| কবি ঘনশ্যাম-নরহরির বৈষ্ণব পদাবলী |
| সহজই বিষম অরুণ দিঠি কবি ঘনশ্যাম দাস ১৯৪৬ সালে প্রতাশিত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “বৈষ্ণব পদাবলী” সংকলন, পৃষ্ঠা ৭৮৮। এই পদটি ঘনশ্যাম দাস কবিরাজের পদ বলে এই গ্রন্থে উল্লেখ করা রয়েছে। যেহেতু পদকল্পতরুর সতীশচন্দ্র রায় ও বৈষ্ণদব পদাবলী গ্রন্থের হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের মত বিশেষজ্ঞগণ এই পদটিকে ঘনশ্যাম কবিরাজের রচনা বলে মনে করেছেন, আমরাও এই পদটিকে ঘনশ্যাম কবিরাজের পাতায় রাখলাম। এটা তো হতেই পারে যে, নরহরি ঘনশ্যাম চক্রবর্তী তাঁর সংকলন গীতচন্দ্রোদয়ে তাঁর পূর্বতন কবি ঘনশ্যাম কবিরাজের কিছু পদ সন্নিবেশ করেছিলন। দুজনেরই একই ভণিতা! পাঠকের সুবিধের জন্য ঘনশ্যাম চক্রবর্তীর পাতাতেও এই পদটি তুলে দেওয়া হলো। ॥ কামোদ ॥ সহজই বিষম অরুণ দিঠি অঞ্চল আর তাহে কুটিল কটাখি। হেরইতে হামারি ভেদি উর অন্তর ছেদল ধৈরয শাখী॥ এ সখি বিহরই কো পুন এহ। পীত বসন জনু বিজুরী বিরাজিত সজল জলদরুচি দেহ॥ ধ্রু॥ মৃদু মৃদু হাসি ভাষি উপজায়ল দারুণ মনসিজ-আগি। যাকর ধূমে ধরমপথ কুলবতী হেরই বহু পুণ ভাগি॥ তঁহি পুন বেনু অধরে ধরি ফুকরই দহইতে গৌরব লাজ। কহ ঘনশ্যাম দাস ধনি ঐছন আন আন হৃদয়ক মাঝ॥ এই পদটি রয়েছে আনুমানিক ১৭২৫ সালে, ১১৭০টি পদ সম্বলিত, নরহরি (ঘনশ্যাম) চক্রবর্তী প্রণীত, ৪৬২ শ্রীগৌরাব্দে (১৯৪৯), হরিদাস দাস দ্বারা প্রকাশিত, শ্রীশ্রীগীতচন্দ্রোদয় ( পূর্বরাগ ) গ্রন্থ, পৃষ্ঠা-২১৭-এ। এই জন্য এই পদটি ঘনশ্যাম চক্রবর্তীর রচনা বলে মনে করা অসংগত হবে না। ॥ কামোদ ॥ সহজই বিষম অরুণ দিঠি তাকর আর তাহে কুটিল কটাখ । হেরইতে হামারি ভেদি উর অন্তর ছেদল ধৈরজ-শাখ ॥ এ সখি ! বিহরই কো পুন এহ । পীতবসন জনু বিজুরী বিরাজিত সজল জলদরুচি দেহ ॥ ধ্রু ॥ মৃদু মৃদু হাসি ভাষি উপজায়ল দারুণ মনসিজ আগি । যাকর ধূমে ধরম-পথ কুলবতী হেরই বহু পুণ তাগি ॥ এহি পুন বেনু অধরে ধরি ফুকরই দহইতে গৌরব লাজ । কহ ঘনশ্যাম দাস ধনী ঐছন আন আন হৃদয়ক মাঝ ॥ এই পদটি, আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫), ১ম খণ্ড, ১ম শাখা, ৭ম পল্লব, শ্রীরাধার পূর্ব্বরাগ--সবিস্তার, পদসংখ্যা ১৫০-এ এভাবে রয়েছে। ॥ কামোদ ॥ সহজই বিষম অরুণ দিঠি তাকর আর তাহে কুটিল কটাখি । হেরইতে হামারি ভেদি উর অন্তর ছেদল ধৈরজ-শাখী ॥ এ সখি ! বিহরয়ে কো পুন এহ । পীত-বসন জনু বিজুরী বিরাজিত সজল-জলদ-রুচি দেহ ॥ ধ্রু ॥ মৃদু মৃদু হাসি ভাষি উপজায়ল দারুণ মনসিজ আগি । যাকর ধূমে ধরম-পথ কুলবতী হেরই বহু পুণ তাগি ॥ এহি পুন বেণু অধরে ধরি ফুকরই দহইতে গৌরব লাজ । কহ ঘনশ্যাম দাস ধনী ঐছন অন অন হৃদয়ক মাঝ ॥ টীকা বা ব্যাখ্যা - ৮ - ১১। “মৃদু মৃদু ভাষি” ইত্যাদি। (শ্রীকৃষ্ণ) মৃদু মৃদু সম্ভাষণ ও হাস্য করিয়া (অন্তরে) প্রবল কাম-বহ্নি উত্পাদিত অর্থাৎ প্রজ্বলিত করিলেন ; যাহার ধূমে কুলবতী কামিনী ধর্ম্মের পথ দেখিয়াও কিন্তু দূরে থাকে (অর্থাৎ ধূমের প্রাবল্যে ধর্ম্ম-পথে চলিতে পারে না)। এ স্থলে ‘রূপক’ অলঙ্কারের ধ্বনি দ্বারা কন্দর্প-জনিত চিত্ত-বিভ্রমরূপ বস্তু ব্যঞ্জিত হইতেছে। ১২ - ১৫। “তহি পুন” ইত্যাদি। তাহাতে আবার তিনি (কুলবতীগণের) কুলাভিমান ও লজ্জা দগ্ধ করিবার জন্য অধরে বংশী (অপর পক্ষে অগ্নি-প্রজ্বালনের যন্ত্র বংশীর আকার-বিশিষ্ট বাঁশের চোঙ্গা) ধারণ করিয়া ফুত্কার দিতেছেন ; (উহার ফল যে কি হইবে, তাহা কে বলিতে পারে ?) পদকর্ত্তা ঘনশ্যাম কহিতেছেন,০০০ হে শ্রীরাধে! (কেবল তোমার এই দশা ঘটে নাই ; ) এই প্রকার অন্যোন্য অর্থাৎ তোমাদের উভয়ের হৃদয়ের মাঝেই হইয়াছে। এ স্থলে বেণুর ফুত্কারকে কবি প্রজ্বালন-যন্শ্রে ফুকাররূপে বর্ণিত করায়, শ্লেশমূলক রূপক ও অতিশয়োক্তির সঙ্কর অলঙ্কার ঘটিয়াছে। --- সতীশচন্দ্র বায়, পদকল্পতরু॥ এই পদটিই, ১৯৬০ সালে, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদরত্নাবলী”, পৃষ্ঠা ৩৬-এ এভাবে দেওয়া রয়েছে। ॥ কামোদ ॥ সহজই বিষম অরুণ-দিঠি তাকর আর তাহে কুটিল কটাখ । হেরইতে হামারি ভেদি-উর-অন্তর ছেদল ধৈরজ-শাখ॥ এ সখি, বিহরয়ে কো পুন এহ। পীত বসন জনু বিজুরী বিরাজিত সজল জলদ-রুচি দেহ॥ মৃদু মৃদু ভাষি হাসি উপজায়ল দারুণ মনসিজ-আগি। যাকর ধূমে ধরম-পথ কুলবতী হেরই বহু পুণ ভাগি॥ তঁহি পুন বেণু অধরে ধরি ফুকরই দহইতে গৌরব লাজ। কহ ঘনশ্যাম দাস ধনি ঐছন আনহ হৃদয়ক মাঝ॥ ব্যাখ্যা - তার আরক্তিম চোখের দিকে তাকানোই কঠিন---কটাক্ষ সো তো আরো দুঃসহ। দৃষ্টির মিলন হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমার ধৈর্যের শাখা ছেদন করেছে। তার মেঘের ন্যায় মেদুর অঙ্গকান্তি আর পীত বসন, তার মৃদু মৃদু আলাপন আমার মনে বাসনার অগ্নিশিখাকে প্রজ্বলিত করল। তার ধূমে আচ্ছন্ন হল প্রচলিত ধর্মের পথ। সে পথের নিশানা জেনেও কুলবতী নারী তা থেকে দূরেই থেকে যায়। সে যখন বাঁশিতে তুলেছে তান তখন তার ফুত্কারে সেই অগ্নিশিখা দ্বিগুণ জ্বলে উঠে লাজ গৌরব পুড়িয়ে ফেলল। --- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীশ্রীপদ-রত্ন-মালা। এই পদটি, ১৯৬১ সালে বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী” গ্রন্থের, পদ সংখ্যা ২৫৪, পৃষ্ঠা ২০০-এ এইভাবে দেওয়া রয়েছে। গোবিন্দরতিমঞ্জরী ৪র্থ পদ। সহজই বিষম অরুণ দিঠি তাকর আর তাহে কুটিল কটাখি । হেরইতে হামারি ভেদি উর অন্তর ছেদল ধৈরজ-শাখি॥ এ সখি, বিহরয়ে কো পুনঃ এহ। পীত বসন জনু বিজুরী বিরাজিত সজল-জলদ-রুচি দেহ॥ মৃদু মৃদু ভাষ হাসি উপজায়ল দারুণ মনসিজ-আগি। যাকর ধূমে ধরম-পথ কুলবতী হেরই বহু পুণ ভাগি॥ তঁহি পুন বেণু অধরে ধরি ফুকরই দহইতে গৌরব লাজ। কহ ঘনশ্যাম দাস ধনি ঐছন অন অন হৃদয়ম মাঝ॥ . ******************* এই ঘনশ্যাম ( নরহরি চক্রবর্তীর ) সূচীতে . . . ঘনশ্যাম কবিরাজের সূচীতে . . . দ্বিজ ঘনশ্যামের সূচীতে . . . অনির্দিষ্ট ঘনশ্যামের সূচীতে . . . সম্মিলিত ঘনশ্যামের সূচীতে . . . মিলনসাগর |