কীর্ত্তনানন্দ, গৌরসুন্দর দাসের রচনার প্রমাণ - পাতার উপরে . . . গৌরসুন্দর দাসের “শুন শুন বৈষ্ণব-ঠাকুর” পদটি সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকাতেও সম্পূর্ণ রূপে রেখেছেন। এর কারণ এই পদটি থেকেই জানা যায় যে গৌরসুন্দর দাস, কীর্ত্তন আনন্দ নামের রাধাকৃষ্ণ লীলা সমুদ্র সংকলন প্রকাশিত করেন। এই গ্রন্থটির প্রকাশনা নিয়ে পদকল্পতরুর সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায় লিখেছেন . . .
“গৌরসুন্দর ভণিতার চারিটী পদ পদকল্পতরু গ্রন্থে উদ্ধৃত হইয়াছে। আমরা ‘গৌরদাস’ প্রসঙ্গে বলিয়াছি যে, ৩০২৬ সংখ্যক ‘গৌর’ ভণিতার (রাধানাথ কি তব বিচিত্র মায়া) পদটীও রচনা দর্শনে গৌরসুন্দরের রচিত বলিয়াই বিবেচনা হয় ; সুতরাং পদকল্পতরুতে গৌরসুন্দরের মোটে পাঁচটী পদ পাওয়া যাইতেছে। ইহা দ্বারা পদকর্ত্তা গৌরসুন্দর যে পদকল্পতরুর সংকলয়িতা বৈষ্ণবদাসের পূর্ব্ববর্ত্তী কিংবা অন্ততঃপক্ষে সমকাল-বর্ত্তী কবি, তাহা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।
লালগোলার অধিপতি শ্রীযুক্ত রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রাও বাহাদুরের সম্পূর্ণ অর্থব্যায়ে বহরমপুরের শ্রীযুক্ত বনওয়ারিলাল গোস্বামী মহাশয়ের দ্বারা প্রকাশিত কীর্তনানন্দ গ্রন্থে সঙ্কলয়িতার নাম মুদ্রিত হয় নাই। সেরূপ বিদ্যাপতির পদাবলীর সম্পাদক শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয় তাঁহার ভূমিকায় ‘কীর্ত্তনানন্দ’ পুথির উল্লেখ ও উহা হইতে বহুসংখ্যক পদ সংগ্রহ করিয়া থাকিলেও অন্ততঃ পুথিখানার প্রাচীনতা প্রমাণিত করার জন্যও উহার সঙ্কলয়িতার নাম-নির্দ্দেশ ও সময় নিরূপণ করার জন্য চেষ্টা করেন নাই। ইহার কারণ বোধ হয় এই যে, তাঁহার উল্লিখিত ও শ্রীযুক্ত বনওয়ারিলাল গোস্বামী মহাশয়ের উক্ত সংস্করণের আধার-ভূত ‘কীর্ত্তনানন্দ’ পুথিখানা শেষ অংশে খণ্ডিত ; সুতরাং পুথির শেষে সংকলয়িতার নাম পাওয়া যায় নাই। আমরা কিন্তু ঐ মুদ্রিত গ্রন্থের ৩০পৃষ্ঠার একটী পদের উক্তি হইতে ‘গৌরসুন্দর দাস’ শ্রীরাধাকৃষ্ণের লীলা-সমুদ্রস্বরূপ ‘কীর্ত্তনানন্দ’ সঙ্কলিত করেন, ইহা জানিতে পারিয়াছি। পদটী নিম্নে উদ্ধৃত হইল যথা,---
এই কীর্ত্তনানন্দ গ্রন্থের ৫পৃষ্ঠার ‘সূতিকা মন্দিরে গিয়া আনন্দে বলাই ' । ইত্যাদি শ্রীকৃষ্ণের জন্ম-লীলার পদের ভণিতা এইরূপ, যথা--- বৈষ্ণব দাসেতে কয় মনের হরিষে। জন্ম নিত্য লীলা প্রভু করিলা প্রকাশে॥
এই পদে রচয়িতা বৈষ্ণবদাস যদি পদকল্পতরুর সঙ্কলয়িতা বৈষ্ণবদাস হয়েন, তাহা হইলে গৌরসুন্দর ও বৈষ্ণবদাস পরস্পরের গ্রন্থে পরস্পরের পদ উদ্ধৃত করায়, উভয়েই সমকাল-বর্ত্তী পদ-কর্ত্তা, এইরূপ সিদ্ধান্ত অপরিহার্য্য মনে হয়।
বস্তুতঃ এই ‘কীর্ত্তনানন্দ’ পুথিখানাতেও ‘পদ-রস-সার’ ও ‘পদরত্নাকর’ পুথির ন্যায় পদকল্পতরুতে যাহা উদ্ধৃত হয় নাই, এরূপ বহুসংখ্যক পদ দেখা যায়। ‘পদ-রস-সার’ ও ‘পদরত্নাকর’ পুথি যে পদকল্পতরুর পরবর্ত্তী সংগ্রহ, তাহা উক্ত পুথিদ্বয়ের প্রসঙ্গে পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। কীর্ত্তনানন্দ পুথিখানাকেও আমরা সেইরূপ পরবর্ত্তী সংগ্রহ বলিয়াই বিবেচনা করি। তবে গৌরসুন্দরের এই সংগ্রহ-গ্রন্থের কাল পদকল্পকরুর পরবর্ত্তী হইলেও তাঁহার কয়েকটি পদ পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে দেখিয়া, তাঁহাকে বৈষ্ণবদাসের সম-সাময়িক প্রায় দুই শত বত্সরের পূর্ব্ববর্ত্তী পদ-কর্ত্তা বলিয়াই সিদ্ধান্ত করিতে হইতেছে।
গৌরসুন্দরের রচনায় বিশেষ কবিত্ব-শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে তাঁহার ‘কীর্ত্তনানন্দ’ সংগ্রহ গ্রন্থখানার জন্যই যে, তাঁহার নাম চির-স্মরণীয় হইবে. তাহাতে সন্দেহ নাই ; সুতরাং অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে কীর্ত্তনানন্দের সংকলয়িতা গৌরসুন্দরকেই আমরা পদকল্পতরুর উদ্ধৃত পদাবলীর রচয়িতা বলিয়া অনুমান করিতে বাধ্য হইয়াছি।”
গৌরসুন্দর দাস অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের কবি বৈষ্ণবদাস সমকালীন
এই পাতার কবিতার ভণিতা - গৌর, গৌরসুন্দর, গৌরসুন্দর দাস
কবি গৌরসুন্দর দাস - তিনি বৈষ্ণবদাসের সমসাময়িক। পদকল্পতরুতে তাঁর “গৌরসুন্দর” ভণিতার চারটে এবং “গৌর” ভণিতার ৩০২৬ সংখ্যক “রাধানাথ কি তব বিচিত্র মায়া”, পদ রয়েছে যা একই রকমের ।
প্রায় একই সময়ে তিনিও ‘কীর্ত্তন আনন্দ’ নামের একটি রাধাকৃষ্ণ লীলা সমুদ্রের ন্যায় সংকলন করেন। এই গ্রন্থে "বৈষ্ণবদাস" ভণিতার পদ রয়েছে। সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে "বৈষ্ণবদাস" এবং "গৌরসুন্দর দাস" সমসাময়িক। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ। দুর্ভাগ্যবশত "কীর্ত্তনানন্দ" গ্রন্থটি আমরা যোগাড় করে উঠতে পারিনি।
আমরা মিলনসাগরে কবি গৌরসুন্দর দাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in
বিভিন্ন রূপে গৌর ভণিতার কবিদের পাতার লিঙ্ক - পাতার উপরে . . . মিলনসাগরে প্রকাশিত "গৌর" সম্বলিত বিভিন্ন ভণিতায় ক্লিক করলেই সেই পাতায় চলে যেতে পারবেন।