কবি হরিদাস এবং দ্বিজ হরিদাস - সম্ভবত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক কবি। ভণিতা হিসেবে আমরা তাঁদের কবিতা আলাদা আলাদা পাতায় রেখেছি। এই পাতায় "হরিদাস" ভণিতার পদাবলী রাখা হয়েছে। "দ্বিজ হরিদাস" ভণিতার পদের জন্য এখানে ক্লিক করুন . . .।
গৌরপদতরঙ্গিণীর সংকলক ও সম্পাদক জগবন্ধু ভদ্র সাতজন হরিদাসের সন্ধান আমাদের দিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অন্তত তিন জনের পদকর্তা বা কবি হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করতেন।
আমরা প্রথমে কবি হরিদাস ও দ্বিজ হরিদাস কে নিয়ে শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি এখানে তুলেছি।
সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায় এবং গৌরপদতরঙ্গিণীর সম্পাদক জগবন্ধু ভদ্রের মধ্যে এঁদের নিয়ে বেশ কিছুটা মতানৈক্য ছিল। সতীশ বাবু তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরু গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ভুমিকার ২২৮- পৃষ্ঠায়, হরিদাস ও হরিদাস ( দ্বিজ ) সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“ ‘হরিদাস’ ও ‘হরিদাস দ্বিজ’ ভণিতার ২ + ৪ = ৬টী পদ পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে। জগবন্ধু বাবু তাঁর উপক্রমণিকায় সাত জন হরিদাসের পরিচয় দিয়া, উহাঁদিগের মধ্যে যে তিন জনকে পদ-কর্ত্তা বলিয়া অনুমান করিয়াছেন, তাঁহাদিগের পরিচয় নিম্নে লিখিত হইতেছে,--- প্রথম ও দ্বিতীয় - বড় হরিদাস ও ছোট হরিদাস। ; যথা---
বড় হরিদাস ও ছোট হরিদাস। দুই কীর্ত্তনিয়া রহে প্রভুর পাশ॥ --- চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ১০ম পরিচ্ছেদ।
জগবন্ধু বাবু বড় হরিদাসের অন্য বিশেষ পরিচয় সংগ্রহ করিতে পারেন নাই ; কিন্তু ছোট হরিদাসের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে, অতি সুকণ্ঠ গায়ক বলিয়া তিনি নীলাচলে মহাপ্রভুর নিকটে থাকিয়া তাঁহাকে কীর্ত্তন-গান শুনাইতেন। মহাপ্রভু ইহাঁকে খুব ভালবাসিতেন ; তথাপি অতি সামান্য দোষে ইহাঁকে বর্জ্জন করিয়াছিলেন। সে দোষটা এই যে, হরিদাস একদা শিখী মাহিতীর ভগিনী মাধবী দাসীকে ভিক্ষা-লব্ধ মোটা চাউল দিয়া, তাঁহার নিকট হইতে মহাপ্রভুর জন্যে উত্তম সরু চাউল বদলাইয়া আনিয়াছিলেন। এই উপলক্ষে মাধবী দাসীর সহিত হরিদাসের দুই এক কথা হইয়াছিল। ইহা অধিকাংশ লোকের নিকট তেমন দূষণীয় বিবেচিত না হইলেও মহাপ্রভুর নিয়ম ছিল যে, তিনি কোন স্ত্রীলোকের সহিত কথা-বার্ত্তা কহিতেন না ; তাঁহার সহচর অনুচরদিগের প্রতিও তাঁহার কড়া আদেশ ছিল যে, তাঁহারাও স্ত্রীলোকের সহিত সম্ভাষণ করিতে পারিবেন না। ছোট হরিদাস ওই আদেশ লঙ্ঘন করায়, তাঁহার জীবদ্দশায় মহাপ্রভু আর তাঁহার মুখ-দর্শন করেন নাই। চৈতন্যচরিতামৃতে বর্ণিত আছে যে, পর-জন্মেও যেন হরিদাস মহাপ্রভুর কৃপালাভ করিতে পারেন, এই কামনা করিয়া তিনি প্রয়াগের ত্রিবেণীতে ডুবিয়া প্রাণ-ত্যাগ করেন। . . .
. . . তৃতীয় হরিদাস রাঢ়ীর কুলীন ব্রাহ্মণ ও গৃহী ছিলেন। ইনি ফুলিয়ার মুখটী নৃসিংহের সন্তান। নিবাস ছিল মুশিদাবাদের টেঞা বৈদ্যপুরের সন্নিকটবর্ত্তী কাঞ্চনগড়িয়া গ্রামে। ইনি শ্রীনিবাসাচার্য্য অপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ভক্তিরত্নাকরে (নরহরি চক্রবর্তী রচিত) বর্ণিত আছে যে, মহাপ্রভু অপ্রকট হইলে ভক্তপ্রবর হরিদাস প্রাণ ত্যাগ করিতে ইচ্ছুক হন ; কিন্তু মহাপ্রভু স্বপ্নে দর্শন দিয়া তাঁহাকে আত্মহত্যা করিতে নিষেধ ও বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য আদেশ করেন। তদনুসারে হরিদাস বৃন্দাবনে যাইয়া শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। হরিদাসের আজ্ঞা অনুসারে তাঁহার শ্রীদাস ও গোকুলানন্দ নামক পুত্রদ্বয় পরবর্ত্তী কালে শ্রীনিবাসাচার্য্যের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন।”
এ ছাড়াও বৈষ্ণব দাস রচিত ও সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর, ১ম খণ্ড, ১ম শাখা, মঙ্গলাচরণ, পদসংখ্যা ১৭ তে আমরা পাই . . . গৌরাঙ্গচাঁদের প্রিয় পরিকর . দ্বিজ হরিদাস নাম। কীর্ত্তন-বিলাসী প্রেম-সুখরাশি . যুগল-রসের ধাম॥ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক এই কীর্তন-বিলাসী দ্বিজ হরিদাস, পদকর্তা হতেই পারেন।
শ্রীনিবাসাচার্যের শিষ্য হরিদাস - পাতার উপরে . . . হরিদাস ভণিতার “নাচিতে না জানি তমু নাচিয়ে গৌরাঙ্গ বলি” পদটির শেষে রয়েছে . . . অন্তে শ্রীনিবাস-পদ- সেবাযুক্ত যে সম্পদ . সে সম্পদের সম্পদী যে হয়। তার ভুক্ত-গ্রাস-শেষে কিবা গৌড় ব্রজ-বাসে . দন্তে তৃণ হরিদাসে কয়॥ এখানে পদকর্তাকে সুপ্রসিদ্ধ শ্রীনিবাসাচার্যর শিষ্য বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে, অন্তত এই পদটির রচয়িতা হরিদাস, শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক হতে পারেন না। এই হরিদাস, শ্রীনিবাসাচার্যেরও পরবর্তী বলে অনুমান করা যায়। সতীশচন্দ্র রায় লিখেছেন যে এই পদটি পদকল্পতরুর ৩০১৪ সংখ্যক পদ এবং জগবন্ধু ভদ্র এই পদটিকে দেখেন নি কারণ এই পদটি গৌরপদতরঙ্গিণীতে নেই। কিন্তু “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”-এর দ্বিতীয় সংস্করণের সম্পাদক মৃণালকান্তি ঘোষ অন্য কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন যে এই পদটি গৌরপদ- তরঙ্গিণীতে রয়েছে কিন্তু পরমানন্দের ভণিতায়। আমরা মিলনসাগরে হরিদাসের পাতায় দুটি ভণিতাতেই এই পদটি তুলে দিয়েছি।
আমরা মিলনসাগরে কবি হরিদাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in