শান্তির আর্তি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
শুভদিন আসবে কবে, ফুলের মতন শিশুর দল মাতাল হবে উত্সবে আর মহোত্সবে | থাকবে নাকো হিংসা দ্বেষ | শিশুর দল বড় হয়ে বাঁধবে জগত প্রেমের পাশে | আজ জগত জোড়া হানাহানি শিশু বৃদ্ধ কিছু না মানি অতর্কিত আক্রমণে ধ্বংস করে সব পরানি | যারা এমন হৃদয়হীন তারা কি এমন ভাবনা হীন | তাদের শিরে নামবে একদিন ভয়ঙ্কর সে অমোঘধ্বনি | পালাবার না পাবে পথ পূরবে না তো কোনো মনোরথ হাহা করে দীর্ণ হবে তাদের হৃদয়খানি | তাই তো প্রভু আর্তি জানাই মনের থেকে পাপের রোশনাই . দূর করে দাও এখনি | আনন্দময় করো তুমি বিশ্বভুবনখানি |
উদ্ধার কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
বিশ্বের নিয়ন্তা তুমি বিশ্ববিভু তোমাকে প্রণাম করি জগতের প্রভু দিন নাই রাত নাই সর্বদাই তুমি সন্তানের পাশে থাকো, এই জন্মভূমি সর্বদাই রক্ষা কর শত্রু দল নাশি | তোমাতেই অনুগত সব ভারতবাসী | নিশ্চিত বিশ্বাসে তারা সকালে সন্ধ্যায়— নিয়মিত পূজে তোমা অকুন্ঠ শ্রদ্ধায় – শত সহস্র কন্ঠে ওঠে বেদমন্ত্র ধ্বনি পুণ্য জাহ্নবীর কূলে সুপবিত্র জানি | আসমুদ্র হিমাচল শতকোটি প্রাণ কত দুঃখ কষ্ট সয়ে বিশ্বাসে অম্লান | বিদেশি বর্বর জাতি কোথা হতে এসে দখল করিল দেশ অতি অনায়াসে | ঘৃণা ভরে অত্যাচারে করিল জর্জর পাশবিক অত্যাচার নিত্য সহচর | ভাগ্যগুণে ইউরোপে প্রলয় ঘটিল বিশ্বজুড়ে জনগণ প্রমাদ গণিল অবশেষে ব্রিটিশেরা আর্থিক কারণে আমাদের ছেড়ে গেল, কুটবুদ্ধি মনে দেশটাকে ভাগ করে চলে গেল তারা, কোটি কোটি লোকজন হল দিশাহারা | বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত হনু মোরা | শান্তি সুখ না মিলিল, আমরা বেচারা |
মঙ্গল গ্রহ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
হে মঙ্গল, হে লোহিতাঙ্গ কতকাল আছো তুমি একই কক্ষপথে আবর্তিয়া চলিয়াছ সূর্যের চৌদিকে | মুহূর্তের তরে সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে না কখনো | দ্বিতীয় বসুন্ধরা তুমি | পণ্ডিতেরা কন মানুষের আদি জন্মভূমি | তোমার শরীরে ছিল বায়ুর আস্তরণ বড় বড় হ্রদ জলচর প্রাণীদের বাসস্থান, সমুদ্র অতল | ছিল পৃথিবীর সাথে সখ্য অতি অন্তরঙ্গ শষ্প তৃণে ঢাকা ছিল তোমার শ্রীঅঙ্গ | শূন্য পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছিবার উপায়ে ছিল তোমার অধিকার | কী জানি কি ঘটে গেল তোমার জগতে প্রাণের অস্তিত্ত্ব সেথা হইল নির্মূল | সেই তথ্য আবিষ্কারে আমরা দৃঢ়মূল | আজিকে তোমার সাথে মোদের ঘটেছে মিলন বিজ্ঞানীদের তৈরি করা মঙ্গলযানের মাধ্যম | তোমাতে প্রাণের চিহ্ন আজিও নহে পরীক্ষিত, জলবায়ু বৃক্ষাদি সবই অন্তর্হিত, কিছুরই সাক্ষী নাই তোমার শরীরে | অবলুপ্তি অনুমানে তোমার অধিবাসী, মানুষের আদি পুরুষ, আশ্রয় প্রাথী হয়ে এসেছিল এ ধরায় | দোর্দ্দণ্ড প্রতাপে তারা করিছে রাজত্ব | যদি একদিন এ জগত ছেড়ে যেতে হয়, কোথা যাবে তারা . রহিল অজানা |
মুক্তি প্রার্থী কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতের চাদর বিছানো শিউলি তলাতে তোমায় পেয়েছি শিশুর মুখের মনভোলানো প্রথম হাসিতে | তোমায় শুনেছি শিশুর মুখের আধো আধো প্রথম বুলিতে | দেখেছি তোমায় ভোরের বেলায় পুব আকাশের প্রথম অরুণিমায় দেখেছি তোমায় সাঁঝের বেলায় দিবসের শেষ রশ্মি রেখায় | যেদিকে তাকাই তোমার পরশ তোমার ছবি হৃদয় মাঝে পাই | আমার সাথে তোমার এ যোগ মাঝে মাঝে কেন যে হারাই | সবাই দূরে চলে গেছে দেহেতে বা মনেতে | একলা একলা দিন কাটে না বিষবাষ্প ভরা এই ধরণীতে | দাও আমাকে অমৃত মন্ত্র মুক্তি মন্ত্র দাও গো আমার কানে | সংসার সমুদ্র হতে লও গো আমায় টেনে |
আকুতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
নব্বই বছর মাত্র পৃথিবীর পথে চলেছি কখনো হেঁটে কখনো বা রথে | সম্মুখে রয়েছে চাহি অনন্তকালের অনন্ত জিজ্ঞাসা, আর আছে তার সাথে পিছে রাখা জীবনের---সুখ দুঃখ মাখা স্মরণের কত চিহ্ন চিত্ত মাঝে আঁকা | কত আশা ছিল মনে হলো না পূরণ, কত ভাবের হয়ে গেল অকাল মরণ | তারি লাগি দুঃখ ভারে বিষণ্ণ হৃদয়, অনুক্ষণ হৃদি মাঝে ঘটিছে প্রলয় | তাই তো প্রার্থনা ওই যমদেব কাছে পূর্ণজন্ম যদি দাও দিও ধরা মাঝে | সুন্দর এ পৃথিবীর রূপ রস মধু প্রাণ ভরে পান করে সুখে থাকি শুধু | সেই কাণ্ড ঘটিবে কি রয়েছে সংশয় নিষ্ঠুর কুটিল তুমি তবু দয়াময় |
আমিও আছি তিনিও আছেন কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
আমি নহি কবি, নহি আমি কোনো দার্শনিক, দুই একটা ভাবনা চিন্তা মনে জেগে ওঠে কিন্তু উহা অতি তাত্ক্ষণিক | শব্দের ভাণ্ডারে মোর নাই অধিকার স্মরণের গহন হতে কখনো কখনো এক আধটি শব্দ ভেসে আসে মুহূর্তেই যায় হারাইয়া | কেমনে ব্যক্ত হবে মনের ভাবনা না পাই ভাবিয়া | জীবনটাও এই মতো অত্যন্ত চঞ্চল বাঁধিয়া রাখিয়া দেব নাহিক সম্বল | ক্ষণে ক্ষণে মন মাঝে উঁকি দেয় . অসীম বিস্ময় | অনাদি অনন্ত আমি নাহি মোর ক্ষয় | অনাদি অনন্ত কাল আমিও আছি . তিনিও আছেন | যখনি মুদিব চক্ষু সবকিছু হবে অর্থহীন |
সমীক্ষা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
পারবি না তোরা পারবি না তো হারাতে যতই চেষ্টা করিস তোরা যতই গল্প বানাস মিথ্যা দিয়ে গড়া আমায় পারবি না তো ঠকাতে | আমার কাছে সত্য আছে . লোভ যে আমার নাই | পরের ধনের দিকে আমি . ফিরেও না তাকাই | আমায় যত বলিস কৃপণ অপব্যায়ের উল্লাসেতে নাইকো আমার মন | নাইকো আমার ভয় | ভয়ের সৃজন যতই করিস করব আমি জয় | ঈর্ষা লোভ যাদের ঘিরে নিত্য নৃত্য করে নিজের জালেই বদ্ধ হয়ে মরবে তারা বেঘোরে | উপরেতে যিনি আছেন দেখেন তিনি সব তাঁকে ফাঁকি দেবার শাঠ্য হবে পরাভব | দুর্বৃত্তরা নিজের গড়া জেলখানাতেই বদ্ধ সুস্থ জীবন সুস্থ সমাজ তাদের কাছে অলভ্য | শান্তিময় সুস্থ জীবন যদি কাম্য হয় লোভ, ঈর্ষা মিথ্যা মোহ কর তুমি জয় |
শীত কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
নতুন বছরের হলো শুভারম্ভ পুরাতন বিদায় হলো বিস্মৃতির পার বসুধা প্রস্তুত করে শীতের সম্ভার | মা ধরণী উপড়ে দিলেন তার সোনালি ফসল | দিগন্ত প্রসারী মাঠে ছড়াইল গেরুয়া অঞ্চল | মার্গ শীর্ষ মাস যার নাম অগ্রহায়ণ সমাপ্তির পথে | হাড় কাঁপানো . শীতের আগমন জানাইছে প্রকাশিয়া সপ্রগল্ ভ দম্ভ | নানা জনে নানা ভাবে তোলে শীতের প্রসঙ্গ | কেহ করে আবাহন উত্সাহে ও আনন্দে | শীতের সবজির আদর ঘরে ঘরে বঙ্গে | খেজুরের রস আর নৈলেন গুড় রসনা তৃপ্তি কল্পে অতি সুমধুর | এ রসে বঞ্চিত হলে দুঃখ অতিশয় আপামর জনে করে বিষণ্ণতাময় | খেজুরের রসে তৈরি নানাবিধ পায়স ও পিষ্ট ভুলাইয়া রাখে শীতের নিদারুণ কষ্ট | শীতের কবলে পড়ে বুড়োরা, শিশুরা স্বল্পবাস স্বল্প বিত্ত গরিব যাহারা | শীতের স্থায়িত্ব কিন্তু চাহে না তাহারা | শীতের সঙ্গে বিত্তবানের সম্পর্কটি মধুর হতভাগ্য বিত্তহীনে করে রাখে দূর |