| কবি লোচনদাসের লোচন ও লোচনাদাস ভণিতার বৈষ্ণব পদাবলী |
| বিষ্ণুপ্রিয়ার বারমাস্যা ফাগুনের পূর্ণমাসী তুমার জন্মদিনে ফাগুনে গৌরাঙ্গচাঁদ পূর্ণিমা দিবসে ফাল্গুনে গৌরাঙ্গচাঁদ পূর্ণিমা দিবসে ফাল্গুনে পৌর্ণমাসী তোমার জন্মদিনে বৈশাখে চম্পকলতা নৌতুন গামছা ভণিতা লোচন দাস কবি লোচন দাস এই পদটি আনুমানিক ১৫৬০ সাল নাগাদ জয়ানন্দ দ্বারা বিরচিত, ১৯৭১ সালে বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় দ্বারা সম্পাদিত “চৈতন্যমঙ্গল”, বৈরাগ্য খণ্ড - ২৩, ১২১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক জয়ানন্দের ভণিতাতে পাওয়া এই পদটি পদকল্পতরুতে লোচন দাসের ভণিতাতে পাওয়া গিয়েছে। এ নিয়ে পদকল্পতরু থেকে সতীশচন্দ্র রায়ের টীকা সেই পদের শেষে দেওয়া হলো। ॥ সিন্ধুড়া রাগ॥ ফাগুনের পূর্ণমাসী তুমার জন্মদিনে। উদ্ধর্ত্তন তৈল স্নানে কর গৃহাঙ্গনে॥১ পিষ্টক পাএশ পুষ্প ধূপ দীপ গন্ধে। সংকীর্ত্তনে নাচ প্রভু পরম আনন্দে॥২ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে॥ ধ্রু। তুমার জন্মতিথি পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বাল বৃদ্ধ যুবা॥৩ চৈত্রে চাতক পাখি পিউ পিউ ডাকে। শুনি জে প্রাণ করে তা কহিব কাকে॥৪ প্রচণ্ড উদ্ভট বাত তপ্ত শিকতা। কেমতে ভ্রমিবে প্রভু পদাম্বুজ রাতা॥৫ ও গৌরাঙ্গ প্রভু তুমার নিদারুণ হিয়া। গঙ্গাএ প্রবেশ করি মরু বিষ্ণুপ্রিয়া॥৬ বৈশাখে চম্পকমালা নৌতন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলি বন্ধনের কঁছা॥৭ চন্দনে চর্চ্চিত অঙ্গ সরু পৈতা কান্ধে। রূপ দেখ্যা কুলবধু বুক নাঞি বান্ধে॥৮ ও গৌরাঙ্গ হে বিষম বৈশাখের রৌদ্রে। তুমার বিচ্ছেদে মরি সর্ব্বত্র দুঃখ-সমুদ্রে॥৯ বসন্ত কোকিল পাখি ডাকে কুহু কুহু। তুমা না দেখিয়া মূর্ছা যায় মুহুর্মুহু॥১০ চুতাঙ্কুর খায়্যা মত্ত ভ্রমরের রোলে। তুমি দূর দেশে আমি যুড়াব কার কোলে॥১১ মোরে না জায় ভাণ্ডিয়া। মনের পুড়নি কারে কহিব ভাঙ্গিয়া॥১২ জ্যৈষ্ঠ মাসে সুবাসিত জলে স্নান করাইব। দিব্য ধৌত সরু বস্ত্র অঙ্গে পরাইব॥১৩ গঙ্গাজল চামরে চৌদিক দিব বা। রিদএ তুলিয়া লব দু’খানি রাঙ্গা পা॥১৪ আমি কি বলিতে জানি। বিশল্য কাণ্ডেতে জেন বিকল হরিণী॥১৫ আষাঢ়ে নৌতন মেঘ দর্দ্দুরের নাদ। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিল বিবাদ॥১৬ মেঘের শবদ শুনি মউরের নাট। কেমনে বঞ্চিব আমি নদিআর বাট॥১৭ মোরে সঙ্গে লৈয়া জায়। জথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তা চায়॥১৮ শ্রাবণে সলিল ধারা ঘনে বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব আমি রহিব আর কোথা॥১৯ লক্ষ্মীবিলাস গৃহে পালঙ্ক শয়নে। সে সব চিন্তিতে আর না জিব শ্রাবণে॥২০ প্রভু তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥২১ ভাদ্রে ভাস্বত তাপ সহনে না জাএ। কাদম্বিনী নাদে নিদ্রা মদন জাগাএ॥২২ যার প্রাণনাথ ভাদ্রে না থাকে মন্দিরে। প্রাণ উচাটন তার বজ্রাঘাত শিরে॥২৩ বিষম ভাদ্রের খরা। জীয়ন্তএ মরা প্রাণনাথ নাঞি জারা॥২৪ আশ্বিনে অম্বিকা পূজা আনন্দিত মহী। কান্ত বিনু সে দুঃখ কাহার প্রাণে সহি॥২৫ শরৎ সমএ শোভা নদীয়া নগরী। গৌরচন্দ্র রমণী তারকা সারি সারি॥২৬ মোরে কর উপদেশ। যথা থাক তথা থাক করিহ উদ্দেশ॥২৭ কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয় বা। করঙ্গ কপীন কত আচ্ছাদিব গা॥২৮ কত পুণ্য করিয়া হইল্যাঙ তুমার দাসি। ইবে অভাগিনী হব হেন প্রায় বাসি॥২৯ তুমি সর্ব্বভূত অন্তরয্যামী। তুমার সমুখে কি বলিতে জানি আমি॥৩০ হেমন্তে নৌতন ধান্য জগত প্রকাশে। সর্ব্বসুখময় গৃহ কি কাজ সন্ন্যাসে॥৩১ পাট নেত ভোট শ্বেত শল্বাত কম্বলে। সুখে নিদ্রা জাঅ আমি থাকি পদতলে॥৩২ তুমি সর্ব্ব জীবের অধিকারী। কত দুঃখ বিন দিবে হঅ্যা দণ্ডধারী॥৩৩ পৌষে প্রবল শীত জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত আলিঙ্গনে শীত তিলেক না থাকে॥৩৪ তপ্ত জলে স্নান তুমার অগ্নি জ্বলে পাশে। নানা সুখ আমোদ করহ গৃহ বাসে॥৩৫ পৌষে প্রবাস তুমার নাঞি সহে। সঙ্কীর্ত্তন অধিক ধর্ম্ম সন্ন্যাস নহে॥৩৬ মাঘ মাসে স্না কর হবিষ্যান্ন খায়। শ্রীভাগবত পড় শিষ্যেরে পড়ায়॥৩৭ বলি বস্য শ্রাদ্ধ কর ভূদেব আচার। পবিত্রতা দেখি নবদ্বীপে চমত্কার॥৩৮ বিষম মাঘ মাসের শীতে। কত নিবারণ দিব এ দারুণ চিতে॥৩৯ বিষুণুপ্রিয়া ঠাকুরাণী যত কৈল নিবেদন। দৃকপাত না করে প্রভু না করে শ্রবণ॥৪০ শ্রবণযুগলে প্রভু দিআ দুই হাত। জয়ানন্দ বলে প্রভু হা নাথ হা নাথ॥৪১ বিষ্ণুপ্রিয়া প্রবোধিআ চলিলা সন্ন্যাসে। সর্ব্বসুখ ছাড়ি প্রভু চলেন বিদেশে॥৪২ মহাবৈরাগ্য প্রকাশ। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রবোধিয়া চলিলা সন্ন্যাস॥৪৩ এই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩২৫ বঙ্গাব্দের (১৯১৮ সাল) ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা, ৯ম পল্লব, দ্বাদশমাসিক বিরহ। এই বারমাস্যা পদটি ১৭৭৭ ও ১৭৭৮-১৭৮৮ পদসংখ্যক পদাংশ-রূপে দেওয়া রয়েছে। পদটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক জয়ানন্দের ভণিতাতেও পাওয়া গিয়েছে। এ নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের টীকা পদের শেষে দেওয়া হলো। ॥ পঠমঞ্জরী বা কৌরাগিণী॥ ফাগুনে গৌরাঙ্গচাঁদ পূর্ণিমা দিবসে। উদ্ধর্তন-তৈলে স্নান করাব হরিষে॥ পিষ্টক পায়স আর ধূপ দীপ গন্ধে। সংকীর্ত্তন করাইব পরম আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার জন্মতিথি পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বালবৃদ্ধযুবা॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৭৮ সংখ্যাক পদ--- চৈত্রে চাতকপক্ষ পিউ পিউ ডাকে। তাহা শুনি প্রাণ কান্দে কি কহিব কাকে॥ বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহু কুহু। তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা পাই মুহুর্মুহু॥ পুষ্প-মধু খাই মত্ত ভ্রমরীর বোলে। তুমি দূর দেশে আমি গোঙাইব কার কোলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে আমি কি বলিতে জানি। বিষাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৭৯ সংখ্যাক পদ--- বৈশাখে চম্পকলতা নৌতুন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলি বসনের কোঁচা॥ কুঙ্কুম চন্দন অঙ্গে সরু পৈতা কান্ধে। সে রূপ না দেখি মুঞি জীব কোন ছান্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম বৈশাখের রৌদ্র। তোমা না দেখিয়া মোর বিরহ-সমুদ্র॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮০ সংখ্যাক পদ--- জ্যৈষ্ঠে প্রচণ্ড তাপ তপত সিকতা। কেমনে বঞ্চিবে প্রভু পাদাম্বুজ রাতা॥ সোঙরি সোঙরি প্রাণ কান্দে নিশি দিন। ছটফট করে যেন জল বিনে মীন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার নিদারুণ হিয়া। অনলে প্রবেশ করি মরিবে বিষ্ণুপ্রিয়া॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮১ সংখ্যাক পদ--- আষাঢ়ে নৌতুন মেঘ দাদুরীর নাদে। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে॥ শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরের নাট। কেমনে যাইব আমি নদীয়ার বাট॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে সঙ্গে লৈয়া যাও। যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮২ সংখ্যাক পদ--- শ্রাবণে ললিত ধারা ঘন বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা॥ লক্ষ্মীর বিলাস-ঘরে পালঙ্কে শয়ন। সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৩ সংখ্যাক পদ--- ভাদ্রে ভাস্কর-তাপ সহনে না যায়। কাদম্বিনী-নাদে নিদ্রা মদন জাগায়॥ যার প্রাণনাথ প্রভু না থাকে মন্দিরে। হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা। জীয়ন্তে মরিল প্রাণনাথ নাহি যারা॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৪ সংখ্যাক পদ--- আশ্বিনে অম্বিকা-পূজা দুর্গা-মহোত্সবে। কান্ত বিনে যে দুখ তা কার প্রাণে সবে॥ শরত-সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে। হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে কর উপদেশ। জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৫ সংখ্যাক পদ--- কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা। কেমনে কৌপীন বস্ত্রে আচ্ছাদিবে গা॥ কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম দাসী। এবে অভাগিনী মুঞি হেন পাপ-রাশি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি অন্তরযামিনী। তোমার চরণে মুঞি কি বলিতে জানি॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৬ সংখ্যাক পদ--- অঘ্রাণে নৌতুন ধান্য জগতে বিলাসে। সর্ব্ব সুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে॥ পাট নেত ভোটে প্রভু শয়ন কম্বলে। সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার সর্ব্বজীবে দয়া। বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৭ সংখ্যাক পদ--- পৌষে প্রবল শীতে জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত-আলিঙ্গনে দুঃখ তিলেক না থাকে॥ নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূর দেশে। বিরহ-আনলে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে পরবাস নাহি সহে। সংকীর্ত্তন অধিক সন্ন্যাস-ধর্ম্ম নহে॥ শ্রীশ্রীপদকল্রতরুর ১৭৮৮ সংখ্যাক পদ--- মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব। তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব॥ এই ত দারুণ শেল রহল সম্প্রতি। পৃথিবীতে না রহল তোমার সন্ততি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে লেহ নিজ পাশ। বিরহ-সাগরে ডুবে এ লোচন দাস@॥ টীকা - @ - জয়ানন্দ রচিত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থে এই দ্বাদশমাসিক পদটী দৃষ্ট হয় ; উহাতে ‘এ লোচন দাস’ স্থলে ‘জয়ানন্দ দাস’ পাঠ আছে। জয়ানন্দ চৈতন্য প্রভুর প্রায় সম কালে এবং লোচন দাস তাঁহার কিঞ্চিৎ পরবর্তী সময়ে প্রাদুপ্ভুত হইয়াছিলেন ; সুতরাং এই পদটি লোচন দাসের রচিত হইলে, জয়ানন্দ কর্ত্তৃক তাহা ‘চৈতন্য মঙ্গল’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হওয়া সম্ভবপর বোধ হয় না ; পক্ষান্তরে লোচনদাসের ন্যায় প্রসিদ্ধ মহাত্মা কর্ত্তৃক যে জয়ানন্দের এইরূপ এরটি পদ অপপহৃত ও রূপান্তরিত হইবে, ইহাও বিশ্বাসযোগ্য নহে। সুতরাং এই পদটী প্রকৃতপক্ষে জয়ানন্দের রচিত হইলে কোন অনভিজ্ঞ কীর্ত্তন-গায়ক বা লিপিকর কর্ত্তৃক উহাতে ভ্রমবশতঃ লোচন দাসের ভণিতা সংযোজিত হইয়াছে, অথবা লোচন দাসের রচিত পদই পরবর্ত্তী কোন লিপিকর কর্ত্তৃক জয়ানন্দের ভণিতাযুক্ত হইয়া জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গলে সন্নিবেশিত হইয়াছে---এইরূপ অনুমান হয়। জয়ানন্দের স্বহস্তলিখিত চৈতন্য-মঙ্গল প্রাপ্ত না হইলে, তিনিই এ পদের রচয়িতা কি না নিঃসন্দেহে বলা যাইবে না।---সতীশচন্দ্র রায়, শ্রীশ্রীপদকল্পতরু॥ এই পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, (প্রথম সংস্করণ ১৯০২), ২৫৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ॥ পঠমঞ্জরী বা কৌরাগিণী॥ ফাল্গুনে গৌরাঙ্গচাঁদ পূর্ণিমা দিবসে। উদ্ধর্ত্তন-তৈলে স্নান করাব হরিষে॥ পিষ্টক পায়স আর ধূপদীপগন্ধে। সংকীর্ত্তন করাইব মনের আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে তোমার জন্মতিথি-পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বালবৃদ্ধযুবা॥ চৈত্রে চাতকপঙ্খী পিউ পিউ ডাকে। তাহা শুনি প্রাণ কাঁদে কি কহিব কাকে॥ বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহু কুহু। তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা যাই মুহুর্মুহু॥ পুষ্পমধু খাই মত্ত ভ্রমরীরা বুলে। তুমি দূরদেশে আমি গোঙাব কার কোলে॥ @ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে আমি কি বলিতে জানি। বিঁধাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ বৈশাখে চম্পকলতা নূতন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলিবসনের কোচা॥ কুঙ্কুম চন্দন অঙ্গে সরু পৈতা কাঁধে। সে রূপ না দেখি মুই জীব কোন ছাঁদে॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে বিষম বৈশাখের রৌদ্র। তোমা না দেখিয়া মোর বিরহসমুদ্র॥ জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড তাপ প্রকাণ্ড সিকতা। কেমনে বঞ্চিবে প্রভু পদাম্বুজরাতা॥ সোঙরি সোঙরি প্রাণ কাঁদে নিশি দিন। ছটফট করে যেন জল বিনু মীন॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে নিদারুণ হিয়া। আনলে প্রবেশি মরিবে বিষ্ণুপ্রিয়া॥ আষাঢ়ে নূতন মেঘ দাদুরীর নাদে। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে॥ শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরীর নাট। কেমনে যাইব আমি নদীয়ার বাট॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ মোরে সঙ্গে লৈয়া যাও। যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ শ্রাবণে ললিত ধারা ঘন বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা॥ লক্ষ্মীর বিলাস-ঘরে পালঙ্কে শয়ন। সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ ভাদ্রে ভাস্কত-তাপ সহনে না যায়। কাদম্বিনী-নাদে নিদ্রা মদন জাগায়॥ যার প্রাণনাথ প্রভু না থাকে মন্দিরে। হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা। প্রাণনাথ নাহি যার জীয়ন্তে সে মরা॥ আশ্বিনে অম্বিকাপূজা দুর্গামহোত্সবে। কান্ত বিনা যে দুঃখ তা কার প্রাণে সবে॥ শরত সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে। হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ মোরে কর উপদেশ। জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা। কেমনে কৌপীনবস্ত্রে আচ্ছাদিবা গা॥ কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম দাসী। এবে অভাগিনী মুই হেন পাপরাশি॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে অন্তরযামিনী। তোমার চরণে আমি কি বলিতে জানি॥ অগ্রাণে নূতন ধান্য জগতে বিলাসে। সর্ব্বসুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে॥ পাটনেত ভোটে প্রভু শয়ন কম্বলে। সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে তোমার সর্ব্বজীবে দয়া। বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ পৌষে প্রবল শীত জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত-আলিঙ্গনে দুঃখ তিলেক না থাকে॥ নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূরদেশে। বিরহ-আনলে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে পরবাস নাহি শোহে। সংকীর্ত্তন অধিক সন্ন্যাসধর্ম্ম নহে॥ মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব। তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব॥ এইত দারুণ শেল রহিল সম্প্রতি। পৃথিবীতে না রহিল তোমার সন্ততি॥ ও গৌরাঙ্গ পহুঁ হে মোরে লেহ নিজ পাশ। বিরহ-সাগরে ডুবে এ লোচন দাস॥ টীকা - @ - এই বিরহবর্ণনটীর প্রত্যেক মাসবর্ণনে লোচনদাস ছয়টী চরণ ব্যবহার করিয়াছেন। কিন্তু চৈত্রমাসবর্ণনে আটটী চরণ দেখা যায়। ইহাতে আমাদের সন্দেহ হয় যে @ চিহ্নিত চরণদ্বয় সুন্দর হইলেও প্রক্ষিপ্ত। ---জগবন্ধু ভদ্র, মৃণালকান্তি ঘোষ, “শ্রীগৌরপদতরঙ্গিণী”॥ এই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, ৪৬১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই গ্রন্থে, এই বারমাস্যার প্রতি মাসের পদকে একটি স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ধরা হয়েছে। দ্বাদস মাসিক বিরহ এক বৈশাখে চম্পকলতা নৌতুন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলি বসনের কোঁচা॥ কুঙ্কুম চন্দন অঙ্গে সরু পৈতা কান্ধে। সে রূপ না দেখি মুঞি জীব কোন ছান্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম বৈশাখের রৌদ্র। তোমা না দেখিয়া মোর বিরহ সমুদ্র॥ দুই জ্যৈষ্ঠে প্রচণ্ড তাপ তপত সিকতা। কেমনে বঞ্চিবে প্রভু পাদাম্বুজ রাতা॥ সোঙরি সোঙরি প্রাণ কান্দে নিশি দিন। ছটফট করে যেন জল বিনে মীন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার নিদারুণ হিয়া। অনলে প্রবেশ করি মরিবে বিষ্ণুপ্রিয়া॥ তিন আষাঢ়ে নৌতুন মেঘ দাদুরীর নাদে। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে॥ শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরের নাট। কেমনে যাইব আমি নদীয়ার বাট॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে সঙ্গে লৈয়া যাও। যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ চার শ্রাবণে গলিত ধারা ঘন বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা॥ লক্ষ্মীর বিলাসঘরে পালঙ্কে শয়ন। সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ পাঁচ ভাদ্রে ভাস্করতাপ সহনে না যায়। কাদম্বিনীনাদে নিদ্রা দূরেতে পলায়॥ যার প্রাণনাথ প্রভু না থাকে মন্দিরে। হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা। জীয়ন্তে মরিল প্রাণনাথ নাহি যারা॥ ছয় আশ্বিনে অম্বিকাপূজা দুর্গা মহোত্সবে। কান্ত বিনে যে দুখ তা কার প্রাণে সবে॥ শরত-সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে। হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে কর উপদেশ। জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ সাত কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা। কেমনে কৌপীন বস্ত্রে আচ্ছাদিবে গা॥ কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম দাসী। এবে অভাগিনী মুঞি হেন পাপরাশি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি অন্তরযামিনী। তোমার চরণে মুঞি কি বলিতে জানি॥ আট অঘ্রাণে নৌতুন ধান্য জগতে বিলাসে। সর্ব্ব সুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে॥ পাট নেত ভোটে প্রভু শয়ন কম্বলে। সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার সর্ব্বজীবে দয়া। বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ নয় পৌষে প্রবল শীতে জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত আলিঙ্গনে দুখ তিলেক না থাকে॥ নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূর দেশে। বিরহআনলে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে পরবাস নাহি সহে। সংকীর্ত্তন অধিক সন্ন্যাসধর্ম্ম নহে॥ দশ মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব। তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব॥ এই ত দারুণ শেল রহল সম্প্রতি। পৃথিবীতে না রহল তোমার সন্ততি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে আমি কি বলিতে জানি। বিষাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ এগার ফাল্গুনে গৌরাঙ্গ চাঁদ পূর্ণিমা দিবসে। উদ্বর্ত্তন তৈলে স্নান করাব হরিষে॥ পিষ্টক পায়স আর ধূপ দীপ গন্ধে। সংকীর্ত্তন করাইব পরম আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার জন্মতিথি পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বাল বৃদ্ধ যুবা॥ বার চৈত্রে চাতকপক্ষ পিউ পিউ ডাকে। তাহা শুনি প্রাণ কান্দে কি কহিব কাকে॥ বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহু কুহু। তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা পাই মুহুর্মুহু॥ পুষ্পমধু খাই মত্ত ভ্রমরীর বোলে। তুমি দূর দেশে আমি গোঙাইব কার কোলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে লেহ নিজ পাশ। বিরহসাগরে ডুবে এ লোচন দাস॥ এই পদটি ১৯৩৭-৫৩সালের মধ্যে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ড, ৩৪১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। শ্রীগৌরচন্দ্রের বিরহে শ্রীমতী বিষ্ণুপ্রিয়ার বারমাস্যা ( লোচন দাস ) ॥ পঠমঞ্জরি - একতালা॥ ফাল্গুনে গৌরাঙ্গ চাঁদ পূর্ণিমা দিবসে। উদ্বর্ত্তন তৈলে স্নান করাব হরিষে॥ পিষ্টক পায়স আর ধূপ দীপ গন্ধে। সংকীর্ত্তন করাইব পরম আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার জন্মতিথি পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বালবৃদ্ধযুবা॥ চৈত্রে চাতক পক্ষ পিউ পিউ ডাকে। তাহা শুনি প্রাণ কান্দে কি কহিব কাকে॥ বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহু কুহু। তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা যাই মুহুর্মুহু॥ পুষ্পমধু খাই মত্ত ভ্রমরীর বোলে। তুমি দূর দেশে আমি গোঙাইব কার কোলে॥ ১ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে আমি কি বলিতে জানি। বিষাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ বৈশাখে চম্পকলতা নৌতুন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলি বসনের কোঁচা॥ কুঙ্কুম চন্দন অঙ্গে সরু পৈতা কান্ধে। সে রূপ না দেখি মুঞি জীব কোন ছান্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম বৈশাখের রৌদ্র। তোমা না দেখিয়া মোর বিরহ সমুদ্র॥ জ্যৈষ্ঠে প্রচণ্ড তাপ তপত সিকতা। কেমনে বঞ্চিবে প্রভু পদাম্বুজ রাতা॥২ সোঙরি সোঙরি প্রাণ কান্দে নিশি দিন। ছটফট করে যেন জল বিনে মীন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার নিদারুণ হিয়া। অনলে প্রবেশ করি মরিবে বিষ্ণুপ্রিয়া॥ আষাঢ়ে নূতন মেঘ দাদুরীর নাদে। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে॥ শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরের নাট। কেমনে যাইব আমি নদীয়ার বাট॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে সঙ্গে লইয়া যাও। যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ শ্রাবণে গলিত ধারা ঘন বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা॥ লক্ষ্মীর বিলাস ঘরে পালঙ্কে শয়ন। সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ ভাদ্রে ভাস্কর-তাপ সহনে না যায়। কাদম্বিনী-নাদে নিদ্রা-মগন জাগায়॥ যার প্রাণনাথ প্রভু না থাকে মন্দিরে। হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা। জীয়ন্তে মরিল প্রাণনাথ নাহি যারা॥ আশ্বিনে অম্বিকা পূজা দুর্গামহোত্সবে। কান্ত বিনে যে দুখ তা কার প্রাণে সবে॥ শরত সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে। হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোর কর উপদেশ। জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা। কেমনে কৌপীন বস্ত্রে আচ্ছাদিবে গা॥ কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম দাসী। এবে অভাগিনী মুঞি হেন পাপ-রাশি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি অন্তরযামিনী। তোমার চরণে মুঞি কি বলিতে জানি॥ অঘ্রাণে নৌতুন ধান্য জগতে বিলাসে। সর্ব্ব সুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে॥ পাট নেত ভোটে প্রভু শয়ন কম্বলে। সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার সর্ব্বজীবে দয়া। বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ পৌষে প্রবল শীত জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত আলিঙ্গনে দুঃখ তিলেক না থাকে॥ নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূর দেশে। বিরহ-অনলে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে পরবাস নাহি সহে। সংকীর্ত্তন অধিক সন্ন্যাস-ধর্ম্ম নহে॥৩ মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব। তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব॥ এইত দারুণ শেল রহল সম্প্রতি। পৃথিবীতে না রহল তোমার সন্ততি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে লেহ নিজ পাশ। বিরহ-সাগরে ডুবে এ লোচন দাস॥ টীকা - ১ - এই কলিটি প্রক্ষিপ্ত বলিয়া বোধ হয়। প্রত্যেক মাসে ৬টি করিয়া চরণ আছে---চৈত্র মাসে ৮টি চরণ দেখা যায়। ২ - তোমার রক্তোত্পল সৃশ চরণ যুগল উত্তপ্ত বালুকা কেমন করিয়া সহিবে? ৩ - হরিনাম সংকীর্ত্তন অপেক্ষা কি সন্ন্যাস ধর্ম অধিক ফলপ্রদ? --- নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র, “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ড॥ এই পদটি ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সংকলিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, ৬৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। বিষ্ণুপ্রিয়া-বারমাস্যা ফাল্গুনে পৌর্ণমাসী তোমার জন্মদিনে উর্দ্বতন তৈলে স্নান কর গঙ্গাস্নানে। পিষ্টক পায়স আর ধূপ দীপ গন্ধে সংকীর্তনে নাচে প্রভু পরম আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার জন্মতিথি পূজা আনন্দিত নবদ্বীপে বাল বৃদ্ধ যুবা॥ চৈত্রে চাতক পক্ষী পিউ পিউ ডাকে শুনিয়া যে প্রাণ করে কি কহিব কাকে। বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহুকুহু তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা যাই মুহুর্মুহু। পুষ্পমধু খাই মত্ত ভ্রমরীর রোলে তুমি দূর-দেশে আমি গোঙাইব কার কোলে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে আমি কি বলিতে জানি বিষাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ বৈশাখে চম্পকমালা নৌতুন গামছা দিব্য ধৌত কৃষ্ণকলি বসনের কোঁচা। চন্দনে চর্চিত অঙ্গ সরু পৈতা কান্ধে সে রূপ না দেখি মুঞি জীব কোন ছান্দে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম বৈশাখের রৌদ্রে তোমার বিচ্ছেদে মরি বিরহ সমুদ্রে॥ জ্যৈষ্ঠে প্রচণ্ড তাপ তপত সিকতা কেমনে ভ্রমিবে প্রভু পদাম্বুজ-রাতা। সোঙরি সোঙরি প্রাণ কান্দে নিশিদিন ছটফট করে যেন জল বিনে মীন। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার নিদারুণ হিয়া গঙ্গায় প্রবেশ করি মরু বিষ্ণুপ্রিয়া॥ আষাঢ়ে নৌতুন মেঘ দাদুরীর নাদে দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে। শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরের নাট কেমনে বঞ্চিব আমি নদীয়ার বাট। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে সঙ্গে লইয়া যাও যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ শ্রাবণে সলিলধারা ঘনে বিদ্যুত্লতা কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা। লক্ষ্মীর বিলাস ঘরে পালঙ্কী শয়ন সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি বড় দয়াবান বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ ভাদ্রে ভাস্করতাপ সহনে না যায় কাদম্বিনী-নাদে নিদ্রা মদন জাগায়। যার প্রাণনাথ ভাদ্রে নাহি থাকে ঘরে হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা জীয়ন্তে মরিল প্রাণনাথ নাহি যারা॥ আশ্বিনে অম্বিকাপূজা আনন্দিত মহী কান্ত বিনে যে দুখ তা কার প্রাণে সহী। শরত-সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোর কর উপদেশ জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ কার্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা কেমনে কৌপীনবস্ত্রে আচ্ছাদিবে গা। কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম দাসী এবে অভাগিনী মুঞি হেন পাপরাশি। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি অন্তরযামিনী তোমার চরণে মুঞি কি বলিতে জানি॥ অঘ্রাণে নৌতুন ধান্য জগতে প্রকাশে সর্ব সুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে। পাট নেত ভোট প্রভু সকলাত কম্বলে সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার সর্বজীবে দয়া বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ পৌষে প্রবল শীত জ্বলন্ত পাবকে কান্ত-আলিঙ্গনে দুঃখ তিলেক না থাকে। নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূর-দেশে বিরহ-আননে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে পরবাস নাহি সহে সংকীর্তন-অধিক সন্ন্যাসধর্ম্ম নহে॥ মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব। এই ত দারুণ শেল রহল সম্প্রতি পৃথিবীতে না রহল তোমার সন্ততি। ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে লেহ নিজ পাশ বিরহ-সাগরে ডুবে এ লোচনদাস॥ এই পদটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, কাঞ্চন বসু সম্পাদিত পদাবলী সংকলন "বৈষ্ণব পদাবলী", ২৪৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। বৈশাখে চম্পকলতা নৌতুন গামছা। দিব্য ধৌত কৃষ্ণকেলি বসনের কোঁচা॥ কুঙ্কুম চন্দন অঙ্গে সরু পৈতা কান্ধে। সে রূপ না দেখি মুঞি জীব কোন . ছান্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম বৈশাখের . রৌদ্র। তোমা না দেখিয়া মোর বিরহ সমুদ্র॥ জ্যৈষ্ঠ প্রচণ্ড তাপ তপত সিকতা। কেমনে বঞ্চিবে প্রভু পাদাম্বূজ রাতা॥ সোঙরি সোঙরি প্রাণ কান্দে প্রাণ নিশি . দিন। ছটফট করে যেন জল বিনে মীন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার নিদারুণ . হিয়া। অনলে প্রবেশ করি মরিবে বিষ্ণুপ্রিয়া॥ আষাঢ়ে নৌতুন মেঘ দাদুরীর নাদে। দারুণ বিধাতা মোরে লাগিলেক বাদে॥ শুনিয়া মেঘের নাদ ময়ূরের নাট। কেমনে যাইব আমি নদীয়ার বাট॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে সঙ্গে লৈয়া . যাও। যথা রাম তথা সীতা মনে চিন্তি চাও॥ শ্রাবণে গলিত ধারা ঘন বিদ্যুল্লতা। কেমনে বঞ্চিব প্রভু কারে কব কথা॥ লক্ষ্মীর বিলাসঘরে পালঙ্কে শয়ন। সে সব চিন্তিয়া মোর না রহে জীবন॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি বড় দয়াবান। বিষ্ণুপ্রিয়া প্রতি কিছু কর অবধান॥ ভাদ্রে ভাস্করতাপ সহনে না যায়। কাদম্বিনীনাদে নিদ্রা দূরেতে পলায়॥ যার প্রাণনাথ প্রভু না থাকে মন্দিরে। হৃদয়ে দারুণ শেল বজ্রাঘাত শিরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে বিষম ভাদ্রের খরা। জীয়ন্তে মরিল প্রাণনাথ নাহি যারা॥ আশ্বিনে অম্বিকাপূজা দুর্গা মহোত্সবে। কান্ত বিনে যে দুখ তা কার প্রাণে সবে॥ শরত সময়ে নাথ যার নাহি ঘরে। হৃদয়ে দারুণ শেল অন্তর বিদরে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে কর উপদেশ। জীবনে মরণে মোর করিহ উদ্দেশ॥ কার্ত্তিকে হিমের জন্ম হিমালয়ের বা। কেমনে কৌপীন বস্ত্রে আচ্ছাদিবে গা॥ কত ভাগ্য করি তোমার হৈয়াছিলাম . দাসী। এবে অভাগিনী মুঞি হেন পাপরাশি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তুমি অন্তরযামিনী। তোমার চরণে মুঞি কি বলিতে জানি॥ অঘ্রাণে নৌতুন ধান্য জগতে বিলাসে। সর্ব সুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে॥ পাট নেত ভোটে প্রভু শয়ন কম্বলে। সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদতলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার সর্ব্বজীবে . দয়া। বিষ্ণুপ্রিয়া মাগে রাঙ্গা চরণের ছায়া॥ পৌষে প্রবল শীতে জ্বলন্ত পাবকে। কান্ত আলিঙ্গনে দুখ তিলেক না থাকে॥ নবদ্বীপ ছাড়ি প্রভু গেলা দূর দেশে। বিরহআনলে বিষ্ণুপ্রিয়া পরবেশে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে পরবাস নাহি সহে। সংকীর্ত্তন অধিক সন্ন্যাসধর্ম্ম নহে॥ মাঘে দ্বিগুণ শীত কত নিবারিব। তোমা না দেখিয়া প্রাণ ধরিতে নারিব॥ এই ত দারুণ শেল রহল সম্প্রতি। পৃথিবীতে না রহল তোমার সন্ততি॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে আমি কি বলিতে . জানি। বিষাইল শরে যেন ব্যাকুল হরিণী॥ ফাল্গুনে গৌরাঙ্গ চাঁদ পূর্ণিমা দিবসে। উদ্বর্ত্তন তৈলে স্নান করাব হরিষে॥ পিষ্টক পায়স আর ধূপ দীপ গন্ধে। সংকীর্ত্তন করাইব পরম আনন্দে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে তোমার জন্মতিথি . পূজা। আনন্দিত নবদ্বীপে বাল বৃদ্ধ যুবা॥ চৈত্রে চাতকপক্ষ পিউ পিউ ডাকে। তাহা শুনি প্রাণ কান্দে কি কহিব . কাকে॥ বসন্তে কোকিল সব ডাকে কুহু কুহু। তাহা শুনি আমি মূর্চ্ছা পাই . মুহুর্মুহু॥ পুষ্পমধু খাই মত্ত ভ্রমরীর বোলে। তুমি দূর দেশে আমি গোঙাইব কার . কোলে॥ ও গৌরাঙ্গ প্রভু হে মোরে লেহ নিজ . পাশ। বিরহসাগরে ডুবে এ লোচন দাস॥ . ************************* . সূচীতে . . . মিলনসাগর |