কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
শান্তির আর্তি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


শুভদিন আসবে কবে,
ফুলের মতন শিশুর দল
মাতাল হবে উত্সবে আর মহোত্সবে |
থাকবে নাকো হিংসা দ্বেষ |
শিশুর দল বড় হয়ে
বাঁধবে জগত প্রেমের পাশে |
আজ জগত জোড়া হানাহানি
শিশু বৃদ্ধ কিছু না মানি
অতর্কিত আক্রমণে
ধ্বংস করে সব পরানি |
যারা এমন হৃদয়হীন
তারা কি এমন ভাবনা হীন |
তাদের শিরে নামবে একদিন
ভয়ঙ্কর সে অমোঘধ্বনি |
পালাবার না পাবে পথ
পূরবে না তো কোনো মনোরথ
হাহা করে দীর্ণ হবে তাদের হৃদয়খানি |
তাই তো প্রভু আর্তি জানাই
মনের থেকে পাপের রোশনাই
.        দূর করে দাও এখনি |
আনন্দময় করো তুমি বিশ্বভুবনখানি |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
উদ্ধার
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


বিশ্বের নিয়ন্তা তুমি বিশ্ববিভু
তোমাকে প্রণাম করি জগতের প্রভু
দিন নাই রাত নাই সর্বদাই তুমি
সন্তানের পাশে থাকো, এই জন্মভূমি
সর্বদাই রক্ষা কর শত্রু দল নাশি |
তোমাতেই অনুগত সব ভারতবাসী |
নিশ্চিত বিশ্বাসে তারা সকালে সন্ধ্যায়—
নিয়মিত পূজে তোমা অকুন্ঠ শ্রদ্ধায় –
শত সহস্র কন্ঠে ওঠে বেদমন্ত্র ধ্বনি
পুণ্য জাহ্নবীর কূলে সুপবিত্র জানি |
আসমুদ্র হিমাচল শতকোটি প্রাণ
কত দুঃখ কষ্ট সয়ে বিশ্বাসে অম্লান |
বিদেশি বর্বর জাতি কোথা হতে এসে
দখল করিল দেশ অতি অনায়াসে |
ঘৃণা ভরে অত্যাচারে করিল জর্জর
পাশবিক অত্যাচার নিত্য সহচর |
ভাগ্যগুণে ইউরোপে প্রলয় ঘটিল
বিশ্বজুড়ে জনগণ প্রমাদ গণিল
অবশেষে ব্রিটিশেরা আর্থিক কারণে
আমাদের ছেড়ে গেল, কুটবুদ্ধি মনে
দেশটাকে ভাগ করে চলে গেল তারা,
কোটি কোটি লোকজন হল দিশাহারা |
বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত হনু মোরা |
শান্তি সুখ না মিলিল, আমরা বেচারা |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মঙ্গল গ্রহ
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


হে মঙ্গল, হে লোহিতাঙ্গ
কতকাল আছো তুমি একই কক্ষপথে
আবর্তিয়া চলিয়াছ সূর্যের চৌদিকে |
মুহূর্তের তরে সে নিয়মের ব্যতিক্রম
ঘটে না কখনো | দ্বিতীয় বসুন্ধরা তুমি |
পণ্ডিতেরা কন মানুষের আদি জন্মভূমি |
তোমার শরীরে ছিল বায়ুর আস্তরণ
বড় বড় হ্রদ জলচর প্রাণীদের বাসস্থান,
সমুদ্র অতল |
ছিল পৃথিবীর সাথে সখ্য অতি অন্তরঙ্গ
শষ্প তৃণে ঢাকা ছিল তোমার শ্রীঅঙ্গ |
শূন্য পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছিবার
উপায়ে ছিল তোমার অধিকার |
কী জানি কি ঘটে গেল তোমার জগতে
প্রাণের অস্তিত্ত্ব সেথা হইল নির্মূল |
সেই তথ্য আবিষ্কারে আমরা দৃঢ়মূল |
আজিকে তোমার সাথে মোদের ঘটেছে মিলন
বিজ্ঞানীদের তৈরি করা মঙ্গলযানের মাধ্যম |
তোমাতে প্রাণের চিহ্ন আজিও নহে পরীক্ষিত,
জলবায়ু বৃক্ষাদি সবই অন্তর্হিত,
কিছুরই সাক্ষী নাই তোমার শরীরে |
অবলুপ্তি অনুমানে তোমার অধিবাসী,
মানুষের আদি পুরুষ, আশ্রয় প্রাথী হয়ে
এসেছিল এ ধরায় | দোর্দ্দণ্ড প্রতাপে
তারা করিছে রাজত্ব | যদি একদিন
এ জগত ছেড়ে যেতে হয়, কোথা যাবে তারা
.                            রহিল অজানা |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
স্রষ্টার জয়গান
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


অরুণ উদয়ের প্রাক্ কালে
.           পূর্ব গগনের ভালে
তোমায় দেখে নিত্য আমি
.            প্রণাম করি সকালে |
তোমার প্রভা আমার হৃদয় রাঙিয়ে তোলে
নিশার অন্ধকারের দুঃখ দেয় ভুলিয়ে
তোমার মহিমা সুপ্ত জগত জাগিয়ে তোলে |
নিশাচর যারা তোমার মহিমা সইতে নারে |
পাখিরা সব জেগে ওঠে
তোমার মহিমা গীতি রবে
সারা জগত মাতিয়ে তোলে |
আমরা যারা দুঃখ ভোগী
নূতন কর্মে হয়ে ব্রতী
সারাদিন তোমার কথা ভুলে থাকি |
ভুলব কেমন করে—
দিনের শেষে তোমার দেখা পাই
অস্তগিরি শিখর পরে |
দিনের শেষের রশ্মি রেখা ডাকে ঈশারায়
অংশ নিতে রাত্রি শেষে
উদয় ভানুর জন্ম বন্দনায় |
এমন করেই উত্সবে আর ব্যসনে
আমরা সবাই তোমায় ভুলি
আবার সারা দেই তোমার আহ্বানে |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মুক্তি প্রার্থী
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতের
চাদর বিছানো শিউলি তলাতে
তোমায় পেয়েছি শিশুর মুখের
মনভোলানো প্রথম হাসিতে |
তোমায় শুনেছি শিশুর মুখের
আধো আধো প্রথম বুলিতে |
দেখেছি তোমায় ভোরের বেলায়
পুব আকাশের প্রথম অরুণিমায়
দেখেছি তোমায় সাঁঝের বেলায়
দিবসের শেষ রশ্মি রেখায় |
যেদিকে তাকাই তোমার পরশ
তোমার ছবি হৃদয় মাঝে পাই |
আমার সাথে তোমার এ যোগ
মাঝে মাঝে কেন যে হারাই |
সবাই দূরে চলে গেছে
দেহেতে বা মনেতে |
একলা একলা দিন কাটে না
বিষবাষ্প ভরা এই ধরণীতে |
দাও আমাকে অমৃত মন্ত্র
মুক্তি মন্ত্র দাও গো আমার কানে |
সংসার সমুদ্র হতে
লও গো আমায় টেনে |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
আকুতি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


নব্বই বছর মাত্র পৃথিবীর পথে
চলেছি কখনো হেঁটে কখনো বা রথে |
সম্মুখে রয়েছে চাহি অনন্তকালের
অনন্ত জিজ্ঞাসা, আর আছে তার সাথে
পিছে রাখা জীবনের---সুখ দুঃখ মাখা
স্মরণের কত চিহ্ন চিত্ত মাঝে আঁকা |
কত আশা ছিল মনে হলো না পূরণ,
কত ভাবের হয়ে গেল অকাল মরণ |
তারি লাগি দুঃখ ভারে বিষণ্ণ হৃদয়,
অনুক্ষণ হৃদি মাঝে ঘটিছে প্রলয় |
তাই তো প্রার্থনা ওই যমদেব কাছে
পূর্ণজন্ম যদি দাও দিও ধরা মাঝে |
সুন্দর এ পৃথিবীর রূপ রস মধু
প্রাণ ভরে পান করে সুখে থাকি শুধু |
সেই কাণ্ড ঘটিবে কি রয়েছে সংশয়
নিষ্ঠুর কুটিল তুমি তবু দয়াময় |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
আমিও আছি তিনিও আছেন
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


আমি নহি কবি, নহি আমি কোনো দার্শনিক,
দুই একটা ভাবনা চিন্তা মনে জেগে ওঠে
কিন্তু উহা অতি তাত্ক্ষণিক |
শব্দের ভাণ্ডারে মোর নাই অধিকার
স্মরণের গহন হতে কখনো কখনো
এক আধটি শব্দ ভেসে আসে
মুহূর্তেই যায় হারাইয়া |
কেমনে ব্যক্ত হবে মনের ভাবনা
না পাই ভাবিয়া |
জীবনটাও এই মতো অত্যন্ত চঞ্চল
বাঁধিয়া রাখিয়া দেব নাহিক সম্বল |
ক্ষণে ক্ষণে মন মাঝে উঁকি দেয়
.                   অসীম বিস্ময় |
অনাদি অনন্ত আমি নাহি মোর ক্ষয় |
অনাদি অনন্ত কাল আমিও আছি
.                    তিনিও আছেন |
যখনি মুদিব চক্ষু সবকিছু হবে অর্থহীন |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
কে তুমি
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


কে তুমি হাসিছ থাকি আড়ালে আবডালে
যাহা কিছু ঘটিতেছে সৃষ্টির প্রাঙ্গণে
বিকশিতভাবে কিংবা চক্ষুর অন্তরালে
সকলই তোমারি কীর্তি | তোমারি অঙ্গুলি চালনে
কেহ লাফায়,  কেহ হাসে,  কেহ কাঁদে
.                  অরোধ্য ক্রন্দনে |
মনুষ্যের গৃহমাঝে নিত্য অভিনীত
দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা প্রবাহ
মূঢ়তার অভিনয় করে কেহ কেহ
প্রহরে প্রহরে | ক্ষণিকের তরে
নিজেদের মূর্খতা বুঝিতে না পারে |
হিংসা, স্বার্থ, ঈর্ষা, লোভ, দম্ভ, স্বেচ্ছাচার
এই সব ধনে ধনী, ভাবে এ সংসার
তাহাদের ইচ্ছার অধীন | করে না বিচার
অপরের মনোভাব, যারা চায় স্থিতি,
শান্তির আবহ আর সুখ নিতিনিতি ;
অপরের দুঃখে হয় প্রফুল্ল অন্তর,
কাহারো মৃত্যুতে থাকে উত্সব মুখর |
ধ্বংস যজ্ঞ সুখ তাদের বাড়ায় গৌরব |
তোমার ছলায় অন্তিমে সে পায় পরাভব |
দুঃখের সাগর ঘন অন্ধকারময়
সেখানে কাটাতে হবে দুঃসহ সময়
বিধাতার বিধান এই পণ্ডিতেরা কয় |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
সমীক্ষা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


পারবি না তোরা পারবি না তো হারাতে
যতই চেষ্টা করিস তোরা
যতই গল্প বানাস মিথ্যা দিয়ে গড়া
আমায় পারবি না তো ঠকাতে |
আমার কাছে সত্য আছে
.        লোভ যে আমার নাই |
পরের ধনের দিকে আমি
.        ফিরেও না তাকাই |
আমায় যত বলিস কৃপণ
অপব্যায়ের উল্লাসেতে নাইকো আমার মন |
নাইকো আমার ভয় |
ভয়ের সৃজন যতই করিস করব আমি জয় |
ঈর্ষা লোভ যাদের ঘিরে নিত্য নৃত্য করে
নিজের জালেই বদ্ধ হয়ে মরবে তারা বেঘোরে |
উপরেতে যিনি আছেন দেখেন তিনি সব
তাঁকে ফাঁকি দেবার শাঠ্য হবে পরাভব |
দুর্বৃত্তরা নিজের গড়া জেলখানাতেই বদ্ধ
সুস্থ জীবন সুস্থ সমাজ তাদের কাছে অলভ্য |
শান্তিময় সুস্থ জীবন যদি কাম্য হয়
লোভ, ঈর্ষা মিথ্যা মোহ কর তুমি জয় |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
শীত
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


নতুন বছরের হলো শুভারম্ভ
পুরাতন বিদায় হলো বিস্মৃতির পার
বসুধা প্রস্তুত করে শীতের সম্ভার |
মা ধরণী উপড়ে দিলেন তার সোনালি ফসল |
দিগন্ত প্রসারী মাঠে ছড়াইল গেরুয়া অঞ্চল |
মার্গ শীর্ষ মাস যার নাম অগ্রহায়ণ
সমাপ্তির পথে | হাড় কাঁপানো
.                        শীতের আগমন
জানাইছে প্রকাশিয়া সপ্রগল্ ভ দম্ভ |
নানা জনে নানা ভাবে তোলে শীতের প্রসঙ্গ |
কেহ করে আবাহন উত্সাহে ও আনন্দে |
শীতের সবজির আদর ঘরে ঘরে বঙ্গে |
খেজুরের রস আর নৈলেন গুড়
রসনা তৃপ্তি কল্পে অতি সুমধুর |
এ রসে বঞ্চিত হলে দুঃখ অতিশয়
আপামর জনে করে বিষণ্ণতাময় |
খেজুরের রসে তৈরি নানাবিধ পায়স ও পিষ্ট
ভুলাইয়া রাখে শীতের নিদারুণ কষ্ট |
শীতের কবলে পড়ে বুড়োরা, শিশুরা
স্বল্পবাস স্বল্প বিত্ত গরিব যাহারা |
শীতের স্থায়িত্ব কিন্তু চাহে না তাহারা |
শীতের সঙ্গে বিত্তবানের সম্পর্কটি মধুর
হতভাগ্য বিত্তহীনে করে রাখে দূর |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*