কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
বিশ্বাস
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৫ ( এপ্রিল ১৯১৮ ) সংখ্যায় প্রকাশিত।

( গাথা )

বরষ পরে গুরু আসিয়া
কহিল --- “আরে,  এস, এ ধারে
ভাল তো নুটু ঘোষ ?                 সকল মঙ্গল ?
কেমন চাষবাস এবারে ?”

ঘোষজা পুলকিত তনুতে
চরণ ধুলী ল’য়ে মাথাতে
বসিয়া করে করে                      কহিল সবিনয়ে
“সকলি ভাল তব দয়াতে |”

“এবার তবে আর কিছুরি
ওজর করিও না বৃথা এ
ইষ্ট মন্ত্রটি                             ধারণ করি ফেল’
কি হবে মিছে কাল বীতায়ে ?

“বছরো আছে ভাল, উনিশে
অমৃত যোগ গেছে পড়িয়া
এদিন মেলা ভার                  ও-দিনে ভাবি তাই
ফেলি এ শুভ কাজ করিয়া |

“কি জানি কবে কার কি হয় !
পড়েছে দিন কাল এমনি
আজিকে দেখি যা’য়             কালি সে নাহি, হায়,
স্বপন মনে হয় যেমনি !

ঘোর এ কলি কি না ?   সে হেতু
চারিটি পাদ পাপ পূর্ণ
নহিলে এ দেশের                   এ হেন দশা হয় ?
গেল এ রসাতলে তূর্ণ |

রুদ্ধ শ্বাসে নুটু শুনি এ
শঙ্কা গণে মনে---তাই তো
দেশটি রসাতলে                যায় তো কোনখানে
সপরিবারে আমি যাইব !

নীরব দেখি গুরু নুটুরে
ভাবিল বুঝি কায হইল,
কহিল ---“তবে তাই             যোগাড় কর’ গিয়ে,
উনিশে দিন ঠিক রহিল |”

ধরণী-নিবন্ধ নয়নে
কহিল নুটুঘোষ--- “প্রভু গো
ছোট যে ছেলে                    ক’টি !   ইষ্ট মন্তর
নারি নিতে এবে কভু তো !

“পাগল হলে নাকি, বাবাজী ?
ছেলেরা ছোট তা’তে কি ক্ষতি ?
মন্ত্র বিনা ঘেরে                        শুদ্ধ নহে দেহ
গুরুরে পাওয়া সে তো নিয়তি |

“যা” কিছু কর কাজ সকলি
না হলে গুরু নয় সিদ্ধ,
তীর্থ দান ধ্যান                        দেবতা দ্বিজ পূজা
সবারি মূল গুরু, নিত্য |

“গুরু যে নরাকারে দেবতা
এ ভব-নদী-পার-তরণী !
চতুর্ব্বর্গের                         ফল তো হাতে হাতে
করিলে গুরু-সেবা অমনি |

“ভক্তি কর যদি গুরুরে
কিছুরি প্রয়োজন হবে না
তীর্থধর্ম্মের                            সরাসরি সার গুরু
ভবের ভয় আর রবে না !

“মাত্র একবার দিবসে
ইষ্টমন্ত্রটি স্মর’ গে
মুক্তি তবে তব                     সাধ্য রোখে কেবা ?
যাবেও সশরীরে স্বরগে !”

অশ্রু দর দর নয়নে
ভক্তি পুলকের আবেশে
কন্ঠ গদগদ                           কহিল নুটু ----- “প্রভু
ক্ষম’ এ অবহেলা আদেশে !

“বছর দুই আরো না গেলে
নারিব ও আদেশ রাখিতে !
কেন তা’ শোন বলি,                   আমারো কায সারা
তা’ হলে হ’য়ে যায় বাড়ীতে !

“তখন ছেলে দু’টি তবুও
কাযের মত কিছু হইবে
পারিবে দু’পয়সা                        আনিতে ততদিনে
বধুও কায শিখি লইবে |

“রাজার সাথে এই মামলা
চুকিবে ততদিনে, সাড়াব ‘
ভিটে খানা,  দু’খানা                     ঘরও তুলে দিব :
বলদও জোড়া দুই বাড়াব’ |

“তা” হলে ছেলেদের রবে না
অন্ন বস্ত্রের দুঃখ
নহিলে ক’বে তারা                          চিরটাকাল ধরি—
‘বাবাটা ছিল অতি মূর্খ |’

“মা-হারা আহা তারা বাল্যে
পায়নি কোন সুখ জীবনে
এখন আমি যদি                         কিছু না দিয়ে যাই,
বাঁচিবে তবে তারা কেমনে ?

“আমি জানি প্রভু সে কথা
মূর্খ হইলেও বুঝিতো
ইষ্টমন্ত্রটি                                   জপিয়া একবার
গুরুরে যেমনিই পূজিব’---

“অমনি রথ নামি আসিবে
স্বর্গে যেতে হবে চড়িয়া
তাইতো আগে হতে                       রাখিয়া যেতে চাই
এসব ঠিক্ ঠাক্ করিয়া |”

#        #         #        #

উঠিল গুরুদেব শিহরি
দেখি এ বিশ্বাস অন্ধ,
আপন হীনতায়                           সরমে গেল মরি !
মন্ত্র একি নব-চ্ছন্দ !

.                        ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানসী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার মাঘ ১৩১৫ ( জানুয়ারী ১৯০৯ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


ও গো আমার চিত্ত বনের
.     বেতস লতার মঞ্জরী,
.        কল্প লোকের সুন্দরী,
নয়ন-পথের স্বপ্ন-রথের উর্ব্বশী
.   পাগল-করা পূরশশী
.       অবন্ধনে বাঁধ’ মোরে
খুলে লাজের উত্তরী !

বেণী তোমার এলিয়ে পড়ুক্
.   সু-ত্রিবেণীর সঙ্গমে
.      আমার স্থাবর জঙ্গমে—
চরণ রাখ চিরদিনের বাঞ্ছনে
.   সেঁউতি জ্বলুক্ কাঞ্চনে
.       দিন শেষের স্বর্ণ শোভায়
বর্ণ লোভায় সঞ্চরি |

চারু তোমার চুম্বনেতে
.    করিয়া রস সঞ্চিত
.       আর রেখ’না বঞ্চিত

নবীন আলোর উদয় সাথে ঘুম মোর
.    দিক্ ভেঙে আজি চুম তোর
.       এ ফাল্গুনে কর্ মোরে তোর
ফুলের মধুর চঞ্চরী !

মন সায়রের স্বর্ণ-হংসী
.   আয় নেমে তোর মর্ত্ত্যেতে
.      আছি আমি বুক্ পেতে---
আয়রে আমার বর্ষা ধারার সঙ্গিনী
.    নীরের ক্ষীরের রঙ্গিনী !
.       নুয়ন-নীরের গাহন জলে
আর খেলিস্ নে সন্তরি !

থাকুক্ পরা’ আলোর বসন,
.    চুলের আঁধার পশ্চাতে
.      আয় লো বাসক-সজ্জাতে
আলিঙ্গন ঝরুক্ ফুলের ফুল-ঝুরি—
.   আমার পাতা বুক জুড়ি’—
.      চিরন্তনী মোর মোহিনী
মোহপুরের অপ্ সরী |

.                        ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষাতত্ত্ব
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৬ ( অগাস্ট ১৯১৯ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.       জান’ কি মা উপ্ রে কিসের শব্দ ?
.       নীচে মানুষ ভয়েই থাকে স্তব্ধ !

তুমি ভাব’ মেঘের আওয়াজ, আপনি বুঝি হয় ?
ওটা তোমার মস্ত ভুল মা !  শোন’ মিথ্যে নয় !
আমি যেমন তোমার ছেলে ছাদের উপর খেলি

.                 ( ইচ্ছা মত গিয়ে )
আকাশ দেশেও তেম্ নি আছে তাদের অনেক ছেলে
.                  কেবল খেলা নিয়ে !

যখন করে ছুটোছুটি টিনের ছাদের’পর,
শব্দ আসে, যাতে তোমার লাগে এমন ডর |
.           তাইতে তুমি মোরে, কেবল
.           রাখ ঘরে ভরে’        
পাছে আমি দুষ্টু হয়ে কেবল খেলা করি
কিম্বা ছাদে ছুট্ তে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে পড়ি !

.          বল’ ত’ মা কেন পড়ে জল ?
.          ভাব্ ছ বুঝি ছেদা মেঘের তল !

তা’ নয় মা ছুটে ছুটে ঘেমে ওঠে তারা
তাদের গায়ের ঘাম গুলি সব পড়ে এমন ধারা |
তাদের মা-ও তোমার মত ঠাণ্ডা হ’তে বলে
.              বাতাস করে কত !
তারা কিন্তু শোনে নাক মোটেই মায়ের কথা
.              বাড়ায় আরও তত !
তোমার মত ওদের মারও মুখে মাণিক জ্বলে
ঝিলিক্ মারে আকাশ জুড়ে যখন কথা বলে !
.                বুঝতে তুমি নার’,  আমায়
.                ক্ষ্যাপা বলে সার’ !
ঘুমোয় ওরা শান্ত হয়ে যখন এসে নেমে
তোমার কওয়া বৃষ্টি বাদল তখনি যায় থেমে !
.               তুমি তাদের কভু দেখ’ নিত’
.                   তাদের কথা বোঝাও শেখ’নিক’ !

জল পড়্ লেই তাদের আমি পষ্ট দেখা পাই
ভালবাসি তাদের কথাও, সবাই শুন্ তে চাই!
পাঠায় আমায় জলের ফানুস্ উঠান্ খানি ভরে’
.               ছুঁলেই মিলায় জলে
তাতেই তাদের ছবি আছে মুখটি নিচু ক’রে’
.               দেখ্ লে দেখা মেলে !
জলের ধারা পড়ে যখন তারি ফাঁকে ফাঁকে
আঙুল নেড়ে আদর করে আমায় তারা ডাকে !
.                ঢেকে দু’টি কাণ, আমি   
.                শুনি তাদের গান !
আমার বড় ভালবেসে আকাশ শিশুর দল
তাইতে এত ভালবাসি দেখ্ তে বাড়া’ জল !

.                        ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আশীর্ব্বাদ
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ ( মে ১৯২০
) সংখ্যায় প্রকাশিত |


আজি এ দিনে ধন কি রতন দিব রে ?
ধারিনা ধার তার দীনতার বিবরে !
এ হেন উত্সব কলরব-বিহীনে
কেমন শুভদিন শোভাহীন সে যে বিনে !
মমতা মাখা মুখ ভরা বুক কোথা সে
কোথা সে আকুলতা ব্যস্ততা সদা সে !
মায়ের যত মায়া ধরি কারা ঘুরিত
সকল প্রয়োজনে আয়োজনে উরিত
সবার মাঝে আজি উঠি বাজি সে কথা
করিছে আন্ মনা উন্মনা, কেন গা ?
সেই যে কি থাকিত আজিবীত বলিয়া
যাবে কি হেন দিন সুখহীন চলিয়া ?
শ্রেষ্ঠ ধন মম নিরুপম মমতা
দিতেছি শত হাতে তব মাথে লহ’ তা !

এবে যে আমি, ধন, দুইজন তোমারি
তুমিই আছ জুড়ে বুক পুরে আমারি !
নিয়ত চিত মাঝে নানা সাজে রচি এ
তোমারি কল্যাণ সব প্রাণ যাচিছে !
আসুক্ শত বার ফিরি আর দিন এ
মাগি রে বিভু পাশে বহু আশে বিনয়ে !
পিতা এ ধন দীন মনহীন ভেব’ না –
হয়ত তুমি যবে বড় হবে --- রব’ না
আমি এ ধরণীতে ;  গাথাটিতে এ কবির
পিতার পরাণের ও মনের সুগভীর
স্নেহের সমুদয় পরিচয় লিখিনু,
সকল শুভ আশা ভালবাসা রাখিনু |

.                        ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মরণ সুন্দর
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৭ ( জুলাই ১৯২০ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.     মরণ  মরণ রে বিজয় তুহারি !
সুন্দর কান্ত চির মানস-হারি !
.     অন্ধকার ঘন নিবিড় নীরন্ধ্র
.     নিতম্ব-চুম্বিত বেণী বিবন্ধ
.     সঘন অমানিশিপুঞ্জিত তমসম
.     অঙ্গবরণ তব চিত্ত ভরিছে মম
অমর মরণ রে বিশ্ব-বিহারি !
.     কৃষ্ণ ---তার দু’টি অপলক আঁখে
.     ধুমকষায়িত  অশ্রুনিষেকে

.     ধৌত করিছে নিতি, মোহবন্ধ হরি
.     লক্ষ-হৃদয়-গল লাক্ষা চরণ ভরি
মরণ সুমোহন দুখ অপহারি !
.      ক্রন্দন গুঞ্জন মঞ্জীরে কত তব
.      বেদন-সুছন্দে সঙ্গীত উদ্ভব
.      তপ্তশ্বাসে তব অঙ্গ পরশ পাই
.      তরল মুকুতা হার তোমারে পরাতে চাই
মরণ রে সুন্দর মুরতি ধারি !

.                        ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বনদেবী
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
মহারাজ জগদিন্দ্র রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩১৯ ( ফেব্রুয়ারী ১৯১৩ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


.                                        ( ১ )
.          দ্বিরদরখচিত ---সিংহ-আসনে বসি আমি দিবাবিশি,
.          ঘন বৃংহন স্বনে, নকীব ফুকারে কাঁপাইয়া দশদিশি ;
শিখিরপুচ্ছে সুশোভিত রাজছত্র                 চন্দ্র-আতপ খচিত শ্যামল পত্র
.          বৈতালি’ পিক-বিস্তুত অহোরাত্র, পথে পথে পাতা বৃষ্টি :
.          আলোকে গীতে ও গানে রাজপুরী মম নিশিদিন হয় সৃষ্টি !

.                                       ( ২ )
.          স্থাপিত তোরণদ্বারে নারিকেল ঘট, দুলিছে আম্রশাখা ;
.           ধান্য-দুর্ব্বাদলে নিয়ত রচিত অর্ঘ্য মিনতি-মাখা |
শত নির্ঝরে অঙ্কিত আলিপন               চামর ঢুলায় চমরীরা আজীবন
.            চন্দন করে সৌরভ বিকীরণ, তালবীথি করে পাখা,
.            আশ্রম-মৃগদল দূত সম ফিরে কত-না বর্ণে আঁকা |

.                                        ( ৩ )

.           বারণ-যুথ-শোভন সুচারু তোরণ মোহন পুষ্পহারে,
.           পটিত দিগ্ দিগন্তে কান্ত পতাকা বিহগ-পক্ষ ভারে |
বংশ-রন্ধ্রে সমীরিত প্রেম-গীতি               চরণ নিয়ে নবীন শস্প-বীথি
.            চন্দ্রিকা রচে’ কোমল শয্যা নিতি আলো ও অন্ধকারে,
.            স্বপ্নে আমার হাসি ফুল হয়ে ফোটে যথা তথা চারিধারে |

.                                       ( ৪ )
.            পুষ্পরাগরেণু দিঠি সম উড়ে খুঁজিয়া খুঁজিয়া কা’রে,
.            সঞ্চিত গাঢ় প্রীতি পরিচয় মোর প্রকাশে গন্ধভারে ;
প্রেমগৌরবে দেহ সৌরভে ধূপ         দেবতার লাগি মরিতেছে অপরূপ !
.             মরি লজ্জায়, যেন প্রতি লোমকূপ ফুটে কদম্বহারে,
.             ধূপের আত্মত্যাগে ভুলাইতে চায় আপনার ভাবনারে |

.                                       ( ৫ )
.             আজ্ঞা অপেক্ষিছে অরণি-সেনানী দীপ্ত ও তেজীয়ান্ ,
.             ভস্ম করিবে শত্রু জ্বালিয়া রুদ্র দাবানল লেলিহান্ !
ঝঞ্ঝার ভেরি বাজে গম্ভীর রবে               প্রস্তর শিলা উড়ায়ে যুদ্ধ হবে—
.             মন্দুরা ত্যজি হ্রেষি বাজী-রাজি সবে হবে বনে আগুয়ান্ ,
.             ইঙ্গিতে মম পাশে--- মৃত্যু দাঁড়াবে ভীম বলে বলীয়ান্ |

.                                          ( ৬ )
.             বন্দী উরগগণ বিবর-কারায় ফেলিছে দীর্ঘশ্বাস,
.             নর্ত্তকী শিখিদল কলাপ মেলিয়া নাচে তারা বার’মাস !
বনপথখানি চকিত নগরপাল                 সভাসদ মম সুমধুর সুরলাল,
.              শরীররক্ষী দীর্ঘ বিশাল শাল অনলস মম পাশ—
.              প্রসাধনকারী মম ষড় ঋতু আসে লয়ে শোভা-সাজ রাশ |

.                                          ( ৭ )
.              শক্তির ভাণ্ডার ফিরে গণ্ডার সুকঠিন দ্বাররক্ষ ;
.              নির্ম্মছে মধুচক্র অফুরান’ শ্রমে মধুমক্ষিকা লক্ষ |
শুষ্ক পত্র সম খসে’ যায় জরা,                   মধুযৌবনে দেহ-নবরূপ ভরা ;
.              শান্ত শীতল ছায়া দেয় তাপহরা কাল’ মম আঁখি-পদ্ম ;
.              রচিত অশথতলে অতিথির তরে শ্রান্তি-বিনোদ কক্ষ |

.                                         ( ৮ )
.          নভ কুঞ্জjগণ  হৈমকুম্ভে  করায়  আমারে স্নান ;
.               নির্ম্মল সম সীঁথে’ সন্ধ্যা ঊষার সিন্দুর করে দান |
দেবতা অতিথি আসে হেথা কতজন           নল দাশরথি দীন পাণ্ডবগণ
.               মোর বোধিতলে করেছিলা অর্জ্জন বুদ্ধ সুনির্ব্বান্ ;
.               রিক্ত সকল-হারা সকলের আমি সমাদরে দিই স্থান |

.                  
                 ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জন্মভূমি
কবি বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
মহারাজ জগদিন্দ্র রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার চৈত্র ১৩১৯ ( মার্চ ১৯১৩ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


তব             দীপটি জ্বালে সূর্য্যশশী
.                পদ চুম্বে জলধি,
.                 মৃদমন্দে মধুছন্দে
.                           নিতি পদ বন্দে জগতী !
.                 জলদ জালে ---কচকলাপ---
.                তারকাহারে খচিত
.                 আঁচল রাঙা, ধানের শীষে,--
.                                 দূকুল চারু রচিত |
তুমি            অযুত সুত যুত ,স্তূত
.                গঙ্গা পূত সলিলে
.                 তালবীথিকা বীজনরত
.                সুরভি ভরা অনিলে |
.                 দাসের মত ছয়টি ঋতু
.                                 অবধানে ও আদেশে
.                 বিহগগণে ঘোষিছে তব
.                কীর্ত্তি দেশে বিদেশে |
তব              তুচ্ছ তৃণে গুচ্ছে রচা’
.                মলিন ধূলি শিখানে
.                  নীরব বীণা ঝঙ্কারিল
.                কবির করে কি গানে—
.                  মঞ্জরিল শুষ্ক লতা
.                গুঞ্জরিল বিহগে,
.                  ক্রৌঞ্চসহ ক্রৌঞ্চী গেল
.                অমর মন-স্বরগে |
ওগো,           পাইল প্রাণ কাব্য কত
.                পুণ্য-গাথা ধর্ম্ম
.                  তোমার গেহে সে কোন যুগে
.                ভাবিতে ভরে মর্ম্ম !
.                  অট্টালিকা ছিলনা এত
.                তাড়িতালোক দৃপ্ত,
.                  কুটির ভরা রত্ন ছিল
.                অশেষ মহাদীপ্ত !
হেথা             আছিল ঋষি অমর ত্যাগী—
.                   মগ্ন ধ্যানে নিয়ত ;
.                   রাজ্য প্রজা পালিত রাজা
.                পিতৃস্নেহে নিরত ;
.                    চাতুরী ছলা মানুষগুলা
.                জানিত নাক’ বিন্দু,
.                    রমণী ছিল দেবীর পীঠে
.                বিমল সুখ ইন্দু |
ওগো,              এই সে ধূলি---কতনা বীর
.                       রক্তে রাঙা পড়িয়া,
.                    এই সে ভূমি, যেথায় লোকে
.                বাঁচিয়া থাকে মরিয়া ;
.                    এই সে দেশ আমার, ওগো—
.                জন্মভূমি ---স্বর্গ !
.                    যাহার তরে আজিকে কবি
.                        রচিল গীত-অর্ঘ্য |

.                                   ****************                          
.                                                                              
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর