কবি বৈষ্ণবদাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
এত শুনি বিধুমুখী মনে হয়ে অতি সুখী
কবি বৈষ্ণবদাস
জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী, ১৯৩৪ (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থের,
প্রথম তরঙ্গ, প্রথম উচ্ছাস - নান্দী বা পূর্ব্বাভাস, পদসংখ্যা ৫।


এত শুনি বিধুমুখী                            মনে হয়ে অতি সুখী
কহে শুন প্রাণনাথ তুমি।
কহিলে সকল তত্ত্ব                               বুঝিনু স্বপন সত্য
সেই রূপ দেখিব হে আমি॥
আমারে যে সঙ্গে লবে                            দুই দেহ এক হবে
অসম্ভব হইবে কেমনে।
চূড়াধরা কোথা থোবে                        বাঁশী কোথা লুকাইবে
কাল গৌর হইবে কেমনে॥
এত শুনি কৃষ্ণচন্দ্র                             কৌস্তভের প্রতিবিম্বে
দেখাওস শ্রীরাধার অঙ্গ।
আপনি তাহে প্রবেশিলা                         দুই দেহ এক হৈলা
ভাবপ্রেমময় সব অঙ্গ॥
নিধুবনে এই কয়ে                                দুহুঁ তনু এক হয়ে
নদীয়াতে হইলা উদয়।
সঙ্গে যে ভক্তগণে                                  হরিনাম সঙ্কীর্ত্তনে
প্রেমবন্যায় জগত ভাসায়॥
বাহিরে জীব উদ্ধারণ                          অন্তরে রস আস্বাদন
ব্রজবাসী সখা সখী সঙ্গে।
বৈষ্ণব দাসের মন                              হেরি রাজা শ্রীচরণ
না ভাসিলাম সে সুখতরঙ্গে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মরি আলো নদীয়া মাঝারে ও না রূপ
কবি বৈষ্ণবদাস
জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী, ১৯৩৪ (১৩৩৪
বঙ্গাব্দ) গ্রন্থের, চতুর্থ তরঙ্গ, দ্বিতীয় উচ্ছাস - নৃত্য ও কীর্ত্তন, পদসংখ্যা ৭৮।


.        ॥ শ্রীরাগ॥

মরি আলো নদীয়া মাঝারে ও না রূপ।
কেবল মূরতি নব পিরীতের কূপ॥ ধ্রু॥
বদনমণ্ডল চাঁদ ঝলমল কনক-দরপণ নিন্দিতে।
চাঁদমুখে হরি বোলে বাবভরে প্রেমে কাঁদিতে কাঁদিতে॥
তেজি সুখময় শয়ন আসন, নামডোর গলে শোভিতে।
সুগন্ধী চন্দন অঙ্গেতে লেপন, সংকীর্ত্ত্ন রসে তুষিতে॥
ভাবে গর গর না চিহ্নে আপন পর পূলক আবলী অঙ্গেতে।
‘রা’ বলিয়া গোরা ‘ধা’ বোল না পারে ভবভরে আর বলিতে॥
বাজহি মাদল করহি করতাল কলিকলুষ ভয় নাশিতে।
ভকতগণ মেলি দেই করতালি ফিরয়ে চৌদিকে নাচিতে॥
চরণপল্লব দিতে ভক্তগণে, হরিনাম-জীবে প্রকাশিতে।
দয়াল গৌরাঙ্গ আসিলা অবনী বৈষ্ণব দাসেরে ভবে তারিতে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মিশ্র পুরন্দর তবে মনে বিচারিঞে
কবি বৈষ্ণবদাস
১৯২২ সালে চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত
শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু, পৃষ্ঠা ৪১।


.        ॥ গৌরচন্দ্র॥

মিশ্র পুরন্দর তবে মনে বিচারিঞে।
পুরোহিত দ্বিজগণে আনিল ডাকিয়ে॥
নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী আইল তখন।
মিশ্র পুরন্দর কহে মধুর বচন॥
অদ্য শুভদিন হয় শুক্লাষ্টমী তিথি।
বিশ্বম্ভরের হাতে দেহ ভাগবত পুথি॥
জগন্নাখ মিশ্র তবে দ্বিজ আজ্ঞা মতে।
ভাগবত পুথি দিল বিশ্বম্ভরের হাতে॥
দেখিঞে ব্রাহ্মণগণ করে বেদধ্বনি।
বহিরে কতজন করে হরিধ্বনি॥
বৈষ্ণবদাস কহে যোড় করি হাত।
ধন্য রে নদীয়ার লোক শচী জগন্নথা॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দুহুজন মিলল কুঞ্জক মাহ
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ৯০।


দুহুজন মিলল কুঞ্জক মাহ। রাইক বচনেই চিনিহি নাহ॥
লখই না পারই ঘোর আন্ধিয়ার। কাহে ভেল গৌরী শ্যাম আকার॥
শ্যামক বচনে কহে ধনি রাই। তিমির ঝাপাই আয়ল তুয়া ঠাই॥
এতেক বচন কহি মনোমথ মাঁতি। দুহুজন সাজল সোমরক ভাতি॥
দোহ অধরামৃত দুহু করু পান। নয়ানে নয়ান করি বয়ানে বয়ান॥
দুহু লুবধ বর করতহি কেলি। দুহু পুলকাইত অবসর ভেলি॥
সুরত সমাধি বৈঠল দুহু জন। বৈষ্ণব দাস সেই মাগএ চরণ॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাধাপ্রেমোদয়ে গোরার স্থির নাহি হয়
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ৮৪।

॥ সর্বকালোচিত গৌরচন্দ্র॥
সর্বকালোচিতাভিসার তদ্ভাবাক্রান্ত শ্রীমহাপ্রভু।

রাধাপ্রেমোদয়ে গোরার স্থির নাহি হয়। সেই ভাবে খেনে খেনে করও উদয়॥
অভিসারে সাজই সময় সুজানি। মত্তমাতঙ্গ চলে যথা সুরধুনী॥
জিনি জাম্বুনদ হেম অঙ্গের কিরণ। দশদিশ আলো করে জিনি শশিগণ        
শ্রীমুখমণ্ডল সিংহগ্রীব ভুজদ্বয়। কিসে বা তুলনা দিব তুলনা না হয়॥
কুন্তল অতুল নাসা শ্রুতিযুগাধর। কুণ্ডল মঞ্জুল বিম্বু নিন্দি খগবর॥
ভাঙ্গ বিভঙ্গি আঁখি নাহি পরিমাণ। নীল পঙ্কজ জিনি কামের কামান॥
ঘনবাসো অঙ্গে জেন বিজুরি সঞ্চারে। মদনবিজয়ী মালা উরো পরিসরে॥
প্রেমধারা অবিরত বহে নিরন্তরে। বৈষ্ণবদাস রূপ ভাবিএ বিভোরে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শুন শুন সুন্দরী বচন আমার
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ৯০।

॥ শ্রীকৃষ্ণস্যোক্তি॥

শুন শুন সুন্দরী বচন আমার। নিবিড় তিমির কৈছে কৈলি অভিসার॥
না জানি আমাতে তোমার কতই সুনেহ। অব বিঘটন কাহে তেজলি গেহ॥
চরণ সুকোমল জাঁহার। তুলি পরসে জানি নহে হিতকার॥
দিগ নহে দরশন তিমির বেয়াপি। ভুজজ কণ্টক কত বাট রহে ঝাপি॥
ভয় নাহি উপজল রাজনন্দিনী। কেমনে আইলি পথে কুরঙ্গনয়ানি॥
বৈষ্ণবদাস কহে প্রেম নিরূপমা। দোঁহু প্রেমাধীন হয় দোঁহাতেই সীমা॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রতিরস সমাধিয়া কিশোর কিশোরী
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ৯৯।


রতিরস সমাধিয়া কিশোর কিশোরী। কিশোর কহেন সুন প্রাণের কিশোরী॥
পুরুষের বেশে যেমন কৈলে অভিসার। মোর বেশ লেহ পুন সাজ আরবার॥
জতন করিয়া আমি সাজাব তোমায়। গৌরবরণে তোমায় কত শোভা পায়॥
এত বলি মোহনিয়া চূড়া জে উতারি। রাই শিরে বান্ধল বামে টের করি॥
শ্রুতির ভূষণ হত করিয়া সকল। লুলিত করিয়া দিল মকর কুণ্ডল॥
নিজগলের বলমালা রাইগলে দিল। পুরুষের ছান্দে পীতবাস পরাইল॥
অলকে কাঙ্কিত ধনির মুখ শোভা করে। নিজ করের বাঁশি দিল সুপি রাই করে॥
আমারে সাজাইলে জেমন শ্রীবংশীবদন। তুমিহ নারীর বেশ করহ ধারণ॥
বৈষ্ণবদাসের সেই চরণে বাঞ্ছিত। সাজাহ বন্ধুরে তোমার নিজ অভিমত॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সুন সুন প্রাণবন্ধু নিবেদন করি
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ৯৯।


সুন সুন প্রাণবন্ধু নিবেদন করি। ভুবনমোহিনী তোমাএ সাজাইব নারী॥
খুলিল মউলির ঝুটী রাই বিনোদিনী। চাঁচর কুন্তলে করে মোহনিয়া বেনি॥
মঞ্জুল কনকচাণপা বাছিয়া লইল। হেম ঝাঁপা একাকারে বেণীর আগে দিল॥
সিন্দুর চন্দনের বিন্দু অতুল রচয়। নব ভানু পূর্ণশশী নীরদ উদয়॥
কর্ণে কর্ণ ফুল দেই নাসাতে বেসর। গলে গজমোতি হারে করিল উজর॥
বলয়া কঙ্কণ করে রঞ্জে সুবদনী। নীল সাড়ি আঁটি দেয় দুসারি কিঙ্কিণী॥
বুঝিএ দাড়ায় শ্যাম রাই বামভাগে। বৈষ্ণবদাসের হৃদি সরোজেতে জাগে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কি শোভা হঞাছে আজু নিকুঞ্জেতে হেরি
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ১০০।

॥ সখী উক্তি॥

কি শোভা হঞাছে আজু নিকুঞ্জেতে হেরি। রাই নব নাগর শ্যাম নতুন নাগরী॥
রাই শিরে মোহনচূড়া শ্যাম পিঠে বেণী। রাই সৌদামিনী বামে শ্যাম কাদম্বিনী॥
অলকে তিলকে শোভে রাই মুখ ইন্দু। শ্যামভালে নব ভানু সিন্দুরের বিন্দু॥
কর্ণে শোভিত শ্যাম কনক কর্ণফুলে। রাই শ্রুতে দোলে কিবে মকর কুণ্ডলে॥
শ্যামগলে মতিমালে ঘনে বকপাতি। রাই ওরে বনমালা অপরূপ ভাঁতি॥
নীলবাসে শোভে শ্যাম জিমিত তিমিরে। নীলাম্বরী ছাড়ি রাই পীত বাস ধরে॥
ত্রিভঙ্গভঙ্গিমা রাই শ্যাম মনমোহিনী। বৈষেণবদাস ভাবে রূপের নিছনি॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভাবের আবেশে কহে গৌরাঙ্গরায়
কবি বৈষ্ণবদাস
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত, ১৯৮২ সালে বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে ভূদেব চৌধুরী, সুখময়
মুখোপাধ্যায়, পঞ্চানন মণ্ডল ও সুমঙ্গল রাণা দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৩৮১টি
পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”, পৃষ্ঠা ১২৩।

॥ তত্র শ্রীকৃষ্ণস্য উক্তি॥ তদুচিৎ মহাপ্রভু॥

ভাবের আবেশে কহে গৌরাঙ্গরায়।পুরব প্রেমের ভরে গদগদ কয়॥
বচন চাতুরি হাম কিছু নাহি জানি। কাহে প্রিয়ে রোখভরে কহ অছু বাণী॥
হরিগুণকীর্তনে জাগিয়াছি নিশি। না জানি কি দোষে আমি হইলাম দুষি॥
কহএ বৈষ্ণবদাস ব্রজভাব জানি। কত ছলা জানে গোরা রসিকশিরোমণি॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর