কবি কবিবল্লভের বৈষ্ণব পদাবলী
*
সখি হে কি পুছসি অনুভব মোয়
কবি কবিবল্লভ
আনুমানিক ১৭৫০ সালে বৈষ্ণবদাস ( গোকুলানন্দ সেন ) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত
শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের, সটীক সংস্করণ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ (১৯১৮), দ্বিতীয় খণ্ড, তৃতীয় শাখা-দ্বিতীয় ভাগ, ১১শ
পল্লব, আক্ষেপানুরাগ, পদসংখ্যা ৯৩৭। এই পদটি হুবহু একই রূপে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত বিমানবিহারী
মজুমদার সম্পাদিত পাঁচশত বত্সরের পদাবলী ১৪১০-১৯১০,  পদসংখ্যা ১২৬ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছে।


রসোদ্গারান্তে অনুরাগঃ।

॥ ধানশী॥

সখি হে কি পুছসি অনুভব মোয়।
সোই পিরিতি অনু-                                রাগ বাখানিয়ে
অনুখণ নৌতুন হোয়॥ ধ্রু॥
জনম অবধি হৈতে                                ও রূপ নেহারলুঁ
নয়ন না তিরপিত ভেলা।
লাখ লাখ যুগ হাম                           হিয়ে হিয়ে মুখে মুখে
হৃদয় জুড়ন নাহি গেলা॥
বচন-অমিয়া-রস                                     অনুখণ শূনলুঁ
শ্রুতি-পথে পরশ না ভেলি।
কত মধু-যামিনি                                 রভসে গোঙায়লুঁ
না বুঝলুঁ কৈছন কেলি॥
কত বিদগধ জন                                    রস অনুমোদই
অনুভব কাহু না পেখি।
কহ কবি বল্লভ                                    হৃদয় জুড়াইতে
মিলয়ে কোটিমে একি॥

.                                                                                 
সূচীতে . . .   

টীকা -
১-৩। “সখি হে” ইত্যাদি। হে সখি! আমাকে (প্রেমের) অনুভব কি জিজ্ঞাসা করিচেছ ? সেই প্রেমকেই
অনুরাগ বলিয়া ব্যাখ্যা করি --- (যাহা) অনুক্ষণ অর্থাৎ ক্ষণে ক্ষণে নূতন (রূপে প্রতীত) হয়!
১২-১৫। “কত” ইত্যাদি। কত রসিক ব্যক্তি রস অর্থাৎ অনুরাগকে প্রশংসা করিয়া থাকেন ; (কিন্তু)
অনুরাগের (প্রকৃত) অনুভব কাহাতেও দেখিতে পাই না। কবিবল্লভ কহেন---হৃদয় জুড়াইবার জন্য (প্রাণের
মানুষ) কোটির মধ্যে একটি পাওয়া যায়। সতীশচন্দ্র রায়, শ্রীশ্রীপদকল্পতরু।

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

এই পদটি সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বৈষ্ণব পদরত্নাবলী” সংকলন, ১৯৬১-তে এইভাবে রয়েছে।

সখি হে কি পুছসি অনুভব মোয়।
সোই পিরিতি                                 অনুরাগ বাখানিতে
তিলে তিলে নূতন হোয়॥
জনম অবধি হাম                                    রূপ নেহারলুঁ
নয়ন না তিরপিত ভেল।
সোই মধুর বোল                                    শ্রবণহিঁ শুনলুঁ
শ্রুতিপথে পরশ না গেল॥
কত মধু-যামিনী                                  রভসে গোঙায়লুঁ
না বুঝলুঁ কৈছন কেল।
লাখ লাখ যুগ                                   হিয়ে হিয়ে রাখলুঁ
তবু হিয়া জুড়ন না গেল॥
কত বিদগধ জন                                     রস অনুমগন
অনুভব কাহু না পেখ।
কহ কবি বল্লভ                                    হৃদয় জুড়াইতে
লাখে না মিলল এক॥

.                                                                                 
সূচীতে . . .   

ব্যাখ্যা -
রাধা বলছেন---সখি, তুমি আমাকে আমার অনুভূতির কথাটি জিজ্ঞাসা করো ? সেই ভালবাসার অনুভূতি
আমি ব্যাখ্যা করি কী ভাবে, তা যে ক্ষণে ক্ষণে নব নব রুপে আসে প্রাণে। মনে হয় যেন জন্মাবধি আমি ঐ
রুপ দেখছি, কিন্তু দেখে দেখে আমার চোখের সাধ মিটল না। তোর সেই সুন্দর কথা আমি কান দিয়ে
শুনেছি বটে, কিন্তু আমি এতই মুগ্ধ যে, তার কোনো কথার অর্থই আমার হৃদয়গোচর হয়নি। কত ফাল্গুনের
রাত তারই সঙ্গে সানন্দ প্রেমের লীলায় কেটে গেল---কিন্তু কে যে কী আচরণ করেছি তার কিছুই বুঝিনি---
অখন আর তা স্মরণে নেই। যেন মনে হয় লক্ষ-লক্ষ যুগ তার বক্ষে বক্ষ রেখেছি তবু তো হৃদয় শীতল হল
না, কত রসিকজন পৃথিবীতে আছেন, কিন্তু প্রেমের সবটুকু অনুভব করতে পেরেছেন এমন তো কাউকে
দেখলাম না। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈষ্ণব পদরত্নাবলী, পৃষ্ঠা ১৬৯।


টীকা -
সারদাচরণ মিত্র মহোদয় এই পদটি বিদ্যাপতি ঊণিতায় পাইয়াছিলেন। যিনিই ইহা লিখুন তিনি যে
উচ্চস্তরের কবি ছিলেন সন্দেহ নাই। রসকদম্ব-এর লেখক কবিবল্লভ অথবা নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্য
বল্লভদাসের পক্ষে এ ধরণের পদ লেখা সম্ভব মনে হয় না। অথচ ‘সোই পিরিতি অনুরাগ বাখানিয়ে /
অনুখণ নৌতুন হোয়’ অর্থাৎ সেই প্রেমকেই অনুরাগ বলিয়া ব্যাখ্যা করি যাহা ক্ষণে ক্ষণে নূতন বলিয়া মনে
হয় --- এই ভাবটি শ্রীরূপের প্রদত্ত অনুরাগের সংজ্ঞার যেন অনুবাদ।

উজ্জ্বলনীলমণিতে (১৪। ১৪৬) আছে ---
সদানুভূতমপি যঃ কুর্ষ্যান্নবনবং প্রিয়ম্।
রাগো ভভন্নবনবঃ সোহনুরাগ ইতীর্য্যতে॥

অর্থাৎ, যে রাগ নবনবায়মান হইয়া সর্বদা অনুভূত প্রিয়জনকেও অননুভবৎ প্রতীয়মান করায়, প্রতিক্ষণে
নবীনতা দান করে --- তাহাকেই অনুরাগ বলে। সেই জন্য পদটি কোন চৈতন্যোত্তর কবির বলিয়া অনেকে
মনে করেন।” বিমানবিহারী মজুমদার, পাঁচশত বত্সরের পদাবলী।

.                                                                                 
সূচীতে . . .   

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত, বৈষ্ণবদাস সংকলিত, বৈষ্ণব পদাবলীর শ্রীশ্রীপদকল্পতরু
পদকল্পতরুর পঞ্চম খণ্ডের ভূমিকায়, নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিদ্যাপতি ঠাকুরের পদাবলী, ১৯০৯-তে এই পদটি
সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে লিখছেন . . . “নগেন্দ্র বাবু তাঁর ‘পাঠ নির্ণয়’ শীর্ষকের ২’৯০ পৃষ্ঠায় এই পদের
মৈথিল যে পাঠ ‘প্রকৃত’ বলিয়া প্রদর্শিত করিয়াছেন, আলোচনার সুবিধার জন্য উহা নিম্নে উদ্ধৃত হইল,---


সখি হে কি পুছসি অনুভব মোয়।
সোই পিরিতি অনুরাগ বাখানইতে
তিলে তিলে নূতন হোয়॥
জনম অবধি হম রূপ নিহারল
নয়ন না তিরপিত ভেল।
সোই মধুর বোল শ্রবণহি শুনল
শ্রুতি-পথে পরশ না গেল॥
কত মধু-যামিনি        রভসে গমাওল
না বুঝল কৈসন কেল।
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখল
তৈও হিয় জুড়ন ন গেল॥
যত যত রসিক জন রসে অনুমগন
অনুভব কাহু ন পেথ।
বিদ্যাপতি কহ প্রাণ জুড়াইত
লাখে না মিলল এক॥

.                                                                                 
সূচীতে . . .   

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিদ্যাপতি ঠাকুরের পদাবলী, ১৯০৯, পৃষ্ঠা ৪৯৪, পদসংখ্যা ৮৩৪-তে পদটি যেভাবে
রয়েছে . . .

(রাধার উক্তি)

সখি কি পুছসি অনুভব মোয়।
সেহো পিরিতি অনুরাগ বাখানইত
তিলে তিলে নূতন হোয়॥ ২॥
জনম অবধি হম রূপ নিহারল
নয়ন ন তিরপিত ভেল।
সেহো মধুর বোল শ্রবণহি শুনল
শ্রুতিপথে পরশ না গেল॥ ৪॥
কত মধু যামিনি        রভসে গমাওল
না বুঝল কৈসন কেল।
লাখ লাখ যুগ হিয় হিয় রাখল
তইও হিয়া জুড়ল ন গেল॥ ৬॥
কত বিদগদ জন রস অনুমগন
অনুভব কাহু ন পেথ।
বিদ্যাপতি কহ প্রাণ জুড়াইত
লাখে না মিলল এক॥ ৮॥

.                       *************************                      
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এ সুখে বিহি কি পুরায়ব সাধা
কবি কবিবল্লভ
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”-এর পৃষ্ঠা ৩৫।


এ সুখে বিহি কি পুরায়ব সাধা।
সোই হইবে বুঝিরুপনিধি রাধা॥
জদি মোহে না মিলিবে সো বর রামা।
তবে জিউ ছাড়ব রাখব কোন কামা॥
তোহে ভেল দূতী পাস ভেলি আশা।
জিউ রাখব কিয়ে করিব উদাসা॥
শুনিঞ বচন দুতী য়ই অবিলম্বে।
আওল চলি জাহা রমণীকদম্বে॥
কহে কবিবল্লভে শুন ব্রজবালা।
হরি জপয়ে তুয়া গুণ মণিমালা॥

.         *************************           
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কুচপর হাত ধয়ল বলী
কবি কবিবল্লভ
দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত, বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায়
সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”-এর পৃষ্ঠা ৪৯।


কুচপর হাত ধয়ল বলী।
কমল গরাসল কমলকলি॥
অধরে অধরে কিয়ে লাগল দ্বন্দ্ব।
কমল পীএ কি কমলমকরন্দ॥
এত বুঝি কিঙ্কিণি করয়ে ফুকার।
রাধা মদন না করে পরচার॥
দৃঢ় পরিরম্ভণে হিয়ে হিয়ে লাগ।
টুটল হার লাজ ভয় ভাগ॥
শ্রমজলে পূরিত ভেল দোহ দেহা।
জনু ঘন বিজুরি ভৈ গেল নব নেহা॥
একই জীবন একই পরাণ।
পহিলহি হোয়ল রাধা কান॥
এত জানি মনমথ করল বিবেক।
আনি করল দুহু তনু তনু এক॥
কহে কবিবল্লভ আর কি বিচার।
এ দুহু মূরতি রস অবতার॥

.         *************************           
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর