কবি বিজয়ানন্দ দাস - এই কবির জীবন ও রচনাকাল সম্বন্ধে কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই। এসম্বন্ধে বেশ তর্ক-বিতর্কও চলেছিল এক সময়ে!
“বিজয়ানন্দ” ভণিতাযুক্ত একটি মাত্র গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ, গোকুলানন্দ সেন (বৈষ্ণবদাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭৫০ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯১৫-১৯৩১ সময়কালে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে (পদসংখ্যা ২২৪২) এবং জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৩৪, প্রথম সংস্করণ ১৯০২) একবার বিজয়ানন্দ দাসের ভণিতায় এবং দ্বিতীয়বার যদুনন্দন দাসের ভণিতায় সংকলিত হয়েছে।
শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের পদকর্তাগণের পরিচয়ে, ১৬২-পৃষ্ঠায়, এই কবিকে শ্রীচৈতন্যদেবের কাছ থেকে “রত্নবাহু” উপাধী প্রাপ্ত লিপিকার হিসেবে মনে করা হয়েছে কিন্তু জগবন্ধু ভদ্র যাঁর কথা বলেছেন তাঁর নাম “বিজয়দাস”। জগবন্ধু ভদ্র তাঁর গৌরপদতরঙ্গিণীর প্রথম সংস্করণে এ বিষয়ে যা লিখেছেলেন তা সতীশচন্দ্র রায় তাঁর শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের পদকর্তাগণের পরিচয়ে উদ্ধৃত করেছেন। তা হলো . . . “জগবন্ধুবাবু বিজয়ানন্দের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন,--- ইনি মহাপ্রভুকে অনেক গ্রন্থ লিখিয়া দিয়াছিলেন। ইহাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে পরিতুষ্ট হইয়া, মহাপ্রভু ইহাঁর নাম ‘রত্নবাহু’ রাখিয়াছিলেন। ইনি কি পদ-কর্ত্তা? . . .”
জগবন্ধু ভদ্রের মৃত্যুর পর প্রকাশিত গৌরপদতরঙ্গিণীর ২য় সংস্করণে, সম্পাদক মৃণালকান্তি ঘোষ ২১১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . . “সতীশবাবু ভুল করিয়াছেন ; জগবন্ধুবাবু বিজয়ানন্দ সম্বন্ধে কোন কথা বলেন নাই, তিনি লিখিয়াছেন ‘বিজয়দাস’ সম্বন্ধে। বিজয়দাসই মহাপ্রভুকে অনেক গ্রন্থ লিখিয়া দিয়াছিলেন ; এবং শ্রীগৌরাঙ্গ তাঁহাকেই ‘রত্নবাহু” উপাধি দিয়াছিলেন।”
সতীশচন্দ্র রায়, উপরে দেওয়া জগবন্ধু ভদ্রের প্রশ্নবাচক উদ্ধৃতির পরে খুব সুন্দর ক’রে লিখেছেন . . . “আমরা জগবন্ধু বাবুর জিজ্ঞাসার উত্তরে শুধু এইমাত্র বলিতে পারি যে, বৈষ্ণব সাহিত্যে এযাবৎ অন্য কোনও বিজয় দাসের উল্লেখ পাই নাই ; সুতরাং অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে মহাপ্রভুর লিপি-কার বিজয় দাসের দাবী অগ্রাহ্য করার কোন কারণ দেখা যায় না। প্রবাদ আছে,--- “গ্রন্থী ভবতি পণ্ডিতঃ” অর্থাৎ বহু সদ্গ্রন্থের অধিকারী ব্যক্তি পণ্ডিত হইয়া থাকেন। যখন বহু সদ্গ্রন্থের রক্ষা ও কদাচিৎ পঠনের ফলেই পাণ্ডিত্য জন্মিয়া থাকে, তখন সে সকলের লিপীকরণ ও তজ্জন্য আদ্যোপান্ত সযত্নে পঠনের ফলে লিপি-কার যে পণ্ডিত হইবেন, তাহাতে সন্দেহের কি কারণ আছে ? বস্তুতঃ যখন প্রাচীন গ্রন্থে শুধু নামোল্লেখের বলে অনেক ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে পদ-কর্ত্তা বলিয়া অনুমিত হইয়াছেন, তখন মহাপ্রভুর লিপি-কার বিজয় দাসকে পদকর্ত্তা বলিয়া স্বীকার না করার কোন কারণ নাই। বিজয় দাস যদিও প্রথমে তাঁহার সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্যই রত্নবাহু উপাধি পাইয়া থাকেন, কিন্তু তিনি পদ-রচনায় কৃতিত্বের জন্যও সেই উপাধির অধিকারী হইয়াছেন। বিজয় দাস অধিক পদ রচনা করিয়াছিলেন বলিয়া অনুমান হয় না। তিনি হয় ত এরূপ দুই চারিটী গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদের দ্বারা শ্রীগৌরাঙ্গের চরণে ভক্তি-পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করিয়া গিয়াছেন।”
সতীশচন্দ্র রায়ের এত সুন্দর উদ্ধৃতি পঠনের পরেও সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়! এ সব তখনই মেনে নেওয়া সম্ভব হবে যখন আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো যে “বিজয় দাস”, “বিজয়ানন্দ” ভণিতায় পদ রচনা করে গিয়েছেন। কিন্তু তার জন্য আমাদের আরও গবেষণার অপেক্ষা করতে হবে।
আমরা মিলনসাগরে কবি বিজয়ানন্দ দাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের উদ্দেশ্যপাতার উপরে . . . নরহরি চক্রবর্তীর কবিতা বা পদাবলির মান দ্বিতীয় শ্রেণীর কি না, তাঁর কবিতা বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের তুল্য কি না বা জ্ঞানদাসের কাব্যের মানের কাছাকাছি কি না, এই সব গূঢ় তাত্ত্বিক তর্ক-বিতর্কের আলোচনায় উনিশ ও বিংশ শতকের বাংলার পদাবলী সাহিত্য সরগরম হয়েছিল! সেসময়ের বিভিন্ন গ্রন্থকারের লেখা পড়লেই তা চোখে পড়ে। কিন্তু মিলনসাগর এ বিষয়ের অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তত্ত্বকথায় যেতে আগ্রহী নয়! তাই এই আলোচনা আমরা এখানে করলাম না।
আমাদের উদ্দেশ্য, উত্কর্ষের নিরিখে বৈষ্ণব পদাবলীর বিচার করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য পদকর্তাদের যতগুলি সম্ভব পদ একত্রে এখানে প্রকাশ করা। বৈষ্ণব পদকর্তা ও সংকলকগণ যে আজীবন কঠোর পরিশ্রম করে এই বিশাল সাহিত্য বাঙালীকে এযুগে উপহার দিয়ে যেতে পেরেছেন, আমরা মিলনসাগরে তাঁদের সবাইকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও নমস্কার জানাই।
আমরা প্রতিটি পদে, সেই পদেটির উত্স-গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছি। একাধিক ক্ষেত্রে একাধিক রূপে পাওয়া একই পদ একত্রে তুলে দিয়েছি তুলনার জন্য। সংস্কৃত ভাষার পদগুলির বাংলায় অনুবাদ বা ব্যাখ্যা হাতে পেলেই তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"পাতার উপরে . . . বৈষ্ণব পদাবলীর পদগুলি মূলত গান হিসেবেই রচনা করা হোতো। প্রায় প্রতিটি পদের শুরুতেই সেই পদটির “রাগ”-এর উল্লেখ থাকে। তবে কিছু পদের আগে তার “রাগ”-এর উল্লেখ নেই এমনও পাওয়া গিয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীর সংকলকগণ যখন তাঁদের সংকলনে পদ সাজান, তখন পর পর একাধিক গানের যদি একই সুর বা রাগ থাকে, তাহলে তাঁরা প্রথম গানটিতে তার রাগ উল্লেখ ক’রে পরের গানটিতে রাগের যায়গায় “তথা রাগ” বা “যথা” শব্দ বসিয়ে দিতেন, এই বোঝাতে যে পরের গানটি একই রাগাশ্রিত। কিন্ত এমনও পাওয়া গিয়েছে যে একই গান বিভিন্ন সংকলকের সংকলনে ভিন্ন রাগাশ্রিত বলে উল্লেখিত। বহু পদই মুখে মুখে গীত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। তাই একই গান বিভিন্ন গায়কের মুখে ভিন্ন ভিন্ন সুরে পাওয়া গিয়ে থাকতেই পারে। তাই অনেক বিদগ্ধজনেরা মনে করেন যে এখন আর পদের রাগের উল্লেখ না করলেও চলে। যে যেমন সুরে চায়, গেয়ে আনন্দ লাভ করলেই এর সার্থকতা। আমরা অবশ্য যে সংকলন থেকে যে পদ নিয়েছি, সেই সংকলনে উল্লেখিত রাগটি মিলনসাগরের পাতায় তুলে দিয়েছি। এমন হতে পারে বিশেষজ্ঞরা অন্য সংকলনে সেই গানটির অন্য রাগ দেখতে পাবেন।
বিজয়ানন্দ দাস শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কালের কবি হতেও পারেন পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধ থেকে ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধ
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in