কবি যদনন্দন দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
সৌন্দর্য্য-অমৃত-সিন্ধু তাহার তরঙ্গ-বিন্দু
ভণিতা যদুনন্দন দাস
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ৮ম সর্গের পদ, ৮৪-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথারাগ॥

সৌন্দর্য্য অমৃত সিন্ধু, তাহার তরঙ্গ বিন্দু, তরুণীর চিত্তাদ্রি ডুবায়।
কৃষ্ণ রম্য নর্ম্ম কথা, সুধু সুধাময় গাথা, তরুণীর কর্ণানন্দ ময়॥
সখী হে কহ এবে কি করি উপায়।
কৃষ্ণাঙ্গ মাধুরী ছান্দে, সর্ব্বেন্দ্রিয়গণ বান্ধে, বলে পঞ্চেন্দ্রিয় আকর্ষয়॥ ধ্রু॥
কোটি চন্দ্র সুশীতল, অঙ্গ ক্ষিতি তাপ হর, গন্ধ সুধা জগৎ প্লাবিত।
অধর অমৃত সার, কি কহিব সখী আর, বিচারিতে সব বিপরীত॥
নবীন জলদ দ্যুতি, বসন বিজুরি ভাঁতি, ত্রিভঙ্গিম বন্যবেশ তায়।
মুখপদ্ম জিনি চান্দ, নয়ন কমল ছান্দ, মোর নেত্র সেই আকর্ষয়॥
মেঘ জিনি কণ্ঠ ধ্বনি, নূপুর কিঙ্কিণী মণি, মুরলী মধুর ধ্বনি তায়॥
সনর্ম্ম বচন ভাঁতি, রমাদির মোহে অতি, কর্ণ স্পৃহা তাহাতে বাঢ়ায়॥
কৃষ্ণের অঙ্গের গন্ধ, মৃগমদ করে অন্ধ, কুঙ্কুম চন্দন দিল তায়।
অগুরু কর্পূর তাতে, যাহাতে যুবতী মাতে, মোর নাসা সেই আকর্ষয়॥
বক্ষস্থল পরিশর, ইন্দ্র নীল মণি বর, কপাট জিনিয়া তার শোভা।
সুবাহু অর্গল ছন্দ, কোটীন্দু শীতল অঙ্গ, আকর্ষয়ে সেই বক্ষ লোভা॥
কৃষ্ণাধরামৃতময়, যার হয় ভাগ্যোদয়, তার লব সেই জন পায়।
কৃষ্ণ চব্য পান শেষ, জিনিয়া অমৃত দেশ, জিহ্বা মোর সেই আকর্ষয়॥
রাধার উত্কণ্ঠা বাণী, বিশাখিকা তাহা শুনি, কৃষ্ণ সঙ্গ উপায় চিন্তিতে।
হেন কালে শুন কথা, তুলসী আইলা তথা, গন্ধ পুষ্প গুঞ্জার সহিতে॥
কৃষ্ণমাল্য পূজা লৈঞা, তুলসী আনন্দ পাঞা, আইলা অতি ত্বরিত গমনে।
তারে প্রফুল্লিতা দেখি, রাই মনে হৈলা সুখী, কহে দাস এ যদুনন্দনে॥

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), ৪র্থ খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ,
৩০শ পল্লব, অষ্টকালীয় নিত্য-লীলা, ২৫৯১-পদসংখ্যায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ সুহই॥

সৌন্দর্য্য-অমৃত-সিন্ধু                                তাহার তরঙ্গ-বিন্দু
ললনার চিত্তাদ্রি ডুবায়।
কৃষ্ণের যে নর্ম্ম-কথা                                সুধু সুধাময় গাথা
তরুণীর কর্ণ নদী হয়॥
সখি হে কি করি উপায়।
কৃষ্ণের মাধুরী-ছান্দে                             সর্ব্বেন্দ্রিয়গণে বান্ধে
বলে পঞ্চেন্দ্রিয় আকর্ষয়॥
নবাম্বুদ জিনি দ্যুতি                                বসন বিজুরী ভাতি
ত্রিভঙ্গিম রম্য বেশ তায়।
মুখ জিনি পদ্ম চাঁদ                                    নয়ন-কমল ফাঁদ
মোর দিঠি-আরতি বাঢ়ায়॥
মেঘ জিনি কণ্ঠ-ধ্বনি                              তাহে নূপুর কিঙ্কিণী
মুরলী-মধুর-ধ্বনি তায়॥
সনর্ম্ম বচন-ভাতি                                  রমাদির মোহে মতি
কৃষ্ণ-স্পৃহা তাহাতে বাঢ়ায়॥
কৃষ্ণের অঙ্গের গন্ধ                                  মৃগমদ করে অন্ধ
কুঙ্কুম চন্দন দিল তায়।
অগুরু কর্পুর তাতে                             যাহাতে যুবতি মাতে
তাহে মোর নাসা আকর্ষয়॥
বক্ষ-স্থল পরিসর                                     ইন্দ্রনীল-মণিবর
কপাট জিনিয়া তার শোভা।
সুবাহু অর্গল-ছন্দ                                কোটি-চন্দ্র-শীত অঙ্গ
সেহ হয় মোর বক্ষ-লোভা॥
কৃষ্ণাধরামৃতময়                                    যার হয় ভাগ্যোদয়
তার লব সেই জন পায়।
কৃষ্ণ-চব্য পাণ-শেষ                                জিনিয়া অমৃত-দেশ
তাহে মোর জিহ্বা আকর্ষয়॥
রাধার উত্কণ্ঠা-বাণী                             বিশাখা যে তাহা শুনি
কৃষ্ণ-সঙ্গ উপায় চিন্তিতে।
হেন কালে শুন কথা                                তুলসী আইলা তথা
পুষ্প-গুঞ্জা-মালার সহিতে॥
কৃষ্ণ-মাল্য পূজা লৈয়া                                তুলসী হরিষ হৈয়া
আইল অতি তুরিত-গমনে।
তারে প্রফুল্লিতা দেখি                                রাই হৈলা মহাসুখী
কহে দাস এ যদুনন্দনে॥

ই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”,
২২৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ সুহই॥

সৌন্দর্য্য অমৃতসিন্ধু                                তাহার তরঙ্গবিন্দু
ললনার চিত্তাদ্রি ডুবায়।
কৃষ্ণের যে নর্ম্মকথা                                সুধু সুধাময় গাথা
কর্ণ তায় নদী হয়ে ধায়॥
কহ সখি কি করি উপায়।
কৃষ্ণের মাধুরীছান্দে                             সর্ব্বেন্দ্রিয়গণে বান্ধে
বলে পঞ্চেন্দ্রিয় আকর্ষায়॥
নবাম্বুদ জিনি দ্যুতি                                বসন বিজুরী ভাতি
ত্রিভঙ্গিম রম্য বেশ তায়।
মুখ জিনি পদ্মচাঁদ                                      নয়নকমল ফাঁদ
মোর দিঠি আরতি বাঢ়ায়॥
মেঘ জিনি কণ্ঠধ্বনি                                তাহে নূপুর কিঙ্কিণী
মুরলী মধুর ধ্বনি তায়॥
সনর্ম্ম বচনভাতি                                  রমাদির মোহে মতি
কৃষ্ণস্পৃহা তাহাতে বাঢ়ায়॥
কৃষ্ণের অঙ্গের গন্ধ                                   মৃগমদ করে অন্ধ
কুঙ্কুম চন্দন দিল তায়।
অগুরু কর্পূর তাতে                              যাহাতে যুবতি মাতে
তাহে মোর নাসা আকর্ষায়॥
বক্ষস্থল পরিসর                                        ইন্দ্রনীল মণিবর
কপাট জিনিয়া তার শোভা।
সুবাহু অর্গলছন্দ                                   কোটিচন্দ্রশীত অঙ্গ
সেই হয় মোর বক্ষ লোভা॥
কৃষ্ণাধরামৃতময়                                    যার হয় ভাগ্যোদয়
তার লব সেই জন পায়।
কৃষ্ণচব্য পানশেষ                                 জিনিয়া অমৃতাশেষ
তাহে মোর জিহ্বা আকর্ষায়॥
রাধার উত্কণ্ঠাবাণী                             বিশাখা যে তাহা শুনি
কৃষ্ণসঙ্গ উপায় চিন্তিতে।
হেন কালে শুন কথা                                তুলসী আইলা তথা
পুষ্পগুঞ্জামালার সহিতে॥
কৃষ্ণমাল্য পূজা লৈয়া                                তুলসী হরিষ হৈয়া
আইল অতি তুরিতগমনে।
তারে প্রফুল্লিতা দেখি                                রাই হৈলা মহাসুখী
কহে দাস এ যদুনন্দনে॥

ই পদটি ১৯৩১-১৯৫৫ সময়কালে প্রকাশিত নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ড, ২৫৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ গান্ধার - মধ্য়ম দশকুশী॥

সৌন্দর্য্য অমৃত সিন্ধু,                                তাহার তরঙ্গ-বিন্দু,
ললনার চিত্তাদ্রি ডুবায়।
কৃষ্ণের যে নর্ম্ম-কথা,                                শুধু সুধাময় গাথা,
তরুণীর কর্ণানন্দী হয়॥
কহ সখি কি করি উপায়।
কৃষ্ণের মাধুরী ছান্দে,                            সর্ব্বেন্দ্রিয়গণে বান্ধে,
বলে পঞ্চেন্দ্রিয় আকর্ষয়॥
নবাম্বুদ জিনি দ্যুতি,                              বসন বিজুরি ভাতি,
ত্রিভঙ্গিম রম্য বেশ তার।
মুখ জিনি পদ্ম চাঁদ                                   নয়ন কমল ফাঁদ,
মোর দিঠি-আরতি বাঢ়ায়॥
মেঘ জিনি কণ্ঠধ্বনি,                              তাহে নূপুর কিঙ্কিণী,
মুরলী মধুর ধ্বনি তায়॥
নর্ম্ম-বচন ভাতি,                                  রমাদির মোহে মতি,
কৃষ্ণ-স্পৃহা তাহাতে বাঢ়ায়॥
কৃষ্ণের যে অঙ্গ-গন্ধ,                                মৃগমদ করে অন্ধ,
কুঙ্কুম চন্দন দিল তায়।
অগুরু কর্পূর তাহে,                             যাহাতে যুবতী মাতে,
তাহে মোর নাসা আকর্ষয়॥
বক্ষস্থল পরিসর,                                       ইন্দ্রনীলমণিবর,
কপাট জিনিয়া তার শোভা।
সুবাহু অর্গল-ছন্দ,                                কোটীন্দু-শীতল অঙ্গ,
সেহ হয় মোর বক্ষ-লোভা॥
কৃষ্ণাধর অমৃতময়,                                যার হয় ভাগ্যোদয়,
তার লব সেই জন পায়।
কৃষ্ণচর্ব্ব্যপাণ-শেষ,                                জিনিয়া অমৃত দেশ,
তাহে মোর জিহ্বা আকর্ষয়॥
রাধার উত্কণ্ঠা বাণী,                           বিশাখা যে তাহা শুনি,
কৃষ্ণসঙ্গ উপায় চিন্তিতে।
হেন কালে শুভ কথা,                               তুলসী আইলা তথা,
পুষ্প গুঞ্জা-মালার সহিতে॥
তুলসী উলসী হৈয়া,                               কৃষ্ণমাল্য পূজা লৈয়া,
আইলা অতি তুরিত গমনে।
তারে প্রফুল্লিতা দেখি,                               রাই হৈলা মহাসুখী,
কহে দাস এ-যদুনন্দনে॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রতন-মন্দিরে রসালস-ভরে
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ২য় সর্গের পদ, ২৭-পৃষ্ঠা । কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথারাগঃ॥

রতন মন্দিরে, রসালসভরে, শয়নে আছয়ে রাই।
মুখরাবচনে, জাগিয়া বিশাখা, জাগায়ে তাহারে যাই॥
অতি ত্বরা ডাকি, কহে উঠ সখী, ঘুচাহ আলস কায।
তার বাণী শুনি, মুগধি সুধনী, জাগে ঘুমে দিঠিরাজ॥
রাজহংসী যেন, নদীতে শয়ন, তরঙ্গে চালয়ে ঘন।
রতন পালঙ্কে, রাই এই রঙ্গে, হিলোল এ দুই নয়ান॥
হেন কালে রতি, মঞ্জরী সুমতি, জানে অবসর কাল।
বৃন্দাবনেশ্বরী, পদযুগ ধরি, সেবন করয়ে ভাল॥
কতেক প্রকার, করি বারেবার, জাগায় সকল সখী।
উঠি ত্বরাকরি, বসিলা সুন্দরী, ক্ষিতিতলে পদ রাখি॥
হেনই সময়ে, মুখরা দেখয়ে, উড়নি পিয়ল বাস।
বিশাখাকে কহে, কিবা দেখি ওহে, দেখিয়া লাগয়ে ত্রাস॥
হাহা পরমাদ, করিয়া বিষাদ, একি পরমাদ হায়।
দেখি হেমকান্তি, বসনের ভাতি, তোমার সখির গায়॥
সন্ধ্যাকালে কালি, উরে বনমালী, দেখি আছি পীতবাস।
সতী কুল হৈঞা, সে রূপে ভুলিঞা, ধরম করিলা নাশ॥
মুখরা বচন, করিয়া শ্রবণ, বিশাখা চকিত হৈঞা।
দেখি পীতবাস, আছে রাই পাশ, একি কহে ধীর হৈয়া॥
মুখরাকে তবে, কহে শুন এবে, স্বভাব অন্ধতা তুয়া।
একে আর দেখ, আনে আনে লেখ, নাহি কহ বিচারিয়া॥
রাইর বরণ, দ্রব হেম সম, পিন্দন এনীল বাস।
তাহাতে বিহানে, রবির কিরণে, সে যেন পীয়ল বাস॥
গবাক্ষ জালেত, দেখহ বিদিত, রবির কিরণ লাগে।
ইহার কারণে, তোমার মরমে, শঙ্কা উঠি কেনে জাগে॥
শুদ্ধমতি জনে, হেন কহ কেনে, অবোধ জরতি মতি।
এ যদুনন্দন, কহয়ে বিভ্রম, বড়ই পরমাদ অতি॥

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), ৪র্থ খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ,
৩১শ পল্লব, অষ্টকালীয় নিত্য-লীলায় দ্বিখণ্ডিত রূপে, ২৭৫৭ ও ২৭৫৮-পদসংখ্যা হিসেবে দেওয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে ২৭৫৮ পদের শেষে দেওয়া সতীশচন্দ্র রায়ের পাঠান্তরের ব্যাখ্যা আমরা দুটি পদেই দিলাম,
পাঠকের সুবিধার জন্য। মনে হয় সতীশচন্দ্র রায়ের, “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থটি দেখার সুযোগ হয়নি, অথবা
এই যায়গাটা তাঁর চোখ এড়িয়ে গিয়েছে।

অথ প্রাতঃকালীয়-লীলা যথা।
॥ বিভাষ॥

রতন-মন্দিরে                        রসালস-ভরে
শয়নে আছয়ে রাই।
মুখরা বচন                          শুনিয়া তখন
বিশাখা জাগায়ে যাই॥
অতি ত্বরা ডাকি                    কহে উঠ সখি
ঘুচাহ আলস-কাজ।
তার বাণী শুনি                     জাগিলা সুধনী
আলসে ঘুরে দিঠি-রাজ॥
রাজহংসী যেন                        নদীতে শয়ন
তরঙ্গে চালয়ে ঘন।
রতন-পালঙ্কে                        শুতিয়াছে রঙ্গে
হিলোলে এ দু নয়ন॥
হেন কালে রতি-                      মঞ্জরী সুমতি
জানে অবসর-কাল।
বৃন্দাবনেশ্বরী-                           পদযুগ ধরি
সেবন করয়ে ভাল॥
কত পরকার                        করি বারে বার
জাগাইল সব সখী।
উঠি ত্বরা করি                        বসিলা সুন্দরী
খিতি-তলে পদ রাখি॥
হেনই সময়ে                          মুখরা দেখয়ে
উঢ়নি পিয়ল বাস।
বিশাখাকে কহে                    কিবা দেখি ওহে
দেখিয়া লাগয়ে ত্রাস॥
হাহা পরমাদ                            বড় পরমাদ
একি পরমাদ হায়।
দ্রব-হেম-কাঁতি                        বসনের ভাতি
তোমার সখীর গায়॥
সন্ধ্যাকালে কালি                      উরে বনমালী
দেখিয়াছি এই বাস।
সতীকুল হৈয়া                        সে রূপে ভুলিয়া
ধরম করিলা নাশ॥

পাঠান্তর-
এই পদের 'মুখরা বচন' ইত্যাদি (পদসংখ্যা ২৭৫৮) অবশিষ্ট কলিগুলি ক ও চ পুথিতে (পদকল্পতরুর
আকর-গ্রন্থাবলী) পূর্ব্ববর্ত্তী পদের শেষাংশরূপে লিখিত হইয়াছে। বস্তুতঃ পূর্ব্বপদে ভণিতা না থাকায় ও এই
পদটি পূর্ব্বপদেরই অনুবৃত্তি হওয়ায় ইহা পূর্ব্বপদের শেষাংশ বলিয়াই বোধ হয়। কিন্তু ঘ পুথি অনুসারে
ইহাকে স্বতন্ত্র পদ গণনা না করিলে ৩১শ পল্লবের নির্দ্দিশ্ট পদ-সংখ্যা পূরণ হয় না বলিয়া আমরা অগত্যা
ইহাকে স্বতন্ত্র পদ-রূপেই গণনা করিলাম।
---সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু॥

ই পদটি ১৯০০ সালে প্রকাশিত হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-গ্রন্থ”,
১ম খণ্ড, ৪৫৯-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ বিভাষ॥

রতন-মন্দিরে, রসালস-ভরে, শয়নে আছয়ে রাই।
মুখরা-বচন, শুনিয়া তখন, বিশাখা জাগায়ে যাই॥
অতি ত্বরা ডাকি, কহে উঠ সখি, ঘুচাহ আলস কাজ।
তার বাণী শুনি, জাগিলা সুধনী, আলসে ঘুরে দিঠি-রাজ॥
রাজহংস যেন, নদীতে শয়ন, তরঙ্গে চলয়ে ঘন।
রতন পালঙ্কে, শুতিয়াছে রঙ্গে, হিলোল দু নয়ন॥
হেনকালে মণি-মঞ্জরী সুমতি, জানে অবসর কাল।
বৃন্দাবনেশ্বরী-পদযুগ ধরি, সেবন করয়ে ভাল॥
কত পরকার, করি বার বার, জাগাইল সব সখী।
উঠি ত্বরা করি, বসিলা সুন্দরী, খিতি-তলে পদ রাখি॥
হেনই সময়ে, মুখরা দেখয়ে, উঢ়ন পিয়ল বাস।
বিশাখাকে কহে, কিবা দেখি ওহে, দেখিয়া লাগয়ে ত্রাস॥
হাহা পরমাদ, বড় পরমাদ, একি পরমাদ হায়।
দ্রব-হেম-কাঁতি, বসনের ভাতি, তোমার সখীর গায়॥
সন্ধ্যাকালে কালি, উরে বনমালী, দেখিয়াছি এই বাস।
সতীকুল হৈয়া, সে রূপে ভুলিয়া, ধরম করিলা নাশ॥
মুখরা বচন, শুনিয়া তখন, বিশাখা চকিত হৈয়া।
দেখি পীতবাস, আছে রাই পাশ, একি কহে ধীর হৈয়া॥
মুখরাকে তবে, কহে শুন এবে, স্বভাবে আন্ধল তুয়া।
একে এক দেখ আনে আন লেখ নাহি কহ বিচারিয়া॥
রাইক কিরণ, দ্রব-হেম সম, পিন্ধল নীলিম বাস।
তাহাতে বিহান, রবির কিরণে, সে যে নহ পীত বাস॥
গবাক্ষ-জালেত, দেখ পরতেকে, রবির কিরণ লাগি।
ইহার কারণে, তোমার মরমে, শঙ্কা উঠে কেনে জাগি॥
শুদ্ধ সত জনে, হেন কহ কেনে, অবুধ জনার মতি।
এ যদুনন্দন, কহয়ে বিভ্রম, বড় পরমাদ অতি॥

ই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”,
২২৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ বিভাষ॥

রতন-মন্দিরে                      রসালস-ভরে
শয়নে আছয়ে রাই।
মুখরা-বচন                        শুনিয়া তখন
বিশাখা জাগায়ে যাই॥
অতি ত্বরা ডাকি                  কহে উঠ সখি
ঘুচাহ আলস-কাজ।
তার বাণী শুনি                   জাগিলা সে ধনী
গলিত বসন সাজ॥
রাজহংসী যেন                      নদীতে শয়ন
তরঙ্গে চালয়ে ঘন।
রতন-পালঙ্কে                     শুতিয়াছে রঙ্গে
হিলোলিত দুনয়ন॥
হেনকালে রতি                     মঞ্জরী সুমতি
জানে অবসর-কাল।
বৃন্দাবনেশ্বরী                        পদযুগ ধরি
সেবন করয়ে ভাল॥
কত পরকার                    করি বারেবার
জাগাইল সব সখী।
উঠি ত্বরা করি                    বসিলা সুন্দরী
খিতি-তলে পদ রাখি॥
হেনই সময়ে                      মুখরা দেখয়ে
উঢ়নি পিয়ল বাস।
বিশাখাকে কহে                 কিবা দেখি ওহে
দেখিয়া লাগয়ে ত্রাস॥
হাহা পরমাদ                        বড় পরমাদ
একি পরমাদ হায়।
দ্রব-হেমকাঁতি                      বসনের ভাতি
তোমার সখীর গায়॥
সন্ধ্যাকালে কালি                     উরে বনমালী
দেখিয়াছি এই বাস।
সতীকুল হৈয়া                      সে রূপে ভুলিয়া
ধরম করিলা নাশ॥
মুখরা-বচন                            শুনিয়া তখন
বিশাখা চকিত হৈয়া।
দেখি পীতবাস                    আছে রাই পাশ
একি কহে ধীর হৈয়া॥
মুখরাকে তবে                      কহে শুন এবে
স্বভাবে-আন্ধল তুয়া।
একে এক দেখ                      আনে আন লখ’
নাহি কহ বিচারিয়া॥
রাইক কিরণ                            দ্রব-হেম সম
পিন্ধল নীলিম বাস।
তাহাতে বিহান                        রবির কিরণে
মনে হয় পীত বাস॥
গবাক্ষ-জালেতে                        দেখ পরতেকে
রবির কিরণ লাগি।
ইহার কারণে                        তোমার মরমে
শঙ্কা উঠে কেনে জাগি॥
শুদ্ধ সত জনে                        হেন কহ কেনে
অবুধ জানার মতি।
এ যদুনন্দন                             কহয়ে বিভ্রম
বড় পরমাদ অতি॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুখরা-বচন শুনিয়া তখন
ভণিতা যদুনন্দন
কবি যদুনন্দন দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), ৪র্থ খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ,
৩১শ পল্লব, অষ্টকালীয় নিত্য-লীলায় দ্বিখণ্ডিত রূপে, ২৭৫৭ ও ২৭৫৮-পদসংখ্যা হিসেবে দেওয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে ২৭৫৮ পদের শেষে দেওয়া সতীশচন্দ্র রায়ের পাঠান্তরের ব্যাখ্যা আমরা দুটি পদেই দিলাম,
পাঠকের সুবিধার জন্য। মনে হয় সতীশচন্দ্র রায়ের, “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থটি দেখার সুযোগ হয়নি, অথবা
এই যায়গাটা তাঁর চোখ এড়িয়ে গিয়েছে।

॥ তথা রাগ॥

মুখরা-বচন                        শুনিয়া তখন
বিশাখা চকিত হৈয়া।
দেখি পীত বাস                  আছে রাই পাশ
একি কহে ধীর হৈয়া॥
মুখরাকে তবে                     কহে শুন এবে
স্বভাব আন্ধল @@@।
একে একে দেখ                   আনে আনে লখ
নাহি কহ বিচারিয়া॥
রাইর কিরণ                          দ্রব-হেম সম
পিন্ধন নীলিম বাস।
তাহাতে বিহানে                     রবির কিরণে
সে যে নহ পীত বাস॥
গবাক্ষ-জালেতে                     দেখ পরতেকে
রবির কিরণ লাগি।
ইহার কারণে                        তোমার মরমে
শঙ্কা উঠে কেনে জাগি॥
শুদ্ধ সতি জনে                      হেন কহ কেনে
অবুধ জনার মতি।
এ যদুনন্দন                            কহয়ে বিভ্রম
বড় পরমাদ অতি॥

@@@ - অপাঠ্য অক্ষর।

পাঠান্তর-
এই পদের মুখরা বচন ইত্যাদি (পদসংখ্যা ২৭৫৮) অবশিষ্ট কলিগিলি ক ও চ পুথিতে (পদকল্পতরুর আকর-
গ্রন্থাবলী) পূর্ব্ববর্ত্তী পদের শেষাংশরূপে লিখিত হইয়াছে। বস্তুতঃ পূর্ব্বপদে ভণিতা না থাকায় ও এই পদটি
পূর্ব্বপদেরই অনুবৃত্তি হওয়ায় ইহা পূর্ব্বপদের শেষাংশ বলিয়াই বোধ হয়। কিন্তু ঘ পুথি অনুসারে ইহাকে
স্বতন্ত্র পদ গণনা না করিলে ৩১শ পল্লবের নির্দ্দিশ্ট পদ-সংখ্যা পূরণ হয় না বলিয়া আমরা অগত্যা ইহাকে
স্বতন্ত্র পদ-রূপেই গণনা করিলাম।
---সতীশচন্দ্র রায়, পদকল্পতরু॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাধা স্নান বিভূষণ নানা চিত্র বিলেপন
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ২য় সর্গের পদ, ২১-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগঃ॥

রাধাস্নাত বিভূষণ, নানা চিত্র বিলেপন, ব্রজেশ্বরীর আজ্ঞার পালন।
সঙ্গে করি সখীগণ, গেলা তাহার ভবন, প্রাতে কৈল কৃষ্ণের রন্ধন॥
কৃষ্ণচন্দ্র জাগি তথা, গেলা ধেনু শালা যথা, কৈলা তাহা গো দোহন কাযে।
সঙ্গে সখাগণ মেলা, নানান কৌতুক কলা, পুনঃ আইলা স্নানবেদী মাঝে॥
তাহা কৈলা স্নান কাম, সঙ্গে নর্ম্ম সখা যান, ভোজন করয়ে রসময়।
শয়ন হইল তবে, দাসগণ পদ সেবে, নানান কৌতুক ভাব হয়॥
রাই নিজ সখী সনে, কৃষ্ণের শেষান্নাশনে, ভোজন করিলা বহু রঙ্গে।
তাহাতে বিশেষ যত, বিস্তারি কহিব কত, শ্রীগোবিন্দ লীলামৃত ছন্দে॥

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), ৪র্থ খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ,
৩২শ পল্লব, অষ্টকালীয় নিত্য-লীলা, ২৮৪৮-পদসংখ্যা। এই পদটি ভণিতাহীন হলেও, পদকল্পতরুর “পদকর্ত্তৃ-
সুচী”-তে অজ্ঞাত পদকর্ত্তৃগণের মধ্যে নেই। আছে যদুনন্দন দাসের পদাবলীর সূচীর অন্তর্গতই।

অত্র “রাধাং স্নাতবিভূষিতা” মিত্যাদি।

রাধা স্নান বিভূষণ                                নানা চিত্র বিলেপন
ব্রজেশ্বরীর আজ্ঞার পালনে।
সঙ্গে করি সখীগণ                                গেলা তাহার ভবন
প্রাতে কৈল কৃষ্ণের রন্ধনে॥
কৃষ্ণচন্দ্র জাগি তথা                            গেলা ধেনু-শালা যথা
তাহা কৈল গো-দোহন কাজ।
সঙ্গে সখাগণ মেলা                                নানান কৌতুক-কলা
পুন আইলা স্নান বেদী মাঝ॥
তাহাঁ কৈলা স্নান-কাম                            সঙ্গে প্রিয়-সখা রাম
ভোজন করিলা রসময়।
শয়ন করিলা তবে                                  দাসগণ পদ সেবে
নানান কৌতুক তাহে হয়॥
রাই নিজ সখী সনে                                কৃষ্ণের শেষান্নগণে
ভোজন করিলা বহু রঙ্গে।
তাহাতে বিশেষ যত                             বিস্তারি কহিব কত
শ্রীগোবিন্দ-লীলামৃত-ছন্দে॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তবে রাই সখী মেলা বিমনে গৃহেরে গেলা
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ১৯শ সর্গের পদ, ২২৫-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগঃ॥

তবে রাই সখী মেলা, বিমনা গৃহেরে আইলা, উপহার কৈলা কৃষ্ণ লাগি।
অপরাহ্ণে স্নান কৈলা, অঙ্গ বেশ বনাইলা, কৃষ্ণ মুখ দেখি গেল আসি॥
পরম আনন্দ ভরে, বনপথ নাহি হেরে, আগুবাঢ়ি দেখিলা গোবিন্দে।
নয়নে নিমিষ পড়ে, তাহে বিধি নিন্দা করে, এইরূপে বাঢ়িল আনন্দে॥
কৃষ্ণ অপরাহ্ন কালে, ধেনু মিত্র লৈয়া চলে, ব্রজবাসী করিবারে সুখী।
সখা সঙ্গে নানা রঙ্গ, নানাবিধ কথা ছন্দ, শৃঙ্গ বেণু সাজে পাখা শিখি॥
রাধিকার মুখ দেখি, আনন্দে ভরল আঁখি, অতি তৃপ্ত হৈয়া গেল মনে।
পিতা আদি গুরুজনে, কৈল বহু লালনে, অনেক ললিতা মাতা গণে॥
এই অপরাহ্ন লীলা, সূত্র অতি মনোহরা, স্মরণ করিয়ে হিয়া মাঝে।
ইহার বিস্তার কহি, সঙ্ক্ষেপার্থ রসময়ী, কহিতে না উঠে শঙ্কা লাজে॥

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ (১৯২৭), ৪র্থ খণ্ড, ৪র্থ শাখা - ২য় ভাগ,
৩২শ পল্লব, অষ্টকালীয় নিত্য-লীলা, ২৮৬৭-পদসংখ্যায় এইরূপে “যদুনন্দন” ভণিতা সহ দেওয়া রয়েছে।

॥ পুনশ্চ॥

তবে রাই সখী মেলা                                বিমনে গৃহেরে গেলা
উপহার কৈলা কৃষ্ণ লাগি।
অপরাহ্নে স্নান কৈলা                                অঙ্গে বেশ বনাইলা
কৃষ্ণ দেখিবারে অনুরাগী॥
পরম-আনন্দ-ভরে                                        বন-পথ নেহারে
আগুবাঢ়ি দেখিলা গোবিন্দ।
নয়ানে নিমিষ পড়ে                              তাহে বিধি নিন্দা করে
এইরূপে বাঢ়িল আনন্দ॥
কৃষ্ণ অপরাহ্ণ-কালে                                ধেনু মিত্র লৈয়া চলে
ব্রজ-বাসী করিবারে সুখী।
সখা সঙ্গে নানা রঙ্গে                                  কতবিধ কথা-ছন্দে
শৃঙ্গ বেণু সঙ্গে পাখা-শিখী॥
রাধিকার মুখ দেখি                                 আনন্দে তরল আঁখি
অতি তৃপ্ত হৈয়া গেল মনে।
পিতা মাতা গুরুগণে                                     কৈল বহু লালনে
কহে দাস এ যদুনন্দনে॥

ই পদটি ১৯০০ সালে প্রকাশিত হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-গ্রন্থ”,
১ম খণ্ড, ৪৬১-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পুনশ্চ॥

তবে রাই সখী মেলা, বিমনে গৃহেতে গেলা, উপহার কৈলা কৃষ্ণ লাগি।
অপরাহ্নে স্নান কৈলা, অঙ্গে বেশ বনাইলা, কৃষ্ণ দেখিবারে অনুরাগী॥
পরম-আনন্দ-ভরে, বন-পথ নেহারে, আগুবাড়ি দেখিলা গোবিন্দ।
নয়ানে নিমিষ পড়ে, তাহে বিধি নিন্দা করে, এইরূপে বাঢ়িল আনন্দ॥
কৃষ্ণ অপরাহ্ণকালে, ধেনু মিত্র লৈয়া চলে, ব্রজবাসী করিবারে সুখী।
সখা সঙ্গে নানা রঙ্গে, কতবিধ কথা-ছন্দে, শৃঙ্গ বেণু সঙ্গে পাখা শিখী॥
রাধিকার মুখ দেখি, আনন্দে তরল আঁখি, অতি তৃপ্ত হৈয়া গেল মনে।
পিতা মাতা গুরুগণে, কৈল বহু লালনে, বহে১ দাস এ যদুনন্দনে॥

১ - “বহে” - সম্ভবত “কহে” হবে। মুদ্রণ প্রমাদ।

ই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”,
২২৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ তথারাগ॥

তবে রাই সখী মেলা                              বিমনা গুহেতে১ গেলা
উপহার কৈলা কৃষ্ণ লাগি।
অপরাহ্নে স্নান কৈলা                                অঙ্গে বেশ বনাইলা
কৃষ্ণ দেখিবারে অনুরাগী॥
পরম আনন্দভরে                                         বন-পথ নেহারে
আগুবাঢ়ি দেখিলা গোবিন্দ।
নয়ানে নিমিষ পড়ে                                তাহে বিধি নিন্দা করে
এইরূপে বাঢ়িল আনন্দ॥
কৃষ্ণ অপরাহ্ণকালে                                  ধেনু মিত্র লৈয়া চলে
ব্রজবাসী করিবারে সুখী।
সখা সঙ্গে নানা রঙ্গে                                   কত বিধ কথাছন্দে
শৃঙ্গ বেণু শিরে পাখাশিখী॥
রাধিকার মুখ দেখি                                  আনন্দে তরল আঁখি
অতি তৃপ্ত হৈয়া গেল মনে।
পিতা মাতা গুরুগণে                                     কৈল বহু লালনে
কহে দাস এ যদুনন্দনে॥

১ - সম্ভত “গৃহেতে” হবে। মুদ্রণ প্রমাদ।

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বন্দো গুরু পদতল চিন্তামণিময় স্থল
ভণিতা যদুনন্দন
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ১ম সর্গের পদ, ৩-পৃষ্ঠা । কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২
খৃষ্টাব্দে মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে
প্রাপ্তি স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগঃ॥

বন্দো গুরু পদতল, চিন্তামণিময় স্থল, সর্ব্ব গিণ খনি দয়ানিধি।
আচার্য্য প্রভুর সুতা, নাম শ্রীল হেমলতা, তাঁহার চরণে সর্ব্বসিদ্ধি॥
অগেয়ান অন্ধকারে, পতন দেখিয়া মোরে, জ্ঞানাঞ্জন দিলা দয়াকরি।
তাঁহার করুণা হৈতে, নেত্র হৈল প্রকাশিতে, দূরে গেল অন্ধকারাবলি॥
বন্দো শ্রীআচার্য্য প্রভু, আমার প্রভুর প্রভু, তাঁর পদে কোটি পরণাম।
বন্দো গোপাল ভট্ট নাম, রাধাকৃষ্ণ প্রেমধাম, পরাপর গুরু কৃপাধাম॥
বন্দো প্রভু গৌরচন্দ্র, সকল আনন্দ কন্দ, পরমেষ্টি গুরু তিঁহ হয়।
যেঁহো কৃষ্ণ প্রেমবন্যা, দিয়া কৈল ক্ষিতি ধন্যা, অনন্ত প্রণতি তাঁর পায়॥
বন্দো তাঁর ভক্তগণ, তাঁর গুণ অনুক্ষণ, রোদন মিশালে যেই গায়।
না জানয়ে নিশি দিশি, গৌর প্রেমরসে ভাসি, কল্পতরু সম কৃপাময়॥
বন্দো নিত্যানন্দ রায়, দৌর প্রেম যার গায়, অনেক প্রণাম করি তাঁরে।
বন্দো তাঁর ভক্ত ততি, সদয় হৃদয় অতি, প্রেমের সাগরে যেঁহো তারে॥
আচার্য্য পায়, প্রণাম করিয়ে তায়, গৌরচন্দ্র বিনু স্মৃতি নাই।
বন্দো তাঁর ভক্ত যত, যে লয় আচার্য্য মত, যাতে হৈতে গৌরচন্দ্র পাই॥
বন্দো রূপ সনাতন, সর্ব্বদা বিহ্বল মন, রাধাকৃষ্ণ লীলারস রঙ্গে।
বহু শাস্ত্রগণ আনি, প্রকাশিল সার জানি, রাধাকৃষ্ণ প্রেমের তরঙ্গে॥
বন্দ ভট্ট রঘুনাথ, বন্দ দাস রঘুনাথ, বন্দ আর শ্রীজীব গোসাঞি।
বন্দ রায় রামানন্দ, গদাধর প্রেম কন্দ, বন্দ আর স্বরূপ গোসাঞি॥
বন্দ শ্রীমুকুন্দ দাস, বন্দ নরহরি দাস, বন্দ আর শ্রীরঘুনন্দন।
শ্রীখণ্ডেতে যার বাস, গৌর প্রেম সুখোল্লাস, যার শীল ভুবন বন্দন॥
ঠাকুর পণ্ডিত পায়, বন্দনা করহোঁ তায়, সদা রহে প্রেমানন্দপূর।
দৌরাঙ্গ জীবন যার, কে কহিবে গুণ তাঁর, য়ার নামে পাপ যায় দূর॥
বর্ণিতে বিলম্ব হয়, গ্রন্থ বাঢ়ে অতিশয়, না জানিয়ে বন্দনার ক্রম।
আপন পবিত্র কাজে, নাম গাই গ্রন্থ মাঝে, নাশাইতে মনে বিভ্রম॥
সকল বৈষ্ণবগণ, দৃশ্যাদৃশ্য যত জন, সবার চরণ ধূলী যত।
আপন মস্তকে করি, হরষিত হৈয়া ধরি, প্রত্যেকে বন্দি আর কত॥
আচার্য্য প্রভুর গণ, পরিবার যত জন, প্রণমহ সবার চরণে।
আমি অতি সুপামর, মোরে কৃপা দৃষ্টি কর, দন্তে তৃণ করোঁ নিবেদনে॥
পাতিত তারণ কাযে, সবে আইলা ক্ষিতি মাঝে, সবে হয় দয়ার সাগর।
সংসার সাগরানলে, পড়িয়া কাকুতি করে, এ যদুনন্দনে পার কর॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তবে কৃষ্ণ উঠি বৈসে মৃদু মন্দ মন্দ হাসে
ভণিতা যদুনন্দন দাস
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ১ম সর্গের পদ, ১৩-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগ॥ ত্রিপদী॥

