সন্ধ্যা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সমাগত সন্ধ্যালগ্ন দিক চক্রবালে সূর্যের রক্তিম টিকা সন্ধ্যায় কপালে | সূর্যাস্তের লাল আভা দেহখানি মোর রাঙায়ে দিয়াছে, জলদ গম্ভীর স্বরে কার আবির্ভাব হ’ল, দেখিনু অদূরে ভয়ঙ্কর দিব্যজ্যোতি দন্ড কাঁধে লয়ে যমদেব দাঁড়াইয়া আমার সম্মুখে | শুধাইলাম আগমন প্রভু অসময়ে কেন | বজ্রনিনাদিত কন্ঠে কহিলেন তিনি সময় হয়েছে শেষ চলত এক্ষনি | জীবনের সব প্রাপ্তি হয়ে গেছে শেষ বাকি কিন্তু নাহি আর একটি নিমেষ | যুক্তপানি হয়ে তারে কহিলাম ---প্রভু জীবনে সামান্য কিছু বাকি আছে তবু | দুই একটি মরুদ্যান আছে বর্তমান সেই খানে জীবনের করিব সন্ধান | তারপরে ছেড়ে দেব এ ঘোর সংসার জীবনের ভিক্ষা আমি চাহিব না আর | কৃপাপরবশ হয়ে কহিলেন তিনি দুই চারিদিনমাত্র রাখিবারে পারি | জিজ্ঞাসিলাম ক্ষমা করো যদি বলে যাও মরণের পরপারে আছে নাকি সময়ের গতি তখনি অদৃশ্য দেখি যমপুরী পতি |
মুক্তিপথ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
মুক্ত হল পথ মুক্তি পেল রথ রুদ্ধ হ’ল জীবনের যত মনোরথ | সম্মুখে বিরাজে এক সুদীর্ঘ শর্বরী আঁধার আঁধারময় সেই বিভাবরী | সঙ্গী কেহ নাহি সেথা মহামৌণ শূন্যতায় আমি শুধু একা | এ জীবনে যারা সব ছিল চারিপাশে বিধির নিয়মে তারা হারাইয়া গেছে | শুনিয়াছি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময় মহাবিশ্ব নিয়ন্তার অবস্থান হয় | দেখিতে স্পর্শিতে তারে কেহ নাহি পারে এই মত তত্ত্বকথা মুণিজন কয় কেমনে চিনিব তোমা দাও পরিচয় |
জন্মভিটা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “জীবনের খেয়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
জীবন সায়াহ্নে এসে কেঁদে ওঠে হিয়া শৈশবের স্মৃতি মাখা বাড়িখানি নিয়া | কত যত্নে তৈরী করা পূর্বপুরুষদের সাক্ষী বহন করে সৃষ্টি নৈপুণ্যের | বিশাল সেই বাড়িখানি গড় দিয়ে ঘেরা দুই পার্শ্বে হিজলবন দৃষ্টিরোধ করা |
দিনের আলোর তথায় প্রবেশ নিষেধ | চৈত্রমাসে হিজলবন ফুলে ফুলে লাল চোখ গেল বৌ কথা কও আরো কত পাখিদের . ছিল নিবাস স্থল | মৌমাছিদের গুনগুনানি শোনাত . ঘুম পাড়ানি গান | মাছরাঙা, কাক-কোকিল আর ভুতুম প্যাঁচা সকলের সাথে ছিলাম সখ্যসূত্রে গাঁথা | মাছের ভাণ্ডার ছিল অতি অপর্যাপ্ত বাঘ শেয়াল পাখিদের সম্বত্সরের খাদ্য |
আম জাম নারিকেল লিচু ও কাঠাল আরো কত কত ফল, ছিল জামরুল রসনার তৃপ্তি দিতে করিত না ভুল | গোয়াল ভরা গরু বাছুর দৃষ্টি নন্দন করা এদের সাথে আত্মীয় বন্ধন কভু যেতো না ছেঁড়া | যেদিন কোন গাইয়ের বাচ্চা প্রসব হত আমাদের আনন্দের বন্যা বয়ে যেত |
এমন করেই আনন্দেতে কাটতো মোদের দিন দেশভাগ হয়ে গেল-নামলো বিষম দুর্দিন শান্তির আগার ছেড়ে সব কিছু ফেলে এক বস্ত্রে চলে এলাম জীবন ধারণ . আর মানরক্ষার তরে | কীযে সব হয়ে গেল . শান্ত শিষ্ট প্রজা সকলে অল্পদিনেই নাম লেখালো বর্গীর দলে | চৌদ্দপুরুষের বাড়ি, শান্তির আবাস ত্যাগ করে বরিলাম দারিদ্র . আর নানাবিধ ক্লেশ | অদ্যাপিও মনে সদা জাগরুক মাতৃভূমি . জন্মভূমি সেই ফেলে আসা দেশ |
প্রার্থনা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
ওগো মাতা বাগ্দেবী, ওগো চিন্ময়ী . আমার প্রণাম গ্রহণ করো | অনুমতি দাও তুচ্ছ প্রার্থনা এক করি নিবেদন এমন সাধ্য নাই উপযুক্ত উপাচারে তোমায় . করিব বরণ | ভাষায় আমার দখল নাই | জানি না কোন্ ভাষাতে তোমায় করব আমন্ত্রণ | ক্ষমা করো মাগো আমার অক্ষমতার কারণ . তোমার কাছে আমার এ মিনতি | কৃপা করে দাও গো মোরে দু একটা কবিতা লেখার শকতি বিশ্বজন পায় যেন তায় কাব্য রসের আস্বাদন | সে রসে বঞ্চিত আমি --- এক অভাজন | মিলমিলাইয়া ছন্দ নিরাশ করা অভিজ্ঞতার নিরিখে লিখেছি কয়েকটা ছড়া | এতে কারো মন ভরে না বিজ্ঞজনে করে বিরূপ আলোচনা সরস লেখার অক্ষমতার বেদনা দূর করে দেয় অন্য লেখার ভাবনা | তোমার দয়ায় মাগো মহা মূর্খ কালিদাস বিশ্বসেরা মহাকবি রূপে পেয়েছেন প্রকাশ | সহস্রবর্ষের তার কাব্য রস সুধা বিশ্ব সাহিত্যের দলে হয়েছে পুরধা | আমি অতি ক্ষুদ্র ব্যক্তি অত লোভ নাই যদিও বর দাও মাগো দুয়েকটা কবিতা শুনাই |
অলৌকিক কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আমার কাছে অনেকেই . যাচ্ ঞা করে কবিতা | মনের মধ্যে যোগান নাই কেমন করে . লিখি তা, জোর করে কখনো যদি লিখতে বসি উলট পালট ভাবনা এসে . দখল করে মূলকথা | হাওয়া এসে নিভিয়ে দেয় . লেখার ঘরের প্রদীপটা, এমন করেই বাধা পড়ে . কবি হবার প্রচেষ্টা | ঘুমের ঘোরে গভীর রাতে . কী জানি কি কাহার হাতে পূর্ণতা পায় অলেখা সেই কবিতা | বিস্ময়ে তাই সকাল হলে . চক্ষু মেলে কৌতূহলে কেমন করে এমন হল . বুঝতে নাহি পারি তা |
নশ্বরতা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
হে বিধাতা এক নিবেদন আছে তোমার কাছে আমায় যারা ঘিরে আছে তাদের করো রক্ষে | সময় হয়েছে নিকট আমার . বিদায় নেবার অশ্রু সজল চক্ষে | তোমার কঠোর নিয়ম মেনে . আমায় যেতে হবে একই নিয়ম চিরকালই চলেছে আর চলবে সৃষ্টির প্রথম ঊষার অরুণ লগন থেকে | সকলেই চলে যায়--- যারা পড়ে থাকে চিরকাল বাঁচবে তারা অক্ষত পুরাতন দেহে . নহে নহে নহে | এ বিশ্বাসে হে বিধাতা . করো তাদের উদ্ধুদ্ধ নইলে তোমায় স্মরণ করা . হবে তাদের অসাধ্য | ভাগ্যিস আমি বৃদ্ধকালে বুঝেছি এই সার কথা তাইতো তোমার শরণ নিলাম যতই বুকে বাজুক ব্যথা |