কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো। আমাদের ঠিকানা - srimilansengupta@yahoo.co.in
কবি কুমুদানন্দ - ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, দীনবন্ধু দাস সংকলিত “সংকীর্ত্তনামৃত”-এ এই কবির একটিই শ্রীকৃষ্ণের বাললীলার পদ রয়েছে “কাঁচা মরকত নবনি জড়িত”। পদে কেবল ভণিতা রয়েছে কুমুদানন্দ। কবির পুরো নাম বা পদবী দেওয়া নেই।
বিষয়ের নিরিখে রামগোপাল দাসের “শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”, বা তাঁর পুত্র পীতাম্বর দাসের রচিত “রসমঞ্জরী” বা “অষ্টরস ব্যাখ্যা” গ্রন্থে বাললীলার পদ আশা করা যায় না। কিন্তু পদটি রাধামোহন ঠাকুরের পদামৃতসমুদ্র, নরহরি চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকর ও গীতচন্দ্রোদয় এবং বৈষ্ণব দাসের পদকল্পতরুতেও নেই। সম্ভবত এই কারণেই এই কবিকে অনেকে বৈষ্ণবদাস পরবর্তী কবি বলে মনে করতে পারেন।
পদটির প্রথম প্রকাশের গ্রন্থ সংকীর্তনামৃতের ইতিহাস - পাতার উপরে . . . পদটি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের “বৈষ্ণব পদাবলী” তে থাকলেও অন্য কোনো প্রাচীন পদাবলী গ্রন্থে নেই। মনে রাখতে হবে যে ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের “বৈষ্ণব পদাবলী” প্রকাশিত হবার অনেক পূর্বেই, দীনবন্ধু দাসের সংকীর্তনামৃত গ্রন্থটি সর্বসমক্ষে চলে এসেছিল। ১৯২১ সালের মার্চ মাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের ৪২৮টি পুথি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতের সভাপতি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর হাতে অর্পণ করেন। সেই ৪২৮টি পুথির মধ্যে এই দীনবন্ধু দাসের “সংকীর্ত্তনামৃত” পুথিটিও ছিল। পুথিটি হাতে পাওয়ার পরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পক্ষে বই আকারে প্রকাশিত হয় অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায়, ১৯২৭ সালে।
দুজন কুমুদানন্দের উল্লেখ - পাতার উপরে . . . পদটি বৈষ্ণবদাস পরবর্তি "সংকীর্তনামৃত" গ্রন্থে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বলে এই কবিকে অনেকেই বৈষ্ণবদাস পরবর্তি কবি বলে মনে করেন। আমরা, দুজন পরম বৈষ্ণব কুমুদানন্দের কথা জানতে পারছি। তাঁদের দুজনেই চৈতন্য সমসাময়িক বলে মনে হচ্ছে। এই পদটি সম্ভবত কোনো কারণে পূর্বেকার সংকলকদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। সেই দুজন কুমুদানন্দ হলেন . . .
১। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বাঙ্গালার ইতিহাস” ২য় খণ্ডের ২১৪-পৃষ্ঠায়, কৃষ্ণদাস কবিরাজের জীবনী অধ্যায়তে এক কুমুদানন্দের উল্লেখ রয়েছে . . . “. . . যৌবনে নিত্যানন্দের শিষ্য মীনকেতনের সাক্ষাৎ পাইয়া কৃষ্ণদাস গৃহত্যাগ করিয়াছিলেন এবং চারিশত ক্রোশ পদব্রজে অতিবাহিত করিয়া বৃন্দাবনে উপস্থিত হইয়াছিলেন। একোনাশীতি বর্ষ (৭৯) বয়ঃক্রমকালে বৃন্দাবনৰাসী গোবিন্দ গোস্বামী, যাদবাচার্য্য গোস্বামী, ভূগর্ড গোস্বামী, চৈতন্যদাস, কুমুদানন্দ চক্রবর্তী, কৃষ্ণদাস চক্রবর্তী, শিবানন্দ চক্রবর্তী-প্রমুখ বৈষ্ণৰ প্রধানগণের অনুরোধে, তিনি চৈতন্যচরিতামৃত রচনা আরম্ভ করিয়াছিলেন।” সুতরাং এই কুমুদানন্দ চৈতন্য সমসাময়িক।
২। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৫ জুন, ২০১৬, আনন্দবাজার পত্রিকাতে প্রকাশিত তাঁর “রাজার দান প্রত্যাখ্যান করলেন কুমুদানন্দ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“অদ্বৈতাচার্যের পুত্র বলরামের কনিষ্ঠ পুত্র এবং মথুরেশ গোস্বামীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সাধক কুমুদানন্দ গোস্বামী পাগলা গোস্বামী বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। পরম বৈষ্ণব কুমুদানন্দ ছিলেন নিরাসক্ত নিবিষ্ট সাধক। বিষয় সম্পত্তির জগৎ থেকে বহু দূরে থাকতেন তিনি। শোনা যায় একবার নদিয়ারাজের পক্ষ থেকে তাঁকে কিছু সম্পত্তি দান করতে চাইলে, তিনি তা অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। রাজার দান ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই তিনি পাগলা গোঁসাই নামে খ্যাত হন।”
এই কুমুদানন্দ ছিলেন অদ্বৈতাচার্যের (১৩৫৫ - ১৪৮০ শকাব্দ) অর্থাৎ (১৪৩৩ - ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দ) পৌত্র। এক প্রজন্মোর ২৫ বছর ধরলে এই কুমুদানন্দের জন্ম ১৪৮৩খৃষ্টাব্দের আসেপাশে ধরা যেতে পারে, যাতে কি না তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রায় সমবয়স্ক প্রতিপন্ন হচ্ছেন।
এঁরা কেউই পদকর্ত্তা ছিলেন কি না তা জানা যায় না ঠিকই, কিন্তু পরম বৈষ্ণব এবং সেকালের উচ্চশিক্ষিত হবার সুবাদে পদাবলী রচনা, তাঁদের পক্ষে অসম্ভব কাজ ছিল না বলে মনে করা যেতেই পারে। দুজনেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক।