কবি গোপাল দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
ষোড়শ নায়িকার অষ্ট অষ্ট গুণ
গোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত  
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,  
বৈষ্ণব পদাবলী  সংকলন  “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”,  পঞ্চম কোরক, নায়িকা বর্ণন,
পৃষ্ঠা ৬৪।


ষোড়শ নায়িকার অষ্ট অষ্ট গুণ।
এক সহস্র আঠাইশ ইহার গণন॥
তাহার স্বভাব হয়ে অনেক প্রকার।
প্রাখর্য্যতা সাম্যতা মার্দ্দব হএ আর॥
প্রাখর্য্য প্রগল্ ভা আর মধ্য প্রাখর্য্যা।
লঘুরূপ প্রাখর্য্যা আর প্রগল্ ভতাবষ্যা॥
অতি বড় সাম্য আর সাম্য জে মধ্যম।
লঘুতা সাম্য এই তিন হএ তরতম॥
বড়ই মার্দ্দব আর মার্দ্দব মধ্যম।
লঘুতা মার্দ্দব হএ অত্যন্তিক সম॥
উত্তম মধ্যম লঘু তিন ধরে গুণ।
এক হৈতে তিন গুণ হএ পুন পুন॥
সূক্ষ্ম করিলেহ হয় অনেক প্রকার।
সেই তিন বুঝিতে পারে সূক্ষ্ম বুদ্ধি জার॥
কেহো ত দক্ষিণা হয়ে কেহো হয়ে বামা।
বামা দক্ষিণা মিশ্র তাহে কহি সমা॥

অথ ললিতা----
বামা প্রখরা ললিতা শিখিপিঞ্ছ সমান্বরা।
গোরোচনা অঙ্গকান্তি ভৈরবে স্বয়ম্বরা॥
সারদী জননী হয়ে বিশোক হয়ে পিতা।
বিশাখার গুণ কহি বাহিক-বনিতা॥

অথ বিশাখা---
মধ্যমা যে গুণ হয়ে কান্তি সৌদামিনী।
পাবন ঘোষ পিতা হয়ে দক্ষিণা জননী॥
তারাবলী বস্ত্র হয়ে ললিতা সম গুণ।
এই ত কহিল বিশাখার গুণগণ॥

অথ চিত্রা---
চতুরাক্ষ পিতা হএ চচ্চিতা জননী।
দক্ষিণা মৃদুস্বভাব রঞ্জ কুসুমশালিনী॥
কাঞ্চনকান্তি বস্ত্র হয়ে পিঠেরর বনিতা।
সংক্ষেপে কহিল এই সুচিত্রার লেখা॥

অথ চম্পকলতা---
এবে কহি চম্পকলতার গুণগণ।
চম্পকবর্ণা চম্পকলতা টাস্ কলাবসন॥
বামা মধ্যাগুণ হয়ে চণ্ডাক্ষে স্বয়ম্বরা।
বামঠ জে পিতা মাতা মাহিক গোপবরা॥

অথ তুঙ্গবিদ্যা---
তুঙ্গবিদ্যার গুণ কহি অতি সুচরিতা।
পুরষ্কর নামের গোপের হএত দুহিতা॥
মেধা জে জননী তার বালি সে বিবাহিতা।
দক্ষিণা প্রখরা চন্দ্র চন্দন ভূষিতা॥
বস্ত্র যে পাণ্ডুর হয়ে কুঙ্কুম বর্ণতা।
ইন্দুলেখার গুণ এবে কহি তার কথা॥

অথ ইন্দুলেখা---
এ সভার নামে গুণ হঞা আনন্দিতা।
দুর্ব্বঘোষ নামে ইন্দুলেখা বিবাহিতা॥
হরিতাল দেহকান্তি দাড়িম্ব পুষ্পবাসী।
বেলাসাগর পিতা হএ জননীর নাম উসি।
শ্রীরাধিকার হইতে হএ তিন দিবসের কনিষ্ঠি॥

অথ রঙ্গদেবী সুদেবী---
রঙ্গদেবী সুদেবী যমক ভগ্নী দুই।
পদ্ম যে কেশরবর্ণ সমান গুণ সেই॥
বক্রেক্ষণে বিভা তার ললিতা দেবরে।
জবা পুষ্পের শ্রেণী বসন সেই ধরে॥ ইতি অষ্টসখী।

অথ মধুমতী (ইত্যাদি)---
মধুমতী প্রাণসখী গৌর কলেবর।
রক্তবস্ত্র পরিধান প্রাণের সোঁসর॥
বামে প্রখরা গুণ মধুপানে রতা।
রত্নপ্রভা রতিকলা সঙ্গে সুভদ্রবনিতা॥
কুন্দবল্লী সখী হএ সুভদেব নারী।
দুর্মদে বিবাহ হে অনঙ্গমঞ্জরী॥
চন্দ্রাবলী গোবর্দ্ধন মল্লের বনিতা।
দক্ষিণা মৃদুতা ভাব কাঞ্চন দেহলতা॥
তাহার সখী শৈব্যা পদ্মা দক্ষিণা প্রখরা।
বিপক্ষ সখী চন্দ্রাবলী হএ রাধাবরা॥
তারকা পালিকা তটস্থা সখী নাম।
অসংখ্য সখীর নাম অনেক বিধান॥
মালাবতী কলাবতী লীলাবতী নাম।
ললিতার সখী হয়ে অনেক বিধান॥
জাহার জে নিজ সখী সেই স্বভাব ধরে।
দূতী সখী দাসী তিন কর্ম কত করে॥
শ্রীরতিপতিচরণযুগলে যার আস।
রাধাকৃষ্ণকল্পবল্লী কহে গোপালদাস॥

ইতি শ্রীরাধাকৃষ্ণরসকল্পবল্লী নায়িকাকদম্বঃ নাম পঞ্চমঃ কোরকঃ।

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অপরূপ পেখলু কানন ওর
গোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,  
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, ষষ্ঠ কোরক, বিপ্রলম্ভের দিগ্ দরশন,
পৃষ্ঠা ৮৩।


অপরূপ পেখলু কানন ওর।
কনকলতাএ ধয়ল কিএ জোর॥
চল চল মাধব কয়ল পয়ান।
দেয়ল ফল বিহি তোহারি মন মান॥
অজানুক রুখ ফলদ্বয় ভেল।
কেহ কহে দাড়িম কেহ কহে বেল॥
কেহ কহে মাকন্দ ফলল অকাল।
কেহ কহে পাকল মনমথ তাল॥
গোপালদাস কহে তহুঁ রসে ভোর।
জানলুঁ ফল নহে কনক কটোর॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গুরুজন সবহিঁ মন্দির তেজি চললহিঁ
শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, ষষ্ঠ কোরক, বিপ্রলম্ভের দিগ্ দরশন, পৃষ্ঠা ৮৯।


গুরুজন সবহিঁ                                 মন্দির তেজি চললহিঁ
চান্দ-গহন দিন লাগি।
একলি নারী                                       কৈছে হাম বঞ্চব
এ ঘোর জামিনী জাগি॥
মাধব তুহুঁ জনি করসি অকাজ।
চঞ্চল চরিত                                 তোহারি হাম জানিয়ে
তুহু পৈঠবি ব্রজপুর মাঝ॥
পহিলহি যৌবন                                   কাল মোহে লাগল
নাহ রহত দূরদেশ।
হেরইতে রূপ                                       মদন মুরুছায়ই
কো বুঝে বচনবিশেষ॥
ইথে লাগি তোহে                             নিষেধি হাম পুন পুন
অন্তর করহ পয়ান।
শুনইতে কানু                                      বচন অনুমানিয়ে
গোপালদাস ইহ গান॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কোমল কুসুমদলে নখচিহ্ন দিয়া
শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, ষষ্ঠ কোরক, বিপ্রলম্ভের দিগ্ দরশন,
পৃষ্ঠা ৯২।


অথ নিরক্ষর---
কোমল কুসুমদলে নখচিহ্ন দিয়া।
কেশতৃণ পাঠাল দৈন্যাদি করিঞা॥
এই সব দূতী আদি করে গতাগতি।
পূর্ব্বরাগে মানে প্রবাসে এই সব রিতি॥
রতিপতিচরণযুগলে করি আস।
গতি নাহি কহে ( রাম )গোপালদাস॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রোদতি রাই কানু করি কোর
শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, সপ্তম কোরক, ভক্তি অনুরাগ, পৃষ্ঠা
১০৭।


রোদতি রাই কানু করি কোর।
হরি হরি প্রাণনাথ কাঁহা গেও মোর॥
নিকট থাকিতে বিচ্ছেদ হেন বাসে।
কিরবী বিলাপ জেন মহিষিগণ ভাষে॥
রতিপতি-চরণযুগল করি আস।
রাধাকষ্ণ-রসলীলা কহে গোপাল দাস॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কনক পুথুলি নহ বালা
শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, অষ্টম কোরক, নায়িকা বিভাগ, পৃষ্ঠা
১১৮।


দূতী-উক্তি তত্র পদম্---

কনক পুথুলি নহ বালা।
কোমল সিরিসক মালা॥
মাধব নিবেদিয়ে তোয়।
মরিজাদ রাখবি মোয়॥
ঘুমাইলে জাগা নাহি জায়।
নিজপতি ছায়া নাহি চায়॥
বলে ছলে আনলুঁ কান।
ব্রজকুলরমণি পরাণ॥
দূতীক কাতর ভাষ।
গোপালদাস পহু হাস॥


এই পদটিই, ১৯২২ সালে চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
দ্বারা প্রকাশিত শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু সংকলনে এইভাবে রয়েছে।

সখী সমর্পণ।

কনক পুতলি নববালা।
কমল শিরীশ জনু মালা॥
মাধব নিবেদিয়ে তোয়।
মরিযাদ রাখবি মোয়॥
বলে ছলে আন লুকায়ই কান।
ব্রজকূলরমণী পরাণ॥
ঘুমাইলে জাগা নাহি জায়।
নিজপতি ছায়া নাহি চায়॥
দূতীক কাতর ভাষ।
গোপাল দাস লহু হাস॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কৈছে রহল বরনারি
শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, অষ্টম কোরক, নায়িকা বিভাগ, পৃষ্ঠা
১২৭।

অথ শ্রীকৃষ্ণ-উক্তি তত্র পদম্---

কৈছে রহল বরনারি।
কি কহব কহই না পারি॥
আওলুঁ সচেতন দেখি।
স্থির বিজুরি সম রেখি॥
তোহে কহল কিছু বাণি।
তুহু কাহে না কর সম্ভাষ।
কেবল রহুতহিঁ শ্বাস॥
জিবইতে দরশন পাব।
সখি কহহু ( ? ) জব আব॥
তইখানে করাল পয়ান।
গোপালদাস আগুয়ান॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অষ্ট নায়িকার এই বর্ণনা কহিল
কবি শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, অষ্টম কোরক, নায়িকা বিভাগ, পৃষ্ঠা
১২৯।


অষ্ট নায়িকার এই বর্ণনা কহিল।
বিভাবের ভেদ কিছু করিতে হইল॥
রতিপতিচরণযুগলে যার আস।
রাধাকৃষ্ণরসকল্পবল্লী কহে গোপালদাস॥


ইতি শ্রীরাধাকৃষ্ণরসকল্পবল্লীগ্রন্থে নায়িকাবর্ণনং নাম অষ্টমঃ কোরকঃ সমাপ্তঃ।

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হরি হরি কি হৈল করমে
কবি শ্রীগোপালদাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত
এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত,
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, নবম কোরক, সম্ভোগ বিবরণ,
পৃষ্ঠা ১৩৮।


হরি হরি কি হৈল করমে।
সেল জানি রহিল মরমে॥
মনমথ সনে ছিল বাদ।
তেঞি এত কৈলা পরমাদ॥
এ পাপ মদন তুরন্ত।
আর তাহে দারুণ বসন্ত॥
দুখ দেই মলয়া সমীর।
কত সহে অবলা শরীর॥
সখি মোরে কহত উপায়।
আর দুখ সহনে না জায়॥
ধিক মোর কুলবতী লাজে।
ধিক মোর পরাধিন কাজে॥
ধিক মোর জাতি অভিমান।
ধিক মোর বহু গুণগান॥
মুরলী খল করে ধ্বনি।
বাদ সাধায় হেন জানি॥
অবশেষ আছএ পরাণ।
এই ফল বুঝিল নিদান॥
সময়ে সব কিছু হয়ে।
অসময়ে কেহো কারো নয়ে॥
আজনম যাবে ভাল জানি।
বিপদ সময়ে সব চিনি॥
বিহঙ্গম করে কল কল।
সব দেহ উথলে আনল॥
ছটফটি কুসুম শয়নে।
উঠে বৈসে হয়ে অচেতনে॥
কাতর নয়ানে ঘন চায়।
কাহ্ন ফুকয়েহি যায়॥
সহচরী ভাবিয়া অন্তরে।
প্রবোধ নাহিক প্রাণ ধরে॥
নানা কথা উদ্দীপন হয়ে।
সহচরী আক্ষেপ করয়ে॥
ব্রজবিরহে দুঃখ পায়।
কন্দর্প এই উদ্দীপন করায়॥
বিরহে সাগরে গোপীগণ।
এত দুঃখ বিচ্ছেদ কারণ॥
পরস্পর দুই জনার হ’য়ে।
সেই জত কৃষ্ণের হৃদয়ে॥ ইতি


শ্রীরাধিকার অভরণ বসন চলন।
সেই রূপ সদা কৃষ্ণের হয়ে উদ্দীপন॥
শ্রীকৃষ্ণের চূড়া বেণু মুরলী অম্বর।
যত কিছু রূপ গুণে স্ফূরে নিরন্তর॥
দুহুকার এত দুখ এ বোল সুনিঞা।
গোপালদাসে মরে মনেত পুড়িঞা॥

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আষাঞা কবরী ভার দূরে করে অলঙ্কার
কবি রামগোপাল দাস
১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, রামগোপাল দাস (ভণিতা গোপাল দাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, নবম কোরক, সম্ভোগ বিবরণ, পৃষ্ঠা ১৩৯।


অথ মাথুর-বিরহ তত্র পদ---

॥ মঙ্গল গুর্জ্জরী রাগ॥

আষাঞা কবরী ভার                                  দূরে করে অলঙ্কার
ভূমে পড়ি কান্দে উচ্চস্বরে।
প্রাণনাথ বলি কান্দে                                  ধৈরজ নাহিক বান্ধে
সঘনে কান্দয়ে কলরবে॥
সহচরি আজি কেনে দেখি আন ভাঁতি।
যাহারা দেখিলে মোর                                  আনন্দ পাই অগো
তাহা দেখি জ্বলে কেন ছাতি॥
সারি সুক পীকগণ                                     কেনে করে উচাটন
দিবসে কেনে অন্ধকার বাসি।
হিয়ার মাঝারে মোর                               কেমন জানি করে গো
বন্ধু নাকি হৈলা পরদেসি॥
ধেনুবৃন্দ উনমন                                          হামারব অনুক্ষণ
চঞ্চল স্বভাব কেনে দেখি।
বনে যত মৃগিগণ                                    সে কেনে কান্দয়ে গো
ঝুরে কেনে পোসনিয়া পাখি॥
প্রিয়নর্ম্মসখাগণে                                        নাহি দেখি কাননে
মুরলী শব্দ নাহি সুনি।
মউরের ঘন নাদ                                       সুনি কেনে পরমাদ
বজর সমান সুনি ধ্বনি॥
সেই পক্ষ কলরব                                       বিপরীত সুনি লব
ডাহুক ডাহুকী ঘন ডাকে।
হংস সারস বাণী                                      শ্রবণের জ্বালা জানি
এত কেনে হইল বিপাকে॥
শীতল যমুনা জল                                           পুন দেখি গরল
কালিয় আইল হেন বাসি।
যে চান্দ দেখিলে মোর                                    আনন্দ হইথ গো
ই কেনে গরল বরসি॥
মন্দ মন্দ পবন                                          সেহ দহে অনুক্ষণ
চন্দন গরল সম লাগে।
বিষম মদন বাণে                                     কি লাগি পরাণে হানে
হৃদয়ে দারুণ সেল জাগে॥
নীপতরু কুঞ্জবন                                        তাহা দেখি উচাটন
শীতল গরল দুখ জ্বালা।
কোমল শিরিষদল                                     পরশে দহে কলেবর
কুসুমে বিষম শরজ্বালা॥
বিষম বরিষা কাল                                      সেহ মোরে জঞ্জাল
কত দুখ সহিবারে পারি।
দারুণ মদন-শর                                        হিয়া করে জরজর
অবলা কেমনে প্রাণ ধরি॥
মেঘ দেখি প্রাণ ফাটে                               পথিকে না দেখি বাটে
অনুক্ষণ উচাটন হিয়া।
তাহে ত চাতক পাখি                                ঘন হেরি ঘন ডাকি
উদ্দীপন করে পিয়া পিয়া॥
অভরণ যৌবন হেরি                                  পরাণ ধরিতে নারি
রজনী দিবস নাহি যায়।
যত ছিল অনুকুল                                      সেহ বেল প্রতিকূল
নিলজ পরাণ না বাহিরায়॥
সেই মোর সরোবর                                     সেই কুঞ্জ মনোহর
সেই মোর গোবর্দ্ধন গিরি।
পিয়ার নিকটে মোর                                    যত সুখ দিত গো
সে কেন হৈল মোর বৈরি॥
শ্যামের হাতের নীপতরু                               সেহ এবে ফুল ধরু
তাহা যে দেখিতে প্রাণ ফাটে।
যে সুখ যেখানে হয়ে                                দেখি প্রাণ বাহিরায়ে
সাহানবান্ধা যমুনার ঘাটে॥
এ ঘর দেখি এ শূন্য                                    শূন্য দেখি ত্রিভুবন
নিরন্তর জরজর হিয়া।
সে খাট পালঙ্ক হেরি                                   ধৈরজ ধরিতে নারি
মন বুঝে পথিক দেখিঞা॥
শরত শিশির কাল                                  সেহ মোরে দহে ভাল
দারুণ মদন সনে বাদ।
তাহে ঋতু বসন্ত                                      সেহো মোরে দুরন্ত
ভ্রমর নিকর পরমাদ॥
অনিল মলয়া গতি                                     সে হইল বিপরীতি
তাহে দুখ বাঢ়ে নিরন্তর।
একে সে অবলা জাতি                                তাহে বাদ কুলবতি
কেমনে হইব স্বতন্তর॥
শ্যাম তমাল রুখ                                       সেহ দেই মহাদুখ
পিয়ার ভরমে হেরি তায়।
তাহার পরশ লাগি                                  তরুতলে জাঙ সখি
দেখিতে আনল উঠে গায়॥
সুরঙ্গ রঙ্গন মালা                                  বন্ধু মোর গলে দিলা
কদম্ব-মঞ্জরী দিল কানে।
নিজ করে মুছিয়া ঘাম                            তিলক দেল অনুপাম
সেই গুণ পাসরি কেমনে॥
বান্ধেন কবরী ভার                                 নানা ফুলে গাঁথি হার
বনীর বণান কত ভাঁতি।
সে হেন পিয়ার গুণ                                 পাঁজরে বিন্ধিল ঘুণ
কেমনে ধরিব দারুণ ছাতি॥
নানা কুঞ্জে নানা বনে                                দেখিয়া পড়য়ে মনে
সেই কেনে নিরবধি জাগে।
সুরতি আরতি জত                               বুঝিতে না পারি তত
হিয়ায়ে হিয়ায়ে যেন লাগে॥
সে মধুর আলাপনে                                     সুনি কিএ শ্রবণে
আর কি হেরব চান্দমুখ।
সেহ অঙ্গ পরিমল                                       অঙ্গে লাগিব গো
পরশে শীতল হবে বুক॥
আর কি আমার পিয়া                               দেশেরে আসিব গো
আর কি বসিব মোর কোলে।
হিয়া বিদরিয়া মোর                                    প্রাণ বাহিরায় গো
আমি থির হব কার বোলে॥
সেই সখা সেই সখী                                      সেই সব পশুপাখী
সেই সব দেখি ভালে ভাল।
এক চান্দ বিহনে                                       কি করিব তারাগণে
কেমনে বঞ্চিব নিশিকাল॥
এ হেন দারুণ হিয়া                                কেন বা প্রবোধে দিঞা
নেবারিব কোন অভিলাষে।
উদ্দীপন বিরহে গোরি                                   চিত্ত ধরিতে নারি
মন ঝুরে রামগোপাল দাসে॥


ইতি রাধাকৃষ্ণরসকল্পবল্লীগ্রন্থে বিরহ উদ্দীপন নাম নবমঃ কোরকঃ।

.           *************************            
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর