নিবেদন কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় রাধারাণী দেবী ও নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত “কাব্য দীপালি” (১৯৩১ ) কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া |
. লও মোরে সখা বাঁধিয়া তোমাতে আমাতে করি অভিন্ন . দোঁহার জীবন গাঁথিয়া ! করিও এ প্রাণ খেলনা তোমার, কাজের না হোক্ হবে খেলিবার ; খেলার সময় হেলায় কখনো . দিও চুম্বন সাধিয়া--- তাহ’লেও মোর খেলার জন্ম . সার্থকে যাবে কাটিয়া |
. লও মোরে সখা তুলিয়া— শতেক গন্ধ কুসুম চয়নে . আমার এ ফুল ভুলিয়া | সৌরভ নাই এই অপরাধে চলিয়া যাবে কি দলিয়া অবাধে ? না হয় তুলিয়া দিও গো ফেলিয়া--- . যাবে মম কারা খুলিয়া ; তোমার পরশে লভিব মরণ . তপ পদ-রেণু চুমিয়া |
. লও মোরে দয়া করিয়া তোমার চরণে হেম মঞ্জীরে . কঙ্কর রূপে ভরিয়া ! বাজিব নিত্য শিঞ্জন-তালে পড়িব মনে ত’ তবু কোনো কালে ; ঝঙ্কার মম বেড়িয়া তোমারে . ধ্বনিবে রহিয়া রহিয়া ; ধন্য হইব সঙ্গীত রূপে . তোমার চরণ লভিয়া |
. লও মোরে সখা চাহিয়া— আমার ‘আমারে’ তব দিঠি তলে . একবার শুধু ডাকিয়া ! সব কল্পনা হো’ক্ অবসান, আমার এ আমি পা’ক্ নব প্রাণ জীবন মরণ জনম সাধন . দিব গো সাধিয়া সাধিয়া , তব গৌরবে লীন হ’য়ে আমি . রিক্ত হইব মাগিয়া |
ভাবিনী কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ ( সেপ্টেম্বর ১৯১৬ ) সংখ্যায় প্রকাশিত |
. ( গাথা ) . ক্ষুদ্র পল্লী প্রান্তর বালু কঙ্কর শিলা আবিল ধুয়ে . বয়ে যায় এক ক্ষুদ্র তটিনী মুক্তামালার সীমানা থুয়ে | . বর্ষায় নদী প্লাবি তীর ভূমি বহিয়া আনিত গুল্মলতা— . নিদাঘে আবার যাইত ফিরিয়া ক্ষুব্ধ হতাশ প্রণয়ী যথা ! . রামু মোড়লের নাতিনী ভাবিনী ললিত সুঠাম কিশোরী মেয়ে . এ নদীপাড়ের আমের বাগানে যখন তখন আসিত ধেয়ে | . বড়ই গরীব রামমণ্ডল কোন মতে করে দিনাতিপাত— . কেউ নাই ঘরে--- আপনি, ভাবিনী, আর নাতি এক বছর জ্বরে, . তবু সে তাদের মঙ্গ্ লাকে নিয়ে চরাইত নিতি বিলের চরে | . সন্ধ্যায় দিয়ে গোয়ালে সাঁজাল ভাবিনী ঢুকিত রান্নাঘরে . দাদা আর ভায়ে খাওয়ায়ে, রাখিত ভিজাইয়া ভাত প্রাতের তরে | . হরিশ যে দিন পাইত মজুরী মঙ্গ্ লারে নিয়ে ভাবিনী যেত’—
. সারাদিন ঘুরি বাগানে ও বেড়ে ‘খুটিয়া’ আনিত যা’ কিছু পেত’ | . কভু দু’টি বেল, একটি কয়েত্ গোটা কত নটে শুশনি শাক . কিম্বা একটা ঝিঞে বা করলা রাত্রে তাহাই হইত পাক | . বড়ই কষ্ট রামু মোড়লের কেউ তারে ফিরে চাহে না কভু ;-- . পাতিতনা হাত --- সুখী সে যে ছিল নিজ-নির্ভর-গর্ব্বে তবু !
# # # # #
. সে দিন শ্রাবণ বর্ষা ভীষণ দুর্য্যোগ ছিল সারাটা দিন . ক্ষণেকের’ তরে আসেনি দেবতা সূর্য্য ছিলেন আঁধারে লীন ! . মাঠে বাটে সব হাঁটু ভরা জল সাঁজেই অমার নিশীথ যথা— . রাজবাড়ী হতে ফিরিতে নাবিয়া মোড়লের বড় বাজিল ব্যথা ! . ভাবিনী হেথায় ভায়েরে খাওয়ায়ে পাথরে দাদার অন্ন ঢালি, রহিল বসিয়া মাটির একটি ছোট্ট প্রদীপ সমুখে জ্বালি ! . ঘন গর্জ্জনে ঘুর্ণিঝঞ্ঝা চূর্ণিছে কত তরুর শির— . বর্ষার কেশ মুষ্ঠে আঁকড়ি নিষ্ফল রোষে কি অস্থির ! . পবন আহত দ্বারের শিকলি বাজে ক্ষণে ক্ষণে চকিত করি--- . ঝাপ্ টা বাতাস দুয়ার ঠেলিয়া
দিছে বালিকার চিত্ত ভরি ! . শুনিছে ভাবিনী এ প্রলয় মাঝে বুড়ার কম্প্র পায়ের ধ্বনি --- . অই বুঝি দাদা ক্লান্ত নিবাক্ দ্বারে কর হানে রনন্ ঝনি ! . খুলে দেখে দ্বার ---কই ? কেউ নাই ! বায়ু করে যায় অট্টহাস ! . রুধিয়া দুয়ার আসে ফিরে ফিরে কত বার হেন ব্যর্থ আশ্ ! . ভাবিছে ভাবিনী ধ্রুব বিশ্বাসে না-আসা দাদার হয়নি কভু, . আজিও আসিবে ---দুর্য্যোগ আর দূর পথে দেরী--- আসিবে তবু ! . হেরে যেন বালা – মাঝ পথে দাদা একে এ আঁধার তাহাতে জল, . কোথা আল কোথা পথ ঠিক নাই— পথ থৈ থৈ সুসমতল ! . আমরা তো বেশ আছি ঘরে বসে’ না এলেই তুমি করিতে ভাল ! . সরে না বাক্য শুষ্ককন্ঠে ভাবিছ’--- বাঁচিতে পাইলে আলো ! . তালের ছাতাটা উড়ে গেছে ঝড়ে ক্ষুধায় শক্তি নাহি তো হাতে ! . খুঁজিছ’ কি তাই সাশ্রু নয়নে হাঁতাড়ি আঁধারে এ কাল রাতে ? . রক্তের ধারা ঝরিছে চরণে ফুটেছে কতনা কুশের আগা— . সিক্ত সে চীর জলে সট্ পট্ চলিতে কেবলি হোঁচট্ লাগা ! . হাঁকিল তখন তৃতীয় প্রহর পল্লী প্রহরী শৃগাল দলে . পড়িল লুটিয়া ভাবনা ক্লান্ত কিশোরীর মাথা মেঝের তলে |
. “যাই, যাই, দাদা,----আহা মরে’ যাই— হয়েছে তোমার কষ্ট কত |” . বলিতে বলিতে ছুটিল কিশোরী মুছি আঁখি দু’টি তন্দ্রাহত | . “কই ? কত দূরে ? আলো নিয়ে যাব ? যাই, যাই দাদা সবুর কর’ . ভয় কি ? এই যে আসিয়াছি আমি” বলিয়া ভাবিনী ছুটিল খর ! . থেমেছিল জল ; বাতাস তখন রাগে এলোমেলো সরাতে মেঘ— . শিশুর মতন জামা পরে’ তারে খুলিতে যেমন প্রকাশে বেগ ! . ছুটিতে ছুটিতে আসিল ভাবিনী ঊর্ম্মিধুনিত নদীর ধারে ;-- . আরও গেল সে—নিকটে বা দূরে মিলাইল শেষে অন্ধকারে !
# # # # #
. ফিরিল মোড়ল তখনি ঊষায় হরিশ তখনো ঘুমায় ঘরে . ঢুকিতে দুয়ারে কি যে এক বাধা পাইল বৃদ্ধ বাতাস ভরে | . করুণ হিয়ার বৃথা প্রতীক্ষা মরণের ঘোর আর্ত্তনাদ . বাড়ীর বাতাস করেছিল ভারী বৃদ্ধ তাহার পাইল স্বাদ | . “ভাবিনী ---ভাবিনী” ডাকিল মোড়ল ফিরিল সে ডাক নিরুত্তর . ‘সে যে নাই’ হেন কেন মনে হয় রোদন আসিছে নিরন্তর | . নীরব নিজন—আসিল না কেউ | সেবা-পরায়ণ সে দুটি হাত . অন্নের থালে রহিছে জাগিয়া— করে বুড়া ঘন দৃষ্টিপাত ! . চরণ পাটুনী আসিয়া তখনি আছাড়ি পড়িল আঙন তলে— . “ ঘাটে এল যবে, জানি কি তখন “নিশিতে তাহারে পেয়েছে বলে’ ?” . মূর্চ্ছিত বুড়া পড়িল তখনি মেলিল না আর বারেক আঁখি !— . জলটুঙি বাসী কৃষকেরা বলে--- আজ’ ফিরে সে যে দাদারে ডাকি ||
রজকী আরো ব্যথিত হয়ে কহিল স্নেহভরে “কুকুর সে-ও এ হেনকালে আসেনা পথ’ পরে ; অত মানী দেওয়ান্ --- কিনা এ দুর্য্যোগে ছোটে ? চাকর হতে তবে ত মোরা অনেক সুখী বটে |” বেহারা বুঝি জুটেনি কেউ ? আসিবে কেন তারা ? চাক্ রী কারো করে ত’ না যে রহিবে ডাকে খাড়া ? দু’মুঠো ভাত, আহারে বাছা, পাবিনে কি রে কোথা ? যে দেছে প্রাণ, দিবে না কি সে খাইতে, এ কি কথা ?”
শুনিল রূপ দাঁড়ায়ে পথে করুণ সমব্যথা --- “যে দেছে প্রাণ, দিবেনা কি সে খাইতে, এ কি কথা ?” “খাওয়াই যদি এতই বড়, খাওয়ায় তবে কে সে ? চাক্ রী তবে করিব তারি, যাইব তারি দেশে |” তখনি রূপ গোস্বামীজী উপজি রাজ পাশ ইস্তিয়াফা লিখিয়া দিয়া ফেলিল নিশ্বাস ! পুছিল প্রভু--- “পাগল, হাঃ হাঃ, করিছ একি দ্বিজ ? বেতন, বল’, বাড়ায়ে দিব ; বোঝনা হিত নিজ ?”
দেবতা ও মানব কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৫ ( এপ্রিল ১৯১৮ ) সংখ্যায় প্রকাশিত |
. ( ১ ) আমি চাহিনা অমরাবতী . ঘুচেনা যাহার সুরাসুর করে চিরদিন দুর্গতি ! . সুরগন চাহে আপন করিতে যারে . অসুর ছিনায় নিজের বীর্য্য ভারে— . সে মায়া পুবীব অধিকার লয়ে হোক্ . দ্বন্দ্ব অসুরে সুরে !— আমি চাই শুধু একটি কুটীর ছোট . নিভৃত পল্লী পুরে |
. ( ২ ) চির নন্দন পারিজাতে . চাহিনা রচিতে চারু বিচিত্র বিলাস দিবস রাতে ; . বাসব বিজয়ী সুর সম্রাট হতে . চাহিনা গো আমি চাহিনাক’ কোন্ মতে . গজ বাজি রাজি মণি মাণিক্য সুধা . নিক যাব খুশী হরি আমি চাহি শুধু দশজনে সাথে নিয়ে . খেয়ে ও খাওয়ায়ে মরি |