তবে কৃষ্ণ উঠি বৈসে, মৃদু মন্দ মন্দ হাসে, করি নিজ বাহু প্রসারণে।
রাইরে আনিয়া কোলে, আঁখিভরে হর্ষজলে, মাধুরী দেখয়ে দুনয়নে॥
সখি হে দেখ রাধা মাধব পিরিতি।
সব রাত্রি বিহরিলা, তথাপি তৃষিত ভেলা, প্রতিক্ষণ নবীন আরতি॥ ধ্রু॥
ছলে রাই নিদ্রা যায়, চক্ষু নাহি প্রকাশয়, জাগিয়া আছয়ে অনুমানি।
কৃষ্ণ নিরীক্ষয়ে শোভা, সঘন নয়ন লোভা, ধনী চক্ষু প্রকাশে তখনি॥
প্রভাত কমল পারা, মুখপদ্ম মনোহরা, তাতে চক্ষু খঞ্জন যুগল।
তাহাতে ঘূর্ণায় মান, রসের অলস কাম, অলিকে অলকা ভৃঙ্গচল॥
কৃষ্ণচন্দ্র তাহা দেখি, দিয়া আপনার আঁখি, ভ্রমর যুগল মত্তরাজ।
পান করে মুখ শোভা, মকরন্দ মনোলোভা, অতিশয় সতৃষ্ণার কায॥
তবে রাই উঠি বৈসে, বাহু দুই পরকাশে, অঙ্গুলী মোড়িয়া অঙ্গ মোড়ে।
বদনে উঠয়ে হাই, দশন কিরণ ছাই, দেখি কৃষ্ণ হরিষ বিহ্বলে॥
তবে পুনঃ কৃষ্ণচন্দ্র, হাসে মৃদু মন্দ মন্দ, রাই লঞা আপনার কোলে।
উত্তান শয়নে রাখি, দেখে শোভা দিয়া আঁখি, নিমগন আনন্দ হিল্লোলে॥
রাই মিথ্যা করি কান্দে, হাসে মৃদু মন্দ ছান্দে, কেশ অর্দ্ধ খশে অগ্রভাগে।
বিমর্দ্দিত পুষ্পমালা, চন্দন কুঙ্কুম ধূলা, মণিহার ছিণ্ডি রহে অঙ্গে॥
অলসে ঘূর্ণন আঁখি, মিলি ক্ষণে মৃদু দেখি, এই মত বদন সুসমা।
একে কেলি শ্রান্ত অঙ্গ, তাহাতে লাবণি ভঙ্গ, দেখি কৃষ্ণ আঁখি নাহি ক্ষমা॥
স্বর্ণপদ্ম জিনি অঙ্গ, আছে কৃষ্ণ অঙ্গ সঙ্গ, সুরত অলস ভেল তায়।
নবীন তমাল জিনি, কৃষ্ণ অঙ্গ সুসাজনি, তাহে রাই স্বর্ণলভা প্রায়॥
দামিনী জলদে যদি, স্থির রহে নিরবধি, তবে রাধাকৃষ্ণের সুসমা।
বেকত করিয়া কহি, দিতে আর স্থান নাহি, তবে সে কহিয়ে সেই সমা॥
মকর কুণ্ল দোলে, কৃষ্ণের শ্রবণ মূলে, ঢর ঢর গণ্ডের লাবণি।
মুখে মৃদু মন্দ হাসি, উগরে অমিয়া রাশি, মদালসে নয়ন সোহনি॥
ললাটে অলকা লোক, যেন ভৃঙ্গ পাঁতি ভোল, মুখপদ্ম শোভা মধুপানে।
মুখ দশনেতে খত, অঞ্জনে মলিন মত, ওষ্ঠাধর ভৈগেল রঞ্জনে॥
এইরূপে কৃষ্ণের মুখ, দেখি ধনি পাইল সুখ, পুনঃ উনমনা বিলসিতে।
নয়নে নয়নে দুহু, অবলোক লহু লহু, লজ্জা পাঞা করিল কুঞ্চিতে॥
তাহাতে ঈষৎ হাসি, দেখি রাই মুশশী, গোবিন্দের অতি তৃষ্ণা হৈল।
পুনঃ বিলাসের লাগি, মনে মনমথ জাগি, তাহে তাহা আরম্ভ করিল॥
নিজ বামহস্ত তলে, ধরে রাই বেণী মূলে, চিবুক ধরয়ে অন্য করে।
রাই হাস্য গণ্ড শোভা, দেখি কৃষ্ণ হঞা লোভা, হাসি হাসি চুম্বয়ে কপোলে॥
কৃষ্ণাধরস পরশ, কেবল অমিয়া রস, পাইয়া আনন্দ সিন্ধু মাঝে।
মগন হইল ধনী, ঢুলায় সঘন পাণি, অলস কুঞ্চিত চক্ষুলাজে॥
নহি নহি কহে ধনী, আনন্দে গদ্গদা বাণী, মুচকি মুচকি হাসে তায়।
দেখিয়া সখির আঁখি, হইল পরম সুখী, এ যদুনন্দন দাসে গায়॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দেখিয়া রাধিকা বুক কুন্দলতা পায় সুখ
ভণিতা যদুনন্দন দাস
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ৩য় সর্গের পদ, ৩৭-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগঃ॥

দেখিয়া রাধিকা বুক, কুন্দলতা পায় সুখ, পরিহাস করিতে লাগিলা।
চিরদিন তুয়া প্রতি, গোষ্ঠেতে গমন সতী, নকচিহ্ন কেবা বুকে দিলা॥
তুহু ধনি সতী কুলনারী।
অন্তর সহিতে হাস, সদা গদ গদ ভাষ, সব চিহ্ন ভোগচিহ্ন ধারি॥ ধ্রু॥
অধর হঞাছে ক্ষত, সাধ্বী হঞা এ চরিত, দেখি মনে লাগয়ে তরাস।
শুনি কুন্দলতা বাণী, হরষিত হইলা ধনী, কুঞ্চিত নয়ন মৃদু হাস॥
ললিতা কহয়ে শুন, কারণ আছয়ে পুনঃ, কাহে কহ সন্দেহ বিচারি।
করক ফলের ভ্রমে, রাধিকা যুগল স্তনে, বৈসে কীর নখাঙ্ক তাহারি॥
অধর বান্ধুলী শোভা, দেখি কীর হৈল লোভা, বিম্বভ্রমে দশনে দংশিল।
তাহার আছয়ে চিহ্ন, সন্দেহ না কর ভিন্ন, সেই সে কারণে ক্ষত হৈল॥
শুনিয়া রাধা দুহু বাণী, কৃষ্ণ লীলা মনে আনি, কম্প হৈল সুখময় অঙ্গে।
পুনঃ কুন্দলতা হাসে, রসময় পরকাশে, কহে বাক্য আনন্দ করঙ্গে॥
কুন্দলতার দেবর, মধুসূদন নাম ধর, শুন পদমিনী মধু পিল।
পুনঃ আসিবেন এথা, শুনহ আমার কথা, বৃথা কম্প তোহে কেন ভেল॥
পদ্মা কহে পদ্মছলে, এমতি রাইরে বোলে, শুনি চিত্তে আনন্দ বাঢ়য়।
কহয়ে ললিতা তবে, শুন কুন্দলতা এবে, এলাগি পদ্মিনী কম্প নয়॥
সৎ পদ্মিনী মৃদু অতি, ভ্রমরা উন্মত্ত মতি, চঞ্চল দেখিয়া তনু কাঁপে।
মিত্রে অনুরাগ সদা, জানিয়া তাহাতে রাধা, এ যদুনন্দন মনে জপে॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাই কহে শুন সখী সাক্ষাতে কি রূপ দেখি
ভণিতা যদুনন্দন দাস
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ৮ম সর্গের পদ, ৯৬-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ পুনর্যথা রাগ॥

রাই কহে শুন সখী সাক্ষাতে কি রূপ দেখি, সত্য কৃষ্ণ কহ সব মোর।
নবীন তমাল কিবা, নবীন জলদ কিবা, কিবা ইন্দ্র নীলমণিবর॥ ধ্রু॥
সখীহে দরশনে জুড়ায় নয়ন।
রূপ নহে রসসিন্ধু, ইহার তরঙ্গ বিন্দু, ডুবায় ভুবন নারী প্রাণ॥
অঞ্জন শিখর কিবা, মত্ত ভৃঙ্গপুঞ্জ কিবা, যমুনা হইলা মূর্ত্তিবতী।
ইন্দীবর পুঞ্জ কিবা, ব্রজ স্ত্রী অপাঙ্গ কিবা, কিবা দেখি মোর প্রাণপতি॥
কিবা এ মন্মথরাজ, তাহার অতনুসাজ, কিবা এই রসরাজ রাজ।
সেহো হয় তনু হীন, এহো রহে পরবীণ, বুঝিতে না পারি কোন কায॥
কিবা রস সুধানিধি, সব রস সুখাবধি, তার হয়ে বিথার অপারে।
কিবা প্রেমামর তরু, প্রতি অঙ্গে প্রেম ঝরু, সেহো থির চলিবারে নারে॥
মোর নেত্র ভৃঙ্গ পদ্ম, কি কানিতি আনন্দ সদ্ম, কিবা স্ফূর্ত্তি কহত নিশ্চয়।
পুছিতে গদ্গদ বাণী, পুলকিতা অঙ্গ ধনী, এ যদুনন্দন দাস গায়॥

ই পদটি ১৯৩১-১৯৫৫ সময়কালে প্রকাশিত নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ড, ২৬৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

শ্রীশ্রীরাধাকুণ্ড মিলন।
॥ সারঙ্গ - দুঠুকী॥

রাই কহে শুন সখী,                          সাক্ষাতে কি রূপ দেখি,
সত্য করি কহ সব মোরে।
নবীন তমাল কিবা,                               নবীন জলদ কিবা,
কিবা ইন্দ্র নীলমণি বরে॥
সখীহে দরশনে জুড়ায় নয়ান।
রূপ নহে রসসিন্ধু,                                ইহার তরঙ্গ-বিন্দু,
ডুবায় ভুবন-নারী প্রাণ॥ ধ্রু॥
অঞ্জন শিখরি কিবা,                              মত্ত ভৃঙ্গপুঞ্জ কিবা,
যমুনা আইলা মূর্ত্তিমতী।
ইন্দীবর-পুঞ্জ কিবা,                             ব্রজস্ত্রী-অপাঙ্গ কিবা,
কিবা দেখি মোর প্রাণপতি॥
কিবা রস সুধানিধি,                                সব রস সুখাবধি,
তার হয় বিথার অপারে।
কিবা সে প্রেমার তরু,                          প্রতি অঙ্গে প্রেম ঝরু,
সেহো থির চলিবারে নারে॥
কিবা মনমথরাজ,                                তাহার অতনু সাজ,
কিবা ইহ রসরাজ রাজে।
সেহ হয় তনুহীন,                                   ইহো রস পরবীণ,
বুঝিতে না পারি কোন কাজে॥
মোর নেত্র ভৃঙ্গ পদ্ম,                         কি কানিতি আনন্দ সদ্ম,
কিবা স্ফূর্ত্তি কহত নিশ্চয়।
কহিতে গদ গদ বাণী,                                পুলকিত-অঙ্গ ধনি,
এ যদুনন্দন দাসে গায়॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কুঙ্কুম সৌরভ জিনি রাধা প্রতি অঙ্গ গণি
ভণিতা যদুনন্দন দাস
কবি যদুনন্দন দাস
পঞ্চদশ শতকে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের সংস্কৃতে রচিত “গোবিন্দ লীলামৃত” গ্রন্থের, ষোড়শ শতকে, যদুনন্দন
দাস কৃত বঙ্গানুবাদের ১১শ সর্গের পদ, ১৩৭-পৃষ্ঠা। কলকাতা থেকে ১৭৭৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দে
মুদ্রিত গ্রন্থ থেকে আমরা এই পদটি পেয়েছি। প্রকাশকের নাম জানা যায় না, কিন্তু গ্রন্থের শেষে প্রাপ্তি
স্থানের উল্লেখে রয়েছে - “বটতলার উত্তরাংশে ৯নং দোকান অথবা আহিরীটোলা ৯নং বাটী”।

॥ যথা রাগঃ॥

কুঙ্কুম সৌরভ জিনি, রাধা প্রতি অঙ্গ গণি, যেই দন্ধের লবে মাতে হরি।
নাভি ভ্রুকেশ আঁখি, মৃগমদা গুরুমাখি, নীলোত্পল গন্ধরাজ ভরি॥
বক্ষ কর্ণ নাসা মুখ, কর পদ গন্ধ সুখ, অম্বুজ কর্পূর গন্ধ আদি।
কক্ষ নখ শ্রেণী দেশ, নিন্দিয়া সৌরভাবেশ, মলয়জ কেতকীতে সাধি॥
কৃষ্ণের ইন্দ্রিয়গণ, করাইতে আহ্লাদন, শ্রীরাধিকা গুণের উদারে।
রাধা তেই সব গুণ, যে নহে অলপ ঊন, রাধা তেই গুণের বিস্তারে॥
যতেক উপমা বলি, আছে সব সখীতে ভরি, মর্দ্দন কৈল শ্রীরাধার অঙ্গ।
রাধার মাধুরী হেরি, অন্যান্য উল্লাস হেরি, রহে তনু মাধুর্য্য তরঙ্গ॥
প্রেমের প্রমাণ নাহি, গুণে অনুপম তাহি, অসমোদ্ধ সৌন্দর্য্য রুচিশীল।
তারুণ্য অদভুততম, অন্যে নাহি রাধা সম, যে রসে ভুলিল কৃষ্ণ ধীর॥
কোথা রাধা পতিব্রতা, ভুবনে বখানে কথা, কোথা পর বধূ অপবাদে।
কোথা প্রেমাদ্রকময়ী, কোথা পরবশ রহি, বিষ্ম শঙ্কা আছে পরমাদে॥
কোথা উত্কণ্ঠিতা ধনী, কোথা কৃষ্ণ গুণ মণি, নিত্যসঙ্গ অলব্ধ বিশেষ।
এই তিন শুন হিয়া, মূলের সহিত গিয়া, কাটে মোর না পাই উদ্দেশ॥
পত্ব্রতা সার আর, প্রেমোদ্রেক পরকার, উত্কণ্ঠিতা কৃষ্ণ লাগি যত।
গুণ গায় সব সখী, পরবধূ পূষ্ট লেখি, এ যদুনন্দন দাস গায়॥

.                        *************************                         
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর