কবি রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর কবিতা গান ও বৈষ্ণব পদাবলী
*
বৈষ্ণব পদাবলী

জয় জয় শচীর নন্দন গোরারায়
কবি অকিঞ্চন দাস
( রায় বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র )
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মহাজন পদালী সংকলন
“শ্রীপদামৃতমাধুরী”, ৬০৮-পৃষ্ঠা। রায় বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত সংকলনে এই পদটি পেয়েছি
বলেই আমরা এই পদটি তাঁর পাতায় এখানে তুলেছি। কিন্তু আমরা প্রামাণিক ভাবে বলতে পারছি না যে
পদটি তাঁরই রচনা। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান", ১ম
খণ্ডের ১৭৫-পৃষ্ঠায় রয়েছে যে তিনি অকিঞ্চন দাস নাম ব্যাবহার করতেন।

বসন্ত পঞ্চমী

শ্রীগৌরচন্দ্র।

॥ বসন্তরাগ - তেওট॥

জয় জয় শচীর নন্দন গোরারায়।
প্রথম ঝতু বিহরে নদীয়ায়॥
নিত্যানন্দ অদ্বৈত গদাধর সঙ্গ।
দামোদর নরহরি মাধব তরঙ্গ॥
মুকুন্দ মুরারী বসু রামানন্দ গায়।
মধুর মৃদঙ্গ জগদানন্দ বায়॥
নাচত রঙ্গে শ্রীনবদ্বীপ রায়।
দূরে রহি অকিঞ্চন দাস গুণ গায়॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অন্যান্য কবিতা

অন্ন দে মা অন্নপূর্ণা
কবি রায় বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ অগ্রহায়ণ ১৩৫০ এবং পত্রিকার মাঘ ১৩৫০ ( নভেম্বর ১৯৪৩
ও জানুয়ারী ১৯৪৪ ) সংখ্যায় প্রকাশিত।

॥ রামপ্রসাদী সুর॥

এস মা আনন্দময়ী নিরানন্দ এ ভুবনে।
বিশ্ব যে আজ শ্মশান হলো চাহ কৃপা আঁখি-কোণে॥
অনশন দাবানলে
দেশ যে হায় গেল জ্বলে
শ্মশান ভূমে আয় মা নেমে ( যদি ) বাঁচাবি মুমূর্ষু জনে॥
সচল কঙ্কাল মত, কাতরা জননী কত
শতছিন্ন বাসে ঢাকি শিশুরে মরণাহত ;
একি দৃশ্য! হায় অদৃষ্ট! দেখা যায় না দুনয়নে॥
রণচণ্ডীর অট্টহাসি
তাও তুলেছে উপবাসী
ক্ষুধার অন্ন মিলুক আগে, রণে শঙ্কা নাই মরণে ;
অন্ন দে মা অন্নপূর্ণা নিরন্ন সন্তানগণে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কৈশোর স্বপ্ন
কবি রায় বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৫০ ( মে ১৯৪৩ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত।


এত নৃত্য, এত গীত, এত কোলাহল
শুধাইছ তবু কেন চোখে মোর জল ?

মনে পড়ে বৃন্দাবন স্বপ্ন কৈশোরের
ভুলিব কেমনে বন্ধু ব্যথা মরমের!

ছায়া ঘেরা বনভূমি শ্যামলতমাল
এঁকেছে প্রকৃতি সে কি ছবি সুরসাল!

মনে পড়ে যমুনার পুলিন শোভন,
নীপশাখে ময়ূরের পুচ্ছ প্রসারণ ;

মল্লিকা মালতী যূথী কুসুমের মেলা,
মাধবীর গুচ্ছে কত ভ্রমরের খেলা।

যমুনার কালো জলে তরুণীর দল,
বিকশিত শত শত সোনার কমল।

গানে গানে ছেয়ে দিত আকাশ ভুবন,
কি আনন্দ কি পুলক! সাধের স্বপন!

তমালের ডালে বাঁধি ফুলের ঝুলনা
কত প্রেমে ঝুলাইত কিশোরী ললনা!

বন ফুলে মালা গাঁথি দোলাইত গলে,
প্রেমে প্রাণ গলাইত প্রতি পলে পলে।

তেমন চাঁদিনী রাতি কোথায় কি আছে!
বাতাস মদির গন্ধে মাতাল হয়েছে!

যমুনার কুলুকুলু কোকিল কুহরে,
অধীরা ললনাকুল পুলকে শিহরে।

সে সুখের দিনগুলি আসে কি আবার ?
তাই ভাবি তিক্ত মোর সকল সংসার।

বনফুল-মালা আর পরাবে না কেহ,
ছুটিবে না বাঁশী শুনে পরিহরি গেহ!

রাজত্বের বন্দীশালে আমি অধিরাজ!
উত্সবের উত্স মাঝে দৈন্য দেয় লাজ।

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কন্যাকুমারী
কবি রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ, অগ্রহায়ণ ১৩৫০ এবং পত্রিকার মাঘ ১৩৪৭
(ফেব্রুয়ারী ১৯৪১) সংখ্যায় প্রকাশিত।


অয়ি শুচিস্মিতা সিন্ধুস্নাতা কন্যাকুমারী তুমি কি মাতা ?
তুমি সে সাধিকা চির আরাধিকা যোগমগনা তপস্যারতা!

সীমাহীন মহা জলধির বুকে মুক্তি লভিল হেথায় ধরা
একাকিনী সেই বিজনপ্রান্তে কি সাধনে রত আপন হারা!

কোথা গিরিরাজ জনক তোমার কোথায় জলধি অতলস্পর্শ॥
কার তরে এই চির অভিসার কে জাগালো প্রাণে বিপুল হর্ষ?

ত্রিজগৎ মাঝে আর কেবা আছে শিবের সমান যোগ্যবর?
তাঁরি গলে বর মালা অর্পিতে মহাতপ যুগ যুগান্তর।

ভাঙ্গিল ধেয়ান টলিল আসন মহাযোগীশ্বর করুণাকর,
বরবেশে সাজি পরমোল্লাসে বৃষভবাহনে চলিলা হর।

পথ সুদুস্তর বৃষভমন্থর বিবাহ-লগন হইল পার,
স্তম্ভিত পথে বরের যাত্রা নিয়তির গতি দুর্নিবার।

হেথায় বালিকা অর্ঘ্য সাজায় অক্ষত সিন্দুর কজ্জলে
মঙ্গল শঙ্খ সঘনে বাজায় ললাটিকা শোভে উজ্জ্বলে।

কুরুবক মালা করে লয়ে বালা অধীর প্রতীক্ষা---ভোটিবে বর,
রূপের ঝলকে চমকে বিজলি উছলিছে মহীমহাসাগর।

কোথা বর কোথা বিবাহবাসর নিরানন্দ সারা জগৎময়!
ব্যর্থ জীবন ব্যর্থ আরাধন সুকুমারী চিরকুমারী রয়!

মলয়ে শ্বসিল দীর্ঘনিশ্বাস জলধি উঠিল উচ্ছসি
দূরে নটরাজ ঊর্দ্ধ তাণ্ডবে নাচে বাঘাম্বর পড়িল খসি।

বরমালা কন্যা ফেলিল সলিলে পুলিনে ছড়ালো অর্ঘ্যখালি
দাঁড়াইল যেন পাষাণ প্রতিমা আভরণ সব ফেলিল খুলি।

দিগ্ বধুগণ-নয়ন-অশ্রু শেফালি হইয়া ঝরিল পায়,
অযুতকণ্ঠে জয়ধ্বনি উঠে কুমারী-পূজার বেলা যে যায়

যুগযুগান্ত বহি একান্তে বিরহের গুরু দুঃখ-ভার,
মহাযোগিনী-বিগ্রহ রাজে চিরকুমারীর ব্যর্থতার।

বরমালা করে তেমনি রয়েছে মিলনের আশা অন্তহীন
ধ্যান ধরি’ বালা অপলক নেত্রে যাপিছে বিরলে রজনী দিন।

ভারতমাতার চরণ পদ্ম চুমিছে সিন্ধু-সঙ্গমে,
যেথা দুখহীন অসীম শান্তি বিরাজে স্থাবর জঙ্গমে ;

গগনে পবনে চির বসন্ত বহে ধরণীর বিজয়-বাণী
যুগে যুগে সেথা ব্রতচারিণী পতি-আশে রাজে কুমারীরাণী।

যে বরণ ডালা মনোদুখে বালা ছড়ায়ে ফেলিল বালুকাতটে
সেই অক্ষত কজ্জল সে সিন্দুর আছে তেমনি বটে!

আজিও সিন্ধু নিতিনিতি মালা গাথিয়া সাজায় তটের বুকে
বরুণ আলয়ে জলকন্যাগণ মঙ্গলশঙ্খ বাজায় সুখে।

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   

[ ভারতের শেষ প্রান্তে কন্যাকুমারী
(Cape Comorin) তিন দিকে বিশাল সমুদ্র---পূর্বে  
বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর---তাহারই সঙ্গমে  যে
স্থলবিন্দু, তাহাতেই কন্যাকুমারীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত। স্থলপুরাণে গিরিরাজকন্যা উমার  
তপস্যার কাহিনী বিবৃত আছে। কন্যাকুমারী হইতে আট কি দশ মাইল দূরে শুচীন্দ্র মন্দিরে
শিবের মূর্ত্তি আছে।  প্রবাদ এই যে, শিব সেই  পর্যন্ত আসিতে আসিতে কলিযুগের আরম্ভ  
হয়। কলিযুগে দেবতাদের বিবাহ নাই। চিদম্বরমে শিবের উর্দ্ধতাণ্ডব নটরাজ মূর্ত্তি আছে।
কন্যাকুমারীর বালুকা দেখিতে আতপ চাউলের ন্যায়। সমুদ্রের কোলে লাল এবং  কালো  
বালুও রহিয়াছে---উহাই বরণডালার সিন্দুর এবং কজ্জল। ]


.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৈষ্ণব পদাবলী

করুণ দুটি অরুণ দিঠি
ভণিতা অকিঞ্চন দাস
কবি অকিঞ্চন দাস
( রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র )
১৯৪১ সালে প্রকাশিত, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের “কীর্তন প্রবেশিকা”, ১০৯-পৃষ্ঠা। গানটি প্রথমে "সংহতি" পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়। গানটিতে সুরারোপ করেন শশাঙ্কশেখর চট্টোপাধ্যায়। এই গানটি, গ্রন্থের পরিশিষ্টে,
আধুনিক কালের দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও অশ্বিনীকুমার দত্তের গানের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে বলে ধরে নিতে
পারছি যে গানটি "অকিঞ্চন দাস" ভণিতায় স্বয়ং রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রেরই লেখা। এই গ্রন্থে কোথাও
বলা হয়নি যে তিনিই এই অকিঞ্চন দাস।

সর্ব্বকালোচিত শ্রীগৌরচন্দ্র

॥ মিশ্র মল্লার - ঝাঁপতাল॥

করুণ দুটি অরুণ দিঠি,                                মৃদু মৃদপ ভাখই
আকুল কুল-ললনা কুল হেরি।
ভুতলে কিয়ে খসল শশী                              হরিণী বনে ধাবই
প্রেম কিয়ে মুরতি ধরু ফেরি॥
গমন জিনি নটন ঠাম                               রুচির তনু অনুপাম
বরণে ভেল উজর জগমাহ।
নয়ন জনু শাঙন ঘোর                                বরিখে রস বাদর
কো করু সব অবগাহ॥
গৌর গুণ গৌরব                                        অন্তরহি গরগর
জগত-জন মগন ভেল গানে।
দুর্মতি অকিঞ্চন                                        দাস ইহ বঞ্চিত
করম দোষে গরল করু পানে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর