কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
সন্ধ্যা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


সমাগত সন্ধ্যালগ্ন দিক চক্রবালে
সূর্যের রক্তিম টিকা সন্ধ্যায় কপালে |
সূর্যাস্তের লাল আভা দেহখানি মোর
রাঙায়ে দিয়াছে, জলদ গম্ভীর স্বরে
কার আবির্ভাব হ’ল, দেখিনু অদূরে
ভয়ঙ্কর দিব্যজ্যোতি দন্ড কাঁধে লয়ে
যমদেব দাঁড়াইয়া আমার সম্মুখে |
শুধাইলাম আগমন প্রভু অসময়ে কেন |
বজ্রনিনাদিত কন্ঠে কহিলেন তিনি
সময় হয়েছে শেষ চলত এক্ষনি |
জীবনের সব প্রাপ্তি হয়ে গেছে শেষ
বাকি কিন্তু নাহি আর একটি নিমেষ |
যুক্তপানি হয়ে তারে কহিলাম ---প্রভু
জীবনে সামান্য কিছু বাকি আছে তবু |
দুই একটি মরুদ্যান আছে বর্তমান
সেই খানে জীবনের করিব সন্ধান |
তারপরে ছেড়ে দেব এ ঘোর সংসার
জীবনের ভিক্ষা আমি চাহিব না আর |
কৃপাপরবশ হয়ে কহিলেন তিনি
দুই চারিদিনমাত্র রাখিবারে পারি |
জিজ্ঞাসিলাম ক্ষমা করো যদি বলে যাও
মরণের পরপারে আছে নাকি সময়ের গতি
তখনি অদৃশ্য দেখি যমপুরী পতি |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মুক্তিপথ
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মুক্ত হল পথ মুক্তি পেল রথ
রুদ্ধ হ’ল জীবনের যত মনোরথ |
সম্মুখে বিরাজে এক সুদীর্ঘ শর্বরী
আঁধার আঁধারময় সেই বিভাবরী |
সঙ্গী কেহ নাহি সেথা
মহামৌণ শূন্যতায় আমি শুধু একা |
এ জীবনে যারা সব ছিল চারিপাশে
বিধির নিয়মে তারা হারাইয়া গেছে |
শুনিয়াছি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়
মহাবিশ্ব নিয়ন্তার অবস্থান হয় |
দেখিতে স্পর্শিতে তারে কেহ নাহি পারে
এই মত তত্ত্বকথা মুণিজন কয়
কেমনে চিনিব তোমা দাও পরিচয় |

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অশনি সম্পাত
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মধুময় এ জীবন মধুময় ধরণীর ধূলি |
বর্তমানে একথাটি সত্য বলে
.                     কেমন করে মানি |
এ ধরার কোণে কোণে
.                     যে আছে যেথায়
স্বার্থ আর ভোগ নিয়ে নিয়তই
.                      রত তারা দ্বন্দ্ব মত্ততায় |
ইঞ্চিমাত্র স্থান ছাড়িবার
.                       প্রবৃত্তিই নাই তাহাদের
বিন্দুমাত্র অধিকার
.                       যেন ইন্দ্রত্ব স্বর্গের |
কেমনে করিবে পরিহার |
.                        দিনে দিনে চারিদিকে
শুনিতেছি যুদ্ধের হুঙ্কার
.                        শক্তির আস্ফালন আর
.                        আর্তের চীত্কার |
বর্ণে-বর্ণে জাতিতে জাতিতে
.                         বিরোধের নিত্য সূত্রপাত
ধ্বংস অবশেষ পৃথিবীর পরিণতি
.                        শুনিতেছি অশনি সম্পাত |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
জন্মভিটা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


জীবন সায়াহ্নে এসে কেঁদে ওঠে হিয়া
শৈশবের স্মৃতি মাখা বাড়িখানি নিয়া |
কত যত্নে তৈরী করা পূর্বপুরুষদের
সাক্ষী বহন করে সৃষ্টি নৈপুণ্যের |
বিশাল সেই বাড়িখানি গড় দিয়ে ঘেরা
দুই পার্শ্বে হিজলবন দৃষ্টিরোধ করা |

দিনের আলোর তথায় প্রবেশ নিষেধ |
চৈত্রমাসে হিজলবন ফুলে ফুলে লাল
চোখ গেল বৌ কথা কও আরো কত পাখিদের
.                        ছিল নিবাস স্থল |
মৌমাছিদের গুনগুনানি শোনাত
.                        ঘুম পাড়ানি গান |
মাছরাঙা, কাক-কোকিল আর ভুতুম প্যাঁচা
সকলের সাথে ছিলাম সখ্যসূত্রে গাঁথা |
মাছের ভাণ্ডার ছিল অতি অপর্যাপ্ত
বাঘ শেয়াল পাখিদের সম্বত্সরের খাদ্য |

আম জাম নারিকেল লিচু ও কাঠাল
আরো কত কত ফল, ছিল জামরুল
রসনার তৃপ্তি দিতে করিত না ভুল |
গোয়াল ভরা গরু বাছুর দৃষ্টি নন্দন করা
এদের সাথে আত্মীয় বন্ধন কভু যেতো না ছেঁড়া |
যেদিন কোন গাইয়ের বাচ্চা প্রসব হত
আমাদের আনন্দের বন্যা বয়ে যেত |

এমন করেই আনন্দেতে কাটতো মোদের দিন
দেশভাগ হয়ে গেল-নামলো বিষম দুর্দিন
শান্তির আগার ছেড়ে সব কিছু ফেলে
এক বস্ত্রে চলে এলাম জীবন ধারণ
.                    আর মানরক্ষার তরে |
কীযে সব হয়ে গেল
.                     শান্ত শিষ্ট প্রজা সকলে
অল্পদিনেই নাম লেখালো বর্গীর দলে |
চৌদ্দপুরুষের বাড়ি, শান্তির আবাস
ত্যাগ করে বরিলাম দারিদ্র
.                      আর নানাবিধ ক্লেশ |
অদ্যাপিও মনে সদা জাগরুক মাতৃভূমি
.                      জন্মভূমি সেই ফেলে আসা দেশ |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
আত্ম সমীক্ষা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


দুঃখ বেদনা ভরা তুচ্ছ এ জীবন |
বিধাতার দান সেথা অতীব কৃপণ |
সুস্বাস্থ্যের আশীর্বাদ জোটেনি কখন |
শিশুকাল হতে নানা রোগ আর ব্যাধি
নিশিতে আশ্রয় ভেবে আমাতেই হয়েছে সংহতি |
কতবার যমদূতে দেখিয়াছি অতি সন্নিকটে |
অদৃশ্য কাহার হস্ত তরিয়াছে কঠিন সঙ্কটে |
বিদ্যার্থীর পথ হয় নাই কদাপি সুগম
বারংবার বাঁধা এসে ঝরায়েছে তপ্ত অশ্রজল |
দেশের অবস্থা তখন অতীব জটিল
অর্থাভাবে বিদ্যাপথ হয়েছে কুটিল |
পিতামহের স্নেহপাশে তরিয়েছি সে কুটিল পথ |
মেধাবী শিক্ষার্থী বলে মোর পরিচয় |
আমাকে দিয়াছে শক্তি, করিবারে জয়
যতেক বিপত্তি বাধা, সঙ্গে ছিল দৃপ্ত মনোরথ |
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চালাবার কালে
মোক্ষম আঘাত নামে মোর শিরোপরে |
জীবনে চলার পথ হয নাই কুসুমে আস্তীর্ণ
পাকদণ্ডী সেই পথ, আজিকে হয়ে গেছে চূর্ণ |
চাকুরীতে যবে থেকে হইনু আসীন
অন্য এক উপদ্রব যাহা অর্থহীন
আমার এ দেহমন করিল আশ্রয়
বুঝিতে নারিনু কিভাবে করিতে হয়
ক্ষমতাবানদের সন্তোষবিধান
সেটা অন্ধভাবে তাহাদের আদেশ পালন
অথবা অনুগত হয়ে শুনাইয়া সুমিষ্ট বচন |
তোষামোদে অনেকেই বিগলিত হন |
ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন দুই একজন
জীবনের শেষ শ্রদ্ধা তাহাদের করি নিবেদন |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
যমের দুয়ার
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মৃত্যু, তোমাকে আমার নাই কোনও ডর
ছোট ছোট ভাইবোনেদেরে নিয়ে গেছো
.                        তোমার আগারে
অবশেষে জীবনের সঙ্গিনীকে নিয়ে গেলে
.                        অতি চুপিসারে |
একাকী করিয়া দিলে আমাকে সংসারে |
শত চেষ্টা করিয়াও পার নাই
.                        আমাকে করিতে হরণ |
অনিবার্য তুমি, বারে বারে পরাজয়
.                        করিলে বরণ |
তোমার হুঙ্কারে আমি নিঃশঙ্ক হৃদয়
প্রতিবাদ জানাইতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ অতিশয় |
তোমার আলয়ে আমি যাইবো হাঁটিয়া
যখন সময় হবে সুযোগ বুঝিয়া |
তোমার ওই নিকেতনে রাখিও প্রস্তুত
যাত্রীবাহী রথখানা করি সুসজ্জিত |
স্বর্গ ধামে দেখাইব সাক্ষ্য-সাবুদ
কত অন্যায় করিয়াছ নিষ্পাপ
.                        প্রাণগুলি নিয়া |
এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোমাকেই
.                        করিতে হইবে
পরজন্মে উহাদের দীর্ঘ জীবন দিয়া |
অন্যথায় দিব্যধাম বাসীদের
.                        কলঙ্ক রটিবে ||

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
প্রার্থনা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


ওগো মাতা বাগ্দেবী, ওগো চিন্ময়ী
.                আমার প্রণাম গ্রহণ করো |
অনুমতি দাও তুচ্ছ প্রার্থনা এক করি নিবেদন
এমন সাধ্য নাই উপযুক্ত উপাচারে তোমায়
.                                   করিব বরণ |
ভাষায় আমার দখল নাই |
জানি না কোন্ ভাষাতে তোমায় করব আমন্ত্রণ |
ক্ষমা করো মাগো আমার অক্ষমতার কারণ
.                       তোমার কাছে আমার এ মিনতি |
কৃপা করে দাও গো মোরে
দু একটা কবিতা লেখার শকতি
বিশ্বজন পায় যেন তায় কাব্য রসের আস্বাদন |
সে রসে বঞ্চিত আমি --- এক অভাজন |
মিলমিলাইয়া ছন্দ নিরাশ করা
অভিজ্ঞতার নিরিখে লিখেছি কয়েকটা ছড়া |
এতে কারো মন ভরে না
বিজ্ঞজনে করে বিরূপ আলোচনা
সরস লেখার অক্ষমতার বেদনা
দূর করে দেয় অন্য লেখার ভাবনা |
তোমার দয়ায় মাগো মহা মূর্খ কালিদাস
বিশ্বসেরা মহাকবি রূপে পেয়েছেন প্রকাশ |
সহস্রবর্ষের তার কাব্য রস সুধা
বিশ্ব সাহিত্যের দলে হয়েছে পুরধা |
আমি অতি ক্ষুদ্র ব্যক্তি অত লোভ নাই
যদিও বর দাও মাগো দুয়েকটা কবিতা শুনাই |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অলৌকিক
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


আমার কাছে অনেকেই
.          যাচ্ ঞা করে কবিতা |
মনের মধ্যে যোগান নাই কেমন করে
.                             লিখি তা,
জোর করে কখনো যদি লিখতে বসি
উলট পালট ভাবনা এসে
.            দখল করে মূলকথা |
হাওয়া এসে নিভিয়ে দেয়
.            লেখার ঘরের প্রদীপটা,
এমন করেই বাধা পড়ে
.            কবি হবার প্রচেষ্টা |
ঘুমের ঘোরে গভীর রাতে
.      কী জানি কি কাহার হাতে
পূর্ণতা পায় অলেখা সেই কবিতা |
বিস্ময়ে তাই সকাল হলে
.             চক্ষু মেলে কৌতূহলে
কেমন করে এমন হল
.             বুঝতে নাহি পারি তা |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কবিতার জন্ম
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


কবিতার জন্মকথা কে শুনিতে চায়
সেই আদিযুগ হতে কাব্য কবিতায়
মানুষ পেয়েছে তার অন্তরের কথা
মানব ও মানবীর প্রেমের বারতা |
মিলনের বিরহের আনন্দ বেদনা
কত পাঠকের মনে দিয়েছে সান্ত্বনা |
কবিতার উত্সমুখ নহে তো সুখের
ক্রৌঞ্চের করুণ কথা চরণ দুঃখের
গীতিরূপে প্রকাশিল রামায়ণ গানে
অশ্রুজল এলো নেমে শ্রাবণ বর্ষেণে !
নিষ্ঠুর ব্যাধের এক সচকিত প্রাণে
ক্রৌঞ্চ শোক মূর্ত হল সীতার জীবনে |
তদবধি সহস্র সহস্র কবি কবিতা সঙ্গীতে
করুণ রসের স্রোত বহাইল এই ধরণীতে |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
নশ্বরতা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


হে বিধাতা এক নিবেদন আছে তোমার কাছে
আমায় যারা ঘিরে আছে
তাদের করো রক্ষে |
সময় হয়েছে নিকট আমার
.                বিদায় নেবার
অশ্রু সজল চক্ষে |
তোমার কঠোর নিয়ম মেনে
.                আমায় যেতে হবে
একই নিয়ম চিরকালই চলেছে আর চলবে
সৃষ্টির প্রথম ঊষার অরুণ লগন থেকে |
সকলেই চলে যায়--- যারা পড়ে থাকে
চিরকাল বাঁচবে তারা অক্ষত পুরাতন দেহে
.                নহে নহে নহে |
এ বিশ্বাসে হে বিধাতা
.                করো তাদের উদ্ধুদ্ধ
নইলে তোমায় স্মরণ করা
.                হবে তাদের অসাধ্য |
ভাগ্যিস আমি বৃদ্ধকালে
বুঝেছি এই সার কথা
তাইতো তোমার শরণ নিলাম
যতই বুকে বাজুক ব্যথা |

.                 ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*