কবি গতিগোবিন্দ - মহাপ্রভুর পরবর্তী কালের একজন প্রধান বৈষ্ণবাচার্য, শ্রীনিবাস আচার্যের পুত্র এবং পদামৃতসমুদ্র নামের পদাবলী সংগ্রহের সংকলক, রাধামোহন ঠাকুরের বৃদ্ধপিতামহ ছিলেন। গতিগোবিন্দ, গোবিন্দগতি নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। শ্রীনিবাস ঠাকুরের পুত্র গতিগোবিন্দ, তাঁর পুত্র কৃষ্ণপ্রসাদ, তাঁর পুত্র জগদানন্দ এবং তাঁর পুত্র রাধামোহন ঠাকুর।
এই পাতার নীচে দেওয়া গ্রন্থসমূহ থেকে, আমরা তাঁর মাত্র ৫টি পদ সংগ্রহ করতে পেরেছি। তার মধ্যে সতীশচন্দ্র রায়ের সম্পাদিত “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী”-তে পাওয়া “রাই-তনু শোভার ভাণ্ডার” পদটি অনবদ্য! প্রকৃতির সঙ্গে নারীর বা পুরুষের অঙ্গ-গ্রত্যঙ্গের বন্দনা বা হাবভাবের তুলনা করে রচিত কবিতা সাধারণত আমরা দেখি। কিন্তু এক্ষেত্রে রাধার বিভিন্ন অংশকে লুটে বা চুরি করে নিয়ে প্রকৃতি বিভিন্ন রূপের শোভার বর্ধন করছে, এমন বলা হয়েছে, যা সত্যিই অসাধারণ।
গতিগোবিন্দ সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -পাতার উপরে . . . সতীশচন্দ্র রায় শ্রীশ্রীপদকস্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকার ১২১-পৃষ্ঠায় গতিগোবিন্দের পরিচয় ও পদাবলী সম্বন্ধে লিখেছেন . . . “পদকল্পতরুতে গতিগোবিন্দ ভণিতার শুধু একটি মাত্র পদ পাোয়া গিয়াছে। ঐ পদের ভণিতায় আছে --- মনের আনন্দে শ্রীনিবাস -সুত . গতিগোবিন্দ-চিত ভোর রে॥ রাধামোহন ঠাকুর পদামৃতসমুদ্রের মঙ্গলাচরণে লিখিয়াছেন,---“শ্রীগোবিন্দগতিং বন্দে বিদিতং ভুবি সর্ব্বতঃ।” পুনশ্চ উহার টীকায় লিখিয়াছেন,--- “শ্রীমদাচার্য্যপ্রভোঃ পুত্রং শ্রীগোবিন্দগতিসংজ্ঞকং তত্পুত্রাংশ্চ শ্রীগোবিন্দগতিমিত্যাদিনা পুনর্বন্দতে।” গোবিন্দগতি ওরফে গতিগোবিন্দ তাঁহার পদে জগদ্বিখ্যাত পিতার পুত্র বলিয়া পরিচয় দিয়া গৌরব বোধ করিয়াছেন ; সুতরাং আলোচ্য পদে রচয়িতা শ্রীনিবাদ আচার্য্যের পুত্র রাধামোহন ঠাকুর কর্ত্তৃক প্রশংসিত গোবিন্দগতি বা গতিগোবিন্দ হইবেন বলিয়াই বিবেচনা হয়। গতিগোবিন্দের অন্য একটি “রাই-তনু শোভার ভাণ্ডার” ইত্যাদি সুন্দর পদ আমাদিগের অপ্রকাশিত পদা- রত্নাবলী গ্রন্থে উদ্ধৃত হইয়াছে।
শ্রীনিবাস আচার্য্য ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে খেতুরীর মহোত্সবে শুভাগমন করিয়াছিলেন ; তখন তাঁর প্রৌঢ় বয়স। সুতরাং তাঁহার পুত্র গতিগোবিন্দ ষোড়ষ ষতকের মধ্যভাগে জন্মগ্রহণ করিয়া সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন---এরূপ অনুমান করিলে অসঙ্গত হইবে না।
পদামৃতসমুদ্রে ইঁহার কোনও পদ উদ্ধৃত হয় নাই। তবে তিনি শুধু গোবিন্দ ভণিতা দিয়া কোন পদ রচনা করিয়া থাকিলে, উহা গোবিন্দদাস ভণিতার পদাবলীর সহিত মিশিয়া যাওয়াও অসম্ভব নহে। কিন্তু তিনি যে শুধু গোবিন্দ ভণিতা দিয়া কোনও পদ রচনা করিয়াছেন, তাহার কোনও প্রমাণ নাই।
গতিগোবিন্দের রচিত ২৩১৮ সংখ্যক পদটি নিত্যানন্দের বন্দনা-বিষয়ক। পদকর্ত্তার উহাতে কবিত্ব-শক্তি প্রদর্শনের বিশেষ অবসর মিলে নাই ; কিন্তু তাঁহার পূর্ব্বোক্ত “রাই-তনু শোভার ভাণ্ডার” ইত্যাদি অপ্রকাশিত পদ-রত্নাবলীর ৪৩৯ সংখ্যাক মাথর সখী-সংবাদের পদটি পড়িলে মনে হয় যে, গতিগোবিন্দ কেবল পিতার পরিচয়ে প্রসিদ্ধ হন নাই ; তাঁহার নিজেরও কিছু পাণ্ডিত্য ও রসজ্ঞতা ছিল। দুঃখের বিষয় যে, আমাদিগের এই দুর্ভগ্য দেশে অনেক সুপ্রসিদ্ধ পিতার পুত্রের সম্বন্ধেই কিন্তু এতটুকুও বলা চলে না।”
আমরা মিলনসাগরে কবি গতিগোবিন্দ বা গোবিন্দগতি-এর বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
গতিগোবিন্দ বা গোবিন্দগতি জন্ম ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে, মৃত্যু সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in