কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরীর কবিতা
অশ্রু
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


অশ্রুজল বয়ে যায় বাধ নাহি মানে
কারণ ইহার খুঁজি জ্ঞানে ও অজ্ঞানে |
দ্যুলোক ভূলোক নক্ষত্রলোক আদি
সকলি বিষাদ ক্লিষ্ট ভবিষ্যৎ ভাবি |
সৃষ্টির আদিতে সবে ছিল এক হয়ে
স্রষ্টার ইচ্ছায় গেল ছাড়াছাড়ি হয়ে |
পরস্পর ব্যবধান লক্ষ কোটি ক্রোশ
সংশয় ছাড়ে না কভু নাহিক সন্তোষ |
ব্রহ্মাণ্ড জুড়িয়া তারা চলিছে ছুটিয়া |
নিরন্তর ভয়ে ভীত একথা ভাবিয়া |
আকর্ষণ-রজ্জু যদি কভু শ্লথ হয়
মুহূর্তে ঘটিয়া যাবে বিষম প্রলয় |
আদিত্যবর্ণ যত জ্যোতিষ্ক মণ্ডলী
যতই দৃশ্যমান হোক জ্বেলে দীপাবলি
অন্তরে তাদের বসে বিষম আশঙ্কা
কখন বাজিবে তাদের মরণের ডঙ্কা |
তাইতো তাদের অশ্রু নিরন্তর ঝরে
যদিচ পার্থিবজনে অনুমেয় নহে |

.      
      ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অসহায়
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


অন্ধকার অন্ধকার অন্ধকারময়
দশদিক কেবলই মহাশূন্যময় |
প্রকাশিত নয় কোন অস্বিত্বের চিহ্ন
দ্যুলোক ভূলোক সব রয়েছে প্রচ্ছন্ন
জড় অজড় জগৎ হয়েছে বিলুপ্ত
অনুমাত্র সৃষ্টিকর্তা ঘোর চিন্তাক্লিষ্ট |
কেন্দ্রস্থলে মাকড়ের যথা অবস্থিতি
সেইমতো জালবদ্ধ, নাহিক নিষ্কৃতি |
অন্ধকারে একাকীত্বে জাগে মহাভীতি
ধ্যানমগ্ন হইলেন লভিতে মুকতি |
স্থির করিলেন তিনি হইবেন বহু
মানসপুত্র রূপে সৃজিলেন প্রভু
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরে | আরো সৃজিলেন
ভূর্ভুবস্বঃ বাসস্থানরূপে গড়িলেন
এ তিনভূবন দেব ও মানবের জন্য |
সৃষ্টি করে হইলেন আনন্দেতে মগ্ন |
সৃষ্টি স্থিতি সংহারের অধিকর্তারূপে
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের হল অধিষ্ঠান |
প্রজা বৃদ্ধি কল্পে ব্রহ্মা হল যত্নবান  |
ক্রমে ক্রমে ভূলোক ভরিল প্রজাতে
প্রজাপতি নাম হল বিখ্যাত জগতে |
বিপুল গৌরবে ব্রহ্মা হল আনন্দিত |
কিছুকাল না কাটিতেই হলেন চিন্তান্বিত |
প্রজা সংখ্যাধিক্য তাকে করিল আকূল
কেমনে পালিত হবে এই প্রজাকুল |
৮৬৪ কোটি বছরে ব্রহ্মার একদিন হয়
একশত বর্ষ আয়ু কেমনে করিবেন ক্ষয় |
প্রজা বৃদ্ধি এখন তার Control এতে নয় |
উপায়ান্তর না দেখিয়া চলিলেন সেথা
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এক কোণে মগ্ন হয়ে
.                        আছেন বিধাতা |
নিবেদন করিলেন তার সন্নিধানে
প্রজাকুল কি প্রকারে রক্ষিবেন যতনে |
বিধাতা জানাইলেন তিনি অসহায়
এই প্রজাকুল তাকে মানিতে না চায় |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
জয়ী
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


আমার আর কাউকে নাহি ভয়
বিপদ যতই কঠিন হোক
.        করব আমি জয় |
বিঘ্ন বিপদ সঙ্গী করে জীবন আমার গড়া |
দুয়ার ধারে বাজাক যতই কাড়া নাকাড়া |
এবার যাবার সময় হল
পিছন পানে যতই টানো
স্নেহ প্রীতির বাধনে আর বাঁধা রইব না |
বরণ করে আমায় নিতে
ওই গগনের ওপারেতে
.        সাজছে ঘর খানা
সেথায় নাইকো দুঃখ নাইকো কষ্ট
সূর্য ওঠার অস্ত যাবার নাইকো বিড়ম্বনা
নাইকো মেঘের আনাগোনা |
আর যে কটা দিন থাকব ভবে
মোর আচরণে বুঝবে সবে
জাগতিক ব্যবহারে আমার নহে পরাজয়
জগজন মানিবে বিস্ময় |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
জীবন সায়াহ্নের ভাবনা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


জীবন সায়াহ্নে স্নেহ প্রেম প্রীতি আশা
যদিচ উদ্বেল করে, নিতান্ত দুরাশা |
শনৈঃ শনৈঃ আলগা হয় জীবনের
.                যা কিছু বন্ধন |
পঞ্চেন্দ্রিয় আর ষষ্ঠেন্দ্রিয় মন
নিজেদের কর্মকৃতি দেয় বিসর্জন |
আব্রহ্ম ভূবন হয় মরুভূমি প্রায় |
তবু আশা জেগে থাকে হৃদয় গুহায় |
দৈবাৎ কেহ বা করে মিঠে আবাহন
এ জগৎ মনে হবে বুঝি চিরন্তন |
দেহ খানি ছেড়ে দেয় একে একে সব
তরুণ আশা কি কভু মানে পরাভব |
তিনিই মহৎ যিনি পারেন সহিতে
ছেড়ে যাবার দুঃখ দৈন্য শকতি থাকিতে |
অসময়ে ত্যাগের মূল্য কিছুই যে নাই
সময় থাকিতে যত্ন কর গো সবাই |
আকাশে নক্ষত্র রাজি দিব্য শোভা ধরে,
পূর্ণ চন্দ্র করোজ্জল উজলে অন্তরে,
প্রকৃতি শ্যামল শোভা, মলয় বাতাস
এসবে কী দীর্ঘায়িত হয় বৃদ্ধের আবাস ?
অতএব মন্দগতি চলো তীর্থবাসে
নিশ্চিন্ত শান্তি যেথা নিভৃতে বিরাজে |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
পর পারের গান
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


জীবনের শেষ খেয়া পার হয়ে যাই
মায়া মোহ স্নেহ প্রেম যা কিছু সম্বল
বৈতরণী নদী জলে দিয়া বিসর্জন |
ওপারেতে কিবা আছে জানে কোনজন |
যতদিন বেঁচে ছিনু এই ধরণীতে
পরপারে মহাসুখ এই আনন্দেতে
জাগায়ে বিশ্বাস হৃদে পরিজন জানে |
শেষ খেয়া নৌকা চেপে উপজিল মনে
মিথ্যার বেসাতি আমি করেছি জীবনে
কেহ কারো নয় এই সত্য উদ্ ঘাটনে |
সম্মুখেতে মহাশূন্য আশ্রয়বিহীন
চলিতেছি মহাশূন্যে পঞ্চভূতে লীন |
স্মৃতি নাই, বন্ধন নাই হয়ে নিরাসক্ত
মহাবিশ্বে ভ্রমিব যে ইহা অতিসত্য |
মহা মুক্তি বিদেহীরে করে থাকে ভর
একাকী নির্ভীক পান্থ না মিলে দোসর |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
অবারিত আনন্দ কোথা
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


‘আনন্দাদ্ব্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি |
আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি |’

এই আপ্ত বাক্যখানি শুনিতে অতীব মধুর |
আসল সত্যখানি করিতে গোপন ইহা অতি সুচতুর |
জন্মাবধি মনুষ্য জীবন কষ্টে দুঃখে ভরা
একমাত্র বন্ধু মরণ সব কষ্ট লাঘব করা |
অতঃপর ব্রহ্মাণ্ডময় যদি থাকে আনন্দ সাগর
আস্বাদ তাহার এ জীবনে লাভ করা একান্ত দুষ্কর |
জীবনের প্রতিপদে যুদ্ধে মোরা রত
যুদ্ধজয়ের আনন্দ অতি ক্ষণস্থায়ী সুদূর পরাহত |
সমস্যা নূতন নূতন জীবনকে করে জর্জরিত
নিস্তার তাদের হাতে মনুষ্যের সাধ্যের অতীত |
অতএব এক সত্য শোনো মহাশয়
কষ্ট দুঃখ সংগ্রাম হয়ে সমন্বয়
মনুষ্য জীবনরূপে হয় মূর্তিমান
ইহাদের হাতে যদি পাও পরিত্রাণ
বুদ্ধের ধর্মাদর্শ মতে লভিবে নির্বাণ |
অবারিত আনন্দ কোথা কহ মতিমান |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
মরণের পর
কবি রাধিকারঞ্জন সমাদ্দার চৌধুরী
কবির “ঐকতান” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া |


আর বছরে এমনি দিনেই
যখন রইব না আর এই ভুবনেই
নিরালম্ব হয়ে তখন কেমন লাগবে
এই ভাবনা ভেবে ভেবেই বাকি কটা দিন কাটবে |
সূর্য ওঠার রইবে না তাড়া
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করা
চায়ের জন্য রাঁধুনীকে দেব না আর তাড়া |
নাতি নাতনির পড়ার খবর নেওয়া
নিত্যদিনের অভ্যাস যত হয়ে যাবে হাওয়া |
ওষুধ খাবার জন্য কেহ দিবে না আর তাগাদা |
কাগজওয়ালার চিত্কার শুনব না তো আলাদা |
অফিস যাবার আয়োজন
হবে না আর প্রয়োজন
ঠাকুরঘরের শঙ্খধ্বনি কানে পশবে না |
অন্তগামী রবির রাগ মনে ধরবে না |
তখন আমি ঘুরে বেড়াই দিগ্ দিগন্ত ব্যাপিয়া
মহোত্সাহে নিরাশ্রয়ে পঞ্চভূতে মিশিয়া
যারা পড়ে রইবে পিছে তাদের কথা স্মরণে
উদয় কি  আর হবে কভু --- সে তো জানিনে |

.            ********************

.                                                                           
সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*