কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
মিনতি
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য দীপালি”  (১৯৩১ ) কবিতা সংকলন থেকে
নেওয়া |


আমায় প্রাসাদে কখন এনোনা !
এই শোভা সজ্জিত মদমজ্জিত
.             প্রাসাদে কখন এনোনা !
.                 আমি বিলাসের মাঝে নানা শোভা সাজে
.                               হয়ত’ তোমারে পাব’ না –
.                               ভুলেও তোমারে চাব’ না |

তুমি তরুতলে এনো, মরুপথে এনো,
.             ঘোর হতাশায়, দুর্দ্দিনে টেনো
.                        তোমারে করিব আপনা !
আমায় সহাস্য আস্য দিওনা
এই যৌবনমধু--- যামিনীর শীধু
.            পানালস প্রাণ দিওনা !
.                আমি হাসির রঙ্গে ভোগ-তরঙ্গে
.                                হয়ত’ তোমারে পাবনা---
.                                ভুলেও তোমারে চাবনা |

তুমি ক্রন্দন দিও, আঁখি বারি দিও
.            যন্ত্রণা ঘোর দিও ওগো প্রিয়,
.                     সার্থক কর যাতনা ?
আমায় সুখের সময় দিও না—
এই ধনজনমান লোলুপ পরাণ
.             দিওনা দেবতা, দিওনা !
.                আমি আমার মাঝারে সুখ-সংসারে
.                                হয়ত’ তোমারে পাবনা---
.                                ভুলেও তোমারে চাবনা |

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিবেদন
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য দীপালি”  (১৯৩১ ) কবিতা সংকলন থেকে
নেওয়া |


.       লও মোরে সখা বাঁধিয়া
তোমাতে আমাতে করি অভিন্ন
.       দোঁহার জীবন গাঁথিয়া !
করিও এ প্রাণ খেলনা তোমার,
কাজের না হোক্ হবে খেলিবার ;
খেলার সময় হেলায় কখনো
.        দিও চুম্বন সাধিয়া---
তাহ’লেও মোর খেলার জন্ম
.        সার্থকে যাবে কাটিয়া |

.       লও মোরে সখা তুলিয়া—
শতেক গন্ধ কুসুম চয়নে
.        আমার এ ফুল ভুলিয়া |
সৌরভ নাই এই অপরাধে
চলিয়া যাবে কি দলিয়া অবাধে ?
না হয় তুলিয়া দিও গো ফেলিয়া---
.        যাবে মম কারা খুলিয়া ;
তোমার পরশে লভিব মরণ
.        তপ পদ-রেণু চুমিয়া |

.        লও মোরে দয়া করিয়া
তোমার চরণে হেম মঞ্জীরে
.        কঙ্কর রূপে ভরিয়া !
বাজিব নিত্য শিঞ্জন-তালে
পড়িব মনে ত’ তবু কোনো কালে ;
ঝঙ্কার মম বেড়িয়া তোমারে
.        ধ্বনিবে রহিয়া রহিয়া ;
ধন্য হইব সঙ্গীত রূপে
.        তোমার চরণ লভিয়া |

.        লও মোরে সখা চাহিয়া—
আমার ‘আমারে’ তব দিঠি তলে
.        একবার শুধু ডাকিয়া !
সব কল্পনা হো’ক্ অবসান,
আমার এ আমি পা’ক্ নব প্রাণ
জীবন মরণ জনম সাধন
.        দিব গো সাধিয়া সাধিয়া ,
তব গৌরবে লীন হ’য়ে আমি
.        রিক্ত হইব মাগিয়া |

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নারী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
সুকুমার সেন  সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয়” ১ম খণ্ড (১৯৯১ ) কবিতা সংকলন থেকে
নেওয়া |


বিশ্ব যদি নাহি দিত ভিক্ষা সেই দিন
তা হলে হয়ত মহী হত নারী হীন |
চন্দ্র দিল কান্তিকণা ভুজঙ্গ ভঙ্গিমা,
মৃগ দিল নেত্রশোভা, পুষ্প মধুরিমা,
নবতৃণদল দিল মরকত জ্যোতি,
লতা দিল রমণীয় নমনীয় মতি |
পালক লঘুতা দিল, বর্ণ সূর্যকর,
মেঘ দিল অশ্রুরাশি, শশ দিল ভর,
শিখী দিল রূপ গর্ব, বায়ু চঞ্চলতা
মধু দিল বিন্দু মধু, হীরা কঠোরতা |
ব্যাঘ্র দিল জিঘাংসা ও হিংসার আগুন,
তুষার দানিল চিত্তে হিম নিদারুণ,
বহ্নি দিল হৃৎপিণ্ড, মিথ্যা অঙ্গ রাগ,
নভ দিল নির্লজ্জতা, প্রেম বিষ ভাগ |

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পৌষ-লক্ষ্মী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
গিরিজাকুমার বসু সম্পাদিত “দীপালী” পত্রিকার পৌষ ১৩৪১ ( জানুয়ারী  ১৯৩৫ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


.        পুষ্যার পুষ্পকে পৌষ-সারথ্যে
.        এসো মা গো লক্ষ্মী, এস মাত মর্ত্ত্যে !
খামারে ও ক্ষেতে খড়ে                বঙ্গের ঘরে ঘরে
.        তীরে নীরে তৃণ-শিরে ঘাটে মাঠে বর্ত্মে |

.        এস মা গো লক্ষ্মী, ত্রিভুবন মান্যে
.        মণ্ডিত-মণিতাজ, কনক-সুধান্যে
হৈম-বরণা কমা                        মহিম মনোরমা
.        শক্তিরূপিণী রমা, তুমি অসামান্যে |

.        পদ্মা-প্রতীক পোষ শস্যের সঙ্গে
.        এস পোষ, এস এস নিরন্ন বঙ্গে—
কোটি সুত ক্ষুধাতুর                তাহাদের ক্ষুধা দূর
.        করিবারে এলে কি মা, সুশীতল অঙ্গে ?

.        এস পোষ যেও নাক’, থাক’ চির পদ্মে
.        জনম জনম মাত ছেড়ো না এ সদ্মে,
উলুবলে উপবন                 রচগো কমলাসন
.        কমলা অচলা হও, ভুলা’য়োনা ছদ্মে |

.        শুচি রুচি সত্যে ও উজলিয়া কর্ম্মে
.        চিন্তায় শ্রী-রূপে, মঙ্গল ধর্ম্মে,
বাক্যে বাগীশ হয়ে                জীবনে অমৃত লয়ে
.        সুন্দরী লক্ষ্মী, এস চির মর্ম্মে |

.        লোক-মাতা লক্ষ্মী, নন্দনে নন্দি
.        এস পো’ষ-পার্ব্বণে, নবান্নে বন্দি ;
আনো মধু সামগান                 অন্ন ও জল প্রাণ
.        মুক্তির সন্ধান, অমৃত-সুগন্ধী |

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হোলির গান
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
গিরিজাকুমার বসু সম্পাদিত “দীপালী” পত্রিকার চৈত্র ১৩৪১ ( মার্চ  ১৯৩৫ ) দোল সংখ্যায়
প্রকাশিত |


.        সাবধান বরনারী
বসন্তে কে পান্থ এল ছুঁড়ে ফুলের পিচ্ কারী ||
.        বকুলতলায় যাওয়া বিষম দায়
.        পথ চলায় মুকুল ঝরে গায়
.        পলাশ-রেণু মাখা শিমুল-ভরে
.                        চাইতে যে চোখ নারি ||

ভূঁয়ে ভূঁই-চাপা কাননে অশোক
.                        গগনে জ্যোত্স্না বারি
কোথায় লুকাই, কেমনে বাঁচাই
.                        এ মোর সুনীল শাড়ী ?

হোথা কে আবার আবীর খেলিছে না
জ্বালালে আমায়, মনে হয় চেনা-চেনা
দোহাই তোমার,  পথ ছেড়ে দাও,
.                        বেলা গেল যাই বাড়ী ||

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাণী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
বিজয়চন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত “বঙ্গবাণী” পত্রিকার চৈত্র ১৩২৮ ( মার্চ ১৯২২ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


এস মা অমল কমল-বাসিনী
.        নারায়ণী বাণী, জননী,
জ্ঞান-বিজ্ঞান-সঙ্গীত সুধা
.        ধারায় ধুইয়া ধরণী |
এস মানবের ধ্যান-ধারণার তন্ত্রীতে,
এস কন্ঠের মূক কুন্ঠিত ইঙ্গিতে,
এস বিশ্বের শত শকুন্ত-সঙ্গীতে,
.        সত্য-শুভ্র-বরণী |
এস কল্যাণী মঙ্গল তব মূর্ত্তীতে,
ঊর উদাত্ত অভয় উক্তিতে,
.        বাঁচাও অমৃতে, মৃত্যু-আহতে মূর্চ্ছিতে,
.                বিতরি নবীন জীবনী |
যদি        এসেছ’ ভারতী, করুণাময়ী মা প্রসন্না
তবে        লহ’ এ দাসের প্রণতি ভক্তি-নিষণ্ণা,
জাগো   বর্ণ-আলোকে আলোকি এ চিত, বরেণ্যা,
চির                অন্ধ-তামস-হরণী |
.        দাও রসনায় নব বাণী নব ভঙ্গীতে,
.        নবীন রাগিণী দাও এ কন্ঠ-সঙ্গীতে,
.        দাও মা শক্তি, মৃত্যু-সাগর লঙ্ঘিতে
.                তোমার চরণ-তরণী |

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষা আবাহন
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত  সম্পাদিত মাসিক  “মালঞ্চ” পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৩ ( আগষ্ট ১৯১৬ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


শুষ্ক ভূমি সিক্ত করি
.        ঢালি পীযুষ জলধারা
বরষা আসে নীরদ পরি
.        বাজে বিমানে সুর-কাড়া !
বরণ করি পরাণ পণে
.        ধরিয়া হাতে হেম ঝারী,
এয়োর মত তটিনী গণে
.        আনে বরষা শুভ বারি |
নবীন ঘাসে মহীর পীঠে
.        পড়িল চারু আলিপন,
ধূপের মত গন্ধ মিঠে
.        করে ধরণী বিকীরণ |
পবন বহে গন্ধ বাসে
.        বীজন রত তাল তরু |
হরষ হাসে বরষা আসে
.        সিঞ্চিবারে ধরা মরু |
গভীর যেন শ্রান্তি ভরে
.        কাযের সব অবসান,
তিমির চিরি বিজুরী করে
.        নব চেতনালোক দান |
শীতল রসে ধরা সরসা
.        জীবন ‘প্রিয় প্রিয়’ করে—
আর নয়নে প্রেম বরষা
.        ‘প্রিয়াৎ প্রিয়তর’ তরে !

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভাবিনী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ ( সেপ্টেম্বর ১৯১৬ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.                 
( গাথা )
.            ক্ষুদ্র পল্লী প্রান্তর বালু
কঙ্কর শিলা আবিল ধুয়ে
.            বয়ে যায় এক ক্ষুদ্র তটিনী
মুক্তামালার সীমানা থুয়ে |
.            বর্ষায় নদী প্লাবি তীর ভূমি
বহিয়া আনিত গুল্মলতা—
.             নিদাঘে আবার যাইত ফিরিয়া
ক্ষুব্ধ হতাশ প্রণয়ী যথা !
.             রামু মোড়লের নাতিনী ভাবিনী
ললিত সুঠাম কিশোরী মেয়ে
.              এ নদীপাড়ের আমের বাগানে
যখন তখন আসিত ধেয়ে |
.              বড়ই গরীব রামমণ্ডল
কোন মতে করে দিনাতিপাত—
.              কেউ নাই ঘরে--- আপনি, ভাবিনী,
আর নাতি এক বছর জ্বরে,
.              তবু সে তাদের মঙ্গ্ লাকে নিয়ে
চরাইত নিতি বিলের চরে |
.              সন্ধ্যায় দিয়ে গোয়ালে সাঁজাল
ভাবিনী ঢুকিত রান্নাঘরে
.              দাদা আর ভায়ে খাওয়ায়ে, রাখিত
ভিজাইয়া ভাত প্রাতের তরে |
.              হরিশ যে দিন পাইত মজুরী
মঙ্গ্ লারে নিয়ে ভাবিনী যেত’—

.               সারাদিন ঘুরি বাগানে ও বেড়ে
‘খুটিয়া’ আনিত যা’ কিছু পেত’ |
.               কভু দু’টি বেল, একটি কয়েত্
গোটা কত নটে শুশনি শাক
.                কিম্বা একটা ঝিঞে বা করলা
রাত্রে তাহাই হইত পাক |
.                বড়ই কষ্ট রামু মোড়লের
কেউ তারে ফিরে চাহে না কভু ;--
.                পাতিতনা হাত --- সুখী সে যে ছিল
নিজ-নির্ভর-গর্ব্বে তবু !

#         #          #         #          #

.             সে দিন শ্রাবণ বর্ষা ভীষণ
দুর্য্যোগ ছিল সারাটা দিন
.             ক্ষণেকের’ তরে আসেনি দেবতা
সূর্য্য ছিলেন আঁধারে লীন !
.              মাঠে বাটে সব হাঁটু ভরা জল
সাঁজেই অমার নিশীথ যথা—
.               রাজবাড়ী হতে ফিরিতে নাবিয়া
মোড়লের বড় বাজিল ব্যথা !
.               ভাবিনী হেথায় ভায়েরে খাওয়ায়ে
পাথরে দাদার অন্ন ঢালি,
              রহিল বসিয়া মাটির একটি
ছোট্ট প্রদীপ সমুখে জ্বালি !
.               ঘন গর্জ্জনে ঘুর্ণিঝঞ্ঝা
চূর্ণিছে কত তরুর শির—
.               বর্ষার কেশ মুষ্ঠে আঁকড়ি
নিষ্ফল রোষে কি অস্থির !
.               পবন আহত দ্বারের শিকলি
বাজে ক্ষণে ক্ষণে চকিত করি---
.               ঝাপ্ টা বাতাস দুয়ার ঠেলিয়া

দিছে বালিকার চিত্ত ভরি !
.               শুনিছে ভাবিনী এ প্রলয় মাঝে
বুড়ার কম্প্র পায়ের ধ্বনি ---
.               অই বুঝি দাদা ক্লান্ত নিবাক্
দ্বারে কর হানে রনন্ ঝনি !
.               খুলে দেখে দ্বার ---কই ? কেউ নাই !
বায়ু করে যায় অট্টহাস !
.               রুধিয়া দুয়ার আসে ফিরে ফিরে
কত বার হেন ব্যর্থ আশ্ !
.                ভাবিছে ভাবিনী ধ্রুব বিশ্বাসে
না-আসা দাদার হয়নি কভু,
.                আজিও আসিবে ---দুর্য্যোগ আর
দূর পথে দেরী--- আসিবে তবু !
.                হেরে যেন বালা – মাঝ পথে দাদা
একে এ আঁধার তাহাতে জল,
.                 কোথা আল কোথা পথ ঠিক নাই—
পথ থৈ থৈ সুসমতল !
.                 আমরা তো বেশ আছি ঘরে বসে’
না এলেই তুমি করিতে ভাল !
.                সরে না বাক্য শুষ্ককন্ঠে
ভাবিছ’--- বাঁচিতে পাইলে আলো !
.                তালের ছাতাটা উড়ে গেছে ঝড়ে
ক্ষুধায় শক্তি নাহি তো হাতে !
.                খুঁজিছ’ কি তাই সাশ্রু নয়নে
হাঁতাড়ি আঁধারে এ কাল রাতে ?
.                রক্তের ধারা ঝরিছে চরণে
ফুটেছে কতনা কুশের আগা—
.                সিক্ত সে চীর জলে সট্ পট্
চলিতে কেবলি হোঁচট্ লাগা !
.                হাঁকিল তখন তৃতীয় প্রহর
পল্লী প্রহরী শৃগাল দলে
.               পড়িল লুটিয়া ভাবনা ক্লান্ত
কিশোরীর মাথা মেঝের তলে |

.                “যাই, যাই, দাদা,----আহা মরে’ যাই—
হয়েছে তোমার কষ্ট কত |”
.                 বলিতে বলিতে ছুটিল কিশোরী
মুছি আঁখি দু’টি তন্দ্রাহত |
.                 “কই ?  কত দূরে ?  আলো নিয়ে যাব ?
যাই, যাই দাদা সবুর কর’
.                  ভয় কি ?  এই যে আসিয়াছি আমি”
বলিয়া ভাবিনী ছুটিল খর !
.                 থেমেছিল জল ;  বাতাস তখন
রাগে এলোমেলো সরাতে মেঘ—
.                 শিশুর মতন জামা পরে’ তারে
খুলিতে যেমন প্রকাশে বেগ !
.                 ছুটিতে ছুটিতে আসিল ভাবিনী
ঊর্ম্মিধুনিত নদীর ধারে ;--
.                 আরও গেল সে—নিকটে বা দূরে
মিলাইল শেষে অন্ধকারে !

#         #           #           #            #

.             ফিরিল মোড়ল তখনি ঊষায়
হরিশ তখনো ঘুমায় ঘরে
.             ঢুকিতে দুয়ারে কি যে এক বাধা
পাইল বৃদ্ধ বাতাস ভরে |
.             করুণ হিয়ার বৃথা প্রতীক্ষা
মরণের ঘোর আর্ত্তনাদ
.             বাড়ীর বাতাস করেছিল ভারী
বৃদ্ধ তাহার পাইল স্বাদ |
.              “ভাবিনী ---ভাবিনী”  ডাকিল মোড়ল
ফিরিল সে ডাক নিরুত্তর
.               ‘সে যে নাই’ হেন কেন মনে হয়
রোদন আসিছে নিরন্তর |
.                নীরব নিজন—আসিল না কেউ |
সেবা-পরায়ণ সে দুটি হাত
.                অন্নের থালে রহিছে জাগিয়া—
করে বুড়া ঘন দৃষ্টিপাত !
.                চরণ পাটুনী আসিয়া তখনি
আছাড়ি পড়িল আঙন তলে—
.               “ ঘাটে এল যবে, জানি কি তখন
“নিশিতে তাহারে পেয়েছে বলে’ ?”
.                  মূর্চ্ছিত বুড়া পড়িল তখনি
মেলিল না আর বারেক আঁখি !—
.                  জলটুঙি বাসী কৃষকেরা বলে---
আজ’ ফিরে সে যে দাদারে ডাকি ||

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পদত্যাগ
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার পৌষ ১৩২৩ ( ডিসেম্বর ১৯১৬ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.                  
( গাথা )
পরাণপণে খাটিত সদা প্রভুর কাজে রূপ,--
বাংলা সুবা দেওয়ান্ তারি ---উচ্চ পদ-ও খুব |
দক্ষ হেন কর্ম্মচারী ক্লান্ত নহে কাজে
রাত্রি দিবা লেখনী যার সমান চলিয়াছে |

প্রভুর তাহে সুবিধা বড়—বিলাসবাটিকার
হলেন চির-বন্দী দৃঢ় প্রিয়ার প্রহরায় !
কচিৎ প্রভু বাহিরে আসি কহেন হাসি হাসি—
“রূপের মত লোকেরে আমি বড়ই ভালবাসি |”

মিষ্টবাণী, একটু হাসি, সঙ্গী করি রূপ
উচ্চপদ মদিরা পিয়ে খাটিত সদা চুপ !
মুষলধারে সে দিন প্রাতে বাদল দিল দেখা
মুছিয়া দিল পথের যত পথিক-পদ-লেখা |
সঘনে ডাকে বজ্র মেঘে বধির করি কাণ
নগরবাসী কাতর ঘরে রুদ্ধ দিনমান |
সাঁঝেতে যবে বরষা ধারা শ্রান্ত কৃশ দেহ—
জানাল দূত – “পাল্কীবাহী এলনা আজি কেহ |”

পদব্রজে দেওয়ান্ চলে, আঁধার ঘন রাতি,
চরণ বাধে জলের তলে--- নিভিয়া গেছে বাতি |
পথের পাশে কুটীর বাসে পুছিছে রজকিনী---
স্বামীরে তার--- “এ ঘোর রাতে কাহার পদ শুনি ?”
রজক কহে নিরীক্ষিয়া --- “দেওয়ান মনে হয় |”
শুধায় প্রিয়া—“যাবেন্ কোথা, অমন অসময় ?”
“ডেকেছে বুঝি বাদশা তাই হাজিরা দিতে চলে—
নাহিলে যাবে চাকুরী, দেখ চাক্ রী কারে বলে ||”

রজকী আরো ব্যথিত হয়ে কহিল স্নেহভরে
“কুকুর সে-ও এ হেনকালে আসেনা পথ’ পরে ;
অত মানী দেওয়ান্ --- কিনা এ দুর্য্যোগে ছোটে ?
চাকর হতে তবে ত মোরা অনেক সুখী বটে |”
বেহারা বুঝি জুটেনি কেউ ? আসিবে কেন তারা ?
চাক্ রী কারো করে ত’ না যে রহিবে ডাকে খাড়া ?
দু’মুঠো ভাত, আহারে বাছা, পাবিনে কি রে কোথা ?
যে দেছে প্রাণ, দিবে না কি সে খাইতে, এ কি কথা ?”

শুনিল রূপ দাঁড়ায়ে পথে করুণ সমব্যথা ---
“যে দেছে প্রাণ, দিবেনা কি সে খাইতে, এ কি কথা ?”
“খাওয়াই যদি এতই বড়, খাওয়ায় তবে কে সে ?
চাক্ রী তবে করিব তারি, যাইব তারি দেশে |”
তখনি রূপ গোস্বামীজী উপজি রাজ পাশ
ইস্তিয়াফা লিখিয়া দিয়া ফেলিল নিশ্বাস !
পুছিল প্রভু--- “পাগল, হাঃ হাঃ, করিছ একি দ্বিজ ?
বেতন, বল’, বাড়ায়ে দিব ; বোঝনা হিত নিজ ?”

.                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেবতা ও মানব
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৫ ( এপ্রিল ১৯১৮ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.                       ( ১ )
আমি      চাহিনা অমরাবতী
.   ঘুচেনা যাহার সুরাসুর করে চিরদিন দুর্গতি !
.           সুরগন চাহে আপন করিতে যারে
.              অসুর ছিনায় নিজের বীর্য্য ভারে—
.           সে মায়া পুবীব অধিকার লয়ে হোক্
.                   দ্বন্দ্ব অসুরে সুরে !—
আমি চাই শুধু একটি কুটীর ছোট
.                    নিভৃত পল্লী পুরে |

.                        ( ২ )
চির             নন্দন পারিজাতে
.   চাহিনা রচিতে চারু বিচিত্র বিলাস দিবস রাতে ;
.            বাসব বিজয়ী সুর সম্রাট হতে
.            চাহিনা গো আমি চাহিনাক’ কোন্ মতে
.            গজ বাজি রাজি মণি মাণিক্য সুধা
.                       নিক যাব খুশী হরি
আমি চাহি শুধু দশজনে সাথে নিয়ে
.                        খেয়ে ও খাওয়ায়ে মরি |

.                      ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর