শারদীয়া দুর্গাপূজা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
ভাদ্রমাসে একদিন বেজে উঠত . ঢাক ঢোল কাঁসি করতাল | ছোটরা সব হয়ে উঠত আনন্দে উত্তাল, মণ্ডপে মায়ের আবির্ভাব, উঠত কোলাহল | বংশ পরম্পরাগত নট্টগুরু ক্ষীরোদ নট্টের দল ঢাক ঢোল আদি সব রেখে যেত বৈঠকখানা ঘরে বাচ্চাদের আনন্দ না ধরে | নিয়ম করে সকাল সন্ধ্যা পরখ করে দেখত তারা বাজনাগুলো হয় নাই বিকল | মূর্তি গড়া কুমোরেরা বাঁশ দড়ি খড় নিয়ে হতো উপস্থিত | ‘সদলবলে মা আসবেন’ --- আমরা হতাম নিশ্চিত | মূর্তির কাঠামো গড়তে তারা অতি নিপুণ-হস্ত একদিনেই কাজ তাদের হয়ে যেত সমাপ্ত | ছোটরা বিষণ্ণ মনে হতো ম্রিয়মান, স্বপ্ন দেখে কতদিনে মূর্তি গড়া হবে সমাপন, সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে মাতা হবেন অধিষ্ঠান | চতুর্থী বা পঞ্চমীতে মূর্তি গড়ার কাজ হলে শেষ ছোটদের মনঃকষ্টের থাকত নাকো লেশ | পূজোর দিনগুলিতে দূর-দেশাগত আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে আনন্দেতে কাটত সারাক্ষণ | নিয়ম মেনে চারদিনে চারটি ছাগ হতো বলি . প্রতিটি বছর | হাট থেকে কিনে আনা নধরকান্তি . দেখিলেই ইচ্ছে হতো করিতে আদর | বলিদানের সময় হলে ঢাক ঢোল আর সব . সমস্বরে তুলতো তুমুল শব্দ আবালবৃদ্ধ বনিতা বলিদৃশ্য দেখতে হতো ব্যস্ত | যাবতীয় কাজ ফেলে ছুটে যেত ত্রস্ত | ছাগের করুণ কান্না জাগাতো না কারো মনে দুঃখ মা দুর্গার ভোগে লাগা সে তো পরম সৌভাগ্য | একটি শিশু ছিল অপারগ এ আনন্দের ভাগ নিতে আর্তের কান্না বাজত তাহার বুকে অশনি সম্পাতে | মন্দির ছেড়ে পালিয়ে যেত লুকিয়ে থাকত ভিতর বাড়ির সর্বশেষের এক ঘরে নীরব অশ্রু মোচন করে মনে মনে দুষতো বিধাতারে | মা শুধাতেন কী হলো তোর বল্ তো মনের কষ্ট কেমন করে বুঝাবে সে ভাষা নাহি মিলত |
চা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
সকাল হতেই বারান্দায় বসে পড়ি রোদ পোহাতে নরম উত্তাপ রবির তেজ সেবন করি পিঠেতে, নিজের হাতে তৈয়ারি করা দার্জিলিঙের চা অতি সহজেই ঘুচায়ে দেয় রাতের অলসতা | গরম সুবাসে মন ভরে দেয় রসনায় স্বাদ অতুলনীয় আড়ষ্ট ভেঙে আনে সজীবতা পান করি যেন স্বর্গের সুধা, . স্বাদ অবর্ণনীয় | চায়ের সঙ্গে আমার মিতালি মনে নাই সেই কোন্ কাল হতে | তার সঙ্গে মধুর মিলন যখন খুশি দিনে কিংবা রাতে | একদিন যদি দৈব বশে চা অমিল হয় দেব দানবের যুদ্ধের মতো ঘটে যায় প্রলয় | এমন মিত্র লাভ করে ঘটেছে এক বিপর্যয় | ক্ষুধা মান্দ্য জাঁকিয়ে ধরেছে আমার অগ্ন্যাশয় | অতঃপর এক কঠিন পাঁতি দিলেন কবিরজ মহাশয় মিথ্যা ও প্রেম, বন্ধু বেশে গুপ্তশত্রু অতিশয়, ওর ছলনায় কান দিও না মোটে, বন্ধুত্ব রাখো, সজাগ থাকো যেন অনর্থ না ঘটে |
করুণা প্রার্থনা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
থাকিয়া গোপনে হৃদয় মাঝারে অস্ফুট ভাষায় কি বলিছ মোরে বেদনা ভরা মর্মকথা পাই না শুনিতে | দাও গো শকতি শুনিতে বুঝিতে যে কথা তুমি চাও গো বলিতে অবোধ্য তোমার ইচ্ছা চাও পুরাতে | যদি তাহা রয়ে যায় আমার অগোচরে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ তবে হবে কেমন করে, পার্থিব সমাজে আর এ বিশ্ব সংসারে মঙ্গলময় রূপ তোমার রইবে অন্ধকারে | হে বিধাতা তোমার প্রকাশ আমি . করিব কী মতে | প্রেরণা অভাবে পারিব কি উজ্জীবিত হতে অহৈতুকী কৃপা যদি তুমি করো দান নিশ্চেষ্ট রবো না প্রভু রাখিতে সম্মান |
আড়ালে তোমার স্থিতি কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
ঝঞ্ঝা-ক্ষুব্ধ জলরাশি পরে বাত্যা তাড়িত তরীখানি ডুবুডুবু করে | আরোহীরা সব ভয়ে নিরুপায় করজোড় করি ডাকিছে তোমায় | ঢেউয়ের শিখরে তোমার নৃত্য কেহ কি দেখিতে পায় ? তোমার মহিমা ডুবন্ত তরী ভাসায়ে ওঠায়, ভীত আরোহীদের মরণের মুখে . কি দিশা দেখায় | আমিও পেয়েছি এ জীবনে অনেকবার নিশ্চিত মৃত্যু হতে মুক্তি কৃপায় তোমার | তোমার দেখা কিন্তু পাইনি কখনো তুমি আছো কি নাই সংশয় এখনো আমার মনে আছে জাগরুক মৃত্যুর আগে এ সংশয় মোর হয় যেন নির্মোক |
দিনশেষ কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
এ ধরার দিন হয়ে এল শেষ যতই সূর্য ওঠার রঙ্গিন আভা করে প্রাণ চঞ্চল, পূর্ণিমায় চন্দ্রমা হয় স্নিগ্ধ সমুজ্জল হৃদয় অন্তরে তারা তোলে না কোনো আলোড়ন | শরীর বহন করা হয়েছে অসাধ্য, বস্তুত ঘোরালো, সংসার বন্ধনের টান নহে ততটাই জোরালো | এই পুরানো আবাসখানা ছেড়ে যেতে হয়েছি আকুল যে পুরে যাবার ইচ্ছা তাহাই কি হবে অনুকূল | কোন যানে চেপে সেথা করিব গমন . তাও জানা নাই | যান আবিষ্কারের জন্য মানুষের চেষ্টায় অন্ত নাই, হয়েছে চন্দ্রযান মানুষের সাধনার ফল আরো দূরে চলে যাওয়া মঙ্গলযান হয়েছে সফল আরো কত যান দেখিবে পৃথিবী --- নহে তাহা দূর | যে যানে চড়িয়া যাব সেই অচিনপুর তার কোনোরূপ রেখা বিজ্ঞানীরা . পারে নাই করিতে অঙ্কন | স্বর্গের কারিগর বৃদ্ধ বিশ্বকর্মা মানুষেরে দেন নাই জানিতে সে যন্ত্রের কৌশল পাছে দেবের আবাস খানা হয়ে যায় . মনুষ্যের বসতিবহুল |
ব্যর্থ প্রতিজ্ঞা কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
যতই প্রতিজ্ঞা করি লিখিব এমন কবিতা যেখানে থাকিবে না স্বর্গ মর্ত্য ইত্যাদির কথা, আধাত্মিকতা অথবা রাজনীতিদুষ্ট কোনো . অবাস্তব বার্তা | চিন্তার স্রোতের মুখে নেমে আসে কঠিন স্তব্ধতা, সব যায় হারায়ে | কানে আসে দেশ দেশান্তর হতে অসহায় শিশু আর নারীর ক্রন্দন | . থাকি কান পেতে | শুনি নিশ্চিহ্ন করেছে কত নগর ও সভ্যতা ঘটায়ে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ শতশত যুগের গড়া সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন | ধ্যানমগ্ন দেবমূর্তি, সৌধশ্রেণী যত অতীতের সাক্ষী সবে, ধূলি শয্যাগত | উন্মত্ত তাণ্ডব করে দুর্বৃত্ত দনুজের দল | স্বল্প বুদ্ধি বৃদ্ধ মোরা শোকেতে বিহ্বল | এই সব দনুজদলের সংখ্যা নহে অসামান্য জনসংখ্যার অনুপাতে যদিও নগণ্য | শুভ বুদ্ধি রাষ্ট্রনেতাদের মনে একাত্মতা . যদি হয় উদিত দনুজ দমন কার্য রহিবে না হয়ে সাধ্যাতীত | ভেদবুদ্ধি জর্জরিত বিভিন্ন মানুষের গোষ্ঠী দনুজ দমন কল্পে নহে একনিষ্ঠ | পরস্পর ভেদবুদ্ধি এতই প্রবল একের ক্ষতিতে অন্যে ফেলে কুম্ভীরাশ্রুজল সুযোগ সন্ধানী দুর্বৃত্তেরা হয়ে সাহসী প্রবল অচিরেই ধ্বংস করবে সভ্যতা সকল | অতএব ভেদাভেদ ভুলে সবে হয়ে যাও এক সভ্যতাকে রক্ষা করো হিংসা মনে কোরো না উদ্রেক |
অবসর কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |
অবসর কথাটি নিতান্ত সরল জটিল করেনি তারে ই-কারাদির দল | সারল্যের অভ্যন্তরে কত রং ধরে সরল দৃষ্টিতে তাহা বুঝবে কেমন করে |
কর্মজীবনান্তে লোক নেয় অবসর নিশ্চিন্তে বাকি জীবন করিবারে ভোর | অবিলম্বে এই তত্ত্ব মিথ্যা হয়ে যায় অসংখ্য দায়িত্ব তার স্কন্ধেতে জোগায় |
“কর্মহীন জীবনটা কেমনে কাটিবে নানা কাজে রত থাকলে স্বাস্থ্য না হারাবে |” এই মতো আপ্তবাক্য শিরেতে বর্ষিবে | কর্মেতে অনীহা হলে বিপদ ঘনাবে | অবসর কথাটির আক্ষরিক অর্থ তোমার জীবনে ঘোর ঘটাবে অনর্থ |
কেহ করেন যোগদান রাজনৈতিক দলে অসাধ্য সাধিতে সেথা ছলে বলে কলে | ছোট ছোট কর্ম যথা শিশুদের শিক্ষা, বাজার করার ভার--- এই সবে দীক্ষা অবশ্য লইতে হবে অম্লান বদনে | লেশ মাত্র ত্রুটি হলে পড়িবে গঞ্জনে | কেহ কেহ এসবেতে লয়ে অব্যাহতি তীর্থে তীর্থে ঘোরে কোন সাধুর সংহতি |
কিছুদিন পরে মন হয় উচাটন শান্তি লাভ তরে করে গৃহে আগমন | ততদিনে বার্ধক্যের বয়সের ভার বেঁচে থাকিবার ইচ্ছা করেছে সংহার |
কেহ কেহ বসে বসে কবিতা লেখেন জীবনের সুখ দুঃখ বর্ণনা করেন | ঈশ্বর চিন্তায় কেহ মগ্ন হয়ে যান | বিপত্নীক যদি হন মুশকিল আসান | অবসরপ্রাপ্ত লোক হন যতই বড় ইচ্ছা অনিচ্ছায় হোক এই পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য সবে এটাই নিয়তি |