কবি আনন্দ দাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
*
মন্দ পবন বহে মনোহর স্থান তাহে
কবি আনন্দ দাস
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত
শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের (১৯২৭ সাল) ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ, ৩১শ পল্লব,
অষ্টকালীয় নিত্য-লীলা, পদসংখ্যা ২৭৯৪।

॥ বরাড়ী॥

মন্দ পবন বহে                                       মনোহর স্থান তাহে
সুশীতল কুণ্ডক কূলে।
চৌদিগে সখী মেলি                                        করত হুলাহুলি
কুঞ্জে কলপতরু-মূলে॥
রাউ কানু কেলি-বিলাস।
দুহুঁ শুভ অভিসরি                                     খেলই পাশা শারি
কৌতুকে হাস পরিহাস॥
কানু কহে কর পণ                                       মোহে পরিরম্ভণ
হারিলে দিবে দশ বার।
হাসিয়া কয় রাই                                      কোথায় শুনিয়ে নাই
পাশক ইহ ব্যবহার॥
হারিলে সে হার দিব                                   জিনিলে মুরলী লব
স্বরূপে খেলিবে যদি পশা।
শুন শুন ব্রজ-বীর                                          চীত করহ স্থির
দূরে কর ইহ প্রতিআশা॥
শুনিয়া রাধার বাণী                                    হাসি কহে রস খনি
হার হারিবে কত বার।
যদি বা জিনিবা তুমি                                মুরলী না দিব আমি
পিছে মিছা পাতিবে জঞ্জাল॥
দুহুঁ-বস-কুন্দল                                             মনোভব-মঙ্গল
ললিতা ললিত কখা কহে।
আপনাকে পণ করি                                খেলে দুহুঁ পাশা শারি
হারিলে অধীন হৈয়া রহে॥
শুনিয়া ললিতা-বাণী                                 কহে রাই বিনোদিনী
আমি কেন হইব অধীন।
শুনিয়া মধুর কথা                                      কহয়ে চম্পকলতা
তুমি বড় এ রসে প্রবীণ॥
কহয়ে বিশাখা সখী                                    শুন রাই চন্দ্র-মুখী
মনে কিছু না করিহ ভয়।
নাগর চঞ্চল-মতি                                    না জানে পাশার গতি
খেল তুমি জিনিবে নিশ্চয়॥
সখীর বচন শুনি                                        দুই জনে মন মানি
পাতিল সে পাশার পসার।
রাই নিল নীলা গুড়ি                                শ্যাম সবুজ লাল শারি
খেলে পাশা ফেলে বারে বার॥
পাশা ফেলে অবসরে                                      মেঘ-গভীর-স্বরে
দশ দশ হাঁকয়ে গোপাল।
পাশা ধরি ফেলে রাই                               বিদু বিদু বোলে তাই
ভালিরে ভালিরে পাশোয়াল॥
ডাহিনে পাশাটি ধরি                                বাম হাতে করি চুরি
কানু বোলে ফেল দুই চারি।
হাসি রুষি কহে রাই                                      মনমথ দোহাই
কৈতব করিয়া সে বিচারি॥
যখন যে দান চাই                                   সেই দান ফেলে রাই
বিস্মিত-হৃদয়ে শ্যাম হাসে।
দুহুঁ দুহুঁ পাশা ধরি                                     পুন পণ দুন করি
বাঢ়ল সে কেলি-বিলাসে॥
ললিতা বিশাখা সখী                                দুই জনে করে সাখী
হারি জিনি করয়ে বিচারি।
তবে সে মিনতি করে                                হারিয়া রসিক-বরে
আনন্দ দাসের বলিহারি॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃষভানু-নন্দিনিকে শোভা বনী
কবি আনন্দ দাস
আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত
শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের (১৯২৭ সাল) ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ, ৩২শ পল্লব,
অষ্টকালীয় নিত্য-লীলা, পদসংখ্যা ২৮৭২।

॥ বরাড়ী॥

বৃষভানু-নন্দিনিকে শোভা বনী।
বরণ-কিরণ-ছবি জিনি দামিনী॥
চরণ-কমল পর                                নখর নিশাকর
মঞ্জির রঞ্জিত মধুর-ধনী।
কিয়ে বিধি অদভুত                          উরুযুগ নিরমিত
খিন-কটি নীলিম-বসন-কসিনী॥
কিয়ে মুখ-ছন্দ                                জিনি কোটি চন্দ
কাম-কামান ভাঙ মৃগ-নয়নী।
শ্যাম-ভুজঙ্গিনী                                  বেণিকে লাবণি
আনন্দ-মতি-গতি-দুখ-হরণী॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শুন রসময় সদয় হৃদয়
কবি আনন্দ দাস
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, পৃষ্ঠা-১০৬৫।

খণ্ডিতা

শ্রীরাধার উক্তি

॥ ইমন॥

শুন রসময়                                        সদয় হৃদয়
আমি সুকঠিন বামা।
বিরহ পাবক                                  মাঝারে ধাবক
হইলুঁ ফেলিলুঁ তোমা॥
আমি মরি মরি                                মূঢ় সে মররী
দিয়েছি অসুখ নানা।
মোর শিরে হাত                              দিয়ে প্রাণনাথ
সকলি করহ ক্ষেমা॥
শুন তুহুঁ যদি                                    লাখ কুলবতী
বিলাসে পাওসি সুখ।
মোর সুখ তাতে                            কোটি গুণ হৈতে
নাহি নাহি কিছু দুখ॥
এক ভিখ মাগি                                   সরলে কহবি
না করবি লাজ ভয়।
চন্দ্রাবলী কত                                  আদরে রাখত
কেমন পিরীতিময়॥
সুখের সাগরে                             যে রাখে তোমারে
সে মোর দোসর দেহ।
কহয়ে আনন্দ                                    দাস এই রস
যে জানে সে জানে লেহ॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কমলিনী বাণী সুকোমল জিনি
কবি আনন্দ দাস
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, পৃষ্ঠা-১০৬৫।

শ্রীকৃষ্ণের উক্তি

॥ ইমন॥

কমলিনী বাণী                                সুকোমল জিনি
শুনিয়ে রসিক মণি।
গদ গদ স্বরে                                  কাতর অন্তরে
কহে জোড় করি পাণি॥
পিরীতি কি জানি                            ফিরি বনে বনে
গোধন পালন মতি।
তুমি প্রেমধাম                                  প্রেমময়ী নাম
মুরতি পিরীতিবতি॥
প্রেমরসকূপ                                     রসের স্বরূপ
তুমি প্রণয়ের ধাতা।
প্রেমের উদয়                                 তোমা হতে হয়
তুমি প্রমধন দাতা॥
বেদস্তুতি যত                                 সেহ বিনিন্দিত
মধুর ভর্ত্সনে তোর।
তোর প্রেমরীতে                                নাগরালি ইথে
বাড়ে কত শত মোর॥
জনমে কখনো                                কাহারো অধীন
ঋণী নহি কারো ধনি।
এহেন সুলেহ                                  দিয়া নিজ দেহ
তুমি করিয়াছ ঋণী॥
তুমি কহ ধনী                                কি রূপে অঋণী
হইব পূরিবে আশ।
গৌর হবে যবে                                শোধ হবে তবে
কহয়ে আনন্দ দাস॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিনোদিনী রাই গৃহে রন্ধনে আছিলা
কবি আনন্দ দাস
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব
পদাবলী”, পৃষ্ঠা-১০৬৫।

.        সুবল মিলন

.        ॥ টোড়ী॥

বিনোদিনী রাই গৃহে রন্ধনে আছিলা।
আচম্বিতে সুবলে দুয়ারে দেখিলা॥
দু ঝুঁটি চুলের গুচ্ছ বাঁন্ধি উচ্চ করি।
হেম থালি হাতে করি বেঢ়াইল কিশোরি॥
সুবল দেখিয়া রাইএর আনন্দিত মন।
কি কারণে আইলি সুবল কহ বিবরণ॥
কখন না দেখি তোমায় আমার ভবনে।
আজ তুমি আইলা বল কিসের কারণে॥
এখনি গোঠেতে গেলি কেন ফিরে এলি।
কেমন আছেন মোর প্রাণ বনমালি॥
সুবল কহয়ে শুন নবীন কিশোরী।
এতক্ষণ কিবা হইল কহিতে না পারি॥
তব কুণ্ডতীরে শ্যাম তোমার লাগিয়ে।
সদা ধ্যান করে প্রেমে কান্দে ফুকারিয়ে॥
অচেতনে পড়ে আছে তব কুণ্ডতীরে।
বিপরীত দেখে আইলাম কহিতে তোমারে॥
তব নাম শ্রবণেতে ডাকিয়া কহিলাম।
আবেশে নয়ন মেলি তাকাইল শ্যাম॥
কি কথা শুনাইলি সুবল কি কথা শুনিইলি।
কথা নয় যে দারুণ শেল মোর বুকে দিলি॥
দিবসে কেমনে যাব কহ দেখি শুনি।
ঘরেতে আছয়ে মোর পাপ ননদিনী॥
কথাতে কথাতে সদা তোলে বিসম্বাদ।
কহয়ে আনন্দ বড়ো দেখি পরমাদ॥

.            *************************             
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর