কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
বন্দী জীবনের অনুভূতি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


গৃহ মাঝে বন্দী আমি দিনের পর দিন
চলিতে অশক্য আমি হয়েছি প্রবীণ |
দ্বিপ্রহরে সবাই যবে নানা ভাবে ব্যস্ত
বিশ্ব চরাচর মোরে করে তোলে ত্রস্ত |
চতুর্দিক জনশূন্য নির্জন নিস্তব্ধ
আকাশ জুড়ে ভেসে আসে অনাহত শব্দ |
কর্ণরন্ধ্রে প্রবেশিয়া অশ্রুত সে ধ্বনি
গহন অন্তরে দেয় তীব্র রন-রনি |
অর্থতার বোঝা অতি দুঃসাধ্য ব্যাপার
ভেবে ভেবে শতবার কূল না পাই তার |
কীসের সংকেত খানি হৃদয় মাঝারে
রেখে যায় এক প্রশ্ন সংকীর্ণ আঁধারে |
এ জগতে আসিলাম কীসের উদ্দেশ্যে
ব্যর্থ হয়ে ধ্বংস হয়ে ফুরাব নিঃশেষে ?

.         ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
শত্রুর স্বরূপ
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


শত্রু যারা বাইরে থাকে তাদের দেখা যায়
তাদের সাথে যুঝে ওঠার সময় পাওয়া যায় |
অস্ত্র শস্ত্র তাদের যত গুদামেতে আছে
সে সমস্তর হদিশ পাওয়া যায় তো সহজে |
সামনা সামনি যুদ্ধে তারা অতি সুশিক্ষিত
প্রতিপক্ষও কম নন---- অল্পদিনেই
.                        হয়ে ওঠেন দক্ষ |
সংগ্রামেতে নহেন কেহ ন্যূন
অস্ত্র শস্ত্রে পূর্ণ তাদের তূন |
আকাশপথে, জলপথে কিংবা স্থলপথে
আক্রমণ করেন তারা দিনে এবং রাতে |
যুদ্ধ শেষে উভয়পক্ষ ধ্বংস হয়ে যান |
কতকাল কেটে যায় হতে পনরুথ্বান |
আর একরকম শত্রু আছে যারা থাকে অন্তরে
অদৃশ্য তারা, আত্মীয় তারা, বাঁধা সূক্ষ্ম তারে |
অতি বড় বন্ধুরূপে তাদের পরিচয়
বিনাশ কালেও তাদের মোরা করি না সংশয় |
তাদের সর্ব কর্মকৃতি অতি ভয়ঙ্কর
তাদের গতি সূক্ষ্ম অতি উদ্দেশ্য তাদের বোঝা
.                        অতীব দুষ্কর |
হঠাৎ যদি কোনোদিন স্বরূপ তাদের
.                         প্রকাশ পায়---
জানবে কখন পায়ের তলার মাটি
.                         হয়ে গেছে ক্ষয় |
উই পোকার মতন তারা জীর্ণ করে ভিতরে
এদের হাতে রক্ষা পাবার ওষুধ কোথায় পাবে রে |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
আক্ষেপ
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


মরণেরে চাহে না কেহ---শুনি দিবারাত্র
আজিকে মরণ আমার কাছে পরম এক মিত্র |
জীবনের স্বাদ আহ্লাদ নহে কিছু বাকি
এতদিনে বুঝিলাম জীবনটা মস্ত এক ফাঁকি |
কেহ কারো নয়, স্ত্রী বলো পুত্র বলো সকলি সমান
বিচিত্র এ সংসারেতে নিজ নিজ স্বার্থে অধিষ্ঠান |
শোক দুঃখ কষ্টে ভরা বিচিত্র এ জীবলীলা
.                        সমাপন করি |
অবিলম্বে যেতে চাই এ জগত ছাড়ি |
ফলে ফুলে সুসজ্জিত
.        এ জগত ছেড়ে যখন যায়
পিছনের পানে কেহ ফিরে না তাকায় |
‘সম্মুখে অকূল সিন্ধু তরঙ্গ মালায়
বাহু তুলে ডাকে তারে আয় আয় আয় |’
সেথায় কি আছে কোন শান্তির আলয়
যেথা এ জগতের দুঃখ দৈন্য সব ভোলা যায় |
লীলাময়ের লীলা খেলা এ জগতময় |
জন্ম মৃত্যু নাগপাশে বাধা এক লয় |
দুঃখ সুখ এজীবনের এপিঠ ওপিঠ
জন্ম লগ্নেই বিধাতা করে দেন ঠিক |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
সংশয় ( ১ )
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


সন্ধ্যাতারা জ্বলে ওঠে পশ্চিম দিগন্তে
মন মোর নেচে ওঠে অসীম আনন্দে |
অতি শীঘ্র ওই দেশে করিব গমন |
সংশয় জাগিছে মনে দেশটি কেমন |
দিনের আলো নিভে এল, কালো যবনিকা
অঞ্চল বিছায়ে দিয়ে সব দেয় ঢাকা |
আকাশের ওপারেতে বাসগৃহ গুলি
একে একে দেখা দেয় নৈশ দীপ জ্বালি |
ওখানেই অবস্থিত সুখ-স্বর্গ ধাম,
ওই ধাম প্রাপ্ত হলে পুরে মনস্কাম |
পার্থিব জীবন এক প্রবাস জীবন
নির্ধারিত কাল অন্তে তথাতে গমন |
স্বস্থানে স্বদেশে ওই নীলিমার পারে
যেখানে রাতের দ্বীপ জ্বলে সারে সারে |
আমার পৃথিবী যদি প্রবাস হইবে
ঈর্ষা স্বেষ যুদ্ধ দ্বন্দ্ব কেন বা ঘটিবে |
পার্থিব জীবন কেবা ত্যজিবারে চায়,
তথাপি তপস্যা করেন কেহ
.                    মুক্তি প্রত্যাশায় |
এ প্রশ্নের মীমাংসা যত দিন না হবে
পৃথিবী ছাড়িয়া যেতে কেহ না চাহিবে

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
সংশয় ( ২ )
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


অচ্ছেদ্য তমিস্রাঘন ব্রহ্মাণ্ড আধারে
মানুষের দৃষ্টি যেথা পৌঁছিতে না পারে
মননের গতি যেথা রুদ্ধ হয়ে যায়
সেই অচিন্ত্য সাগরের তমসা বেলায়
ক্ষুদ্রতম অনুরূপে তোমার অবস্থান
কেন্দ্রীভূত স্বর্বশক্তি তোমাতে আধান |
মুনিগণ জেনেছেন তুমি জ্যোতির্ময়
তোমার ইচ্ছায় হয় সৃষ্টি স্থিতি লয়
অমরত্ব লাভ হয় জানিলে তোমায় |
আমি যে জেনেছি তুমি নাহিক সেথায় |
আমার অন্তরে বসি নিভৃত গুহায়
সৃষ্টিজাল বুনিতেছে ঊর্ণনাভ প্রায় |
ভাগ্য বশে করিয়াছ সৃষ্টি মানুষের
নহিলে কে করিত তোমার মহিমা প্রচার
আমি যবে না রহিব এ জগতে আর
মহাবিশ্ব লুপ্ত হয়ে হবে একাকার |
স্বর্গ নরক মনে রেখো সামাজিক বিচার
এক মাত্র আত্মজ্ঞান করিবে উদ্ধার |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
রহস্য সন্ধান
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


সৃষ্টির রহস্য তত্ত্ব করিতে উন্মেষ
ধ্যানমগ্ন মহাঋষিগণ কোন কাল হতে
কে তিনি, সৃষ্টি করিলেন যিনি অপার বিস্ময় |
দৃষ্টি গ্রাহ্য, দৃষ্টির ওপারে থাকা
.                             ব্রহ্মাণ্ড নিচয় |
তাকেই জানিতে হবে এই হল পণ |
অতঃপর কেটে গেছে লক্ষশত যুগ
এখনও মেলে নাই উদ্দেশ তাহার |
মেনেছেন সকলেই আছেন তিনি অতি সঙ্গোপনে
ইন্দ্রিয়ের অতীত হয়ে চিন্তাশীল মানুষের
.                              অন্তর গহনে |
পণ্ডিতেরা জানিলেন আছেন তিনি
.                তাদের ভাবনায়,
.     আর সূক্ষ্ম চেতনায় |
ভাবনা থেমে গেলে আর তিনি নাই |
বিজ্ঞানীর দাবি তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে
এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের তিনিই ধারক |
ক্ষুদ্রতম অনুরূপে তিনি বিদ্যমান
জানা হয় নাই কোথা তার অবস্থান
.                কিবা পরিমাণ |
ইচ্ছামতো লন্ডভন্ড করেন তিনি সৃষ্টি
আমরা অজ্ঞান মূর্খ নাহি পাই স্বস্তি |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মাতৃভূমি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


স্বর্গে আমার যাবার ইচ্ছা নাই
স্বর্গ নামে জগতেরে মানেন সবাই,
কোথায় সে দেশ, কেমন সে দেশ
.              কাহারো নাই জানা |
সেথায় নাকি কেবল সুখ
দুঃখের নাইকো ঠিকানা |
সেথায় নাকি নিয়ন্ত্রিত আনন্দের বন্যা |
লেশমাত্র নিয়মভঙ্গে শাস্তি হয় অনন্যা |
স্বর্গেরবাসীরা সেথায় সর্বদাই তটস্থ
পাছে মুহূর্তের দোষে হয় স্বর্গ ভ্রষ্ট |
এমন স্বর্গ চাই না আমি
ধন্য এ মোর মাতৃভূমি
বাঁচিতে চাই এ ধরাধামে
ফুল ফল শাক সব্জিতে ভরা
যেন পুনর্জন্ম লভি সেথায়
যেথায় এমন বসুন্ধরা |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
স্মৃতি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


সাধ ছিল সুন্দর জীবন এক কবির সৃজন
গ্রামের সন্তান মোরা, সভ্যতার দান সেথা অতীব কৃপণ |
বসত বাড়িটি মোদের বৃক্ষরাজি ঘেরা
.                             ঘন অন্ধকারময় |
রবির কিরণ সাথে যদিবা দৈবাৎ ঘটে পরিচয়
পরম সৌভাগ্য বলে আপনাকে ধন্য মনে হয় |
বিশাল পরিধি ঘেরা একখানি দিঘি
.                             তারই এক পাড়ে
দেবালয়, টিনের ছাউনি দেওয়া বাসগৃহ সব
.                              সারে সারে |
গোয়াল ঘরগুলি কাহারো পিছনে নয়
.                              শুচিতা বিচারে |
বাড়ির দক্ষিণে এক বিশাল প্রান্তর
দিগন্তের পরপারে তাহার বিস্তার
সোনার ফসলে ভরা আঁচল তাহার
প্রাচুর্যের পরিমাণ চিন্তার অতীত |
সবিস্তারে বর্ণনা মোর সাধ্যাতীত |
পরাধীন জাতি মোরা শিক্ষা দীক্ষা নাই,
সর্বোপরি বিদেশের পুলিশের কঠিন দাওয়াই |
স্বাধীন সত্ত্বার অপমান করে তারা প্রতিপলকেই |
সহসা দুর্ভাগা দেশ ভেঙে হল দুইখান
দুর্ভাগ্য জাতির শিরে নেমে এল বিষম বালাই,
সুন্দর জীবনের বাসনা অলীক রহিল
দুর্দশা কদাপি মোদের পিছু না ছাড়িল |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
আশা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


শতশত জনমের যোগ তোমা সাথে
তুমি মাতৃভূমি, স্বর্গের উপরে তুমি
লালিত পালিত হই তোমার স্নেহেতে |
জীবনেরে ভোগ করি অপার আনন্দে |
মোরা আর্য জাতি, ভোগের পরিধি তাই
অতি সীমায়িত | ইন্দ্রিয়জ ভোগাকাঙ্ক্ষা
অত্যন্ত সসীম | অতীন্দ্রিয় জগতেরে---
জেনেছি আমরা | পার্থিব বিষয় ভোগে
ঘোর অনাসক্তি | ক্ষত্রিয় নৃপতি বর্গ ---
নহে ব্যতিক্রম | উত্পাদনের ষষ্ঠভাগ
শাস্ত্রের অনুশাসনে প্রাপ্ত হন তারা |
প্রজাপালনের পরে বহিঃ-শত্রু আক্রমণ
প্রতিরোধ করে--- অবশিষ্ট যাহা থাকে
রাজার অধিকার সেই অংশ পরে |
এমন দেশটি কিন্তু ছিল না কোথাও |
শান্তিতে সুস্থিত রাজ্য --- অসন্তোষ নাই |
ইহার সুযোগ লয়ে পাশ্চাত্য এক জাতি
পশ্চিম হতে এসে অতর্কিত আক্রমণে
শান্তির আবাসখানি করে নিল জয় |
অতঃপর কত কাল হয়ে গেল পার
অত্যাচারে দীর্ণ মোরা না পেনু নিস্তার |
মহান ঐতিহ্য মোদের হয়ে গেল নষ্ট |
কাব্যকৃতি শাস্ত্র শিক্ষা করিল বিনষ্ট |
তথাপিও মাতৃভূমি হৃদয়ে রহিল
নব সূর্যোদয় জন্য অপেক্ষা করিব |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
ভোজনবিলাসী
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


তোমার সঙ্গে আমার ছিল এক আশ্চর্য মিল
রসনা সিক্ত করা খাদ্য ছাড়া আর সবেতেই গরমিল |
নানান রকম মিঠাই তৈরিতে ছিলে সিদ্ধহস্ত |
শীতের সকালে খেজুর গুড় মেখে মুড়ি খেতে
.                ছিলাম আমি অভ্যস্ত |
খেজুর গুড়ের পায়েস পিঠায় কে না বড় ভক্ত |
রোজ রোজ রসের যোগান পাওয়া হতো বেশ শক্ত |
খেজুর গাছগুলো বড়ই বেয়ারা
তিনদিন পরে দেয় না তাহারা
.                রসের বিন্দুমাত্র |
সেই সময় শিয়ালী থাকে গাছের চর্চায় ব্যস্ত |
গোয়ালে একটি গাই ছিল
নামটি তাহার শুভা
দেমাক তাহার বিষম অধিক
.        দর্শন মনোলোভা |
নিত্য দিন দিত কমসেকম দশ বারো সের দুধ
প্রতিদিনের খাবার বহর ছিল বেজায় অদ্ভুত
বিস্তারিত বিবরণে হতে পারে অনর্থ
এ-বিষয়ে চুপ থাকাটাই একেবারে প্রশস্ত |
দুধের সঙ্গে খেজুর গুড়ের মিলন
.                        যেদিন না ঘটত |
মন খারাপের মাত্রা সেদিন মাঝ গগনে চড়ত |
তবুও বলি তোমার হাতের পিঠে পুলি আর পাটিসাপটা
সারাদিনের ক্লান্তি ঘুচিয়ে উত্ফুল্ল করত প্রাণটা |

.                ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*