কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
অশ্রু
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, “বীরভূমি” (নবপর্য্যায় ১৩১৮-১৩১৯বঙ্গাব্দ, ১৯১১-
১৯১২খৃষ্টাব্দ), ২য় খণ্ড, ২য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, ১৮৫-পৃষ্ঠা।


চির-সাথী তুই, জীবনের পথে
.        আয়, অশ্র, আয় উজলি আঁখি
গাঁথিয়া যতনে মুকুতার মালা
.        আদরে এ বুকে সাজায়ে রাখি।
নব আষাঢ়ের স্নিগ্ধ শীতল
.        হ-দয়-জুড়ানো মাধুরী ল’য়ে
আয় অশ্রু, আমি কাঁদি একবার
.        আয় মোর বুকে নয়ন ব’য়ে।
নিভে যাক্ জ্বালা ; যত পাপ তাপ
.        ধুয়ে মুছে যাক্ চাতুরী ছলা,
আয় রে অশ্রু কাঁদি একবার
.        বালকের মত ছাড়িয়া গলা।
ভাঙিয়া চুরিয়া গিয়াছে হৃদয়,
.        দারুণ নিরাশা অশনি ঘায়,
শত উপেক্ষায় জর জর প্রাণ
.        অনুতাপানলে জ্বলিছে হায়।
আয় আঁখি জল, আয় আজি তোরে,
.        প্রাণের আবেগে ডাকিরে তাই।
শৈশবে যাহা গিয়াছে চলিয়া,
.        আমি তো তাহার কিছুনা চাই।
শুধু চাই তোরে, তুই শুধু আয়,
.        শৈশবের পূত অমূল্য-নিধি।
আয় তোরে পেয়ে ভুলে যাই সব
.        কাঁদিয়া কাঁদিয়া জুড়াক হৃদি।
আয় চির সাথি! থাক্ মোর সাথে,
.        মরুময় এই ধরণী বুকে,
বিপদের মাঝে এ দুঃখ-আগারে
.        তোরে সাথে ল’য়ে থাকিব সুখে।
কাঁদিয়া জনম, কাঁদি চিরকাল
.        অতীতের স্মৃতি রোদন-ময়,
নয়ন-সলিলে ভাসিয়া ভাসিয়া
.        নীরব মরণে লভিব লয়।

.            *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঘৃণিতের প্রত্যুত্তর
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, “বীরভূমি” (নবপর্য্যায় ১৩১৮-১৩১৯বঙ্গাব্দ, ১৯১১-
১৯১২খৃষ্টাব্দ), ২য় খণ্ড, ২য় বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ৩৩৫-পৃষ্ঠা।


অঙ্কুর কহিল হাসি আঁধারেরে ডাকি,
কি যন্ত্রণা পেয়েছিনু তোর মাঝে থাকি
এখন কেমন দিব্য আলোকে আসিয়া।
উদার আকাশে অঙ্গ দিয়িছি মেলিয়া,
রো অবোধ---কহে ডাকি প্রশান্ত আঁধার
এখনো আমাতে মূল রয়েছে তোমার
যত কাল ধরণীর বুকে রবে তুমি,
আশ্রয় তোমার মাত্র অন্ধকার ভূমি।

.            *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সাধুর কার্য্য
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, “বীরভূমি” (নবপর্য্যায় ১৩১৮-১৩১৯বঙ্গাব্দ, ১৯১১-
১৯১২খৃষ্টাব্দ), ২য় খণ্ড, ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, ৪৩২-পৃষ্ঠা।


সমুদ্রের লোনা জল করিয়া গ্রহণ
সুপের পানীয় রবি করেন অর্পণ ;
নিশাকর প্রখর রবির কর ল’য়ে,
না জানি আপনি কত দুঃখ ক্লেশ স’য়ে,
সুশীতল সুধামাখা কর-বিতরণে
তাপতপ্ত ধরারে তোষেন সযতনে!
বৈদ্য সদ্যঃ প্রাণ-ঘাতী কালকূট বিষে
ঔষধ করেন সৃষ্টি ব্যাধির বিনাশে।
সাধু সহি অপরের তিক্ত ব্যবহার,
করিতে বিরত নাহি পর উপকার।

.            *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উজানি পাঠে @
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক “মালঞ্চ” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২৩বঙ্গাব্দ (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) সংখ্যায়
প্রকাশিত।

( ১ )

কুমুদরঞ্জন!
তোমার জ্যোছনা রাশি                             অমরার সুধা হাসি
অমিয় কবিত্ব ধারা মধু প্রস্রবন---
ভাসায়ে পল্লীর বুক,                                হেরিতেও কত সুখ
প্লাবিত করিয়া দেহে’ প্রান্তর কানন ;
ওগো পল্লীতীর্থযাত্রী!                                  যদিও এ দুখরাত্রী
রেখেছে ঘেরিয়া মোর পল্লীনিকেতন,
তবু এ দুখের পাছে                                এই এক সুখ আছে---
তোমার শীতল শান্ত কর পরশন।
দিবার ‘রবির’ কর                                       উজল প্রখরতর
পশে নাই পল্লীমাঝে, তমো আবরণ---
কি গাঢ় কুহেলিকায়                                ছেয়ে রেখেছিল তায়
নিরাশায় পল্লীভূমি ছিল নিমগন!
আজি তুমি এলে কবি                                   করুণার হেমছবি
লয়ে শ্রদ্ধা ভক্তি প্রীতি অমরার ধন।
দূরে গেছে অন্ধকার                               হৌক নিশি, তবু আর
নাহি দুঃখ, এ নিশির আছে প্রয়োজন।
“মঙ্গলার” পদে মোর                               এ প্রার্থনা যেন ভোর---
না হয় এ নিশি ; পল্লী অদৃষ্ট গগন---
করি চির সমুজ্জ্বল                                        নিষ্কলঙ্ক পূর্ণকল
থাকুক পল্লীর হৃদি কুমুদরঞ্জন!


( ২ )
কুমুদরঞ্জন!
যেই তুলি করে ধরি                                “ফুল্লরা” চিত্রিত করি
অমর হইল বঙ্গে “কবিকঙ্কণ”।
খুল্লনা শ্রীমন্ত কথা                                আজো আঁকা যথাতথা
“চণ্ডীর মঙ্গল গাথা” হৃদি-রসায়ন।
উজানি --- অজয়তীরে                           সেই তুলি ল’য়ে কি রে
স্বর্ণ মরালীরে তোর করিলি অঙ্কন ?
বড় প্রাণ কাঁদে ভাই                                 শুধাইতে চাহি তাই
ফেরে নিকি চন্দ্রকান্ত হেরি বৃন্দাবন ?
দুইটি হাঁসের লাগি                             সেই যে গেছে অভাগী---
আদুরি, আজো কি তোর ফেরেনি এখন ?
আঁখি দুটি ছল ছল                              আজো কিরে ঢালে জল
“কাটা তরুমূলে” সেই বালক দুজন ?
হৃদয় “কুনুর” কোলে                           আজিও কি তোর জ্বলে---
সেই আলো---“জননীর উজল নয়ন” ?
কোথায় “চণ্ডালী” তোর                        কোথা “কাপালিক” ঘোর ?
আছে কি এখনও সেই মসজেদ ভবন ?
শত নয়নের জল                                       কলকলে কি বিকল
মাঝে যার নদী হ’য়ে বহিছে বেদন!
আমি পল্লীবাসী দীন                                 এ অপরিশোধ্য ঋণ---
চিরদিন মনে মনে রহিবে স্মরণ।
স্মরিব এ উপকার                                   দেখা ভাই একবার---
করি পল্লীজননীর স্বরূপ দর্শন।
দেরে সেই দিয়া আঁখি                              একবার মাকে দেখি---
সার্থক জনম---হৌক সফল জীবন।
বঙ্গে পল্লী আছে যত                               সবাই তোর উজানি ত’
তুই যে --- সবার চিত্র কুমুদরঞ্জন।

.            *************************      

@ - উজানির “পল্লীকবি” সোদর প্রতিম সুহৃদয় শ্রীযুক্ত কুমুদরঞ্জন মল্লিক বি.এ.
প্রণীত “উজানি” পাঠে লিখিত।


.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আশীর্ব্বাদ
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন
সজনীকান্ত দাস, সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য, রসিকচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার পৌষ
১৩৫২ (ডিসেম্বর ১৯৪৫) সংখ্যায় প্রকাশিত।


আসমুদ্র হিমাচল করিয়া ভ্রমণ
তীর্থে তীর্থে তীর্থবারি করি আহরণ
অন্তরের স্নেহ-শৈত্যে ঘনীভূত করি
মাতা তব তিলোত্তমা তলেছেন গড়ি

পিতা তব জ্ঞানভিক্ষু পশ্চিমে পূরবে
বিদ্যাপীঠ পরিক্রমা করি সগৌরবে
লভেছেন যেই সত্য করেছেন দান
তাহারি মূরতি তুমি লভিয়াছ প্রাণ

কত আশা কত সাধ কত চিন্তা ভয়
আজিকার তরে ছিল কত না সংশয়
সব দ্বিধা বাধা-বন্ধ করিয়া নিঃশেষ
আসিয়াছে শুভদিনে ধরি বর বেশ

যে প্রেম চিন্তায় চির-অম্লান ভাস্বর
বজ্রগীতি মাল্যদাম পবিত্র সুন্দর
পরি নিজ গসে অয়ি বাঙ্গালার বালা
কম করে তুমি বরে দেহ বরমালা

যে ছিল এপরিচিত চির পরিচয়ে
প্রতিষ্ঠিত কর তারে আপন হৃদয়ে
এই মার্গশীর্ষ যেন শত বর্ষ ধরি
ধন্য করে তোমা দোঁহে আনন্দ বিতরি

‘দিল্লী চলো’ দিকে দিকে উঠিয়াছে ধ্বনি
তুমি ত চলেছ দিল্লী বহুভাগ্য গণি
আশীর্ব্বাদ লহ মাতা তোমার সন্তান
স্বাধীন স্বদেশমাঝে হোক রূণ্যবান্।

.            *************************      

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রকৃত বন্ধু
কবি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
১৯১৩ সালে (১৩২০ বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, কুলদাপ্রসাদ মল্লিক ভাগবত রত্ন দ্বারা সম্পাদিত,
"বীরভূমি" পত্রিকার (নবপর্য্যায়), ৩য় খণ্ড, ১২৮-পৃষ্ঠায় প্রকাশিত।

মণি বলে মণিকার শুন মোর কথা
পাষাণে ঘসিয়া মোরে কেন দাও ব্যথা ?
মণিকার কহে, ভাই ঘসিয়া মাজিয়া,
অন্তরের আভা তব উজ্জ্বল করিয়া
আমিই ফুটায়ে দিব ; হে বন্ধু তখন,
ভূপতি মুকুট মাঝে শোভিবে কেমন !
এ মলিন রূপে ছিলে খনির আঁধারে,
আমি বই তখন কে চিনিত তোমারে ?


২) স্বাতন্ত্র্য।

দেখিয়াছি পুণ্য-তোয়া ভাগিরথী-নীরে
কত ক্ষুদ্র তরঙ্গিনী মিশায়েছে ধীরে
আপন জীবন-স্রোত ; তারি ফলে তারা
লভিয়াছে সাগর-সঙ্গম, আত্ম-হারা।
হেন মহা স্রোতে যদি তারা না মিশিত,
ডাঙ্গায় শুকায়ে যেত, কোথা কে জানিত?
পাইত না! সিন্ধু-সঙ্গ। ক্ষুদ্র বুদ্ধি যারা,
স্বতন্ত্র থাকিয়া মরে বিফলেতে তারা।


৩। কিমাশ্চর্য্যমতঃপরম্।

পুত্রের ব্যারামে, পিতা শিয়রেতে ব’সে
মানস করেন পূজা দেবতা উদ্দেশে।
মূল্যবান মানসিক দ্রব্য সংখ্যাতীত,
শুনি পুত্র পিতারে কহিছে হয়ে ভীত।
কোথা এত পাবে বাবা কি দিয়া শোধিবে?
পিতা কহে বাছা তোর ভাল হোক, তবে
একে একে সকলের মুখে দিব ছাই!
আমি তাহে সুচতুর তোর চিন্তা নাই!

.            *************************      

.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর