সজল রায়চৌধুরীর গণসঙ্গীত
*
সজল রায়চৌধুরীর পরিচিতির পাতায় . . .
আমরা যে ঐ আধেক আকাশ
কথা : কবি সজল রায়চৌধুরী, সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। নারী মুক্তি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত।


আমরা যে ঐ আধেক আকাশ
জুড়ে আছি ভাই
তবে কেন আমাদেরই
ঘরের কোণে ঠাঁই ॥

রান্না ঘর আর আতুর ঘরে
দিন বাঁধা চাকায়
আকাশ ডাকে তবু ওড়ার
নেই কোন উপায়
শেকল বাঁধা জীবন থেকে
মুক্তির মিছিলে আমরা যে তাই॥

কর্তার ইচ্ছায় কর্ম
আমরা মানবো না এই ধর্ম
লড়াই দেখে শিখেছি যে
স্বাধীনতার মর্ম
মজুর কিষাণ সবার সাথে
মুক্তির মিছিলে আমরা যে ভাই॥

*************************************








*
চলো যাই রাজস্থানের দেওরালা
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। ১৯৮৭ সালে রাজস্থানের দেওরালা শহরে রূপ কানোয়ার স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে ‘সতী’ হন। রূপ দরিদ্র চাষি পরিবারের মেয়ে ছিল। অসুস্থ স্বামীর সাথে তার বিয়ে দিতে বাধ্য হয় রূপের বাবা-মা। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির দহেজ (যৌতুক)–এর চাহিদা মেটাতে পারে নি তারা। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে শ্বশুরবাড়ির লোকজন রূপকে বাধ্য করে স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে। উদ্দেশ্য তার প্রাপ্য সম্পত্তির অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করা। ধর্মের মদে উন্মাদ জনতার কাছে রূপ হয় ‘সতী’। রামমোহনের প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছেবলে আমরা জানতাম। কিন্তু এখন সরকারী মদতে ধর্মান্ধাতা, সাম্প্রদায়িকতা পুষ্ট হচ্ছে --অবশ্যই এক শ্রেণীর মানুষের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার স্বার্থে। রাজস্থানের প্রচলিত লেকগীতি ‘ঢোল মারু’ অবলম্বনে রচিত হয় এই গানটি।

টইলছে দুপা চখে আন্ধার
প্যাটে খিদের শ্যাল
কামিন মাইয়া কাইট্ ছি মাটি
চলবে পাতাল ব়্যাল॥

সূরয উঠ্যে মাথার উপর
একটু খাওয়ার ছুটি
ঘামের নুনে সিঁইজে লিব
একটা মোটা রুটি॥

ঠিকাদারে হিসাব মারে
সর্দার ল্যায় দস্তুরি
ঝুপ্ ড়ি ঘরে আন্ধার রাইতে
ইজ্জত যায় চুরি॥

খানা ভরাই খন্দ ভরাই
প্যাট তো ভরে না
কামিন মাইয়া বইছি মাটি
পা তো চলে না॥

*************************************








*
টইলছে দুপা চখে আন্ধার
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। কলকাতাকে গতির ডানায় ভাসানোর জন্য যখন পাতালে লাইন পাতার কাজ চলছে, তখন পাতালের অন্ধকারে চাপা পড়ে যায় বহু সীতার কান্না। মেট্রো রেল তৈরির কাজে নিযুক্ত নারী—শ্রমিকদের বুকভাঙা কান্না ও ঘৃণার প্রকাশ এই গানটি।

চলো যাই রাজস্থানের দেওরালা
কিসের আগুন জ্বলছে সেথায় চলো দেখি তাই॥

আগুন ঘিরে তাথৈ নাচে অন্ধ জানোয়ার
কি যন্ত্রণায় কাঁদছে দ্যাখো রূপ কানোয়ার॥

পুরুত মশাই মন্ত্র পড়েন মন্ত্রী শোনান বাণী
সতী হলে মেয়ে হবে স্বর্গের ইন্দ্রাণী
খরায় পোড়ে সোনার ফসল চিতায় পোড়ে কে ?
পুড়ছে দ্যাখো সোনার পুতুল তোমার আমার মেয়ে॥

বলির বাজনা চারিদিকে মধ্যে অসহায়
একটি ছোট প্রাণের ব্যথা কেউ না বোঝে হায়,

প্রথার নামে বলি হলো কত মেয়ের প্রাণ
বিধবা খুন তাকেই বলে নারীর আত্মদান॥

খরায় পোড়ে সোনার ফসল চিতায় পোড়ে কে ?
পুড়ছে দ্যাখো সোনার পুতুল তোমার আমার মেয়ে।

আঁধার ঘিরে কালো আঁধার হাজার বছর ধরে
অন্ধকারে ভূতের নাচন দেহাতে শহরে
আগুন, তুমি সবই পোড়াও, কেন পোড়াও না---
এই সমাজে যুগে যুগে জমাট লাঞ্ছনা

খরায় পোড়ে সোনার ফসল চিতায় পোড়ে কে ?
পুড়ছে দ্যাখো সোনার পুতুল তোমার আমার মেয়ে॥

*************************************








*
দুব্ দুবাইয়া চলে নারী
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া।

দুব্ দুবাইয়া চলে নারী
চোখ পাকাইয়া চায়
সেই নারী হতভাগী
আগে স্বামী খায়
সতী নারীর পতি যেন পর্ব্বতেরই চূড়া
অসতীর পতি যেন ভাঙ্গা নৌকারই গুড়া॥

*************************************








*
ধ্বংস দূতের মৃত্যু এখন বাকি
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। নারী মুক্তি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত।

ধ্বংস দূতের মৃত্যু এখন বাকি
তাই ডাক দেয় হিরোসিমা নাগাসাকি
প্রস্তুত হও যোদ্ধারা ঘরে ঘরে
যুদ্ধ রুখবো জনযুদ্ধের ঝড়ে।

শক্তির মহা উত্স আবিস্কার
আমাদেরই শ্রমে হয়েছে বারংবার
শক্তিসেলের রূপে কেন আসে ফিরে
যুদ্ধ রুখবো জনযুদ্ধের ঝড়ে।

গোলাম বানাতে চায় দুনিয়াকে যারা
সক্তির মদে হয়েছে আত্মহারা
আওয়াজ ওঠাও দুষমন হটো দূরে
যুদ্ধ রুখবো জনযুদ্ধের ঝড়ে।

ওয়াশিংটন প্যারি রোম বার্লিনে
কোটি কন্ঠের প্রতিজ্ঞা নাও চিনে
ঢুকব না আর দানবের গহ্বরে
যুদ্ধ রুখবো জনযুদ্ধের ঝড়ে।

যুদ্ধ রুখতে আমরা মিলেছি ভাই
তবু পায়রা ওড়ানো শান্তির দলে নই
লাল ঝাণ্ডায় লক্ষ পতাকা ওড়ে
যুদ্ধ রুখবো জনযুদ্ধের ঝড়ে।

*************************************








*
বর্ণালী ফুল কেন ঝইব়্যা যায়
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। ১৯৮৩ সালের শুরুতে কোচবিহার সদর হাসপাতালের ধাত্রী বর্ণালী দত্তকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত রাতের অন্ধকারে ধর্ষণ ও হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয় রাজ্যের বিভিন্ন গণসংগঠন। এই গান সেই প্রতিবাদের ভাষা।

বর্ণালী ফুল কেন ঝইব়্যা যায়
হায় ---- হায় রে হায় হায়॥

ফুটেছিল আশা নিয়া
স্বপনে ভরিল হিয়া
প্রাণ সঁপিল আতুড়ের সেবায়
হায় – হায় রে হায় হায়॥

ঘরের মধ্যে থাকবে নারী
চায় যত অত্যাচারী
স্বাধীন নারীর মান রাখা দায়॥

এই দেশেরই ঘরে ঘরে
বর্ণালীরা পুইড়্যা মরে
কত নদী অকালে শুকায়।
হায়--- হায় রে হায় হায়॥

হাজার হাজার বর্ণালী বোন
ছাইড়্যা নিজের ঘরের কোণ
এই কথাটার জবাব তারা চায়
বর্ণালী ফুল কেন ঝইব়্যা যায় ?

*************************************








*
বললেন মন্দিরা ঠানদি
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
জলি বাগচী ও দিপালী সেনগুপ্ত সম্পাদিত “গণবিষাণের গানের স্বরলিপি” (২০১২ ) থেকে নেওয়া। ১৯৭৫-এর জরুরী অবস্থাকে ঘিরে এই ব্যাঙ্গাত্মক গানটি রচিত হয়েছিল।

বললেন মন্দিরা ঠানদি----
প্রতি সোমবার আমি অস্তরে শানদি।
নাগা মিজো অসমীয়া কারো মন পাইনে
মঙ্গলে জারি করি জঙ্গুলে আইনে।
ডলারের রাশি রাশি ধার করি বুধবার
দেশ খাক্ লুটে পুটে চিন্তা কি শুধবার।
বিষ্ণুদে জারি করি সুমহান এন. এস. এ
পিঠ চাপড়িয়ে দিল মস্কোর বেনে সে।
লোকো হরতাল ভাঙ্গি শুক্ কুরে সকালে
ব্যাঙ্গালোরে লাথি ঝারি তাক করে কাঁকালে।
শনিবারে শনি আমি চালু করি এসমা
ট্যাঁ ফোঁ করে মজদুর রাখিনি এমন জো।
রবিবারে ভেজে খাই রাশিয়ান কোপ্ তা
এ ভাবেই কেটে যায় ঠানদির হপ্ তা।

*************************************








*
হাতে হাত রেখে পার হবো
কথা : সজল রায়চৌধুরী
সুর : জলি বাগচী
সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত “গণসংগীত সংগ্রহ” থেকে নেওয়া।

হাতে হাত রেখে পার হবো এই বিষের বিষাদ সিন্ধু
দুষমনদের ফাঁদে, বলো, কেন ঢুকবো ?
যে নামেই ডাকো--- মুসলীম, শিখ, খৃষ্টান কিবা হিন্দু
সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঢেউ রুখবো।

যে হাত ফসল লুটেছে, যে হাত কারখানা করে বন্ধ
সেই কালো হাত বিভেদের বিষে করে দিতে চায় অন্ধ
সব ভুলে, সাথী, আমরা কি আজ বলো সেই দিকে ঝুঁকবো ?

শহীদ নরুল আনন্দ ভাই আশিষ ও জব্বার
রক্তের রাখী বেঁধে দিয়ে গেছে হাতে হাতে সবাকার
সেই রাখী ছিঁড়ে আমরা কি আজ কেউটের বিষে ধুঁকবো ?

জাগে রাজহারা, মীজোরাম জাগে বেল্ চীর হরিজন
মুক্তি-পাগল মাটি ফুঁড়ে ওঠে লড়াকু চম্পারণ
গেরুয়ার পায়ে ভেড়ুয়ার মতো আমরা কি মাথা ঠুকবো ?

হাতে হাত রেখে পার হবো এই বিষের বিষাদ সিন্ধু
দুষমনদের ফাঁদে, বলো, কেন ঢুকবো ?
যে নামেই ডাকো--- মুসলীম, শিখ, খৃষ্টান কিবা হিন্দু
সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঢেউ রুখবো।

*************************************