কবি যদুনাথ দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
যদুনাথের ভ্রমরগীত
( ভূমিকা )
ভ্রমরগীত নিয়ে বিমান বিহারী মজুমদার তাঁর “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য” সংকলনে লিখেছেন . . .
এই ভ্রমরগীত শ্রীমদ্ভাগবতের ভ্রমরগীতার অনুবাদ নহে।---ভাবানুবাদও নহে। ইহা কবির স্বাধীন রচনা।
ইহার বৈশিষ্ট্য হইতেছে এই যে, গোপীদের বিরহ-দুঃখের সঙ্গে সঙ্গে নন্দ যশোদার অপরিসীম
ক্লেশের কথাও ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে। ভাগবতের সঙ্গে ইহার এইটুকু মাত্র মিল যে, গোপীরা একটি
ভ্রমরকে নূতন নূতন ফুলের প্রতি তাহার অনুরাগ দেখিয়া কৃষ্ণস্মৃতিতে নিজেদের ভাব ব্যক্ত করিতেছেন।

নীচে, এই পাতাতেই প্রাপ্ত সব গীত তোলা হয়েছে।

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   
*
খল রে ভ্রমর তুমি
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনাথ দাসের ভ্রমরগীত
১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫০৬-
৫১১পৃষ্ঠায় যদুনাথ দাসের “ভ্রমরগীত”-এর এই পদটি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ভ্রমরগীত ১

খল রে ভ্রমর তুমি                        নিবেদন করি আমি
হেন দিন কবে হবে আর।
মধুপুর তুচ্ছ করি                        পিয়া হবে আগুসরি
সভে মিলি দিব জোকার॥
গোবিন্দ আসিব দেশে                     চরণ মোছাব কেশে
আলিপন দিব উপহার।
ধূপ দীপ নৈবেদ্য করি                        অধর সমুখে ধরি
কত ঘট করিব কুচভার॥
নব নব সখি সঙ্গে                           গুণ যশ যাঁর রঙ্গে
ঘন ঘন দিব হুলাহুলি।
দেখি পিয়ার চাঁন্দ মুখ                        পাসরিব সব দুখ
আলিঙ্গন দিব ভুজ তুলি॥
নয়নের নীর দিয়া                          অভিষেক করাইয়া
নিজ দেহ করিব নিছনি।
বসি পিয়ার বাম পাশে                     করিব কটাক্ষ হাসে
রসাবেশ হবে গুণমণি॥
দুই কর জোড় করি                           বসন গলায় ধরি
মিনতি করিব পিয়া আগে।
মনে যত দুখ আছে                        কহিব পিয়ার কাছে
শুনি তাহা বিয়াজে না হয়॥
হিয়ার মাঝারে করি                        বান্ধিয়া রাখিব হরি
যাইতে না দিব পুনর্ব্বার।
তবে যদি যাবে হরি                        যমুনা প্রবেশ করি
ত্যজিব দেহ আপনার॥

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃন্দাবনে তরু লতা
ভণিতা যদুনাথ দাস
কবি যদুনাথ দাসের ভ্রমরগীত
১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫০৬-
৫১১পৃষ্ঠায় যদুনাথ দাসের “ভ্রমরগীত”-এর এই পদটি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ভ্রমরগীত ২

বৃন্দাবনে তরু লতা                           শুখাইল সন্তপিতা
দাবানলে পোড়ে যেন গাও।
পশু পক্ষী দুঃখ পায়                         এণ জল নাহি খায়
নাহি বহে সুশীতল বাও॥
মূর্চ্ছিত সকল জন                        কান্দে হইয়া অচেতন
দিবা নিশি নাহি জানে আর।
সূর্য্য লুকাইল ডরে                        পাছে গোপীগণ মরে
কৃষ্ণ বিনে দিন অন্ধকার॥
অকালত বজ্র পড়ি                        প্রাণনাথ গেল ছাড়ি
কেমনে রহিব আর ঘরে।
সদায় আকুল প্রাণ                        অন্তরে জাগয়ে শ্যাম
এ দুঃখ বলিব কার তরে॥
কৃষ্ণের সঙ্গিয়া তুমি                       এহা নিবেদিয়ে আমি
কৃপা করি করহ আরতি।
এ দুঃখ বোলহ যাইয়া                     শ্যামের মথুরা ধাইয়া
বনবাসী হৈল কুলবতী॥
তার সঙ্গে প্রীত করি                      এ গোপ আহিরী নারী
কুল শীল সকলি তেজিয়া।
শুধাইবে যত্ন করি                             কিসে ছাড়িল হরি
দেখা দেহ বারেক আসিয়া॥
যেখানে যে কৈল লীলা                      বালকের সঙ্গে খেলা
তাহা দেখি ফেরে গোপীগণ।
যেই তারে পড়ে মনে                     চিত্তে ধৈর্য্য নাহি মানে
হেন বুঝু হারাব জীবন॥
না আইসে শরত শশী                       যথা তথা রহে বসি
পিয়া বিনে অন্য নাহি মনে।
দারুণ পিরিতি করি                         বধিলা আহীর নারী
অপযশ হবে ত্রিভূবনে॥
মলিন বদন-শশী                         কিবা দিবা কিবা নিশি
ফেরে সবে আকুল হইয়া।
কেনে নিদারুণ হৈলে                         গোপীগণ পাসরিলে
সুখে আছে মথুরা যাইয়া॥
পিরিতে ছাড়িলাঞ ঘর                        তনু হৈল জরজর
গুমরি গুমরি উঠে মনে।
বিধি কৈলা অবলা                        তাহে সে এতেক জ্বালা
দাস যদুনাথ গুণ গানে॥

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শুন শুন মধুকর
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনাথ দাসের ভ্রমরগীত
১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫০৬-
৫১১পৃষ্ঠায় যদুনাথ দাসের “ভ্রমরগীত”-এর এই পদটি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ভ্রমরগীত ৩

শুন শুন মধুকর গোপীর করুণা।
প্রাণনাথ বিনে শূন্য হইল যমুনা॥
কোথা হনে ব্রজে আইল দারুণ অক্রূর।
ছাড়ি গেল প্রাণনাথ নিদয়া নিঠুর॥
আরে আরে বিধাতা তুমি ভালে দেবরাজ।
কি করিলে নষ্ট কৈলে দেবের সমাজ॥
এক তিল যারে না দেখিলে প্রাণ যায়।
কি মতে বিচ্ছেদ তার সহিব হৃদয়॥
বিধি নিদারণ বড় দয়া নাহি তারে।
সজীব থাকিতে প্রাণ দহিল আমারে॥
কি কারণে লোকে তারে কহে যুবরাজ।
কৃষ্ণচক্ষু হরিলে, চক্ষুর কিবা কাজ॥
আরে রে অক্রূর তুমি ক্রূর দুরাচার।
হরি লৈলা প্রাণ, এহি তোর ব্যবহার॥
কংসরাজ তোমার বুঝয়ে ভাল মর্ম্ম।
নিষ্ঠুর দেখিয়া নিয়োজিল দূতকর্ম্ম॥
মথুরা নাগরীগণের হইল সুমঙ্গল।
কৃষ্ণের দেখিবে তারা বদনমণ্ডল॥
কিবা পুণ্য কৈল মধুপুরবাসী লোকে।
গোকুলনিবাসী লোক মরিবেক শোকে॥
বিধাতা নিঠুর কিবা লিখিল কপালে।
কিবা অপরাধে আমা ছাড়িল গোপালে॥
এহি মতে গোপীগণ করয়ে ক্রন্দন।
কৃষ্ণের বিচ্ছেদে কান্দে যত পুরজন॥

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোপীর ক্রন্দন শুনি
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনাথ দাসের ভ্রমরগীত
১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫০৬-
৫১১পৃষ্ঠায় যদুনাথ দাসের “ভ্রমরগীত”-এর এই পদটি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ভ্রমরগীত ৪

গোপীর ক্রন্দন শুনি কান্দে নন্দরাণী।
পুত্রশোকে টলমল লোটায় ধরণী॥
আহা রাম কৃষ্ণ বাপু আমাকে ছাড়িলে।
নিশ্চিত হইয়া পুত্র মথুরা রহিলে॥
মা বলিয়া কে ডাকিবে কে মাঙ্গিবে ননী।
কে আর সমুখে রৈয়া বলিবে জননী॥
মুরলীর ধ্বনি আর কর্ণে না শুনিব।
আইস রাম কৃষ্ণ বলি কাহারে ডাকিব॥
কাহারে বলিব আর রাখ গিয়া ধেনু।
কি দোষে ছাড়িয়া মোরে গেল রাম কানু॥
পূর্ণিমার চন্দ্র মুখ না দেখিব আর।
সুন্দর চন্দ্রিকা সখি গলে গুঞ্জাহার॥
শূন্য হইল রতনমন্দির শয্যাঘর।
আজ হৈতে শূন্য হৈল গোকুল নগর॥
নগরের লোকে বলে কৃষ্ণ বড় চোর।
কেহ বোলে কৃষ্ণ ঘরে সাম্ভাইল মোর॥
সকলের পরিবাদ গেল আজি হৈতে।
কংসের আদেশে পুত্র গেল মথুরাতে॥

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ওরে রে মদন তুমি
ভণিতাহীন পদ
কবি যদুনাথ দাসের ভ্রমরগীত
১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫০৬-
৫১১পৃষ্ঠায় যদুনাথ দাসের “ভ্রমরগীত”-এর এই পদটি এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ভ্রমরগীত ৫

ওরে রে মদন তুমি বিজয়া সংসারে।
তোমার বিষম বাণ কে সহিতে পারে॥
আমাকে মারিয়া কৃষ্ণ গেল মধুপুরী।
মরাকে মারিয়া তোক কিসের চাতুরি॥
দন্তে তৃণ ধরিয়া করিয়ে নিবেদন।
না মার মদন অনাথিনী গোপীগণ॥
এতেক বলিয়া হৈল কৃষ্ণ-উন্মাদ।
ভূমিতে পড়িয়া গোপী করয়ে বিষাদ॥
অতি সুশীতল বহে মলয় পবন।
তাহার পরশে পুন পাইল চেতন॥
চৈতন্য পাইয়া অতি কুপিত হইয়া।
পবনের তরে কিছু বলেন গর্জ্জিয়া॥
শুন রে পবন তুমি পরম চঞ্চল।
তুমি কি করিতে পার আমাকে শীতল॥
আমাকে ছাড়িয়া কৃষ্ণ গেল মধুপুরে।
বিরহব্যথায় প্রাণ নিরবধি ঝুরে॥
তাহাতে আমার শত্রু হইল মদন।
কৃষ্ণ বিনে তাহারে কে কহিবে নিবারণ॥
কেন হেন থাকে কৃষ্ণ আমিয়া মিলায়।
তবে আমা সকলের দুঃখ দূর যায়॥
কোথা গেলে পাব আর নন্দের নন্দন।
তবে জুড়াইবে অনাথিনী গোপীগণ॥
এতেক বলিতে হৃদে কৃষ্ণস্ফূর্ত্তি হৈল।
হা হা কৃষ্ণ বলি গোপী ভূমিতে পড়িল॥
সে হেন সুন্দর রূপ না দেখিব আর।
সখা সখী সঙ্গে কেবা করিবে বিহার॥
কুঞ্জ মধ্যে আর না করিব বিলাসন।
পুলিনে যাইয়া না দেখিব বৃন্দাবন॥
বিরহে ব্যাকুল হইয়া কৃষ্ণগুণ গায়।
গুরুজন গঞ্জন মনেতে নাহি ভায়॥
---                ---                ---
শ্রীরাধা-গোবিন্দ-পদ মনে করি আশ।
মাথুর বর্ণন কহে যদুনাথ দাস॥

.        *************************        
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর