বন্দী জীবনের অনুভূতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
গৃহ মাঝে বন্দী আমি দিনের পর দিন চলিতে অশক্য আমি হয়েছি প্রবীণ | দ্বিপ্রহরে সবাই যবে নানা ভাবে ব্যস্ত বিশ্ব চরাচর মোরে করে তোলে ত্রস্ত | চতুর্দিক জনশূন্য নির্জন নিস্তব্ধ আকাশ জুড়ে ভেসে আসে অনাহত শব্দ | কর্ণরন্ধ্রে প্রবেশিয়া অশ্রুত সে ধ্বনি গহন অন্তরে দেয় তীব্র রন-রনি | অর্থতার বোঝা অতি দুঃসাধ্য ব্যাপার ভেবে ভেবে শতবার কূল না পাই তার | কীসের সংকেত খানি হৃদয় মাঝারে রেখে যায় এক প্রশ্ন সংকীর্ণ আঁধারে | এ জগতে আসিলাম কীসের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হয়ে ধ্বংস হয়ে ফুরাব নিঃশেষে ?
শত্রুর স্বরূপ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
শত্রু যারা বাইরে থাকে তাদের দেখা যায় তাদের সাথে যুঝে ওঠার সময় পাওয়া যায় | অস্ত্র শস্ত্র তাদের যত গুদামেতে আছে সে সমস্তর হদিশ পাওয়া যায় তো সহজে | সামনা সামনি যুদ্ধে তারা অতি সুশিক্ষিত প্রতিপক্ষও কম নন---- অল্পদিনেই . হয়ে ওঠেন দক্ষ | সংগ্রামেতে নহেন কেহ ন্যূন অস্ত্র শস্ত্রে পূর্ণ তাদের তূন | আকাশপথে, জলপথে কিংবা স্থলপথে আক্রমণ করেন তারা দিনে এবং রাতে | যুদ্ধ শেষে উভয়পক্ষ ধ্বংস হয়ে যান | কতকাল কেটে যায় হতে পনরুথ্বান | আর একরকম শত্রু আছে যারা থাকে অন্তরে অদৃশ্য তারা, আত্মীয় তারা, বাঁধা সূক্ষ্ম তারে | অতি বড় বন্ধুরূপে তাদের পরিচয় বিনাশ কালেও তাদের মোরা করি না সংশয় | তাদের সর্ব কর্মকৃতি অতি ভয়ঙ্কর তাদের গতি সূক্ষ্ম অতি উদ্দেশ্য তাদের বোঝা . অতীব দুষ্কর | হঠাৎ যদি কোনোদিন স্বরূপ তাদের . প্রকাশ পায়--- জানবে কখন পায়ের তলার মাটি . হয়ে গেছে ক্ষয় | উই পোকার মতন তারা জীর্ণ করে ভিতরে এদের হাতে রক্ষা পাবার ওষুধ কোথায় পাবে রে |
আক্ষেপ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
মরণেরে চাহে না কেহ---শুনি দিবারাত্র আজিকে মরণ আমার কাছে পরম এক মিত্র | জীবনের স্বাদ আহ্লাদ নহে কিছু বাকি এতদিনে বুঝিলাম জীবনটা মস্ত এক ফাঁকি | কেহ কারো নয়, স্ত্রী বলো পুত্র বলো সকলি সমান বিচিত্র এ সংসারেতে নিজ নিজ স্বার্থে অধিষ্ঠান | শোক দুঃখ কষ্টে ভরা বিচিত্র এ জীবলীলা . সমাপন করি | অবিলম্বে যেতে চাই এ জগত ছাড়ি | ফলে ফুলে সুসজ্জিত . এ জগত ছেড়ে যখন যায় পিছনের পানে কেহ ফিরে না তাকায় | ‘সম্মুখে অকূল সিন্ধু তরঙ্গ মালায় বাহু তুলে ডাকে তারে আয় আয় আয় |’ সেথায় কি আছে কোন শান্তির আলয় যেথা এ জগতের দুঃখ দৈন্য সব ভোলা যায় | লীলাময়ের লীলা খেলা এ জগতময় | জন্ম মৃত্যু নাগপাশে বাধা এক লয় | দুঃখ সুখ এজীবনের এপিঠ ওপিঠ জন্ম লগ্নেই বিধাতা করে দেন ঠিক |
সংশয় ( ১ ) কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সন্ধ্যাতারা জ্বলে ওঠে পশ্চিম দিগন্তে মন মোর নেচে ওঠে অসীম আনন্দে | অতি শীঘ্র ওই দেশে করিব গমন | সংশয় জাগিছে মনে দেশটি কেমন | দিনের আলো নিভে এল, কালো যবনিকা অঞ্চল বিছায়ে দিয়ে সব দেয় ঢাকা | আকাশের ওপারেতে বাসগৃহ গুলি একে একে দেখা দেয় নৈশ দীপ জ্বালি | ওখানেই অবস্থিত সুখ-স্বর্গ ধাম, ওই ধাম প্রাপ্ত হলে পুরে মনস্কাম | পার্থিব জীবন এক প্রবাস জীবন নির্ধারিত কাল অন্তে তথাতে গমন | স্বস্থানে স্বদেশে ওই নীলিমার পারে যেখানে রাতের দ্বীপ জ্বলে সারে সারে | আমার পৃথিবী যদি প্রবাস হইবে ঈর্ষা স্বেষ যুদ্ধ দ্বন্দ্ব কেন বা ঘটিবে | পার্থিব জীবন কেবা ত্যজিবারে চায়, তথাপি তপস্যা করেন কেহ . মুক্তি প্রত্যাশায় | এ প্রশ্নের মীমাংসা যত দিন না হবে পৃথিবী ছাড়িয়া যেতে কেহ না চাহিবে
সংশয় ( ২ ) কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
অচ্ছেদ্য তমিস্রাঘন ব্রহ্মাণ্ড আধারে মানুষের দৃষ্টি যেথা পৌঁছিতে না পারে মননের গতি যেথা রুদ্ধ হয়ে যায় সেই অচিন্ত্য সাগরের তমসা বেলায় ক্ষুদ্রতম অনুরূপে তোমার অবস্থান কেন্দ্রীভূত স্বর্বশক্তি তোমাতে আধান | মুনিগণ জেনেছেন তুমি জ্যোতির্ময় তোমার ইচ্ছায় হয় সৃষ্টি স্থিতি লয় অমরত্ব লাভ হয় জানিলে তোমায় | আমি যে জেনেছি তুমি নাহিক সেথায় | আমার অন্তরে বসি নিভৃত গুহায় সৃষ্টিজাল বুনিতেছে ঊর্ণনাভ প্রায় | ভাগ্য বশে করিয়াছ সৃষ্টি মানুষের নহিলে কে করিত তোমার মহিমা প্রচার আমি যবে না রহিব এ জগতে আর মহাবিশ্ব লুপ্ত হয়ে হবে একাকার | স্বর্গ নরক মনে রেখো সামাজিক বিচার এক মাত্র আত্মজ্ঞান করিবে উদ্ধার |
রহস্য সন্ধান কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সৃষ্টির রহস্য তত্ত্ব করিতে উন্মেষ ধ্যানমগ্ন মহাঋষিগণ কোন কাল হতে কে তিনি, সৃষ্টি করিলেন যিনি অপার বিস্ময় | দৃষ্টি গ্রাহ্য, দৃষ্টির ওপারে থাকা . ব্রহ্মাণ্ড নিচয় | তাকেই জানিতে হবে এই হল পণ | অতঃপর কেটে গেছে লক্ষশত যুগ এখনও মেলে নাই উদ্দেশ তাহার | মেনেছেন সকলেই আছেন তিনি অতি সঙ্গোপনে ইন্দ্রিয়ের অতীত হয়ে চিন্তাশীল মানুষের . অন্তর গহনে | পণ্ডিতেরা জানিলেন আছেন তিনি . তাদের ভাবনায়, . আর সূক্ষ্ম চেতনায় | ভাবনা থেমে গেলে আর তিনি নাই | বিজ্ঞানীর দাবি তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের তিনিই ধারক | ক্ষুদ্রতম অনুরূপে তিনি বিদ্যমান জানা হয় নাই কোথা তার অবস্থান . কিবা পরিমাণ | ইচ্ছামতো লন্ডভন্ড করেন তিনি সৃষ্টি আমরা অজ্ঞান মূর্খ নাহি পাই স্বস্তি |
আশা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
শতশত জনমের যোগ তোমা সাথে তুমি মাতৃভূমি, স্বর্গের উপরে তুমি লালিত পালিত হই তোমার স্নেহেতে | জীবনেরে ভোগ করি অপার আনন্দে | মোরা আর্য জাতি, ভোগের পরিধি তাই অতি সীমায়িত | ইন্দ্রিয়জ ভোগাকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত সসীম | অতীন্দ্রিয় জগতেরে--- জেনেছি আমরা | পার্থিব বিষয় ভোগে ঘোর অনাসক্তি | ক্ষত্রিয় নৃপতি বর্গ --- নহে ব্যতিক্রম | উত্পাদনের ষষ্ঠভাগ শাস্ত্রের অনুশাসনে প্রাপ্ত হন তারা | প্রজাপালনের পরে বহিঃ-শত্রু আক্রমণ প্রতিরোধ করে--- অবশিষ্ট যাহা থাকে রাজার অধিকার সেই অংশ পরে | এমন দেশটি কিন্তু ছিল না কোথাও | শান্তিতে সুস্থিত রাজ্য --- অসন্তোষ নাই | ইহার সুযোগ লয়ে পাশ্চাত্য এক জাতি পশ্চিম হতে এসে অতর্কিত আক্রমণে শান্তির আবাসখানি করে নিল জয় | অতঃপর কত কাল হয়ে গেল পার অত্যাচারে দীর্ণ মোরা না পেনু নিস্তার | মহান ঐতিহ্য মোদের হয়ে গেল নষ্ট | কাব্যকৃতি শাস্ত্র শিক্ষা করিল বিনষ্ট | তথাপিও মাতৃভূমি হৃদয়ে রহিল নব সূর্যোদয় জন্য অপেক্ষা করিব |