কৈশোরের স্মৃতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
মনে পড়ে কৈশোরের কথা তখন বেলা দ্বিপ্রহর বৈশাখের দিন | তীব্র দাবদাহ যেন জ্বলন্ত অনল | বাড়ির প্রবেশ পথে বিশাল পুকুর নাম তার বাদামতলা এক কালে ছিল সেথা বৃক্ষ এক খানা বিশাল পরিধি লয়ে তাহার গুড়িটা আজিও উদ্রেক করে সেকালের স্মৃতিটা | সেই জলাশয়ে ছিল সকলের অধিকার বাড়ির মানুষ আর গৃহে পোষা গবাদি পশুর | নানা রকমের মাছ ছিল সে পুকুরে মঝে মঝে ধরা হত জাল দিয়ে ঘিরে | স্নানান্তে ভোজন অন্তে বই খাতা লয়ে উপস্থিত হইতাম টানা পাখা শোভাকরা . বৈঠকখানা ঘরে | আম জাম লিচু আর জামরুল কাঁঠালের ঘনছায়া সমন্বিত শীততাপ ঘর | শালিক কাক ঘুঘুদের মিশ্র কলরব ভঙ্গ করে দিত একমনে পাঠ বালকের থেকে থেকে পক্ক আম্র লভিত ভূতল কুড়ায়ে আনিয়া তাদের রাখিতাম পাশে | গণিতের জট যখন কঠিন লাগিত ভক্ষণে অমৃত ফল মনস্থির হত |
ব্রহ্মাণ্ড কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
গ্রহ তারা রবি কোটি কোটি নক্ষত্রের দল সাথে লয়ে নিজ নিজ পরিজনে ছুটিয়া চলেছে অনন্তের পানে অবারিত গতি | অদ্যাপি জানে না কেহ কোথা তার আছে পরিসীমা কোথা তার শেষ | সৃষ্টিধর করেছেন গতির সঞ্চার গ্রহ তারা সাথে মানুষের মাঝে পণ্ডিতেরা জেনেছেন মনুষ্যই শ্রেষ্ঠ সব সৃষ্টির সমাজে | সেই গতি লভি নর মস্ত অহংকারী আপনার গৃহদ্বার ছাড়ি অজানা কোন্ অন্য লোকে দিতে চায় পাড়ি | তারি সাক্ষ্য দেখি মোরা গ্রহান্তর আভিযান প্রয়াসে | চিত্ত ভরিয়া ওঠে ভবিষ্যৎ আশ্বাসে | বিদ্যুতের গতি ওই গতির পরিমাণ তদপেক্ষা দ্রুতগতি মানুষের মন ষষ্ঠেন্দ্রীয় নিমেষে পৌঁছেতে পারে সৃষ্টির ওপার | অপরূপ সৃষ্টি বিধাতার বৈজ্ঞানিক নিরন্তর করিছে সাধনা বিদ্যুতের সমগতি লভিতে বাসনা সেই কোন অনাদি ঊষাকাল হতে ব্রহ্মাণ্ড চলিতেছে আপনার পথে আজো নাই শেষ | প্রশ্ন জাগে একদিন শেষ হবে মানবের গতি ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রতম কণিকায় হবে পরিণতি |
নশ্বর কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
মরিয়া যাইবো আমি কিন্তু যাইব কোথায় এই দেহে এই মনে এই কায়ায় | পঞ্চভূতে মিশে যাবে দেহটি আমার মনের অস্তিত্ব তখন নহে তো জানায় | শ্রাদ্ধ শান্তি হইবেক যথাযোগ্য ভাবে সকলের দায় ভাগ মিটিবে এভাবে | সকলি নশ্বর বস্তু বলে বিজ্ঞজনে আত্মায় বার্ধক্য নেই তাদের বয়ানে | আত্মা বস্তু নয়, বিবেক নয়, নহে তো কল্পনা অনুভব মাত্র তাহা সাধকের জানা | নহি আমি সাধক বা নহি বিজ্ঞজন অজ্ঞতার অন্ধকারে আছি সর্বক্ষণ | অতএব যতদিন মৃত্যু নাহি আসে এই পৃথিবীতে থাকি তোমাদের পাশে |
কৃপা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তোমার অনেক কৃপা বেঁচে আছি আমি | অবশেষে হয়েছি তোমার অনুগামী | কতশত আধিব্যাধি আমায় ঘিরেছিল | বড়বড় ডাক্তার বৈদ্য এলো আর গেলো | কবরেজ মহাশয়ের পাঁচন নৈপুন্যে যমরাজ পালালো | মাঝে মাঝে চেষ্টায় তার কসুর ছিল না | দৈবের নির্বন্ধে কোন অঘটন ঘটল না | অবশেষে এ জীবনে আসিলেন তিনি হয়ে সীমন্তিনী | নিঃশঙ্ক অন্তরে শুরু হল অভিসার জীবনের পথে তুচ্ছ করি বাধাবিঘ্ন যত কিছু আর . দৃপ্ত মনোরথে | দোসর বন্ধুর মত তাহার জীবন মিশে গেল এ জীবনে . বন্ধুর মতন | আজিকে যখন তিনি ছোঁয়ার বাহিরে তুমি ছাড়া হে প্রভু অন্য . আশ্রয় নাহিরে |
বিধাতা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
হে বিধাতা মানুষকে দানিয়াছ বিদ্বেষের বিষ যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষে মানুষে শুধু দ্বন্দ্ব অহর্নিশ | এরূপ না হইলে সৃষ্টি হইতো সুন্দর কেহ না চাইতো যেতে স্বপ্ন স্বর্গপুর চিন্তামুক্ত হইতেন দেব পুরন্দর | ভুলিব না ভুলিব না তোমার ছলনা প্রেমের নতুন পৃথ্বী করিব রচনা অস্ত্র-শস্ত্র যত কিছু অ্যাটোমবোমা আদি সকলি তোমার পায়ে দিয়া উপহার স্বর্গ গড়িব হেথা কহিলাম সার | আসলে তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছি মোরা সৃষ্টি কর্তা নাম যদি রক্ষিবারে চাও . করো না ছলনা |
শক্তিমান কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
ওই শোনা যায় তার ডঙ্কা মোর মনে জাগায় না শঙ্কা | আমি তারে বরণ করতে চাই | যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নয় আপনার শক্তিবলে করে যাব জয় আজো কুটিলগামী শক্তি সমুদয় গোপনে চাহিছে মোরে . করিবারে ক্ষয় | অটুট প্রত্যয় মোরে করিছে নির্ভিক ওই সব যন্ত্রীদের চেষ্টামাত্র ধিক | একদিন তারা সবে জানিবে নিশ্চিত দুর্বল নহিগো আমি নহি বিড়ম্বিত | যাবার বেলা আমি তাদের করে যাব ক্ষমা মুছে যাক ধুয়ে যাক তাহাদের . হৃদয় কালিমা |
কালের গতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
কালের কুটিল লীলা কে বর্ণিতে পারে | হৃদয়ের গহন কুঠরি হতে বাহিরিয়া আনে | অন্তরতম মনের বিরহের ব্যথা | শনৈঃ শনৈঃ প্রলেপ মাখায়ে দেয় ক্ষতস্হানে | বিশ্বের বিরহী জনে সংসারে বাঁধিয়া রাখে . দুচ্ছেদ্য বন্ধনে নিরবধি কাল আর বুদবুদের মতন ক্ষণস্থায়ী মনুষ্যজীবন | তথাপি করাল কালের হাতে . মুক্তি পায় কোনজন | আছে আছে বিশ্ব মাঝে দুই একজন . মহাজন | কালাতীত হয়ে তারা করে বিচরণ অশেষ আনন্দ যেথা চিরবিদ্যমান তিলমাত্র দুঃখ শোকের নাই যেথা স্থান প্রায় দুর্লভ্য কিন্তু সেই তীর্থস্থান | চিরশান্তি বিরাজিত অমৃত সাগরে তাকে পূজিলাম আমি . শত নমস্কারে |
কুহকিনী আশা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
নীরবে নিভৃতে যখনি যেখানে থাকি হৃদয় মাঝারে কত পুরাতন কথা . থেকে থেকে দেয় উঁকি | তারা কেহ বা হাসায় কেহ বা কাঁদায় . কেহ দেয় শুধু ব্যথা আবার কেহ বা স্মৃতি হতে টেনে আনে . জীবনের কত কথা | জীবনের শেষ লগ্নে কোনো আশা নাই--- আশাহত হয়ে আমি জীবন কাটাই | কত আশা ছিল মনে আগমনি দিনে গড়িব সুন্দর করে এই পৃথিবীরে | স্বার্থ আর আত্মসুখ এই দুয়ে মিলে বেষ্টন করেছে যেন ঊর্ননাভ জালে | প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের মাঝে শুষ্ক মরুভূমি মোর অন্তরে বিরাজে |