কবি বল্লভদাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
দক্ষিণ দেশেতে ভ্রমিতে ভ্রমিতে
কবি বল্লভ দাস
জগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, তৃতীয় উচ্ছাস, পরিকর,
পদসংখ্যা ৪০, পৃষ্ঠা ৩১১।


॥ সুহই॥

দক্ষিণ দেশেতে                                 ভ্রমিতে ভ্রমিতে
গৌরাঙ্গ যখন গেলা।
ভট্টমারি গ্রামে                                   শ্রীগোপাল নামে
বেঙ্কটের পুত্র ছিলা॥
পরম পণ্ডিত                                     অতি সুচরিত
ভট্টপুত্র শ্রীগোপাল।
রাখিয়া প্রভুরে                                    আপনার ঘরে
সেবা করে সদা কাল॥
পূর্ণ চারিমাস                                    তাহা করি বাস
চাতুর্ম্মাস্য ব্রত করে।
গোপালের প্রতি                                 দয়া করি অতি
শক্তি সঞ্চারিলা তারে॥
সে শক্তিপ্রভাবে                                  মজি ব্রজভাবে
গোপাল বৈরাগ্য লয়।
লইয়া করঙ্গ                                     বলিয়া গৌরাঙ্গ
ব্রজেতে উদয় হয়॥
রূপাদির সঙ্গে                                   মিলি প্রেমরঙ্গে
সাধন কৈল অপার।
তাসবার সনে                                     করিল যতনে
লুপত তীর্থ উদ্ধার॥
শ্রীরাধারমণ                                      করিলা স্থাপন
পূজা প্রকাশিলা তার।
এ বল্লভদাস                                     করি বড় আশ
দিয়াছে তোমারে ভার॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নরে নরোত্তম ধন্য গ্রন্থকার-অগ্রগণ্য
কবি বল্লভ
জগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, তৃতীয় উচ্ছাস, পরিকর,
পদসংখ্যা ৬৭, পৃষ্ঠা ৩২০।


॥ মঙ্গল॥

নরে নরোত্তম ধন্য                                গ্রন্থকার-অগ্রগণ্য
অগণ্য পুণ্যের একাধার।
সাধনে সাধকশ্রেষ্ঠ                               দয়াতে অতি গরিষ্ঠ
ইষ্ট প্রতি ভক্তি চমত্কার॥
চন্দ্রিকা পঞ্চম সার                             তিন মণি সারাত্সার
গুরুশ্ষ্যসংবাদ পটল॥
ত্রিভুবনে অনুপাম                                প্রার্থনা গ্রন্থের নাম
হাটপত্তন মধুর কেবল॥
রচিলা অসংখ্য পদ                               হৈয়া ভাবে গদ গদ
কবিত্বের সম্পদ সে সব।
যেবা শুনে, যেবা পড়ে                                যেবা গান করে
সেই জানে পদের গৌরব॥
সদা সাধু মুখে শুনি                               শ্রীচাতন্য আসি পুনি
নরোত্তম রুপে জনমিলা।
নরোত্তম গুণাধার                                  বল্লভে করহ পার
দলেতে ভাসাও পুনঃ শিলা॥

.            *************************               
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রভু আচার্য্য প্রভু শ্রীঠাকুর মহাশয়
কবি বল্লভদাস
জগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, তৃতীয়
উচ্ছাস, পরিকর, পদসংখ্যা ৭৬, পৃষ্ঠা ৩২২।

.        ॥ ধানশী॥

প্রভু আচার্য্য প্রভু শ্রীঠাকুর মহাশয়।
রামচন্দ্র কবিরাজ প্রেমরসময়॥
এ সব ঠাকুর সঙ্গে পারিষদগণ।
উজ্জ্বল ভকতি-কথা করিনু শ্রবণ॥
বৈষ্ণবের তুলা মেলা নানাবিধ দান।
পরিপূর্ণ প্রেম সদা কৃষ্ণগুণ গান॥
এককালে কোথা গেলা না পাই দেখিতে।
দেখিবার দায় রহু না পাই শুনিতে॥
উচ্ছিষ্টের কুকুর মুহু আছিনু সেখানে।
যখন যে কৈলা কাজ সব পড়ে মনে॥
শুনিতে স্বপন হেন কহিলে সে কথা।
ভিটা সোঙারিয়া কাঁদে কুকুর এমতি আছে কোথা॥
বল্লভদাসের হিয়ায় শেল রহি গেল।
এ জনমে হেন বুঝি বাহির না ভেল॥

.            *************************                   
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শুন লো মালিনী সই দুখের বিবরণ
কবি বল্লভ দাস
জগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪ থেকে নেওয়া। চতুর্থ উচ্ছাস,
শচী ও বিষ্ণুপ্রিয়ার বিলাপ, পদসংখ্যা ৫, পৃষ্ঠা ২৫০।


॥ সুহই॥

শুন লো মালিনী সই দুখের বিবরণ।
আজুকার নিশিশেষে                                নিদারুণ নিদ্রাবেশে
দেখিয়াছি দুখের স্বপন॥ ধ্রু॥
যেন বহুদিন পরে                                 আমায় মনেতে কৈরে
মা বলি আসিয়াছিল নিতাই রতন।
কিন্তু যে মেলিনু আঁখি                            আচম্বিত চাঞা দেখি
প্রাণের নিমাই হৈল অদর্শন॥
নাই সে চাঁচর কেশ                                    অস্থিচর্ম্মঅবশেষ
বহির্ব্বাসে কৌপিন পিন্ধনে।
ধূলায় সে অঙ্গ ভরা                                  যেমন পাগল পারা
প্রেমধারা বহে দুনয়নে॥
হারা হইয়া বিশাই                                পাইনু সোনার নিমাই
পূর্ব্ব-সুখ ছিনু পাসরিয়া।
কিন্তু হৈল সর্ব্বনাশ                                  কৈল নিমাই সণ্ণ্যাস
রাখি ঘরে বধূ বিষ্ণুপ্রিয়া॥
এ পূর্ণ যৌবন তার                                  যেন জ্বলন্ত অঙ্গার
তাহা লৈয়া সদা করি বাস।
বিনে প্রাণের নিমাই                                মা বলিতে আর নাই
শুনি ঝুরে এ বল্লভ দাস॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পুলকে বলিত অতি ললিত হেমতনু
কবি শ্রীবল্লভ
দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব-পদলহরী” ১৯০৫, সংকলন গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৫০২।

অথ রসোদ্গার।

শ্রীগৌরচন্দ্র।

॥ বিভাষ॥

পুলকে বলিত অতি,                         ললিত হেমতনু
অনুখণ নটন বিভোর।
কত অনুভাব,                        অবধি নাহি পাইয়ে,
প্রেম সিন্ধু বহ নয়নহি লোর॥
জয় জয় ভুবন মঙ্গল অবতার।
কলিযুগ বারণ,                        মদ বিনিবারণ,
হরিধনি জগতে বিখার॥
নিজ রসে ভাসি,                        হাসি ক্ষণে রোয়ই,
আকুল গদ গদ বোল।
প্রেমভরে গর গর,                না চিনে আপন পর,
পতিত জনেরে দেই কোর॥
ইহ রস সায়রে,                        মগন সুরাসুর,
দিন রজনী নাহি জান।
গোবিন্দ দাস,                        বিন্দু লাগি রোয়ই,
শ্রীবল্লভ পরমাণ॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শ্রীগোবিন্দ কবিরাজ বন্দিত কবিসমাজ
কবি বল্লভ
জগবন্ধু ভদ্র সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪, তৃতীয় উচ্ছাস, পরিকর,
পদসংখ্যা ৭০, পৃষ্ঠা ৩২১।


॥ মঙ্গল॥

শ্রীগোবিন্দ কবিরাজ                                  বন্দিত কবিসমাজ
কাব্যরস অমৃতের খনি।
বাগ্দেবী যাহার দ্বারে                                দাসীভাবে সদা ফিরে
অলৌকিক কবি শিরোমণি॥
ব্রজের মধুর লীলা                                    যা শুনি দরবে শিলা
গাইলেন কবি বিদ্যাপতি।
তাহা হইতে নহে ন্যুন                             গোবিন্দের কবিত্ব গুণ
গোবিন্দ দ্বিতীয় বিদ্যাপতি॥
অসম্পূর্ণ পদ বহু                                     রাখি বিদ্যাপতি পহুঁ
পরলোকে করিলা গমন।
গুরুর আদেশক্রমে                                  শ্রীগোবিন্দ ক্রমে ক্রমে
সে সকল করিল পূরণ॥
এমন সুন্দর তাহা                                  আচার্য্যরত্ন শুনি যাহা
চমত্কার ভাবে মনে মনে।
তাই গুরু মহানন্দে                                   কবিরাজ শ্রীগোবিন্দে
উপাধিটী করিলা প্রদানে॥
গোবিন্দের কবিত্বশক্তি                                   সাধন ভজন ভক্তি
অতুলন এ মহীমণ্ডলে।
ধন্য শ্রীগোবিন্দ কবি                                   কবিকুলে যেন রবি
এ বল্লভ দঢ় করি বলে॥


এই পদটির দ্বিতীয় চরণে “বাগ্দেবী যাহার দ্বারে দাসীভাবে সদা ফিরে” লেখাটি আমার কাছে  
ব্যক্তিগতভাবে খুবই রুচিবিরুদ্ধ মনে হয়েছে। মহাকবি গোবিন্দদাসের মহানতাকে বর্ণন করতে গিয়ে দেবী
সরস্বতীকে কবির দ্বারে, দাসীর সঙ্গে তুলনা না করলেও কবি বল্লভের চলতো। জানি, এত শতাব্দী পরে এই
মন্তব্য লেখারও কোনো মানে হয়না। তবুও লিখলাম। মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর।

.          *************************           
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কাহে ডরসি ধনি! চলু হাম সঙ্গ
কবি বল্লভ
আনুমানিক ১৭০০ সালে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং
১৯২৪ সালে, রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”।  প্রথম ক্ষণদা - কৃষ্ণা প্রতিপদ, পদসংখ্যা ১০, পৃষ্ঠা ৮।


.        ॥ বরাড়ী॥

কাহে ডরসি ধনি! চলু হাম সঙ্গ।
মাধব নহি পরশিব তুয়া অঙ্গ॥
এ রজনী ফুল-কানন মাঝ।
কো এক ফিরত সাজি বহু সাজ॥
কুসুমকো ঘোর ধনুক ধরি পাণি।
মারত শর বালা-জন জানি॥
অতএ চলহ সখি! ভিতর কুঞ্জ।
যঁহি হরি রহত মহাবল-পুঞ্জ॥
এত কহি আনল ধনী হরি পাশ।
পূরল বল্লভ সুখ-অভিলাষ॥

.          *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আজু হাম পেখলুঁ কালিন্দী-কুলে
কবি বল্লভ
আনুমানিক ১৭০০ সালে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং
১৯২৪ সালে, রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”। দ্বিতীয় ক্ষণদা - কৃষ্ণা দ্বিতীয়া, পদসংখ্যা ৫, পৃষ্ঠা ১৩।


.        ॥ সুহই - দেশাগ॥

আজু হাম পেখলুঁ কালিন্দী-কুলে।
তুয়া বিন মাধব বিলুঠই ধূলে॥
কত শত রমণী মনহিঁ নাহি আনে।
কিয়ে বিখ-দাহ-সময়ে জল দানে॥
মদনভুজঙ্গমে দংশল কান।
বিনহিঁ অমিয়া-রস কি করব আন॥
কুলবতী-ধরম কাচ সমতুল।
মদন দালাল ভেল অনুকুল॥
আনল বেচি নীলমণি-হার।
সো তুম পহিরি করবি অভিসার॥
নীল নিচোলে ঝাঁপহ নিজ দেহ।
জনু ঘন ভিতরে দামিনী-রেহ॥
চৌদিকে চতুরী সখী চলু সঙ্গে।
আজু নিকুঞ্জে করহ রস-রঙ্গে॥
বল্লভ উজ্জ্বল নিকষ সমান।
নিজ তনু-পরীখ হেম দশবাণ॥

.          *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আজু সাজলি ধনী অভিসার
কবি বল্লভ
আনুমানিক ১৭০০ সালে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯২৪ সালে,
রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”।  চতুর্থ
ক্ষণদা - কৃষ্ণা চতুর্থী, পদসংখ্যা ১০, পৃষ্ঠা ৩১।


॥ কামোদ॥

আজু সাজলি ধনী অভিসার।
চকিত চকিত                                কত বেরি বিলোকই
গুরুজন-ভবন-দুয়ার॥
অতি ভয়ে লাজে                                সঘন তনু কাঁপই
ঝাঁপই নীল নিচোল।
কত কত মনহিঁ                                  মনোরথ উপজত
মনসিজ-সিন্ধু-হিলোল॥
মন্থর-গমনী                                        পন্থ দরশাওলী
চতুর সখি চলু সাথ।
পরিমলে হরিত                              হরিত করি বাসিত
ভামিনী অবনত মাথ॥
তরুণ তমাল                                     সঙ্গ-সুখ-কারণ
জঙ্গম-কাঞ্চন-বেলী।
কেলি-বিপিন                                নিপুণ রস অনুসরি
বল্লভ লোচন মেলি॥

.          *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কহ কহ এ সখি! মরমকি বাত
কবি বল্লভ
আনুমানিক ১৭০০ সালে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং
১৯২৪ সালে, রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”।  পঞ্চম ক্ষণদা - কৃষ্ণা পঞ্চমী, পদসংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ৩৬।

.        ॥ বালা॥

কহ কহ এ সখি! মরমকি বাত।
সো তোহে কি করল শ্যামর-গাত॥
মনমথ-কোটি-মথন তনু-রেহ।
কৈছে উবরি তুহুঁ আওলি গেহ॥
কুলবতী কোটি হোয়ে যঁহি অন্ধ।
পাওলি কছু কিয়ে সো মুখ-গন্ধ॥
যাকর মুরলী শ্রবণে যহিঁ লাগে।
খসতহিঁ বসন শাশ-পতি-আগে॥
অব নিরধারসি কোন বিচার।
বল্লভ সো রস-সাগর পার॥

.          *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর