিয়া চলেছে অনন্তের পানে
অবারিত গতি |
অদ্যাপি জানে না কেহ
কোথা তার আছে পরিসীমা
কোথা তার শেষ |
সৃষ্টিধর করেছেন গতির সঞ্চার
গ্রহ তারা সাথে মানুষের মাঝে
পণ্ডিতেরা জেনেছেন মনুষ্যই শ্রেষ্ঠ
সব সৃষ্টির সমাজে |
সেই গতি লভি নর মস্ত অহংকারী
আপনার গৃহদ্বার ছাড়ি
অজানা কোন্ অন্য লোকে দিতে চায় পাড়ি |
তারি সাক্ষ্য দেখি মোরা
গ্রহান্তর আভিযান প্রয়াসে |
চিত্ত ভরিয়া ওঠে ভবিষ্যৎ আশ্বাসে |
বিদ্যুতের গতি ওই গতির পরিমাণ
তদপেক্ষা দ্রুতগতি মানুষের মন
ষষ্ঠেন্দ্রীয় নিমেষে পৌঁছেতে পারে
সৃষ্টির ওপার |
অপরূপ সৃষ্টি বিধাতার
বৈজ্ঞানিক নিরন্তর করিছে সাধনা
বিদ্যুতের সমগতি লভিতে বাসনা
সেই কোন অনাদি ঊষাকাল হতে
ব্রহ্মাণ্ড চলিতেছে আপনার পথে
আজো নাই শেষ |
প্রশ্ন জাগে একদিন শেষ হবে মানবের গতি
ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রতম কণিকায় হবে পরিণতি |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
নশ্বর
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মরিয়া যাইবো আমি
কিন্তু যাইব কোথায়
এই দেহে এই মনে এই কায়ায় |
পঞ্চভূতে মিশে যাবে দেহটি আমার
মনের অস্তিত্ব তখন নহে তো জানায় |
শ্রাদ্ধ শান্তি হইবেক যথাযোগ্য ভাবে
সকলের দায় ভাগ মিটিবে এভাবে |
সকলি নশ্বর বস্তু বলে বিজ্ঞজনে
আত্মায় বার্ধক্য নেই তাদের বয়ানে |
আত্মা বস্তু নয়, বিবেক নয়, নহে তো কল্পনা
অনুভব মাত্র তাহা সাধকের জানা |
নহি আমি সাধক বা নহি বিজ্ঞজন
অজ্ঞতার অন্ধকারে আছি সর্বক্ষণ |
অতএব যতদিন মৃত্যু নাহি আসে
এই পৃথিবীতে থাকি তোমাদের পাশে |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কৃপা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


তোমার অনেক কৃপা
বেঁচে আছি আমি |
অবশেষে হয়েছি
তোমার অনুগামী |
কতশত আধিব্যাধি
আমায় ঘিরেছিল |
বড়বড় ডাক্তার বৈদ্য
এলো আর গেলো |
কবরেজ মহাশয়ের
পাঁচন নৈপুন্যে
যমরাজ পালালো |
মাঝে মাঝে চেষ্টায় তার
কসুর ছিল না |
দৈবের নির্বন্ধে কোন
অঘটন ঘটল না |
অবশেষে এ জীবনে আসিলেন তিনি
হয়ে সীমন্তিনী |
নিঃশঙ্ক অন্তরে শুরু হল অভিসার
জীবনের পথে
তুচ্ছ করি বাধাবিঘ্ন যত কিছু আর
.                     দৃপ্ত মনোরথে |
দোসর বন্ধুর মত তাহার জীবন
মিশে গেল এ জীবনে
.                      বন্ধুর মতন |
আজিকে যখন তিনি ছোঁয়ার বাহিরে
তুমি ছাড়া হে প্রভু অন্য
.                       আশ্রয় নাহিরে |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
বিধাতা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


হে বিধাতা
মানুষকে দানিয়াছ বিদ্বেষের বিষ
যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষে মানুষে
শুধু দ্বন্দ্ব অহর্নিশ |
এরূপ না হইলে সৃষ্টি হইতো সুন্দর
কেহ না চাইতো যেতে স্বপ্ন স্বর্গপুর
চিন্তামুক্ত হইতেন দেব পুরন্দর |
ভুলিব না ভুলিব না তোমার ছলনা
প্রেমের নতুন পৃথ্বী করিব রচনা
অস্ত্র-শস্ত্র যত কিছু অ্যাটোমবোমা আদি
সকলি তোমার পায়ে দিয়া উপহার
স্বর্গ গড়িব হেথা কহিলাম সার |
আসলে তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি মোরা
সৃষ্টি কর্তা নাম যদি রক্ষিবারে চাও
.                     করো না ছলনা |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মুক্তির আশা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


বন্দীজীবন কাটতে চায় নারে
বিধির বিধান ভাঙবো কেমন করে |
পড়তে গেলে লাগে
চলতে গেলে বাঁধে
ভাবতে গেলে মাথার ব্যথা
.                    টনটনিয়ে ওঠে
অক্ষমতার বেদনাবোধ
.                     হৃদয়ে ঢেউ তোলে |
বাহির হয়েছি কোন্ সে কৈশোরে
.                      গৃহাঙ্গন ছেড়ে
ফিরে তাকাইনি পিছে
.                       পৌষে কিম্বা আষাঢ়ে
এই পৃথিবীর এমন দশা
.                        কতদিন আর চলবে |
মুক্তির আলো কবে কোথায়
.                         কেমন করে আসবে |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
শক্তিমান
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


ওই শোনা যায় তার ডঙ্কা
মোর মনে জাগায় না শঙ্কা |
আমি তারে বরণ করতে চাই |
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নয়
আপনার শক্তিবলে করে যাব জয়
আজো কুটিলগামী শক্তি সমুদয়
গোপনে চাহিছে মোরে
.                        করিবারে ক্ষয় |
অটুট প্রত্যয় মোরে করিছে নির্ভিক
ওই সব যন্ত্রীদের চেষ্টামাত্র ধিক |
একদিন তারা সবে জানিবে নিশ্চিত
দুর্বল নহিগো আমি নহি বিড়ম্বিত |
যাবার বেলা আমি তাদের করে যাব ক্ষমা
মুছে যাক ধুয়ে যাক তাহাদের
.                        হৃদয় কালিমা |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
দুঃখ
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


দুঃখ জ্বালা সইতে হবে নইলে মুক্তি আসবে কবে
দুঃখানলে দগ্ধ হয়ে দহনজ্বালা সয়ে সয়ে
সবকিছুর অনুভূতি হয়ে যাবে শেষ
তখনি বুঝিবে এলো অন্তিম নিমেষ |
হারায়েছ যারে—
অশ্রুপাতে বাঁধিও না তাহার আত্মারে |
কাছে আছেন যিনি, নিশ্চিন্তে মহাসুখে
.                        থাকিতে দাও তারে
অকলিত ব্যথা, না পাওয়ার বেদনা
.                        জানাবে না কাহারে |
মন করি স্থির অসীম অনন্তলোকে
সব ইচ্ছা সব সাধনাই উত্সর্গ করো তাকে |
দুঃখে তবে না স্পর্শিবে তোমার অন্তর
শান্তিতে স্বস্তিতে পাবে নব জন্মান্তর |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কালের গতি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


কালের কুটিল লীলা কে বর্ণিতে পারে |
হৃদয়ের গহন কুঠরি হতে বাহিরিয়া আনে |
অন্তরতম মনের বিরহের ব্যথা |
শনৈঃ শনৈঃ প্রলেপ মাখায়ে দেয় ক্ষতস্হানে |
বিশ্বের বিরহী জনে সংসারে বাঁধিয়া রাখে
.                                দুচ্ছেদ্য বন্ধনে
নিরবধি কাল আর বুদবুদের মতন
ক্ষণস্থায়ী মনুষ্যজীবন |
তথাপি করাল কালের হাতে
.                     মুক্তি পায় কোনজন |
আছে আছে বিশ্ব মাঝে দুই একজন
.                                মহাজন |
কালাতীত হয়ে তারা করে বিচরণ
অশেষ আনন্দ যেথা চিরবিদ্যমান
তিলমাত্র  দুঃখ শোকের নাই যেথা স্থান
প্রায় দুর্লভ্য কিন্তু সেই তীর্থস্থান |
চিরশান্তি বিরাজিত অমৃত সাগরে
তাকে পূজিলাম আমি
.                      শত নমস্কারে |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কুহকিনী আশা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


নীরবে নিভৃতে যখনি যেখানে থাকি
হৃদয় মাঝারে কত পুরাতন কথা
.           থেকে থেকে দেয় উঁকি |
তারা কেহ বা হাসায় কেহ বা কাঁদায়
.        কেহ দেয় শুধু ব্যথা
আবার কেহ বা স্মৃতি হতে টেনে আনে
.        জীবনের কত কথা |
জীবনের শেষ লগ্নে কোনো আশা নাই---
আশাহত হয়ে আমি জীবন কাটাই |
কত আশা ছিল মনে আগমনি দিনে
গড়িব সুন্দর করে এই পৃথিবীরে |
স্বার্থ আর আত্মসুখ এই দুয়ে মিলে
বেষ্টন করেছে যেন ঊর্ননাভ জালে |
প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের মাঝে
শুষ্ক মরুভূমি মোর অন্তরে বিরাজে |

.              ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*